সিনেমার কাহিনির মূলে আমেরিকান সোসাইটির বর্ণবৈষম্য।… সরাসরি বলেই দেওয়া হয়েছে ছবির যাত্রা ঠিক কোথায়।

অনেক সময়ই এমন হয়। কোনো পরিচিত লোকের সাথে কথা বলার সময় আপনি খেয়াল করেন, তিনি আপাত সব ভাল কথা বললেও তার মুখভঙ্গিতে স্পষ্ট বিদ্রূপ। আপনি মোটা; আপনি জানেন আপনার স্বাস্থ্যের অবনতি হয় নাই; তারপরও সেই লোক আপনার কাঁধে হাত রেখে হাসিমুখে বললেন, “আরে, তুমি তো অনেক শুকায় গেছ!” এইরকম ঘটনায় আপনার তাৎক্ষণিক অনুভূতি প্রসঙ্গভেদে একেক রকম হতে পারে—বিরক্তি, রাগ বা ঘৃণা।

তবে প্রতি ক্ষেত্রে একটা প্রতিক্রিয়া আপনার মাঝে কাজ করবেই—তা হলো অস্বস্তি। এমনই কিছু অস্বস্তিকর কথোপকথন দিয়ে ভরা ‘গেট আউট’ সিনেমার অনেকগুলি সিক্যুয়েন্স। আর এর প্রতিটাতেই মূল চরিত্রের প্রতি খুব সহজে সহানুভূতিশীল হতে পারেন দর্শকরা।

সিনেমার কাহিনির মূলে আমেরিকান সোসাইটির বর্ণবৈষম্য। আমি বিশেষ করে স্বস্তি পেয়েছি এই নিয়ে, যে গল্পে এই ব্যাপারে কোনো প্রতীকের ব্যবহার করা হয় নাই। সরাসরি বলেই দেওয়া হয়েছে ছবির যাত্রা ঠিক কোথায়।

নায়ক ‘ক্রিস’, একজন আফ্রিকান-আমেরিকান মধ্যবয়সী যার গার্লফ্রেন্ড ‘রোজ’ সাদা চামড়ার এলিট পরিবারের মেয়ে। রোজ প্রথমবারের মত বাবা-মায়ের সাথে তার বয়ফ্রেন্ডকে দেখা করাতে নিয়ে যাচ্ছে। সমাজবাস্তবতা সম্বন্ধে সচেতন ক্রিস তার কাছে জানতে চায়—তার বাবা-মা কি আদৌ জানে যে ক্রিস কালো চামড়ার কিনা? রোজ তা নিয়ে তেমন উদ্বিগ্ন না। কারণ তার পরিবার নাকি লিবারেল। সম্ভব হলে তারা তৃতীয়বারের মতোও বারাক ওবামাকে ভোট দিত।

প্রথম দেখায় রোজের বাবা-মার মাঝে সে রকম প্রতিক্রিয়াই দেখা যায়। তারা ক্রিসকে সাদরে গ্রহণ করে। বাবা ‘ডীন আর্মিটাজ’ একজন নিউরোসার্জন; আর তার স্ত্রী ‘মিসি’ হিপনোথেরাপিস্ট। তাদের কথাবার্তা আন্তরিকতায় ভরপুর না হলেও অস্বাভাবিক না। হয়ত বেশিই মার্জিত। তবে আস্তে আস্তে ক্রিস কিছু অসংলগ্নতা টের পেতে থাকে।

পরিচালক জর্ডান পীল (জন্ম. নিউ ইয়র্ক, ইউনাইটেড স্টেটস, ১৯৭৯)

বাড়ির প্রধান পরিচারক-পরিচারিকা দুইজনই কৃষ্ণাঙ্গ। তার ওপর দু’জনের ভঙ্গিমা বেশ অদ্ভুতুড়ে। তাদের অভিব্যক্তিহীন চেহারায় ক্রিস তার জন্য যেন বিদ্রুপের আভাস দেখে। এক ফাঁকে ক্রিস আলাপ করতে যায় ওদের সাথে। তাতে অস্বস্তি আরো বাড়ে।

পরদিন আবার আর্মিটাজদের বাড়িতে তাদের বন্ধুদের আমন্ত্রণ। বার্ষিক এই আয়োজনে অংশ নিতে গিয়ে ক্রিস বেশ বিপাকে পড়ে। সবার ব্যবহার অনেক বেশি পরিশীলিত। এতজনের মাঝে ক্রিস ছাড়া শুধু আর একজনই কৃষ্ণাঙ্গ আছেন। তাকে পরিচিত মনে হওয়ায় তার সাথে কথা বলতে গিয়ে আরো অনাকাঙ্ক্ষিত সব পরিস্থিতির উদ্ভব হতে থাকে। সেসবের কেন্দ্রে ক্রিস নিজেই।

পরিচালক জর্ডান পীল (যিনি একজন আফ্রিকান-আমেরিকান) এর এই সিনেমাটা আমি দেখেছি সুবিধাজনক অবস্থান থেকে। ছবিতে মানুষের নিয়মিত কার্যকলাপের অসঙ্গতিগুলিকে সম্প্রসারিত করে দেখানোয় তেমনটা সম্ভব হয়েছে। কালো-সাদাময় রেসিজম আমাদের দৈনন্দিন জীবনে প্রকট আর প্রত্যক্ষ না। যদিও সূক্ষ্ম আর ঢিলাঢালাভাবে এইরকম রেসিজম আমাদের ভাবনাতেও আসে। তাই রেসিজমকে পাশ কাটিয়ে এই ছবি আমাদের আচারিক টিটকারি দিয়ে ধরার চেষ্টা করেছি আমি; যা প্রথম প্যারাতে স্পষ্ট।

জর্ডান পীল এই সিনেমার জন্য রেফারেন্স নিয়েছেন আইরা লেভিন এর উপন্যাস ‘দ্য স্টেপফোর্ড ওয়াইভস’ (১৯৭২) থেকে—সেখানে সায়েন্স ফিকশন আর হররের আদলে দেওয়া হয়েছিল নারীবাদী বক্তব্য।

আসলে স্যাটায়ারের বহিঃপ্রকাশ যদি কমেডি দিয়ে হতে পারে, তাহলে বক্তব্যের গাম্ভীর্য হররের উপযোগী আবহ তৈরি করে দিলেও অবাক হওয়ার কিছু নাই। এমনিতে হলিউডে হরর আর কমেডি ঘরানার মিশ্রণ নতুন কিছু না। সাহিত্যের আদলে একশ’ বছর আগে থেকেই ধারাটা চলছে। কিন্তু সিনেমায় বেশিরভাগ সময় দুই জঁনরার সম্মিলন ঘটে শুধু। যাতে পুরোভাগে থাকে কমেডি, আর হরর হয়ে যায় অতিরঞ্জন এবং ভায়োলেন্সের দৃশ্যায়ন। স্যাম রেইমি’র ‘ইভিল ডেড’কে (১৯৮১) এই ঘরানার সবচাইতে আধুনিক সংস্করণ বলা যায়।

তবে ‘গেট আউট’ যেন পরিমিতভাবে এই দুই জঁনরাকে তার চিত্রনাট্যের দু’প্রান্তে সন্তর্পণে ঝুলিয়ে রেখেছে—যার মাঝখানে উপকরণ হিসাবে আছে ড্রামা ও থ্রিলার। ফলে সমন্বয়টা ছিল সুচারু। আর এই সবকিছুর ভারসাম্য ধরে রেখেছিলেন পরিচালক পীল।

“হরর ও কমেডি জঁনরায় অনেক মিল আছে। এই দুই জঁনরাতে চিত্রনাট্যের গতি অনেক গুরুত্বপূর্ণ। আর দু’টাই চাইলে আমাদের সামনে অব্যক্ত অনেক কিছু প্রকাশ করে দিতে পারে।”—পরিচালকের এই মন্তব্যের প্রতিফলন সিনেমাতেও স্পষ্ট।

২০১২ সালে বন্ধু কীগান-মাইকেল কী এর সাথে ‘কী এন্ড পীল’ নামের বিখ্যাত কমেডি টিভি সিরিজ নির্মাণ করেছিলেন জর্ডান পীল। সেখানে তিন বছরেরও বেশি সময় কাজ করেছেন। তাই কমেডিতে তিনি ধাতস্থ। তবে এই সিনেমাতে কমেডির বেশিরভাগ যোগান দিয়েছে অভিনেতা লিল রেল হাওরি’র চরিত্রটি। ক্রিসের এই বন্ধু তার সব রকম কাজেই নাক সিঁটকায়। আর হাউরির কথা বলার ভঙ্গিমা তার প্রতিটা স্বাভাবিক সংলাপকেও করে দেয় হাস্যরসাত্মক। অথচ সাউন্ড ডিজাইন আর সম্পাদনার কৌশলে এই হাস্যরসের মাঝেও হররের প্রভাব কমে নাই। তাছাড়া গল্পের অধিকাংশ বদ্ধ পরিসরে হওয়ায় অতিপ্রাকৃতের আগমন ছিল অনেক বেশি কার্যকর।

৪৫ লাখ ডলার বাজেটের এই সিনেমার বক্স অফিসে আয় প্রায় ২৬ কোটি ডলার। স্বল্প বাজেটের সিনেমাগুলির আয়ের দিক থেকে এই ছবি বেশ কিছু রেকর্ড ভেঙে ফেলেছে। মৌলিক চিত্রনাট্য হতে নির্মিত কোনো পরিচালকের প্রথম ছবি হিসাবে এর আয় হলিউডের ইতিহাসে সবচাইতে বেশি।

এছাড়া সমালোচক মহলে এর আবেদন ছিল অভূতপূর্ব। এরকম জঁনরায় বর্ণবৈষম্যকে কটাক্ষ করা নিয়ে হয়েছে বিস্তর আলোচনা। আমেরিকার বর্তমান যুগের ভাবধারা ঠিকঠাক ধরতে পারায় সমালোচকরা আপ্লুত। ‘দ্য র‍্যাপ’ এর ফিল্ম ক্রিটিক আলনসো ডুরাল্ডি’র ভাষায়, “ছবিটি ‘কালোদের প্রতি সাদাদের ভীতির প্রতি কালোদের ভীতি’কে সফলভাবে তুলে ধরেছে।”

আমার ছোট রুমের বড় কম্পিউটার স্ক্রিনের সামনে বসে ছবিটা দেখে তা ‘যুগের ভাবধারা’ কতটা ধরতে পারল কি পারল না সেটা ধরতে পারা আমার কাজ না মনে হয়। আমি এইটুকু বলতে পারি, রবের ব্রেঁসোর ভাষায়—ছবিটাতে ‘ন্যাচারালনেস’ আছে, কিন্তু ‘ন্যাচার’ কতটা আছে জানি না।