page contents
লাইফস্টাইল, সংস্কৃতি ও বিশ্ব

ছোট একটি শহরের আতিথেয়তার গল্প

নয় এগারোর দিন যখন নিউইয়র্কের টুইন টাওয়ারে সন্ত্রাসী হামলা হল, আমেরিকামুখী সারা পৃথিবীর হাজার হাজার প্লেনকে আমেরিকার আকাশসীমায় প্রবেশ করতে নিষেধ করা হল। বলা হল, যে প্লেন যেখানে আছে আমেরিকার আকাশ সীমার বাইরে কাছে-ধারের যে কোনো এয়ারপোর্টে অবতরণ করতে।gander-town

ডেল্টা এয়ারলাইন্সের ফ্লাইট ১৫ জার্মানির ফ্রাংকফুট থেকে আমেরিকামুখী উত্তর আটলান্টিকের উপর থাকা অবস্থায় এমন নির্দেশ পেল। যাত্রীরা জানলে ভীত হয়ে পড়বে তাই তাদের জানানো হল, যান্ত্রিক গোলযোগের কারণে তাদেরকে নিকটস্থ কোথাও অবতরণ করতে হচ্ছে।

ডেল্টার এই ফ্লাইট আড়াইশো যাত্রী নিয়ে কানাডার নিউফাউন্ডল্যান্ড অ্যান্ড ল্যাবরেডরের গ্যানডার নামের খুব ছোট একটা শহরের এয়ারপোর্টে নামল।murad hai 2 logo

শুধু ডেল্টার এই ফ্লাইট নয়, তারা দেখে পুরো এয়ারপোর্ট জুড়ে পঞ্চাশের অধিক প্লেন সারিবদ্ধভাবে দাঁড়িয়ে আছে বিভিন্ন দেশের যাত্রী নিয়ে। ছোট্ট সেই শহরের মোট জনসংখ্যা হল মাত্র দশ হাজারের কিছু বেশি। পঞ্চাশের বেশি আন্তর্জাতিক ফ্লাইটে যাত্রী ছিল আরো দশ হাজারের মত।

সেই ছোট্ট শহর এত মানুষ দেখে ভড়কে যায় নাই। সব মানুষকে কয়েকদিনের জন্য খুব আপন করে আতিথেয়তা দিয়েছে গ্যানডার।

শহরের সব হোটেল, স্কুল কলেজ বন্ধ করে দিয়ে সে সবে অস্থায়ী আবাসনের ব্যবস্থা করেছে। সব ছাত্রদেরকে ভলান্টিয়ার বানিয়ে মানুষের সব রকম সহায়তার জন্য ব্যবহার করা হয়েছে। সব ডাক্তার স্বেচ্ছায় এই সব মানুষের সেবায় নিয়োজিত ছিল। কেউ বিরক্ত হয় নাই।

তারপর যেদিন বিপদ কেটে যাওয়ার সিগনাল এল, সব প্লেন একে একে সেই শহর ছাড়তে শুরু করল।

map-gander-1

মানচিত্রে কানাডার নিউফাউন্ডল্যান্ড অ্য‌ান্ড ল্যাবরেডর।

ডেল্টার সেই ফ্লাইট ছাড়ার পর নিয়ম বহির্ভূতভাবে এক প্যাসেন্জার প্লেনের পাবলিক অ্যানাউন্সমেন্ট সিস্টেমে কথা বলার অনুমতি চাইল । নিয়ম না থাকলেও তাকে অনুমতি দেয়া হল। নয় এগারোর দুর্ঘটনা এসব মানুষকে অনেক আবেগপ্রবণ আর কাছাকাছি এনে দিয়েছে।

ভার্জিনিয়ার অধিবাসী ভদ্রলোক পেশায় একজন ডাক্তার। তিনি মাইক নিয়ে খুব আবেগপ্রবণ হয়ে পড়লেন। এই চরম বিপদের দিনে সেই ছোট্ট শহরের ভাল মানুষগুলির অভূতপূর্ব ভালবাসা আর আতিথেয়তা তাকে কৃতজ্ঞ বানিয়ে দিয়েছে। তাই তার ইচ্ছা হল সেই শহরের জন্য কিছু করা।

আর্থিকভাবে অনেক ধনবান নয় সেই ছোট শহর।

ডাক্তার ভদ্রলোক শহরের সব মানুষের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানিয়ে প্লেনের সহযাত্রীদের কাছে সাহায্য চাইল শহরের ছাত্রদের জন্য বৃত্তি প্রদানের জন্য। এক ঘোষণায় ঠিক তখুনি চাঁদা উঠে গেল প্রায় পনের হাজার ডলার। তার সাথে তিনি নিজে যোগ করলেন আরো পনের হাজার ডলার।

delta-90

গ্যানডারে শরণার্থী বিমানযাত্রীদের জন্যে খাবারের বুফে ব্যবস্থা, সেপ্টেম্বর ২০০১।

ডেল্টা এয়ারলাইন্স যোগ দিল এই মহতি উদ্যোগে। আজ সেই বৃত্তি ফান্ডের পরিমাণ হয়ে দাঁড়িয়েছে দেড় মিলিয়ন ডলার। সেই শহরের কোনো ছেলে মেয়ের কলেজে যাওয়ার জন্য পারিবারিক অস্বচ্ছলতা আর বাধা হল না।

এমন ভাল মানুষ আছে বলেই হয়ত পৃথিবীটা এখনো এত সুন্দর।

এমন গল্প শুনলে নিজের মনটাও সমুদ্রের মত বিশাল হয়ে যায়। অজান্তেই চোখের পাতা ভিজতে শুরু করে সেই স্বপ্ন মানবদের সন্মানে।

(লেখাটা ডেল্টা এয়ারলাইন্সের এক ক্রু লিখেছেন। কেউ একজন শেয়ার করেছে। আমি অনুবাদ করে শেয়ার করলাম নিজের ভাল লাগা থেকে।)

পড়ুন: মুরাদ হাই এর সব লেখা—সাম্প্রতিকে।

About Author

মুরাদ হাই

জন্ম হাতিয়ায়। ১৯৬০ সালের ৯ অক্টোবর। ১৯৭৯ থেকে ১৯৮৫ সাল পর্যন্ত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র ছিলেন। পড়তেন মার্কেটিং বিভাগে। থাকতেন সূর্যসেন হলে। ১৯৮৯ সালে পাড়ি জমান নিউইয়র্কে। সে অবধি সেখানেই আছেন। দুই ছেলে রেশাদ ও রায়ান ছাত্র, স্ত্রী রাজিয়া সুলতানা স্কুলের শিক্ষিকা।