page contents
সমকালীন বিশ্ব, শিল্প-সংস্কৃতি ও লাইফস্টাইল

চার্লি কফম্যানের অ্যাডাল্ট অ্যানিমেশন — ‘অ্যানোমালিসা’

ইতালীয় থিয়েটার অভিনেতা লিওপোলদো ফ্রিগোলি (১৮৬৭-১৯৩৬) তার সময়ে ছদ্মবেশের সম্রাট ছিলেন। তার ত্বরিত বহুরূপী ক্ষমতা এতটাই কার্যকরী ছিল অনেকে ভাবতেন হয়ত তার জমজ কোনো ভাই আছে, যে তাকে মঞ্চের তাৎক্ষণিক চাহিদার সময় সাহায্য করে।

ফ্রিগোলি সোজাসাপটা মানুষ, নিজের সূত্র গোপন রাখেন নি। জমজ ভাইয়ের রটনা দূর করতে নিজেই সবাইকে হাতে ধরে শিখিয়ে দিতেন ছদ্মবেশের সব প্রণালী। তবে এই লোকের নাম নিয়ে পরবর্তীতে বেরসিক মনোবিদেরা অদ্ভুতুড়ে এক ব্যাধির নামে জুড়ে দেন। ‘ফ্রিগোলি ডিল্যুশন’ নামের মানসিক এই রোগে আক্রান্ত লোকজন চারপাশে শুধু ফ্রিগোলি সাহেবকে দেখে। না, আক্ষরিক অর্থে না—এই ব্যাধিগ্রস্ত মানুষের কাছে আশেপাশের সবাইকে একই লোক বলে মনে হয়, যেন ছদ্মবেশ নিয়ে চেহারা পাল্টে একজন লোকই বার বার তার সাথে সাক্ষাৎ করছে।

movie-review-logo

‘অ্যানোমালিসা’ ছবির মূল চরিত্র—ব্যবসায়ী ও সুবক্তা ‘মাইকেল’ যে এই বিশেষ রোগের শিকার সে রকম কোনো ঘোষণা অবশ্য কখনোই দেওয়া হয় না। তবে মাইকেল ওহাইয়ো’তে এসে যে হোটেলে রাত কাটায়, সেটার নাম দিয়ে ব্যাপারটা ধরিয়ে দিতে নির্মাতারা অযথা কারচুপি করেন নি।

annomalisa 1

অ্যানোমালিসা (২০১৫)

আর তাছাড়া আপনাকে আরো ভালোভাবে সবকিছু ধরিয়ে দিতে আছে শ্রুতিকটু এক সংযোজন। হ্যাঁ, এখানে তা আক্ষরিক অর্থেই—মাইকেল যতজন মানুষের সাথে এমনকি এক মুহূর্তের জন্যও কথোপকথনে জড়ায়, তাদের সবার কণ্ঠ একই; অন্তত তার কাছে একই শোনায়। কষ্টের ব্যাপার, সেই কণ্ঠ আবার পুরোদমে গুরুগম্ভীর এক পুরুষের। ফলে পানশালার তন্বী ওয়েট্রেস থেকে বদমেজাজি ট্যাক্সি ড্রাইভার, সবার গলার স্বর আপনার আঠারো বছরে শোনা বাবার বকুনির মতই লাগে।

নব্য ব্যবসায়ীদের এক সম্মেলনে উৎসাহমূলক ভাষণ দিতে মাইকেলের একদিনের জন্য ওহাইয়োতে আসা। বাসায় ফেলে আসা স্ত্রী তাদের একমাত্র ছেলেকে নিয়ে ব্যস্ত, ছেলেটিও নিজেকে নিয়েই ব্যস্ত; অন্তত হোটেল রুমের ভ্যাপসা আবেশে বসে স্ত্রীর সাথে তার টেলিফোনে কথা বলা দেখে তেমনটাই মনে হয়।

কাজেই ছবির একেবারে প্রথম দৃশ্যেই যখন আমরা মাইকেলকে উড়োজাহাজে বসে তার পুরনো প্রেমিকার চিঠি পড়তে দেখি। তা যেন পনেরো মিনিট পর যথার্থতা পায়। ওহাইয়োর বাসিন্দা ‘বেলা’র সাথে তার সম্পর্ক ছিল বেশ ক’বছর আগে। হয়তো সময়ের প্রয়োজনে তাকে ছেড়ে যেতে হয়েছিল, তবু বেলার ঘা শুকোনোর মৌসুম আর আসে নি। মাইকেল তার সংসারে নতুন জীবন পেলেও বেলার যাত্রা আটকে গেছে। ঠিক এমন পরিস্থিতিতে সাবেক ভালোবাসার পুনর্জাগরণ আশা করা বোকামি। এরপরও মাইকেলের ব্যর্থ চেষ্টা তাকে ভঙ্গুর করে দেয় আরও।

annomalisa-6

“নুয়ে পড়া মাইকেল হোটেল রুমে ফিরতেই তার জীবনধারাকে ছিন্ন করতে আসে এক অপরিচিতা।”

নুয়ে পড়া মাইকেল হোটেল রুমে ফিরতেই তার জীবনধারাকে ছিন্ন করতে আসে এক অপরিচিতা। ঠিক বজ্রপাতের মত মেয়েটি তার চেতনাকে বিদ্যুৎ ঝলকে আলোকিত করে, অনুরণিত হয় প্রতিটি অঙ্গ। এই তরুণীর কথাগুলি তার কানে সেই চিরায়ত ঝন ঝন হয়েই বাজে। হ্যাঁ, এ যে তারই গলা। তাদেরই কণ্ঠ।

নাম ‘লিসা’। মাঝবয়সী এই রমণীর সাথে মাইকেলের কাটানো সময়টুকু নিয়েই ছবিটির বাকিটুকু ভরা। তবে চুপিসারে ঢুকেছে আরো অনেক কিছু।

“স্টপ মোশন” অ্যানিমেশন দিয়ে ছবিটি বানানো। মানে চরিত্রমাফিক পুতুল বানিয়ে সেগুলির প্রতিটি অঙ্গভঙ্গির প্রথমে আলাদা আলাদা ছবি তোলা হয়। পরে সেগুলি একের পর এক চালিয়ে দিলেই পাওয়া যায় চলচ্চিত্রের ভ্রম।

annomalisa 2

“মাঝবয়সী এই রমণীর সাথে মাইকেলের কাটানো সময়টুকু নিয়েই ছবিটির বাকিটুকু ভরা।”

এখন অবশ্য কম্পিউটার দিয়ে সেই ভ্রমকে আরো জোরালো করা হয়। এছাড়া মুখভঙ্গির জন্য আছে থ্রিডি প্রিন্টিং। পরিচালক চার্লি কফম্যান, অ্যানিমেটর ডিউক জনসনের সহযোগিতায় প্রথমবারের মত অ্যানিমেশন পদ্ধতিতে নিজেকে জানান দিলেন। এই চিত্রনাট্যে তার একটি বিশেষ “শব্দনাটক” বানাবার ইচ্ছা ছিল, যাতে শ্রোতারা চরিত্রগুলির মিথষ্ক্রিয়ার কেবল শব্দ শুনতে পাবে, বাকিটুকু হবে নিজেদের কল্পনায়। অনেকটা রেডিওতে শোনা নাটকের মত। শেষমেশ পুতুলদের দিয়ে ঠিক অনুরূপ কিছু অর্জিত না হলেও একটি অনুপম অভিজ্ঞতার জন্ম হয়েছে তা নিশ্চিত।


অ্যানোমালিসা: অফিসিয়াল ট্রেইলার (২০১৫)

ছবির কাঠামো থেকে শুরু করে অদৃশ্য প্রতিটি গড়নে কাঁচামাল হিসেবে ছিল ‘বৈপরীত্য’। পুতুলদের মাঝে একেবারেই মানবিক সব অনুভূতির চর্চা দিয়ে এর শুরু। অ্যানিমেশনের ক্ষেত্রে সাধারণত যে অতিরঞ্জিত ও বিচিত্র মানবদেহের প্রদর্শন দেখা যায়, এখানে তা এড়ানো হয়েছে। প্রতিটি দৃশ্যে চরিত্রদের শারীরিক ভাষা যেন বাস্তবতার সূক্ষ্ম অনুকরণে একটু বেশিই সচেতন। আত্মিক ও জাগতিক নানা আদিম বাসনা দেখাতে এই পুতুলরা হয়তো মানুষের চেয়েও তৎপর।

ছবির একপর্যায়ে একটি ‘লং টেকের’ শেষদিকে লিসা ও মাইকেল দৈহিক লেনদেন শুরু করে। এই দীর্ঘ টেক-এর পুরোটা সময়েই আমাদের অবচেতন কিছুটা অস্বস্তিতে থাকে, যা ধীরে ধীরে দেহে ছড়িয়ে যায়। পরবর্তীতে অভিজ্ঞতাটির কথা মনে করলে অস্বস্তিটাকে লজ্জা বলে ভুল হয়। দু’টো পুতুল কামবোধ মিটিয়ে নিচ্ছে, আর আমরা কিনা সুড়সুড়ি খাচ্ছি!

annomalisa 3

চার্লি কফম্যান ও ডিউক জনসন

আখেরে ফল পাব না জেনেও নিতান্ত দায়িত্ববোধ থেকে করা কাজের যে অভিজ্ঞতা তার সাথে এই ছবি দেখার মিল আছে। মাইকেলের সাথে সাথে আমরাও জানি সবকিছু কতটা নগ্ন, সময়ের সাথে বহু কষ্টে জমানো আস্তরণটুকু কতটা সহজে স্বচ্ছ হয়ে যায়। কফম্যান সাহেব শুরু থেকেই আমাদের মনস্তত্ত্বে গর্ত খুঁড়ে আসছেন। ‘বিং জন ম্যালকোভিচ’ (১৯৯৯), ‘অ্যাডাপ্টেশন’ (২০০২), ‘ইটারনাল সানশাইন অফ দ্য স্পটলেস মাইন্ড’ (২০০৪)—সবগুলি ছবিতেই তিনি অল্প অল্প করে গর্তটা আরো গভীর করেছেন। এবার তা আরো কিছুদূর।

কমেন্ট করুন

মন্তব্য

About Author

আয়মান আসিব স্বাধীন
আয়মান আসিব স্বাধীন

জন্ম. ঢাকা। লেখক ও অনুবাদক। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ডেভেলপমেন্ট স্টাডিজ বিভাগে পড়ছেন। বই. সিনে-লয়েড (২০১৭, চৈতন্য)।

Leave a Reply