page contents
লাইফস্টাইল, সংস্কৃতি ও বিশ্ব

চ্যাপলিনের ইউরোপ গমন (১)

ভূমিকা / লুনা রুশদী

জীবনটা ক্লোজ-আপে দেখলে ট্রাজেডি, লং-শটে কমেডি।
—চার্লি চ্যাপলিন

চার্লি চ্যাপলিনের নাম কবে প্রথম শুনলাম মনে নাই, এখন ভাবলে মনে হয় জন্মের থেকেই জানি। যে দৃশ্যটা চোখে ভাসে তা ছোটবেলায় বাংলাদেশ টেলিভিশনে দেখা তার কোনো ছবির অংশ—একটা নামতে থাকা এসকেলেটর দিয়ে উপরে উঠতে চাইছেন চ্যাপলিন আর বারেবারেই পিছলাতে পিছলাতে নিচে পড়ে যেতে যেতে হয়রান কিন্তু কিছুতেই ওঠার চেষ্টা থামে না।

তার এই উল্টা রাস্তায় হাঁটতে চাওয়া আর বারে বারে আছাড় খাওয়া একদম ফাস্ট ফরোয়ার্ডে ঘটে যাচ্ছিল আর সাথের বাজনাটাও বিষয়টাকে আরো হাসির করে তুলছিল। তখন কী ভাবছিলাম জানি না এখন মনে হয় ইনিই চ্যাপলিন—তার ক্লোজ-আপে দেখা জীবন অন্যদেরকে দেখানোর সময় লং-শট হয়েছে।

chaplin-8

চার্লস স্পেন্সার চ্যাপলিন (১৮৮৯ – ১৯৭৭)

তার নাম—চার্লস স্পেন্সার চ্যাপলিন, পরবর্তীতে স্যার উপাধি পেয়েছিলেন। জন্ম ১৮৮৯ সালের ১৬ই এপ্রিল। তিনি বড় হয়েছেন লন্ডনে, প্রচণ্ড দারিদ্র্যে। তার মা ছিলেন মানসিক হাসপাতালে, বাবা নিখোঁজ। সে সময় গরীব, অনাথ, পঙ্গু, অবিবাহিত মা এবং বৃদ্ধদের জন্য ছিল ওয়ার্কহাউস। তারা বিভিন্ন কাজের পরিবর্তে সেখানে থাকা-খাওয়া পেত। চ্যাপলিন এর ৯ বছর বয়স হওয়ার আগেই তাকে দুইবার ওয়ার্কহাউসে পাঠানো হয়েছে।

খুব ছোটবেলা থেকেই তার অভিনয় জীবন শুরু হয়েছে বিভিন্ন মিউজিক হল ঘুরে ঘুরে, পরে মঞ্চ এবং কৌতুক অভিনেতা হিসাবেও কাজ করেছেন। ঊনিশ বছর বয়সে বিখ্যাত ফ্রেড কার্নো কোম্পানিতে নিযুক্ত হয়ে অামেরিকা চলে যান। এখান থেকেই সিনেমার দুনিয়া তাকে খুঁজে পেয়েছিল এবং ১৯১৪ সালে কিস্টোন স্টুডিওর সাথে কাজ করতে শুরু করেন। প্রায় শুরু থেকেই চ্যাপলিন তার নিজের ছবি পরিচালনা করতেন এবং এসানে, মিউচুয়াল, ফার্স্ট ন্যাশলান ইত্যাদি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের সাথে কাজ করার সময় তার কাজ আরো শানিয়ে নিয়েছিলেন।

'দ্যা কিড (১৯২১)' ছবির পোস্টার

‘দ্যা কিড (১৯২১)’ ছবির পোস্টার

১৯১৮ সালের মধ্যেই পৃথিবীর সবচেয়ে বিখ্যাত মানুষদের একজন ছিলেন চ্যাপলিন। ১৯১৯ সালে প্রতিষ্ঠিত ব্যবস্থাপক কোম্পানি ‘ইউনাইটেড আর্টিস্ট’ এর একজন প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন তিনি, এর মাধ্যমে তার নিজের তৈরি চলচ্চিত্রের সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ তার হাতে চলে আসে।

তার প্রথম ফিচার ছবি মুক্তি পেয়েছিল ১৯২১ সালে, নাম ‘দ্যা কিড’। এর পর ১৯২৩ সালে এসেছে ‘এ ওমেন অব প্যারিস’, ১৯২৫ সালে ‘দ্যা গোল্ড রাশ’ এবং ১৯২৮ সালে ‘দ্যা সার্কাস’। ত্রিশ এর দশকের সবাক চলচ্চিত্রের অংশ হতে রাজি হন নাই চ্যাপলিন বরং ১৯৩১ সালে নির্মাণ করেছেন ‘সিটি লাইটস’ এবং ১৯৩৬ সালে ‘মডার্ন টাইমস’—দুটিই কোনো সংলাপ ছাড়া। ১৯৪০ এ নির্মিত তার ছবি ‘দ্যা গ্রেট ডিকটেটর’ এ তিনি খুব রাজনৈতিক, এখানে অ্যাডলফ হিটলারকে ব্যঙ্গ করা হয়েছে।

চল্লিশের দশকে চ্যাপলিন নানা বিতর্কের বিষয় হয়ে পড়েন এবং জনপ্রিয়তাও দ্রুত কমতে থাকে। তাকে কমুনিস্টদের সহমর্মী হিসাবে দোষারোপ করা হতে থাকে এবং এ সময়ে অনেক অল্পবয়সী মেয়েদের বিয়ে ও পিতৃত্বের মামলায় জড়িয়ে যাওয়ায় তাকে ঘিরে বিভিন্ন স্ক্যান্ডাল জন্মেছিলো। এ সময় এফবিআই তদন্ত শুরু করে তাকে নিয়ে এবং শেষ পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্র ছেড়ে সুইজারল্যান্ড চলে যেতে বাধ্য হয়েছিলেন তিনি। তার পরবর্তী চলচ্চিত্রগুলির জন্য ‘ দ্যা ট্র্যাম্প’ বর্জন করেছিলেন। নতুন ছবির মধ্যে ছিল ১৯৪৭ এ নির্মিত ‘মঁসুর ভার্দো’, ১৯৫২ সালে ‘লাইমলাইট’, ১৯৫৭ তে ‘আ কিং ইন নিউ ইয়র্ক’ এবং ১৯৬৭ তে ‘আ কাউন্টেস ফ্রম হংকং’।

তিনি কাজ করেছেন প্রায় ৭৫ বছর ধরে। ১৯৭৭ সালের ২৫ ডিসেম্বর ৮৮ বছর বয়সে তার মৃত্যু হয়।

‘আমার বিদেশ যাত্রা’ বইটা প্রথম প্রকাশিত হয়েছে ১৯২২ সালে। ইংরেজিতে দুই নামে আছে বইটা ‘মাই ওয়ান্ডারফুল ভিজিট’ এবং ‘মাই ট্রিপ অ্যাব্রোড’।

প্রথমে সিরিয়াল হিসেবে একটা ম্যাগাজিনে ছাপা হয়েছিলো। ১৯২১ সালে লন্ডনে ‘দ্যা কিড’ এর মুক্তি উপলক্ষ্যে অনেক বছর পর চ্যাপলিন ইউরোপ ফিরেছিলেন।

সেই ভ্রমণ বৃত্তান্তই রয়েছে এই বইয়ে।


আমার বিদেশ যাত্রা

চার্লি চ্যাপলিন

অনুবাদ: লুনা রুশদী


ঠিক করলাম পালিয়ে যাবো

একটা স্টেক আর কিডনি পাই, ইনফ্লুয়েন্জা এবং একটা কেবলগ্রাম। সম্পূর্ণ বিষয়টার পেছনে রয়েছে এই তিনের জোট। অবস্থার চক্রে ইউরোপে ছুটি কাটাতে যাওয়ার সিদ্ধান্তের কারণ হিসাবে অবশ্য এর সাথে দেশের জন্য কিছুটা মন কেমন করা আর হাততালি পাওয়ার সাধটুকুও যোগ করা যেতে পারে।

chaplin-1a

“ইউরোপকে স্যালুট জানাই আমি।”—চ্যাপলিন

সাত বছর ধরে ক্যালিফোর্নিয়ার অবিরাম রোদ পোহানো হলো, যা কুপার-ইউয়িটস স্টুডিওর কারণে আরো বেশি উজ্জ্বল হয়ে উঠেছিল। সাতটা বছর ধরে একই জায়গায় একই রকম ভাবে চিন্তা-ভাবনা এবং কাজ করার থেকে কিছুদিন বিশ্রামের জন্য এই কিছু থেকে দূরে যেতে চাচ্ছিলাম। হলিউড, সিনেমা-পাড়া, দৃশ্যকল্প, সেলুলয়েডগন্ধি স্টুডিও, কন্ট্রাক্ট, প্রেস নোটিশ, এডিটিং রুম, ভিড়, স্নানরতা সুন্দরী, কাসটার্ড পাই, বিশাল জুতা আর ছোট্ট গোঁফ থেকে অনেক দূরে। একটা সাফল্যের পরিবেশে ছিলাম আমি, তবে আমার কেবলই মনে হচ্ছিল এই সাফল্য যেন ক্রমশ স্থবিরতার পথে চলেছে।

আমার মন ছুটি চাইছিল। লেখার শুরুতেই এই কথাগুলির সাথে যে মনের অবস্থা জড়িয়ে ছিল, সে সম্পর্কে ধারণা করা হয়তো সহজ নয়, তবে এইটুকু অন্তত নিশ্চিন্তভাবেই বলতে পারি যে এমনকি ভাঁড়দেরও কিছু সাধারণ যুক্তিসঙ্গত মুহূর্ত থাকে আর সে রকম কিছু আমাকে টানছিল।

উপরে যে তিনের জোটের কথা বললাম তারা প্রায় একসাথেই এসে পড়েছিল। আমি ‘দ্যা কিড’ এবং ‘দ্যা আইডল ক্লাস’ নামের ছবিগুলি শেষ করে নতুন আরেকটা শুরু করার প্রস্তুতি নিচ্ছিলাম। কোম্পানি কাজ শুরু করে দিয়েছিল, স্ক্রিপ্ট এবং বিন্যাসও ঠিকঠাক। ছবিটা নিয়ে একদিনের কাজও করেছি আমরা।

the-kid-4

“লন্ডন থেকে একটা কেবলগ্রাম অপেক্ষা করছিল আমার জন্য। তাতে বলা হয়েছে যে আমার সর্বশেষ ছায়াছবি ‘দ্যা কিড’ লন্ডনে মুক্তি পেতে যাচ্ছে, আর যেহেতু এটাই আমার সর্বশ্রেষ্ঠ কাজ হিসেবে প্রশংসিত হয়েছে, নিজের দেশ ঘুরে আসার এটাই যথার্থ সময়।”‘দ্যা কিড’ ছবিতে চ্যাপলিন ও জ্যাকি কুগান

আমার খুব ক্লান্ত লাগছিল, দুর্বল আর মনমরা। মাত্রই ইনফ্লুয়েন্জা থেকে সেরে উঠছিলাম। তখন আমার “এইসব করে কী আর হবে” ধরনের একটা মনোভাব কাজ করছিল। আমি যেন কিছু একটা চাইছিলাম অথচ নিজেই জানতাম না সেটা কী।

এর ভেতর একদিন মন্তাগ গ্লাস রাতের খাওয়ার দাওয়াত দিলেন পাসাডিনাতে তার বাড়িতে। অন্য আরো অনেক দাওয়াত ছিল, তবে এই দাওয়াতে নিশ্চিত করে বলা হয়েছিল যে স্টেক-অ্যান্ড-কিডনি পাই পরিবেশন করা হবে। যার প্রতি আমার ব্যাপক দুর্বলতা। সময়ের আগেই পৌঁছে গিয়েছিলাম। পাই তো না যেন এক সিম্ফনি। সন্ধ্যাটাও। মন্টি গ্লাস, তার আনন্দময়ী স্ত্রী, তাদের ছোট্ট মেয়ে, অংকনশিল্পী লুসিয়াস হিচকক এবং তার স্ত্রী—সব মিলিয়ে লাল আলো আর জ্যাজ অর্কেস্ট্রা বর্জিত ঘরোয়া এক পারিবারিক সন্ধ্যা। সেই পরিবেশে আমার ভেতর ভুলে যাওয়া কোনো স্মৃতির সুর বেজে উঠেছিল, কী একটা যেন মনে আসতে আসতেও হারিয়ে যাচ্ছিল।

the-idle-class-3

দ্যা আইডল ক্লাস (১৯২১)

পাই-য়ের ওপর সর্বশেষ আক্রমণের পর, বৈঠকখানায় খোলা আগুনের সামনে বসে আলাপ হল। স্টুডিওর হৈ চৈ অথবা অলস বকর বকর না। চিন্তার বিনিময় হল—চিন্তা যা অন্য চিন্তার ওপরে ভর দিয়ে গড়ে ওঠে। আমি আবিষ্কার করলাম মন্তাগ গ্লাস ‘পটাশ অ্যান্ড পার্লমাটার’ এর লেখকই শুধু নন, আরো অনেক কিছু। তিনি চিন্তা করতে জানতেন এবং তিনি একজন দক্ষ সঙ্গীতবিদ।

তিনি পিয়ানো বাজালেন। আমি গান গাইলাম। বিনোদন হিসেবে না বরং কয়েকজন মিলে ঘরোয়া একটা সুন্দর সন্ধ্যা কাটানোর অংশ হিসেবে। আমরা শেরেড খেললাম। খুব তাড়াতাড়ি শেষ হয়ে গেল সন্ধ্যাটা। আমার মনের ভেতর আকাঙ্ক্ষার জন্ম হল। ভাবলাম সত্যিকার অর্থে গৃহ মানে এটাই—একদম নিজের জায়গা। এখানে এমন একজন মানুষ থাকেন যিনি শৈল্পিক এবং বাণিজ্যিক দুইভাবেই সফল, আবার একই সাথে রাতে দরজা ভাল করে বন্ধ করতে, বিড়ালটাকে বাইরে ছেড়ে দিতে মনে রাখার মতন সচেতনতাও তার ভেতর বিদ্যমান।

লস অ্যান্জেলেসে ফিরলাম গাড়ি চালিয়ে। খুব অস্থির লাগছিল। লন্ডন থেকে একটা কেবলগ্রাম অপেক্ষা করছিল আমার জন্য। তাতে বলা হয়েছে যে আমার সর্বশেষ ছায়াছবি ‘দ্যা কিড’ লন্ডনে মুক্তি পেতে যাচ্ছে, আর যেহেতু এটাই আমার সর্বশ্রেষ্ঠ কাজ হিসেবে প্রশংসিত হয়েছে, নিজের দেশ ঘুরে আসার এটাই যথার্থ সময়। বহু বছর ধরে নিজেকেও এ রকম প্রতিশ্রুতি দিচ্ছিলাম।

যুদ্ধের পরের ইউরোপ দেখতে কেমন হবে?

এ নিয়ে অনেক ভাবলাম। আমি আমার কোনো ছবির উদ্বোধনেই উপস্থিত থাকি নি। লস অ্যান্জেলেসের প্রজেকশন রুমগুলিতেই দেখেছি। খুব জরুরি আর উদ্দীপক একটা বিষয় বাদ দিয়ে এসেছি এতদিন। আমার সফলতা ছিল, তবে তা যেন কোথাও বাক্সবন্দি করে রাখা। আমি কোনোদিন বাক্স খুলে তার স্বাদ নেই নি। আমি চাইতাম কেউ আমার পিঠ চাপড়ে দিক। আর সেটা খোদ ইংল্যান্ড থেকে আসাটা বেশ সুস্বাদু লাগছিল। তারা ইঙ্গিত দিয়েছিলেন আমি পারব, আমিও তাই লন্ডনকে মাতিয়ে দিতে চাইছিলাম। কে-ই বা তা না চাইবে?  আর কাজের চাপে স্নায়ুবৈকল্যের ভূত তো সারাক্ষণই ভয় দেখাচ্ছিল, সাথে ছিল ইনফ্লুয়েন্জা ভুগে ওঠার পরিণাম, স্টেক-আর-কিডনি পাইয়ের কথা আর না-ই বা বললাম।

সবচেয়ে আনন্দময় অনুভূতি আর তার সাথে সাথে বিশ্রামের প্রতিশ্রুতি আমায় হাতছানি দিয়ে ডাকছিল। আমি চাচ্ছিলাম সময় থাকতেই তা লুফে নিতে। হয়ত ‘দ্যা কিড’ ই আমার বানানো সর্বশেষ ছবি হবে। হয়তো আমার সারাজীবনে আর এই স্পটলাইট উপভোগ করার সুযোগ আসবে না। আমি ইউরোপ দেখতে চাইছিলাম—ইংল্যন্ড, ফ্রান্স, জার্মানি আর রাশিয়া। নতুন ইউরোপ।

আর ভাবা যাচ্ছিল না। আমি নতুন ছবি বানানোর প্রস্তুতি বন্ধ করে দিলাম। পরের রাতেই ইউরোপের পথে রওয়ানা দেয়ার সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেললাম। অনেকের নিষেধ, প্রতিবাদ ইত্যাদি না শুনেই কাজটা করলাম। টিকেট কেনা হলো, আমরা গোছগাছ করলাম; সবাই বেশ একটা ধাক্কা খেলো। তাতে খুশিই হলাম। সবাইকে চমকে দিতেই আমি চাইছিলাম।

পরের রাতে বোধ করি প্রায় সমস্ত হলিউড চলে এসেছিল লস অ্যান্জেলেসের ট্রেন স্টেশনে আমাকে বিদায় জানাতে। সঙ্গে তাদের বোন, কাজিন, খালা, ফুপু আরো অন্যান্য আত্মীয়স্বজন। সবাই জানতে চাইছিল আমি কেন যাচ্ছি? একটা গোপন কাজে, তাদের বললাম। বেশ সার্থক জবাব ছিল সেটা। প্রায় সবাই ধরেই নিল যে আমি ছবি তৈরির কন্ট্রাক্ট নিয়েই ইউরোপ যাচ্ছি। কিন্তু যদি বলতাম আমার মন ছুটি চাইছে, ওরা কি আমাকে বুঝত বা বিশ্বাস করত আমার কথা? মনে হয় না।

সেদিনও স্টেশনে অন্য সময়ের মতনই ভিড় জমেছিল। আমি বেশ অবাকই হয়েছিলাম যদিও। এ থেকেই ভবিষ্যৎ আঁচ করা যাচ্ছিল। সেদিনকার উল্লসিত ডামাডোলের ভেতর আমার দিকে ছুঁড়ে দেয়া কথার প্রায় কিছুই মনে নাই। শুধু একটা কথা মনে গেঁথে আছে। একদম শেষ মুহূর্তে আমার ভাই সিড আমার দলের একজনের কাছে ছুটে এসে চিৎকার করে বলেছিল—

“খোদার দোহাই লাগে, ওকে তোমরা বিয়ে করতে দিও না!”

ভিড়ের সবাই হেসে উঠেছিল তার কথায়, আমি ভয় পেয়েছিলাম।

ট্রেন চলতে শুরু করল আর আমিও ট্রেনের রুটিনমাফিক তিনদিনের আরামদায়ক ভ্রমণের জন্য গুছিয়ে বসলাম। মাঝে মাঝে ডাইনিং-কারে গিয়ে খাবার খেয়েছি আর মাঝে মাঝে আমাদের বসার ঘরেই। ঘুমিয়েছি খুব বাজে ভাবে। সব সময়েই তাই করি। বেড়াতে আমার একদমই ভাল লাগে না। লস অ্যান্জেলেসের প্লাটফর্মে ফেলে আসা চেহারাগুলিকে ক্রমেই আরো মায়াময় আর আকর্ষণীয় মনে হচ্ছিল। কাউকে তাড়িয়ে দেয়ার মতন চেহারা তো তাদের না। অথচ তাই তো করেছিল, অথবা হয়ত শুধুই আমার দেখার ভুল, মনের অস্থিরতা প্রসূত বিভ্রান্তি।

দুই হাজার মাইল ধরে আমরা একই জিনিস বহুবার করলাম, তার পুনরাবৃত্তিও করলাম। হয়তো ট্রেনেও অনেক দারুণ মানুষ ছিলেন। আমি খুঁজে দেখি নি। ট্রেনে সাধারণত ভাল কিছুর খোঁজ পাওয়ার থেকে ঝকমারির দাড়িপাল্লাই ভারি থাকে। বেশির ভাগ সময়টা সলিটেয়ার খেললাম। দুই হাজার মাইল যেতে যেতে অনেক বার খেলা যায়।

তারপর শিকাগো পৌঁছলাম। শিকাগো আমার ভাল লাগে, যদিও লম্বা সময়ের জন্য সেখানে থাকা হয় নি, তবে আসা-যাওয়ার পথে তার প্রচণ্ড কর্মব্যস্ততার ঝলক দেখতে পেয়েছি। এর ইতিহাসও অর্জনের সাক্ষ্য দেয়।

ব্যক্তিগতভাবে আমার কাছে অবশ্য, শিকাগো মানে কার্ল স্যান্ডবার্গ, তার কবিতা আমার খুব ভাল লাগে আর লস অ্যান্জেলেসে তার সাথে আমার দেখাও হয়েছিল। প্রিয় বন্ধু কার্ল এর সাথে অবশ্যই দেখা করতে হবে আর সেইসাথে ডেইলি নিউজ এর অফিসটাতেও একবার যেতে হবে। তারা দৃশ্যকল্পের উপর প্রকাণ্ড এক প্রতিযোগিতার ব্যবস্থা করেছিল, আমি ছিলাম বিচারকদের একজন, আর কার্ল স্যান্ডবার্গও ওই কাগজেই কাজ করেন।

আমাদের দলটা পৌঁছলো ব্ল্যাকস্টোন হোটেলে, এখানে আমাদের জন্য একটা সুইট এর ব্যবস্থা করা হয়েছিল। হোটেল ব্যবস্থাপকদের আতিথেয়তায় অভিভূত হয়ে গেলাম।

এরপর এলেন সাংবাদিকরা। সেই গতানুগতিক জিজ্ঞাসাবাদের ধরন বাদ দিয়ে এদের বর্ণনা করা যাবে না—

“চ্যাপলিন সাহেব, আপনি কেন ইউরোপ যাচ্ছেন?”

“ছুটি কাটাতে।”

“সেখানে গিয়ে কি কোনো ছবি বানাবেন?”

“না।”

“আপনার পুরানো গোঁফগুলি দিয়ে কী করেন আপনি?”

“ফেলে দেই।”

“আপনার পুরানো লাঠিগুলি দিয়ে কী করেন?”

“ফেলে দেই।”

“আপনার পুরানো জুতাগুলি কী করেন?”

“ফেলে দেই।”

সেই ছেলেটা অবশ্য ভালই করল। এই প্রশ্নগুলি করে ফেলতে পেরেছিল সে। তাকে পাশে সরিয়ে নতুন ইনিংস খেলতে নামল কাছিমের খোলের মত দেখতে চশমার ফ্রেমের ভেতর থেকে উঁকি দিতে থাকা একজোড়া কালো চোখ। আমার ঠোঁটে আবার সেই তৈরি হাসি ফিরিয়ে আনলাম যা এ রকম সাক্ষাৎকারের জন্য উপযোগী।

“চ্যাপলিন সাহেব, আপনার সঙ্গে কি আপনার লাঠি আর জুতাজোড়া রয়েছে?”

“না।”

“কেন?”

“আমি মনে করি না সেসবের দরকার হবে।”

“আপনি কি বিয়ে করতে যাচ্ছেন ইউরোপে?”

“না।”

ভিড়ের তোড়ে চশমা পরা সাংবাদিকও ভেসে গেল। সে চলে গেলে আমার হাসিটুকুও মিলিয়ে গেল, মুহূর্তের জন্য মাত্র। আবার জলদি তাকে ফিরিয়ের আনতে হল যখন কমবয়সী এক সুন্দরী এসে আমার বাহু স্পর্শ করলেন—

“চ্যাপলিন সাহেব, আপনি কখনো বিয়ে করবেন বলে মনে করেন?”

“হ্যাঁ।”

“কাকে বিয়ে করবেন?”

“তা তো জানি না।”

“আপনি কি “হ্যামলেট” সাজতে চান?”

“বাহ, এটা তো জানি না। কখনো ভেবে দেখি নাই। তবে আপনি যদি কোনো কারণে মনে করেন…।”

মেয়েটা চলে গিয়েছিল এর মধ্যেই। এবার ফ্লোর নিলেন এক বিভাগীয় আইনজীবী।

“চ্যাপলিন সাহেব, আপনি কি বলশেভিক?”

“না।”

“তাহলে ইউরোপ যাচ্ছেন কেন?”

“ছুটি কাটাতে।”

“কীসের ছুটি?”

“মাফ করবেন বন্ধুরা, ট্রেনে আমার একদম ঘুম হয় নাই, এবার ঘুমাতেই হবে।”

ফুটবল খেলোয়াড় যেমন গোলপোস্ট খুঁজে পায়, আমি দেখতে পেলাম শোবার ঘরের খোলা দরজায় এক বন্ধুত্বপূর্ণ হাতের হাতছানি। সেদিকে গেলাম। ভিতরে গিয়ে আসন্ন ছুটির দিনগুলিতে যে আতঙ্ক আমার জন্য অপেক্ষা করে আছে তা টের পাওয়ার অনেক সুযোগ মিলল। ভক্তদের ভিড় ভয় পাই না। সে রকম ভিড় ভালোবাসি। তারা বন্ধুত্বসুলভ এবং তাৎক্ষণিক। তবে ইন্টারভিউ নিতে আসারাই ভয়ানক!

এরপর বেশ নিরাপদেই পৌঁছলাম ডেইলি নিউজের অফিসে। সেখানে আলোকচিত্রীদের সাথে দেখা হল। আমার জন্য মোটেই আনন্দের বিষয় না যদিও। ছবি তুলতে ভীষণ বাজে লাগে আমার। কিন্তু ছবি তুলতে হল দরকারে। প্রতিযোগিতায় আমি ছিলাম বিচারক আর বিচারকের ছবিও থাকতে হবে।

আমি সবসময় ভাবতাম বিচারককে দেখতে হবে বেশ সম্ভ্রান্ত ধরনের, কিন্তু ওরা আমাকে অন্যরকম শেখালো। পত্রিকার ফটোগ্রাফারের মতে বিচারককে দাঁড়াতে হবে হেঁটমুণ্ডু-উর্ধ্বপদ অবস্থায় একটা পা পুবের দিকে তাক করে। তারা একটা গোঁফ লাগিয়ে দেয়ার পরামর্শও দিল, সাথে একটা ডার্বি টুপি আর বেতের লাঠি।

একদম অনিবার্যই ছিল সেটা।

চ্যাপলিন কিছুতেই আমার পিছু ছাড়ছিল না।

অথচ আমি একটা ছুটি চাইছিলাম ভীষণ ভাবে।

তবে কার্ল স্যান্ডবার্গের সাথে দেখা হল। দারুণ দুর্দশার ভেতর মরূদ্যানের মতন। সেই বরাবরের কার্ল। তিনি লস অ্যান্জেলেসের দিনগুলি স্মরণ করলেন। তার সাথে দারুণ ভাল আড্ডা হল।

হোটেলে প্রত্যাবর্তন।

সাংবাদিক। আরো সাংবাদিক। মহিলা সাংবাদিক।

এক প্রচার যজ্ঞ।

“চ্যাপলিন সাহেব…”

আমি পালিয়ে বাঁচলাম। আহ্‌, বেডরুমটা খুব কাজের! বোঝা যাচ্ছে অভ্যাসের একটু হলেও দাম আছে। প্রথম বারের চেয়ে দ্বিতীয় বারের চেষ্টায় সাংবাদিকদের সহজে এড়ানো গেছে। ভাবলাম এই থিওরি পরীক্ষা করে দেখতে হবে যে আসলেই বেডরুমে পালিয়ে বাঁচার ব্যাপারে বেশ সুদক্ষ হয়ে উঠেছি কিনা। থিওরি বাজিয়ে দেখার জন্য সাহস করে ঘর থেকে বের হলাম সাংবাদিকদের মোকাবেলা করতে। ওরা ততক্ষণে চলে গেছে। যখন আবার রিহার্সাল হিসেবে ঘরে আশ্রয় নিলাম, ব্যাপারটা জমল না। কারণের অবর্তমানে, পরিনামও অস্তিত্বহীন।

কিছু খাওয়া-দাওয়া, গোছগাছ, তারপর আবার ট্রেন। এবার নিউইয়র্কের পথে। আবার ভিড়। এই ভিড় আমার প্রিয়। ক্যামেরা, তবে যেহেতু আমাকে তার সামনে দাঁড়াতে হয় নি, তাই সেটাও এবার খারাপ লাগল না।

কার্ল এসেছিলেন আমাকে বিদায় জানাতে।

carl-sandburg-1

কার্ল স্যান্ডবার্গ (১৮৭৮ – ১৯৬৭)। আমেরিকান কবি, লেখক, সম্পাদক।

তার জন্য আলাদা করে ভাল কিছু করতে অথবা বলতেই হবে আমাকে। এমন কিছু যা তার ভাল লাগবে। কী যে বলা যায় ভেবে পাচ্ছিলাম না। আমি এমনি আবোল-তাবোল বকছিলাম। আমার মনে হচ্ছিল তিনিও আমার অসারতা টের পেয়ে যাচ্ছিলেন। তার কবিতার পঙ্‌ক্তি মনে করার চেষ্টা করছিলাম আবৃত্তি করে শোনানোর জন্য। কিছুই মনে আসছিল না। তারপর মনে এল—অনুপ্রেরণা।

“কার্ল, আপনার কবিতার বই কোথায় কিনতে পাব?” হড়বড় করে বলে ফেললাম। এখন আর ফেরত নেয়া যাবে না।

“যে কোনো বইয়ের দোকানেই পাবেন।”

তিনি হয়ত স্বাভাবিক ভাবেই বলেছিলেন। আমার কানে ধমকের মতন শোনাচ্ছিল।

হায় গড, কত বড় আহাম্মক আমি! আমার বিশ্রাম দরকার। মাথা কিছুতেই কাজ করছে না। মুখ বাঁচানোর জন্য বলার মতন কিছুই ভেবে পেলাম না। তাও ভাল, ট্রেনটা চলতে শুরু করল তখন। আশা করি এই লেখা পড়ার সময়, যদি কখনো পড়েন, কার্ল আমাকে মাফ করে দেবেন।

আবার ট্রেনের ছাড়া-ছাড়া ঘুম, আরো সলিটেয়ার, সময় মতন খাবার, তারপর পৌঁছলাম নিউ-ইয়র্ক।

ভিড়। সাংবাদিক। ফটোগ্রাফার। আর ডাগলাস ফেয়ারব্যাংকস। বেচারা ডাগ। সে তার সাধ্যমতন চেষ্টা করেছে। তবে তখন পর্যন্ত তার কোনো ছবির জন্য সাংবাদিক এবং ফোটোগ্রাফারদের সামলাতে হয় নাই। যত রকম ভাবে শরীর বাঁকানো যায় সব রকম ভঙ্গিতেই আমার ছবি তুললেন তারা। এর ভেতর দুইজনের ভেতর তর্ক লেগে গেল যে আমি পুবে তাকাবো নাকি পশ্চিমে, তারা আমাকে নিয়ে চরম টানাহ্যাঁচড়া শুরু করে দিলেন।

কেউ জিততে পারলেন না। মাঝখান থেকে আমি হারলাম। আমার শরীর তো আর টেনে দুই ভাগ করা যায় না। কাপড় কিন্তু যায়—আর হয়েও ছিল তাই।

তবে ডাগ জলদি আমাকে ঠিকঠাক করে একটা গাড়িতে চড়িয়ে নিল। আমিও হাঁপাতে হাঁপাতে কুশনে হেলান দিয়ে বসলাম।

ডাগ আর আমি চললাম রিটজ হোটেলের দিকে।

ভিড়টাও সেখানেই গেল।

অন্তত আমার তো তাই মনে হল। কারণ সেখানেও ভিড় ছিল আর আমি ভেবেছিলাম সেই একই ভিড় এখানেও জমেছে। এমনকি যেন পরিচিত চেহারাও উঁকি দিচ্ছিল ভিড়ের ভেতর থেকে। ক্যামেরা তো দেখেছি অবশ্যই। তবে এবার বেশ সফলতার সাথেই ভিড়টা এড়ানো গেল। বিশেষ করে হোটেলের বেয়ারা আর দারোয়ানদের সাহায্যে দরজা থেকে লবি পর্যন্ত জামার একটা বোতামও না হারিয়ে পার হতে পেরেছি।

বেশ নিজেকে বুদ্ধিমান আর ভারমুক্ত লাগছিল। দেখা গেল স্বস্তির নিঃশ্বাসটা একটু জলদিই নিয়ে ফেলেছিলাম। উপরে আমাদের সুইটে গিয়ে দেখি সাংবাদিক ভদ্রলোকেরা এবং একজন ভদ্রমহিলা অপেক্ষা করছেন।

“চ্যাপলিন সাহেব, আপনি ইওরোপ কেন যাচ্ছেন?”

“ছুটি কাটাতে।”

“আপনার পুরানো গোঁফগুলি দিয়ে আপনি কী করেন?”

“ফেলে দেই।”

“আপনি কি কখনও বিয়ে করবেন?”

“হ্যাঁ।”

“তার নাম কী?”

“আমি জানি না”

“আপনি কি বলশেভিক?”

“আমি একজন শিল্পী। আমি জীবনে আগ্রহী। বলশেভিজম জীবনের একটা নতুন পর্যায়। তাই তাতে আমার আগ্রহ থাকবে এটাই তো স্বাভাবিক।”

“আপনি কি ‘হ্যামলেট’ হিসেবে অভিনয় করতে চান?”

“এ সম্পর্কে তো জানি না…।”

আবারও ভাগ্যদেবী বাঁচিয়ে দিলেন। টেলিফোন আমায় ডেকে নিল। আমার শোবার ঘরের দরজা বন্ধ করে ফোন ধরলাম, দরজা বন্ধই রাখলাম। সাংবাদিকেরা চলে গেলেন। নিজেকে মোচড়ানো-কচলানো একটা ন্যাকড়ার মতন লাগছিল। আয়নায় তাকালাম। দেখলাম তার ভেতর থেকে এক চেশায়ার বিড়াল আমার দিকে তাকিয়ে হাসছে। সাক্ষাৎকারের জন্য যে ঠেকা দেয়া হাসি আবিষ্কার করেছি, সেই হাসি তখনও বয়ে বেড়াচ্ছি। মনে হল এই হাসি শুধু রিপোর্টার দেখলে ফুটিয়ে তোলার থেকে হয়তো সারাক্ষণ মুখে সেঁটে রাখাটা সহজতর হবে। কিন্তু তখন হয়ত কেউ ভাবতে পারে আমি ডাগ এর অনুকরণ করছি। তাই আমার পুরানো চেহারাটাকে আবার স্বাভাবিক হতে দিলাম।

ডাগ এল। মেরি আরো ভাল। ও ছিল তার সাথে। মেরিকে দেখে ভাল লাগলো। আমরা তিনজন মিলে ছাদে গেলাম ছবি তোলানোর জন্য। ছবি তোলার জন্য যত রকম অঙ্গভঙ্গি কল্পনা করা যায় সবই হল কিন্তু যখন একজন ডাগকে পরামর্শ দিল যে সে ছাদের কোনায় ঝুলে থাকবে আর তার এক হাতে থাকবে ম্যারি আরেক হাতে আমি, তখন আমরা দুজনেই প্রায় একযোগে এই প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করলাম।

ডাগ আর মেরির মতো বন্ধু থাকা খুব ভাল।  তারা একদম দারুণভাবে আমাকে বুঝেছিল। তারা বুঝেছিল সাত বছরের কঠোর পরিশ্রম আমার স্নায়ুর উপর কী প্রভাব ফেলেছে। এবং বুঝেছিল কী ভীষণভাবে এই ছুটিটা আমার দরকার। আমার দরকার স্টুডিও, ছবি এবং নিজের থেকেও দূরে যাওয়া।

ডাগ অনেক চিন্তাভাবনা করে পরিকল্পনা করেছিল যে নিউ-ইয়র্কে যতদিন থাকব আমার ছুটিটা একদম যথাযথ হতে হবে। আমার সময়টা যাতে আনন্দে কাটে সে দায়িত্ব নিয়েছিল ডাগ।

কাজেই সে আমাকে পীড়াপিড়ি করল ওর নতুন ছবি ‘দ্যা থ্রি মাসকেটিয়ার্স’ দেখতে যাওয়ার জন্য।

বিরক্তই হলাম। আমার ছবি দেখার ইচ্ছা ছিল না। তবে ভদ্রতার খাতিরে না করলাম না। এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেছিলাম যদিও।

chaplin-1b

“সিরিয়াস অবস্থায় আমাকে যে রকম লাগে।”—চ্যাপলিন

চেষ্টায় কাজ হল না। সে খুব চাইছিল আমি যাতে ছবিটা দেখি এবং আমার আন্তরিক মতামত দেই। সে আমার সমালোচনা এবং পরামর্শ চাইছিল।

তাই কাজটা আমায় করতেই হল। সবসময়েই করি। ঝাঁকি খেতে খেতে দেখলাম ছবিটা।

সাংবাদিকরাও ছিলেন সেখানে। তাদের উপস্থিতি তো জানা কথাই।

ছবি শেষে আমি বেশ কিছু পরিবর্তনের কথা বললাম, কিছু অংশ বাদ দিতে বললাম যা করলে ছবিটা আরো ভাল হবে।

সব সময়েই বলি।

ওরাও খুব ভদ্রভাবে আমার পরামর্শ শুনলেন তারপর ছবিটা যেমন ছিল সেভাবেই চালালেন।

যা সব সময়েই ঘটে।

ভাগ্য ভাল যে আমার কথামত ছবিটার কিছুই বদলানো হয় নাই।

তবে সমালোচক হিসাবে তবুও আমার পরিচিতি আছে। মেরির ছবি ‘লিটল লর্ড ফাউন্টলরয়’ দেখানোর সময়েও আমাকে দাওয়াত দেয়া হয়েছে এবং আমার পরামর্শ চাওয়া হয়েছে। ওরা জানে আমি সমালোচনা করবো। সব সময়েই করি আর ওরা আমাকে ভয় পায়। যদিও আমার ছবির ব্যাপারে ওরা খুব সদয়, দরদি এবং কখনোই সমালোচনা করে না।

মেরিকে বললাম তার ছবিটা বেশি লম্বা হয়েছে। কোথায় কাটা দরকার তা-ও জানালাম। অবশ্য তা সে করে না। কখনোই না।

সে আর ডাগ নম্রভাবে আমার কথা শোনে আর ওদের ছবি যেমন ছিল তেমনি থাকে। সব সময়েই তাই হয়।

খবরের কাগজের লোকেরা হোটেলে এসেছে। আবার সেই প্রশ্নবাণে জর্জরিত আমি আর আমার ঠেকনা দেয়া হাসি দায়িত্ব পালন করলাম পনের মিনিট ধরে। তারপর রেহাই পেলাম।

ডাগলাসের ফোন এল। সে চায় আমার ছুটিটা ভাল কাটুক। ‘দ্যা থ্রি মাসকেটিয়ার্স’ দেখার জন্য দাওয়াত করল আমাকে আবার। এবার সাধারণ দর্শকদের সামনে প্রথমবারের মতন দেখানোর সময়।

সিনেমার আগে আমাদের একত্রে ডিনার করার কথা—ডাগ, মেরি, মিসেস কন্দে নাস্ত আর আমি।

মিসেস নাস্ত এর সাথে দেখা করতে কিছুটা বিব্রত লাগছিল। আগের বার একত্রে ডিনারের কথা থাকলেও শেষ পর্যন্ত হয়ে না ওঠার ব্যাপারটা আমার স্মৃতিতে উঁকি দিচ্ছিল। চিন্তায় ছিলাম। এমনকি পরে লিখেও ক্ষমা চাওয়া হয় নাই। চিঠি না লেখাটা বোকার মত কাজ হয়েছে। হয়ত ‘সব অপরাধ ক্ষমা করলাম’ ধরনের চাউনি আমার জন্য অপেক্ষা করে আছে।

ঠিক করলাম সবচেয়ে ভাল উপায় হল ওই বিষয়ে একটাও কথা না বলে একটু ভাসা ভাসা ভাবে থাকা। তাই করলাম এবং এতে কাজও হল।

তিনিও যথেষ্ট রুচিশীলতার পরিচয় দিলেন এবং এ সম্পর্কে কিছুই বললেন না, সবাই বেশ ভাল সময় কাটালাম।

মিসেস নাস্ত এর সুন্দর লিমোজিনে চড়ে থিয়েটারে গেলাম। থিয়েটারের চতুর্দিকে কয়েকটা রাস্তা জুড়ে ভিড় জমেছিল।

চলচ্চিত্র জগতের একজন হতে পেরে খুব গর্ববোধ করছিলাম। যদিও সে রাতটা ছিল মেরি আর ডাগলাসের। ওদের যশের ছাঁট আমার গায়েও লাগছিল।

ভিড়ের মানুষেরা খুশিতে উপচে পড়তে পড়তে ডাগ, মেরি আর আমার নাম ধরে ডাকছে। আবার আমি গর্বিত হলাম সিনেমার দুনিয়ার লোক হতে পেরে। আমি চেষ্টা করতে থাকি নিজেকে সৌম্যদর্শন করে তুলতে আর সেই পোশাকি হাসিটা মুখে ছড়িয়ে দেই, তবে এবার আনন্দের সাথে। এই হাসিটা সত্যিকারের। খুব ভাল আর সহজ লাগছিল।

আমরা গাড়ি থেকে নামতেই সবাই ভিড় করে এল। ‘অল আমেরিকান’ প্রায় সবাই সেখানে ছিল। ডাগ মেরির হাত ধরে ভিড় বাঁচিয়ে এমন ভাবে পথ বের করে হাঁটছিল যেন সিনেমার দৃশ্যে অভিনয় করছে ওরা আর ভিড়ের মানুষজন সব এক্সট্রা।

আমিও তার দেখাদেখি মিসেস নাস্তের বাহু সংলগ্ন হলাম। অন্তত সেই রকম চেষ্টাই করছিলাম। কিন্তু উনি যেন ভাসতে ভাসতে আমার কাছ থেকে এইটথ অ্যাভিনিউর দিকে চলে গেলেন আর আমি কোনো কারণ ছাড়াই পিছাতে পিছাতে ব্রডওয়েতে। ঢেউয়ের দিক পাল্টে আমাকে ভাসিয়ে নিয়ে গেল থিয়েটারের দরজার সামনে। এখন আর আগের মতন অত গর্ব হচ্ছিল না। যদিও জনগণের প্রতি হাসিটা তখনো ঠোঁটে বজায় ছিল, তবে আবার সেই ঠেকনা দেয়া হাসিটাই।

ব্যাপারটা টের পেয়ে আবার হাসিতে একটু আনন্দ ঠেসে দেয়ার চেষ্টা করলাম। এতে মুখের হা টুকু আরেকটু বিস্তৃত হল আর জায়গা পেয়ে এক পুলিশ দিল এক ঘুসি।

পুলিশের হাতের মুঠির স্বাদ মোটেই ভাল না। তাকে তা জানালাম। সে আমার দিকে কটমট করে তাকাতে তাকাতে এক ধাক্কায় ভিড়ের ভেতর ঠেলে দিল।

কে যেন টান দিল। মেশিনের শব্দ শুনলাম। নিচের দিকে তাকিয়ে দেখি কেঁচি হাতে এক মহিলা আমার প্যান্টের থেকে এক টুকরা কেটে নিচ্ছে। আরেকজন আমার টাই ধরে হেঁচকা টান দিয়ে প্রায় ভবলীলা সাঙ্গ করে দিয়েছিল একটু হলে। তারপরের টার্গেট ছিল আমার কলার, তবে শুধু অর্ধেকটা নিতে পেরেছিল।

আমার গায়ের শার্ট আলগা করে ফেলা হয়েছিল। ভেস্ট এর বোতাম ছেঁড়া। পা মাড়ানো। মুখে খামচি। তারপরও হাসিটা রেখেছিলাম, সেই ঠেকামারা হাসি যদিও। যতবার এ বিষয়ে সতর্ক হচ্ছিলাম ততবার আসল হাসি হাসার চেষ্টায় মুখের হা বড় হচ্ছিল আর প্রতিবারই উপহার হিসেবে পুলিশের ঘুসি এসে জুটছিল। আমি বারে বারেই বোঝানোর চেষ্টা করছিলাম যে আমার নাম চার্লি চ্যাপলিন আর আমার এখন থিয়েটারের ভিতরে থাকার কথা। আর আমার জন্য ‘দ্যা থ্রি মাসকেটিয়ার্স’’ দেখাটা ভীষণ জরুরি।

আমার সনির্বন্ধ অনুরোধ জয়ী হল। যেন পূর্বনির্ধারিত কোনো সংকেতে আমার শরীর শূন্যে উঠে মাথাটা ঘুরে গেল লবির কেন্দ্র লক্ষ্য করে আর পা ফিরল জিগফিল্ড রুফের বিজ্ঞাপন দিতে থাকা একটা বৈদ্যুতিক সাইনবোর্ডের দিকে। এক বিপুল তরঙ্গ আমাকে সমবেত জনতার মাথার উপর দিয়ে বয়ে এনে ফেলল লবির একদম ভিতরে।

দরজা দিয়ে যখন ঢুকছিলাম, গড জানে কীসের মধ্যে, এক বন্ধুর দেখা পেলাম।

charchil-chaplin-1

উইনস্টন চার্চিলের সঙ্গে চ্যাপলিন; ইংল্যান্ডের কেন্টে অবস্থিত চার্চিলের বাড়িতে, ১৯৩১।

তখনও সেই তৈরি হাসিটাই হাসতে হাসতে, সমাবেশের উদ্দেশ্যে হাত নেড়ে  ‘আবার দেখা হবে’ বলতে বলতে মাথা দিয়ে ঠেলতে ঠেলতে থিয়েটার মধ্যে এক হিরকখচিত সম্ভ্রান্ত প্রৌঢ়ার পায়ের কাছে গিয়ে পতিত হলাম। মুখ তুলে তাঁর দিকে চাইলাম, তখনও সেই হাসি মুখে। কিন্তু আমার সব প্রয়াস বৃথা গেল। তার চাহনিতে কোনো বাহবা ছিল না।

বিমর্ষ চিত্তে, নিজেকে খানিক গুছিয়ে, যেটুকু সম্ভ্রম তখনও বাকি ছিল তাই নিয়ে আমাদের দলটার জন্য আলাদা করে রাখা বক্সটার দিকে এগিয়ে চললাম। মেরি ছিল সেখানে, সেই রকমই মিষ্টি আর সুন্দর, মিসেস নাস্ত—ধীর-স্থির শান্ত এবং ডাগ—নির্মল ও সপ্রতিভ।

“আবার দেরি হল,” ওরা তাকাল।

আর মেরি, পর্যাপ্ত গাম্ভীর্য আর শালীনতার সাথে আমার ভুলভ্রান্তিগুলির হিসাব দিতে থাকল।  তবে এর ভেতর অন্তত একটা বিষয়ে ওর চাইতে আমি ভাল জানতাম। আর তাই তাড়াহুড়া করে বাথরুমের দিকে ছুটলাম মেরামতের জন্য। পানি, সাবান আর একটা ব্রাশের মাধ্যমে অলৌকিক পরিবর্তন সাধিত হল, তবু তারপর প্যান্ট, কলার, কিংবা টাই খুঁজে পাচ্ছিলাম না। পরিচ্ছন্ন অথচ জীর্ণদশায় বক্সে ফিরলাম, যেখানে সবাই একযোগে তাদের হতাশা প্রকাশ করছিল।

এই সফরের পর ভীষণ ক্লান্ত লাগা সত্ত্বেও আমি আমার তৈরি হাসিটাই আরো উজ্জ্বল করে তুলতে চাইছিলাম। ডাগ আর মেরি অবশ্য তাতে একটুও খুশি হল না।

কিন্তু আমি কিছুতেই ওদের আমার আনন্দ মাটি করতে না দিয়ে ‘দ্যা থ্রি মাসকেটিয়ার্স’ দেখলাম।

ডাগের জন্য এটা ছিল দারুণ রোমান্চকর সাফল্য, ওর জন্য আমার ভাল লাগছিল তবুও কিছুটা ঈর্ষান্বিতও হলাম। ভাবতে চেষ্টা করলাম ‘দ্যা কিড’ যখন মুক্তি পাবে, সে রাতটা আমার জন্যও এরকম বিশেষ হয়ে উঠবে কিনা।

সব মিলিয়ে মনে রাখার মতন রাত ছিল সেটা, ফেয়ারব্যাংকসের এই মাস্টারপিসের উদ্বোধন। সমস্ত পরিস্থিতির বিচারে আমার ব্যবহারও খুব প্রশংসনীয় ছিল বলেই আমার ধারণা, তবে মনে হয় এখানে অন্তত তিনজন বোধহয় আমার বিরুদ্ধেই ভোট দেবে।

(চলবে)

সাম্প্রতিক পড়ুন: লুনা রুশদীর সব লেখা

About Author

লুনা রুশদী
লুনা রুশদী

জন্ম ২৪ অক্টোবর, ১৯৭৫, করোটিয়া। শৈশব কেটেছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কোয়ার্টার্সে। ইউনিভার্সিটি ল্যাবরেটরি স্কুলে লেখাপড়া নবম শ্রেণী পর্যন্ত, তারপর ১৯৮৯ থেকে সপরিবারে অস্ট্রেলিয়া প্রবাসী। মেলবোর্নে লা-ট্রোব বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অর্থনীতিতে স্নাতক, পরবর্তীতে বৃত্তি নিয়ে ক্রিয়েটিভ রাইটিং এ স্নাতোকত্তর লেখাপড়া সিডনির ইউ.টি.এস বিশ্ববিদ্যালয়ে। ব্যাংকিং সেক্টরে চাকরি নিয়ে দশ বছর নিউজিল্যান্ড থাকার পর বর্তমানে মেলবোর্ন প্রবাসী। মেলবোর্নে স্থানীয় পত্রপত্রিকায় লেখার মাধ্যমে লেখালেখির শুরু - প্রথম বাংলাদেশি পত্রিকা ‘অঙ্কুর’ সম্পাদনা ছাত্রজীবনে। বাংলায় প্রথম প্রকাশিত কবিতা কলকাতার ‘দেশ’ পত্রিকায় ১৯৯৪ সালে। এরপর বিভিন্ন বাংলাদেশি ও ভারতীয় পত্রিকায় লেখালেখি। প্রথম প্রকাশিত ইংরেজি গল্প নিউজিল্যান্ডের ‘লিসেনার’ পত্রিকায় ২০১১ সালে। প্রকাশিত অনুবাদগ্রন্থ অরুন্ধতি রায় এর ‘দ্যা ব্রোকেন রিপাব্‌লিক’ (২০১২), উপন্যাস ‘আনবাড়ি’ (২০১৩) প্রকাশক শুদ্ধস্বর।