page contents
লাইফস্টাইল, সংস্কৃতি ও বিশ্ব

জাতীয়তাবাদী যেভাবে বর্ণবাদী হয়

কুড়ি বছর ধরে আরব দেশে আছি। আরব জাতীয়তাবাদের চেতনা খুব কাছে থেকে দেখেছি। মুসলিম, খৃস্টান ও ইহুদি—এই তিন ধর্মীয় জাতীয়তাকে ধারণ করেও আরবি ভাষা ভিত্তিক জাতীয়তার চেতনাও দেখেছি। এই চেতনার ভেতরে আবার পৃথক পৃথক আরব দেশভিত্তিক বর্ণবাদও দেখেছি।

তাইলে ব্যাপারটা কি এই যে, দেশপ্রেমে জোর দিতে গিয়ে জাতীয়তাবাদী হওয়া? দেশপ্রেম কি আসলেই দেশপ্রেম না সংস্কৃতি প্রেম?

আর জাতীয়তাবাদের গভীর প্রেমে অতঃপর বর্ণবাদী হতে হয় কেন?

ওরা কেন বলে সাদারাই প্রকৃত আমেরিকান?

কোনো অঞ্চলের মানুষের মধ্যে সাংস্কৃতিক মিলের কারণে তাদের দেশ বা ভাষাভিত্তিক মায়া কেন অন্য জাতি-গোষ্ঠীর প্রতি বিদ্বেষ পোষণ করে?

জাতীয়তাবাদীগণ কি টের পায় না যখন তারা বর্ণবাদী হয়?

দেশভিত্তিক বা ভাষাভিত্তিক জাতীয়তাবাদীদের বর্ণবাদ বিরোধিতা কি ধোঁকাবাজি নয়?

“স্মরণ করা যায় দক্ষিণ আফ্রিকার বর্ণবাদ বিরোধী জনপ্রিয় নেতা নেলসন ম্যান্ডেলাকে। তিনি সাদার আধিপত্য ও কালোর আধিপত্যের বিরুদ্ধে আমৃত্যু রাজনৈতিক অবস্থানে থেকেছেন।”

পেছন থেকে কলকাঠি নেড়ে জাতীয়বাদীদেরকে কারা বর্ণবাদী বানায়? নির্দিষ্ট সংস্কৃতির মাধ্যমেও কি বর্ণবাদ মানুষের আচরণে আসছে না?

ধার্মিক জানে এক আরব লোককে সবাই। নিয়মিত এবাদত করেন। নিজের গোষ্ঠীর প্রাধান্য দিতে উঁচা আওয়াজে বলেন—”আআই আআআই, আনা অনসরিয়া।” মানে, “হ্যাঁ হ্যাঁ আমি বর্ণবাদী।”

তিনি জানেন, তার ধর্ম ইসলামে বর্ণবাদী আচরণ করা অপরাধ। তিনি জানেন, নবী মোহাম্মদ সঃ বিদায় হজ্বের ভাষণে বর্ণবাদের বিরুদ্ধে হুঁশিয়ার করেছেন। তবু তিনি বর্ণবাদী চিন্তার ভিতরে থাকেন। তারা নিজেদেরকে উত্তম ভাবেন, অন্য এথনিক গোষ্ঠীকে অধম ভাবেন।

তীব্র গোস্বায় ঘৃণা প্রকাশ করে তার আত্মীয় বলেন—”খারা আলাল হিন্দ ও বাঙাল”—মানে, “হিন্দি ও বাঙালির উপর গু।”

একদিন দেখলাম মার্কেটে হিন্দি দোকানদারকে মারতে উদ্যত এক আরব। তখন অন্য আরেক দেশের আরব এসে মাঝখানে খাড়ায় আর মারমুখী আরবকে বলে, “খাল্লি ইয়া আখি, ইনতা আকবার, হাজা মিসকিন।” মানে “বাদ দেন ভাই, আপনি উত্তম, ওটা মিসকিন।”

ঝগড়া থামাতে আসা আরব লোকটি বর্ণবাদী চিন্তার পক্ষে থেকে হিন্দি লোকটাকেও বলতে বললো মারমুখী লোকটির উদ্দেশে, “ইনতা আকবার, আনা মিসকিন।”

তাকে উত্তম বলার পর মারতে উদ্যত আরব সন্তানের রাগ নামে।

খুব কম সংখ্যক আরব আছেন, যারা বর্ণবাদী বা জাতীয়তাবাদী চিন্তার মাঝে থাকেন না। তারা ভাবেন “কুল্লুন্নাস তৈয়্যিবিন”—মানে “সব মানুষই উত্তম।”

এ রকম চিন্তা করেন যারা, তারা শান্তিকামী সজ্জন। এদের মাঝে নানা ধর্মের মানুষ আছেন, ধর্ম পালনে উদাসীন আছেন এবং ধর্মটর্ম বুঝতে চান না এমনও আছেন।

আরব দেশে এমন আরবও আছেন যারা আরবি ভাষা পড়তে লিখতে পারেন না, কেবল মুখের ভাষা জানেন।

দেখা যায় দুনিয়ার প্রত্যেক দেশেই খুব কম সংখ্যক অবর্ণবাদী সজ্জন মানুষ আছেন। কিন্তু নানা রূপ রঙের বর্ণবাদী আছেন বলেই আধুনিক এই ‘সভ্য’ পৃথিবীতে বর্ণবাদ প্রধান সমস্যা। আর সমস্যটা দেশে দেশে আছে জাতীয়তাবাদী চেতনায় মোড়া। তা দেশভিত্তিক জাতীয়তাবাদ হোক বা ভাষাভিত্তিক জাতীয়তাবাদ হোক।

ক্ষমতলোভী মানুষেরা কি জাতীয়তাবাদের পথ ধরে বর্ণবাদী হয় নাই?

জার্মানির হিটলারের দল ছিল জাতীয়তাবাদী আদর্শের। নাজিরা জাতীয়তাবাদীই ছিল। তাদের দলের নাম হল, ‘ন্যাশনাল সোশালিস্ট জার্মান ওয়ার্কার্স পার্টি’।

দুনিয়া দেখেছে, হিটলার জাতীয়তাবাদী পথ ধরে অবশেষে কতটা মারাত্মক বর্ণবাদী হয়েছিল। কারণ, জাতীয়তাবাদীরা অন্য জাতির উপর দোষ ঢালতে ঢালতে এক পর্যায়ে অন্য জাতি ধ্বংস করতে উঠে-পড়ে লাগে।

১৯৭১-এ তৎকালীন পশ্চিম পাকিস্তানের শাসক গোষ্ঠী বর্ণবাদী হয়ে পূর্ব পাকিস্তানে গণহত্যা চালায়। ওরা নিজেদেরকে উত্তম ভাবত, বাঙালি নৃগোষ্ঠীকে অধম ভাবত। আমার আব্বা আবদুল কুদ্দুস চৌধুরী রাহিমাহুল্লাহ ১৯৭১ এর আগে শ্রম মন্ত্রণালয়ের অধীনে চাকরী করতেন করাচিতে। পান্জাবি সহকর্মীদের বর্ণবাদী আচরণের প্রতিবাদ করে চাকরি ছেড়ে স্বদেশে চলে আসেন। ওই রকম বর্ণবাদী মানসিকতার পাকিস্তানিরা নিজেদেরকে ‘পাক্কা মুসলিম’ মনে করত।

জাতীয়তাবাদের সংজ্ঞাতে একজন জাতীয়তাবাদী বর্ণবাদী হয়ে ওঠার কথা নাই। সংজ্ঞাতে নির্দিষ্ট ভূখণ্ডের মানুষের জীবনাচরণের মিলের ভিত্তিতে স্বাধীনভাবে চলবার কথা আছে। আর জাতিটি যখন নিজেদেরকে অন্যদের তুলনায় উত্তম মনে করে, নিজেদের ভাষা ও জাতিসত্ত্বাকে শ্রেষ্ট মনে করে বৈষম্য চর্চা করে। ওরা সুপিরিওর, তাই ওরাই শাসন করবে সব সময় মনে করে, অন্যরা অধীন থাকবে, তখন তা হয় বর্ণবাদ।
“Beliefs and the World they have created” and “The birth of Now” এর গ্রন্থকার ও ইতিহাস লেখক Jamie Cawley জানান, “গত এক শ বছরে সংক্রামক মারাত্মক মরণব্যাধীর চেয়েও বেশি জোয়ান মানুষ মারছে জাতীয়তাবাদ।” হয়ত ব্যাপারটা এরকম যে, জাতীয়তাবাদ পোক্ত হওয়ার পর বর্ণবাদে পৌঁছে বা কারো দ্বারা পৌঁছানো হয়।

প্যান আফ্রিকা মুভমেন্টের নেতা নাইইউ ওসাহন একবার বলেছিলেন, “আরব দুনিয়ায় আফ্রিকার কালো মানুষদেরে মনে করে পৃথিবীর আবর্জনা।” অধিকাংশ আরবরা মনে করে আফ্রিকার কালো মানুষেরা জাতিগতভাবে নীচ। ওদিকে বেশিরভাগ আফ্রিকান-আমেরিকানরা আমেরিকায় আরবদের দেখতে পারে না। মানে রেইসিজমের পাল্টাপাল্টি জারি আছে। স্মরণ করা যায় দক্ষিণ আফ্রিকার বর্ণবাদ বিরোধী জনপ্রিয় নেতা নেলসন ম্যান্ডেলাকে। তিনি সাদার আধিপত্য ও কালোর আধিপত্যের বিরুদ্ধে আমৃত্যু রাজনৈতিক অবস্থানে থেকেছেন।

আর ইথিওপীয় বংশোদ্ভুত ইসরাইলি অভিনেতা ও মডেল তাহোনিয়া রুবেল বলে দিয়েছেন, “আমার জীবন থেকে প্রমাণ নেন, ইসরাইল এই পৃথিবীতে একটি বর্ণবাদী রাষ্ট্র।”

“কেন জাতিসংঘসহ আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো রেইসিজমের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নিতে পারে না?”

ইসরাইলের জানপ্রাণ বন্ধু দেশ আমেরিকাতে যুগ যুগ ধরেই বর্ণবাদী শয়তানি দেখছে দুনিয়ার মানুষ। গণতান্ত্রিক দল দাবিদার রিপাবলিকান দলটির নেতা কর্মীরা প্রকাশ্যেই বর্ণবাদী প্রচারণা চালায়। ‘বৃটিশ ন্যাশনাল পার্টি’ যুক্তরাজ্যের একটি সিরিয়াস বর্ণবাদী রাজনৈতিক দল।

মায়ানমার বোধ হয়, বর্ণবাদী গণহত্যার রেকর্ড করতে যাচ্ছে গরীব রোহিঙ্গাদের নৃশংসভাবে হত্যা করে-করে। বর্ণবাদী হিংস্রতা আছে ভারতে, পাকিস্তানে। আছে উত্তর কোরিয়ায়, জাপানে। আফ্রিকার রোয়ান্ডায় তো মারাত্মক বর্ণবাদী গণহত্যা হয়েছে।

কেন জাতিসংঘসহ আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো রেইসিজমের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নিতে পারে না? বা মোকাবেলা করতে পারে না কেন?

জাতিসংঘের শান্তি মিশনে যারা কাজ করছেন, তারা বর্ণবাদের বিরুদ্ধে আওয়াজ তুলছেন। তারা আমেরিকার ‘ইন্সটিটিউশনাল রেইসিজম’র বিরুদ্ধে কঠোর। রোহিঙ্গা হত্যাকাণ্ড তদন্ত করতে জাতিসংঘ আসতে চায়। অঙ সাঙ সুচি আসতে দিচ্ছে না। মনে হচ্ছে যেন প্রায় তের লাখ রোহিঙ্গা মুসলমানকে নিশ্চিহ্ন করবার মিশনে সুচি। রোয়ান্ডার বর্ণবাদী গণহত্যা রুখতে পারে নি জাতিসংঘ।

আসলে বোধ হয়, হিসাব অন্যখানে। দুনিয়ার দেশগুলোর অর্থব্যবস্থা, সমাজব্যবস্থা নিয়ন্ত্রণ করছে আড়ালে থেকে যায়নবাদী গ্রুপ—রথচাইল্ড গোষ্ঠী—ইলুমিনাটি। যায়নবাদীরাই প্রথম ও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ লাগিয়েছে। যায়নবাদীরা প্রতিষ্ঠা করেছে ইসরাইল নামের বর্ণবাদী রাষ্ট্র। বর্ণবাদের অপর নাম যায়নবাদ।

১৯৭৫ সালে এক সাধারণ সভায় যায়নবাদের বিরুদ্ধে জাতিসংঘ সংকল্প গ্রহণ করে। জাতিসংঘ “Determines that Zionism is a form of racism and racial discrimination.” কিন্তু যায়নবাদীদের দালাল চক্রের ভোট আর ভেটোর প্যাঁচে পড়ার কারণে জাতিসংঘের দ্বারা বর্ণবাদ ও সাম্রাজ্যবাদ মোকাবেলা সম্ভব হয় না। উল্লেখ্য, যায়নবাদ বিরোধী ইহুদী ধর্মের মানুষেরা বর্ণবাদী ইসরাইল রাষ্ট্রের বিরোধী। তারা ফিলিস্তিনের স্বাধীনতার পক্ষে।

বর্তমান ‘সভ্য’ দুনিয়ার প্রধান সমস্যা বর্ণবাদ আর দুনিয়া নিয়ন্ত্রণের কৌশলও বর্ণবাদীদের হাতে থাকা সত্ত্বেও তাদের জীবনও নানাভাবে বিপন্ন।

About Author

সারওয়ার চৌধুরী

কবি, কথাশিল্পী ও প্রাবন্ধিক। প্রাক্তন সিলেট প্রেসক্লাব সদস্য। সহকারী সম্পাদক দৈনিক জালালাবাদ ১৯৯৩-৯৭। জাপানি কথাশিল্পী হারুকি মুরাকামির গল্পের অনুবাদ বই ও তুর্কি কথাশিল্পী এলিফ সাফাকের উপন্যাস' ফোরটি রুলস অব লাভ' অনুবাদ করেছেন। উপন্যাস, গল্প, প্রবন্ধ ও অনুবাদসহ মোট ছয়টি বই তার প্রকাশিত। ইউএই প্রবাসী ১৮ বছর ধরে। তিনি ইংরেজি, উর্দু, হিন্দি, আরবি ভাষাও জানেন।