ছবি তোলার আগেই ছবিকে সুন্দর করে তুলবে গুগলের নতুন সফটওয়্যার

এমআইটির করা একটি কম্পোজিশনে ১২-মেগাপিক্সেলের আসল ছবি (বামে) এবং নতুন অ্যালগরিদম দিয়ে সম্পাদনা করা ভার্সন (ডানে)
শেয়ার করুন!

ভালো ছবি তোলা এক জিনিস—সেটাকে সুন্দর করে এডিট করা আরেক জিনিস। এখন আমরা প্রায় সবাই সোশ্যাল মিডিয়া, ইনস্টাগ্রামে কমবেশি ছবি আপলোড করিআর ছবি আপলোড দেওয়ার আগে আমরা সেটাকে ফিল্টার করি, স্যাচুরেশন কমিয়ে দেই—অর্থাৎ আমাদের মনমত এডিট করে তারপরে পোস্ট দেই।

কিন্তু সত্যিকার অর্থে ছবিটাকে সুন্দর দেখাবে—এমন কিছু চাইলে হয়ত একজন প্রফেশনাল এডিটর সেই কাজ করে দিতে পারে।

এখন কোনো প্রফেশনাল এডিটরের সাহায্য ছাড়াই হয়ত একটা স্মার্ট অ্যালগরিদম-ই ছবি তোলার সময় প্রফেশনালভাবে ছবি এডিট করে দিতে পারবে।  

এমআইটির করা একটি কম্পোজিশনে ১২-মেগাপিক্সেলের আসল ছবি (বামে) এবং নতুন অ্যালগরিদম দিয়ে সম্পাদনা করা ভার্সন (ডানে)

এমআইটি বা ম্যাসাচুসেটস ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজি এবং গুগল নতুন একটি মেশিন লার্নিং অ্যালগরিদম বের করেছেএই অ্যালগরিদম ছবি তোলার সময় স্বয়ংক্রিয়ভাবে বা নিজেই নিজেই একজন প্রফেশনাল ফটোগ্রাফারের মত ছবির সবকিছু ঠিক করে দিতে পারেঅর্থাৎ, আপনি একটা ছবি তুললেন, আর আপনার ডিভাইসে সচল থাকা নিউরাল নেটওয়ার্ক ঠিক করবে ছবিটিকে কীভাবে দেখতে আরো সুন্দর করা যায়—এই নিউরাল নেটওয়ার্ক প্রয়োজনমত ছবির কন্ট্রাস্ট বাড়িয়ে দিবে, ব্রাইটনেস হয়ত কমিয়ে দিবে। এবং এই সফটওয়্যার যত যাই করুক, সবকিছু করবে মাত্র ২০ মিলিসেকেন্ডের মধ্যে।

এই গবেষণার প্রধান লেখক মাইকেল ঘারবি এমআইটিতে পিএইচডি করছেন। তিনি বলেছেন, এই সময়টুকু এক সেকেন্ড সময়েরও পঞ্চাশ ভাগ। ঘারবির এই অ্যালগরিদমটি এত দ্রুত আপনার ছবিটিকে এডিট করে দিবে যে আপনি ছবিটিকে তোলার আগেই স্ক্রিনে ছবির এডিটেড ভার্সন দেখতে পাবেন।

একটি নিউরাল নেটওয়ার্ক কীভাবে বিভিন্ন ধরনের ফটোগ্রাফিক স্টাইল বা ছবি তোলার স্টাইলগুলিকে শিখতে পারে সেটা আবিষ্কার করার জন্য ঘারবি গত বছর গুগলের গবেষকদের সাথে কাজ শুরু করেন। অর্থাৎ, ছবি তোলার বিভিন্ন স্টাইলগুলিকে কীভাবে একটা অ্যালগরিদম বা কম্পিউটার প্রোগ্রামের মধ্যে নিয়ে আসা যায় সেজন্য তিনি গবেষণা শুরু করেন। এই একই ধরনের কাজ ২০১৫ সালে জার্মান গবেষকরাও করেছিল। তারা একটি নিউরাল নেটওয়ার্ক বানিয়েছিল,  সেই নিউরাল নেটওয়ার্ক যে কোনো ছবি তোলার সময় ভ্যান গগ ও পিকাসোর স্টাইল অনুসরণ করে ছবিটাকে সে রকম করে দিতে পারত।

ঘারবি জানিয়েছেন এই অ্যালগরিদমের উদ্দেশ্য হল কোনো এডিটিং অ্যাপ্লিকেশন ওপেন না করেই প্রফেশনাল ফটোগ্রাফারের মত ছবি তুলতে পারা। এই অ্যালগরিদম একটা অটোমেটিক ফিল্টারের কাজ করে এবং এর কাজ অনেক বেশি সূক্ষ্ম। বেশিরভাগ এডিটিং ফিল্টার সম্পূর্ণ ছবিটাকেই একই রকমভাবে এডিট করে থাকে। যদি ছবিটির সব জায়গায় একই রকম ভাবে এডিট করার প্রয়োজন নাও থাকে তবুও বেশিরভাগ ফিল্টার পুরো ছবিটিকেই এক রকম ভাবে এডিট করে। ঘারবি’র অ্যালগরিদমে আলাদা আলাদা অনেক ফিচার থাকছে, এই ফিচারগুলি একটি ছবির যেখানে যা করা  প্রয়োজন তাই করবে। এবং প্রয়োজন অনুসারে সঠিক জায়গায় সঠিক পরিবর্তন ঘটাবে বা এডিট করবে  

মাইকেল ঘারবি

ঘারবি বলেছেন, বেশিরভাগ ফিল্টারে সাধারণত প্রতিটা পিক্সেলকে একইভাবে বদলে দেওয়া হয়। যখন আপনার ছবিগুলিতে নির্দিষ্ট জায়গায় প্রয়োজনমত পরিবর্তন করা হয়, সেটা বেশি ইন্টারেস্টিং ব্যাপার  

এই অ্যালগরিদম আবার নিজে নিজে অনেক কিছু শিখে নিতেও পারে। যেমন, কোনো সেলফিতে উজ্জ্বল ব্যাকগ্রাউন্ড থাকলে ছবিতে থাকা চেহারাগুলি অটোমেটিকভাবে উজ্জ্বল করে দিবে। পানির ছবি নেওয়ার সময় পানির অংশের স্যাচুরেশন বাড়িয়ে দিবে অথবা কোনো ল্যান্ডস্কেপ ছবিতে গাছের সবুজ রঙ বাড়িয়ে দিবে।

ঘারবির এই অ্যালগরিদম এই কাজ করতে পারছে কারণ ঘারবি ম্যানুয়ালি এডিট করা অনেকগুলি ছবি নেটওয়ার্কে ঢুকিয়ে এই অ্যালগরিদমকে ভিজ্যুয়াল সূক্ষ্মতার ব্যাপারে ট্রেনিং দিয়েছেন। এই নিউরাল নেটওয়ার্কটিতে গবেষকরা ৫০০০ এডিটেড ছবি ঢুকিয়েছেন। এই ছবিগুলি থেকে এই অ্যালগরিদমটি ছবি এডিট করার নিয়মগুলি শিখেছে। এখন আপনি যদি এই নিউরাল নেটওয়ার্কে আপনার নিজের পছন্দমত এডিটেড ছবিগুলি ঢুকান, এটা আপনার নিজস্ব ফটোগ্রাফিক স্টাইল শিখে নিতে পারবে।

আরো একটা গুরুত্বপূর্ণ জিনিস হল, এই সফটওয়্যার এতই হাল্কা যে এটা মোবাইল ফোনেও চলবে। ঘারবি বলেছেন, এটাকে বাস্তবে কোনো ডিভাইসে দ্রুতগতিতে চালানোর ক্ষেত্রে মূল ব্যাপারটি হল,  একটা ছবির সবগুলি পিক্সেলকে প্রসেস করার দরকার হয় না। একটা ছবির লাখ লাখ পিক্সেলকে প্রসেস করার বদলে, ঘারবির অ্যালগরিদমটি ছবিটির একটা কম-রেজ্যুলেশন ভার্সন তৈরি করে নেয়, তারপরে সিদ্ধান্ত নেয় কোন কোন অংশ ঠিক করতে হবে। আগে থেকে নিউরাল নেটওয়ার্কে থাকা নিয়মগুলির মাধ্যমে অ্যালগরিদমটি ডিসিশন নেয় ছবির কোন অংশের জন্য কী রকম কনট্রাস্ট, কী রকম উজ্জ্বলতা, কী রকম কালার ও কী রকম স্যাচুরেশন রাখতে হবে। এরপরে প্রয়োজনমত ছবিটির পরিবর্তন ঘটিয়ে ছবিটিকে আবার হাই-রেজ্যুলেশনে ফিরিয়ে আনেযেহেতু সম্পূর্ণ ছবিকে প্রসেস করতে হয় না, তাই খুবই দ্রুত কাজ করতে পারে এই সফটওয়্যার

এই অটো-এডিটিং ফিচারটি এখনো গবেষণার অধীনে আছে। তবে প্র্যাকটিকালভাবেই এই সফটওয়্যারটি ছবির ক্যামেরার ফিচারগুলিকে আরো দ্রুতগতির ও দক্ষ করে তুলবে। ঘারবি জানিয়েছেন অ্যালগরিদমটি এইচডিআর রেজ্যুলেশনের ফটো এত দ্রুত প্রসেস করতে পারে যে আপনাকে হাই ডেফিনেশন ছবি প্রসেস করার জন্য আধা সেকেন্ডও অপেক্ষা করতে হবে না। এই প্রজেক্টের সম্ভাবনা ও গভীরতা বিবেচনা করেই গুগল এর সাথে যুক্ত হয়েছে। অ্যান্ড্রয়েডের আগামী ভার্সনগুলিতে এই ফিচারটি থাকবে কিনা সে বিষয়ে নিশ্চিত করে ঘারবি কিছু বলেন নি, তবে জানিয়েছেন যে এই ব্যাপারে আমরা আশা করতে পারি।

কমেন্ট করুন

মন্তব্য

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here