page contents
লাইফস্টাইল, সংস্কৃতি ও বিশ্ব

জাতীয় আয় কাকে বলে

সিলেট এম সি কলেজে ছাত্র থাকার সময়ে ১৯৬৩ সালে আমরা প্রফেসর হায়দার হোসেনের নেতৃত্বে তখনকার পূর্ব পাকিস্তানের বিশেষ বিশেষ শিক্ষা ও শিল্পপ্রতিষ্ঠান দেখার জন্যে বের হলাম।

সফরে ছাত্রসংখ্যা কত ছিল তা মনে করতে পারছি না। ১৫ জন হবে। ঢাকা ও রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় ছাড়াও আমরা প্রায় সব কয়টি প্রথম শ্রেণীর কলেজ দেখেছিলাম। তন্মধ্যে ঢাকা কলেজ, জগন্নাথ কলেজ, ভিক্টোরিয়া কলেজ কুমিল্লা, চট্টগ্রাম কলেজ, আনন্দমোহন কলেজ ময়মনসিংহ, রাজশাহী কলেজ, বি এম কলেজ বরিশাল, ডি এল কলেজ দৌলতপুর, এডওয়ার্ড কলেজ পাবনা, কারমাইকেল কলেজ রংপুর, আজিজুল হক কলেজ বগুড়া উল্লেখযোগ্য।

বগুড়ায় আমরা হায়দার হোসেন সাহেবের ভাই অ্যাডভোকেট আকবর হোসেন সাহেবের সৌজন্যে ওস্তাদ আলাউদ্দিন খানের সেতার ও গান শুনে আপ্যায়িত হয়েছিলাম।

শিল্প কারখানার মধ্যে আমরা দেখেছিলাম ঢাকার নাবিস্কো বিস্কুট কোম্পানি, হরদেও গ্লাস ফ্যাক্টরি, তিব্বত সাবান, ঢাকেশ্বরী কটন মিলস, ঢাকা ম্যাচ ফ্যাক্টরি, যশোর চিনির কল, খুলনা নিউজ প্রিন্ট, ফেঞ্চুগঞ্জ সার কারখানা ও ছাতক সিমেন্ট কারখানা।ali ahmad rushdi pngএছাড়াও আমরা দেখেছিলাম বগুড়ায় মহেশ্বর গড়, চালনা বন্দর, ও বাগের হাটে খান জাহান আলীর (রঃ) ষাট গম্বুজ মসজিদ।

এই শিক্ষা সফরটি আমার জীবনে অনেক পরিবর্তন এনে দিয়েছিল।

পরের বছর অনার্স কোর্সের দ্বিতীয় বর্ষ শেষ হওয়ার সাথে সাথে সাবসিডিয়ারি বিষয়ের পরীক্ষাও শেষ হয়ে গেল। তখন পাকিস্তান দ্বিতীয় পঞ্চ বার্ষিক পরিকল্পনার চতুর্থ বছর। প্রেসিডেন্ট আইয়ুব খানের ক্ষমতা গ্রহণের পর এটাই প্রথম উন্নয়ন পরিকল্পনা।

দেশে উন্নয়নের অগ্রগতি নিয়ে মানুষ তখন আলোচনা-সমালোচনায় মুখর। দ্বিতীয় পঞ্চ বার্ষিক পরিকল্পনার সাফল্য কিংবা ব্যর্থতার নিরিখে তৃতীয় পঞ্চ বার্ষিক পরিকল্পনা তৈরি হতে যাচ্ছে। কাজেই এই আলোচনা ও সমীক্ষা ছিল অত্যন্ত সময়োপযোগী। আমরা অনার্সের ছাত্রছাত্রীরা মিলে একটা অর্থনৈতিক মেলা (ইকোনমিক এক্সিবিশন) করার প্রস্তাব দিলে বিভাগীয় শিক্ষকবৃন্দ এবং প্রিন্সিপাল সাহেব তা সাদরে গ্রহণ করলেন।

শিক্ষকদের সহযোগিতায় ও আমাদের পরিশ্রমে ১৬/১৭ দিনের মধ্যেই নানান চিত্র, চার্ট ও ফেস্টুনের মাধ্যমে আমরা দেশে অর্থনৈতিক অগ্রগতির একটা চিত্র তুলে ধরতে সমর্থ হলাম।

আমরা দেখালাম পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানের মধ্যে উন্নয়ন বরাদ্দ ও উন্নয়ন সফলতার তারতম্য এবং দীর্ঘদিন অবহেলার ফলে পূর্ব পাকিস্তান কীভাবে পশ্চিম পাকিস্তানের তুলনায় পিছিয়ে আছে। বিশেষ করে অর্থনৈতিক অগ্রগতির হার বাড়া সত্ত্বেও কী করে দুই পাকিস্তানের মধ্যে অর্থনৈতিক বৈষম্য বাড়ছে।

কলেজের ছাত্র ও শিক্ষকরা আমাদের প্রদর্শনী দেখে খুবই চমৎকৃত হয়েছিলেন।

২.
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অর্থনীতি বিভাগের চেয়ারম্যান প্রফেসর আবু মাহমুদ এসেছিলেন আমাদের প্রদর্শনী দেখতে। তিনি বললেন, তোমরা যা করেছো তা ঠিকই আছে। তবে এই সব কথা মোটামুটি সবাই জানে। তোমাদের এ প্রদর্শনী ঢাকায় কোনো হেড লাইনের সৃষ্টি করবে না। তোমরা বরং সিলেটের অর্থনীতির উপর একটি প্রদর্শনী করতে পারতে। বিশেষ করে এখানকার বেত শিল্প, চা, কমলা লেবু, লন্ডন প্রবাসীদের বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন, গ্যাস এ সবের উপর দারুণ চোখ ঝলসানো প্রদর্শনী করতে পারতে। দেশে বিদেশে তোমাদের সফলতার জয়গান হত।

প্রফেসার মাহমুদ বললেন, ইংলিশ চ্যানেলে সাঁতার কেটে লাস্ট হবার চেয়ে তোমার স্থানীয় পুকুর বা দীঘিতে সাঁতার কেটে প্রথম হওয়া অনেক গৌরবের।

abu-mahmud-1

আবু নসর মুহম্মদ মাহমুদ (১৯২০-১৯৮৮)। আইয়ুব খানের শাসনামলে (১৯৫৮-১৯৬৯) পশ্চিম পাকিস্তান কর্তৃক পূর্ব পাকিস্তানকে অর্থনৈতিকভাবে শোষণের বিরুদ্ধে তীব্র প্রতিবাদ জ্ঞাপন করেন আবু মাহমুদ। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগে প্রদর্শনী করে এই শোষণের চিত্র দেশবাসীর সামনে উপস্থাপন করেন তিনি এবং শোষণ বন্ধ করার লক্ষ্যে ‘দুই অর্থনীতি’র দাবি উত্থাপন করেন। সূত্র: বাংলা একাডেমী চরিতাভিধান, ফেব্রুয়ারি ১৯৯৭, পুনর্মুদ্রণ ২০০৩।—বি. স.

এ সময় তিনি আমাদের একটি ক্লাস নিয়েছিলেন। ক্লাসটি ছিল একটি প্রশ্নোত্তরের ক্লাস অর্থাৎ তিনি কোনো বিশেষ বিষয়বস্তুর ওপর বক্তৃতা দেবেন না। ছাত্ররা যা প্রশ্ন করবে শুধু সেগুলি নিয়েই আলোচনা করবেন।

আমরা জানতে চেয়েছিলাম, ‘জাতীয় আয়’ বলতে কী বোঝানো হয় এবং বিভিন্ন দেশের জাতীয় আয় কতটা তুলনীয়?

তিনি বলেছিলেন, জাতীয় আয় কত তা জানার জন্যে যেসব পদ্ধতি আছে তার মধ্যে অপেক্ষাকৃত সহজ ও সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত পদ্ধতি হচ্ছে ‘ব্যয় পদ্ধতি’ বা ‘এক্সপেন্ডিচার মেথড’। এই পদ্ধতিতে কোনো দেশে কোনো নির্দিষ্ট সময়ে মোট ভোগ ব্যয়, বিনিয়োগ ব্যয়, সরকারী ব্যয় এবং আমদানি ও রপ্তানির পার্থক্যকে জাতীয় আয় বলা হয়।

আমরা জানতে চেয়েছিলাম সরকারী ও বেসরকারী বিনিয়োগ তথা জনস্বার্থমূলক খরচের সবটাই জাতীয় আয়ে রূপান্তরিত হয় কিনা?

স্যার বলছিলেন, হ্যাঁ, তাৎক্ষণিকভাবে সবটুকুই রূপান্তরিত হয়, পরে জাতীয় আয় বাড়বে যে পরিমাণ বিনিয়োগ হয়েছে তার চেয়ে অনেক বেশি। কত বেশি তা নির্ভর করবে প্রান্তিক সঞ্চয় প্রবণতার ওপর (Marginal Propensity to Save)। সঞ্চয় প্রবণতা যত কম, গুণকের মাত্রা তত বেশি।

প্রান্তিক সঞ্চয় প্রবণতা হচ্ছে আয়ের পরিবর্তনের ফলে সঞ্চয়ে যে পরিবর্তন আসে তা। অর্থাৎ change in savings due to change in income.

অর্থনীতিতে যখন কোন বিনিয়োগ কারী প্রাথমিক ভাবে বিনিয়োগ করে কিংবা সরকার যখন কোন বিশেষ খাতে নতুন ভাবে অর্থ বরাদ্দ করে তখন সেই বিনিয়োগ কিংবা অনুদানের অর্থ সরাসরি জাতীয় আয়ের সাথে যোগ হয়। কারণ বিনিয়োগকারী তার শিল্পকারখানা কিংবা ব্যবসা প্রতিষ্ঠান গড়ার জন্যে যে পরিমাণ অর্থ তার শ্রমিকের বেতন, ভূমির খাজনা, পূঁজির সুদ এবং নিজের উদ্যোগের জন্য লাভ হিসাবে খরচ করে তার সবটাই জাতীয় আয়ের অংশ হিসাবে গণ্য হয়।

কিন্তু এখানেই শেষ নয়। এই সব নতুন আয়ের মালিকরা অর্থাৎ শ্রমিক, ভূস্বামী, পূঁজিপতি ও উদ্যোক্তা নিজে তার নতুন আয়ের কিয়দংশ সঞ্চয় করবে এবং বাকি অংশ খরচ করবে।

নতুন এই খরচের জন্যে বাজারে দ্রব্যসামগ্রীর চাহিদা বৃদ্ধি পাবে এবং এই সব দ্রব্যসামগ্রীর বিক্রেতাদের হাতে নতুন করে পয়সা আসবে, তাদের আয় বাড়বে।

দ্বিতীয়বার যাদের আয় বৃদ্ধি পাবে তারাও আয়ের এক অংশ সঞ্চয় করে বাকি অংশ খরচ করবে যা আবার নতুন আয়ের সৃষ্টি করবে। এই ভাবে নতুন আয়ের সৃষ্টি হতে থাকবে যতক্ষণ পর্যন্ত মূল আয়ের অংশবিশেষ বাকি থাকে।

এই প্রক্রিয়ায় সঞ্চয় প্রবণতা যত বেশি থাকে তত তাড়াতাড়ি এই ‘নতুন আয় সৃষ্টির খেলা’ শেষ হয়ে যাবে। সঞ্চয় প্রবণতা যদি শতকারা ১০০ ভাগ হয় তাহলে প্রথম বিনিয়োগ কিংবা সরকারী খরচের পর দ্বিতীয় দফা আয় সৃষ্টির জন্যে আর কিছু থাকবে না। সবটাই অলস হয়ে থাকবে যতক্ষণ পর্যন্ত না বিনিয়োগ আকারে সচল হয়ে আবার বাজারে আসে। এই খরচের পরিমাণ যদি ১০০ টাকা হয় তাহলে জাতীয় আয় কেবম মাত্র ১০০ টাকা বৃদ্ধি পাবে। সঞ্চয় প্রবণতা যদি শতকারা ৫০ ভাগ হয় তাহলে জাতীয় আয় বাড়বে ২০০ টাকা। সঞ্চয় প্রবণতা যদি নতুন আয়ের এক পঞ্চমাংশ বা ০.২০ হয় তাহলে জাতীয় আয় বাড়বে ১/০.২০ = ৫০০ টাকা।

নতুন চাহিদা মিটানোর জন্যে নতুন বিনিয়োগের দরকার হবে। এই নতুন বিনিয়গের নাম প্রভাবিত বিনিয়োগ কিংবা induced investment. প্রাথমিক বিনিয়োগের নাম স্বতঃস্ফূর্ত বিনিয়োগ। স্বতঃস্ফূর্ত বিনিয়োগ এবং প্রভাবিত বিনিয়োগের সমন্বয়ে সৃষ্টি হয় উন্নয়নের গতি (Acceleration)।

কেইনস দেখিয়েছেন, সরকার যদি কোনো নির্দিষ্ট পরিমাণ কর আদায় করে সেই পরিমাণ ব্যয় বাড়ায় তাহলেও জাতীয় আয় বাড়বে। এই তত্ত্বটিকে বলা হয় ব্যালান্সড বাজেট মাল্টিপ্লায়ার ইফেক্ট (Balanced Budget Multiplier Effect)। অর্থাৎ বাজেটের মধ্যে সরকারের আয় ও ব্যয় সমান রেখেও সরকার জাতীয় আয় বৃদ্ধি করতে পারে।

আমরা জিজ্ঞেস করেছিলাম, জাতীয় আয়ের পরিমাণ নির্ধারণের জন্যে আর কী কী পদ্ধতি ব্যবহৃত হয়?

তিনি বলেছিলেন, অন্যান্য পদ্ধতিগুলির মধ্যে আছে উৎপাদন ও আয়পদ্ধতি।

উৎপাদন পদ্ধতির মাধ্যমে জাতীয় আয় গোণার সময় মনে রাখতে হবে কোনো দেশে নির্দিষ্ট বছরে যে সব পণ্যসামগ্রী তৈরি হয় তার সব কয়টিই জাতীয় আয়ের অন্তর্ভুক্ত হবে না। কেবল মাত্র চূড়ান্তভাবে উৎপাদিত দ্রব্য ও সেবাই জাতীয় আয়ের অংশ হিসাবে গণ্য হবে। তাছাড়া উৎপন্ন দ্রব্যাদির পরিমাণ নয় বরং মূল্যমান বা ভ্যালু হচ্ছে জাতীয় আয়।

mc-college-1

অর্থনীতি বিভাগ, মুরারিচাঁদ কলেজ, সিলেট। (স্থাপিত ১৮৯২)

স্যার বলেছিলেন, বিভিন্ন জিনিসপত্রের পরিমাণ দিয়ে জাতীয় আয় নির্ণয় করলে তা হত একটা অর্থহীন পরিভাষা। ধরা যাক এ বছর কোনো দেশ এক টন কয়লা আর এক কেজি স্বর্ণ উৎপাদন করল। আগামী বছর করল দুই কেজি স্বর্ণ আর দুই টন কয়লা। এ ক্ষেত্রে সহজেই বলা যাবে যে দেশের জাতীয় উৎপাদন দ্বিগুণ হয়েছে কিংবা শত করা ১০০ ভাগ বেড়েছে। কিন্ত বাস্তবে কোনো দেশের পণ্যসামগ্রী দুটি মাত্র পণ্যের মধ্যে সীমিত থাকে না।

সেখানে হাজার হাজার পণ্য ও সেবা বিভিন্ন পরিমাণে উৎপাদিত হচ্ছে। কোনোটির পরিমাণ কমছে আবার কোনোটির পরিমাণ বাড়ছে। সব পণ্যের পরিমাণ বাড়লেও দেখা যাবে একই হারে বাড়ছে না। কোনো দ্রব্য কম বাড়ছে আবার কোনো পণ্য বেশি বাড়ছে। এ অবস্থায় এই হাজার হাজার দ্রব্যের নাম ও পরিমাণ মনে রাখা যেমন কঠিন তেমনি অপ্রয়োজনীয়। অথচ এই হাজার হাজার পণ্যের গড় মূল্যমান একযোগে প্রকাশ করা যেমন সহজ তেমনি একটি প্রয়োজনীয় পরিসংখ্যান।

জাতীয় আয়ের পরিমাণ চলমান বাজার দরে প্রকাশ করা যায় আবার আগের কোনো বছরের বাজার দরেও হতে পারে।

কোনো নির্দিষ্ট বছরের বাজার দরে মূল্যমান গোণা হলে আগের বছরের তুলনায় এ বছর জাতীয় আয় শতকরা কত ভাগ বাড়লো কিংবা কমলো তার একটা হিসাব সহজেই বের করা যায়। জাতীয় আয়ের এই হ্রাস-বৃদ্ধিকে বলা হয় প্রকৃত প্রবৃদ্ধির হার। কারণ এ ক্ষেত্রে জিনিসপত্রের দামের যে পরিবর্তন এসেছে তা প্রতিফলিত হয় নি।

আবার জাতীয় আয় চলমান বাজার দরে (কারেন্ট প্রাইস) প্রকাশ করলে বছরের জাতীয় আয়ে যে প্রবৃদ্ধি দেখা দেবে তা হবে কৃত্রিম। কারণ এ ক্ষেত্রে উৎপাদনের পরিমাণ বৃদ্ধি না পেলেও জাতীয় আয় বাড়তে পারে কেবল মাত্র মূল্যবৃদ্ধির কারণে। আবার বাজার দর কমে গেলে মনে হবে জাতীয় আয় কমে গেছে।

ধরা যাক কোন দেশে গত বছর জাতীয় আয় ছিল ১০০ টাকা। এ বছর ১৫০ টাকা। জাতীয় আয়ের এই বৃদ্ধি একাধিক কারণে হতে পারে। প্রথমতঃ দাম বাড়ার কারণে। এক্ষেত্রে প্রকৃত জাতীয় আয় মোটেই বৃদ্ধি পায় নি। দ্বিতীয়তঃ উৎপাদন বৃদ্ধির ফলে। এক্ষেত্রে পুরো ৫০ টাকাই প্রকৃত প্রবৃদ্ধি ।এবং তৃতীয়তঃ দাম ও উৎপাদন উভয়ের বৃদ্ধির ফলে। এক্ষেত্রে প্রকৃত বৃদ্ধির হার বের করার জন্যে একটা দামের সূচক তৈরি করতে হবে এবং সেই সূচক দিয়ে চলতি দামের জাতীয় আয়কে ভাগ করলে প্রকৃত প্রবৃদ্ধির হার পাওয়া যাবে। মনে করো দামের সূচক হচ্ছে ১১০, তাহলে প্রকৃত জাতীয় আয় হবে ১৩৬.৩৪।

জাতীয় আয় নির্ণয়ের সময় যে কেবল মাত্র চূড়ান্ত ভাবে উৎপন্ন দ্রব্যসামগ্রীই গুনতে হবে তার ব্যাখ্যা করতে গিয়ে তিনি বলেছিলেন যে সব দ্রব্যসামগ্রী অন্য কোনো দ্রব্য তৈরি করার জন্যে উৎপাদন করা হয় সেগুলোর মূল্য জাতীয় আয়ের অন্তর্ভুক্ত হবে না। কারণ মাধ্যমিকভাবে উৎপাদিত দ্রব্যাদির মূল্য জাতীয় আয়ে অন্তর্ভুক্ত করা হলে একই বস্তুর মূল্যমান দুইবার গোণা হবে। যেমন গম থেকে আটা হয়, আটা থেকে রুটি হয়। জাতীয় আয় গুণতে গিয়ে আমরা যদি গম, আটা ও রুটির মূল্যমান যোগ করি তা হলে নির্ণীত জাতীয় আয় প্রকৃত জাতীয় আয়ের তুলনায় বেশি বলে ভুল করা হবে। এ ক্ষেত্রে কেবল মাত্র রুটির মূল্যমান জাতীয় আয়ের অংশ হিসাবে ধরা হবে আর গম ও আটার মূল্যমান বাদ যাবে।

আমরা স্যারকে অনুরোধ করেছিলাম জাতীয় আয় নির্ণয়ের ক্ষেত্রে Value Added বা মূল্যমান বৃদ্ধি বলতে কী বোঝানো হয় তা একটু খোলাসা করে বলার জন্যে।

তিনি আরেকটু সহজ করে বললেন জাতীয় আয় হচ্ছে প্রত্যেক স্তরের উৎপাদনে যে পরিমান মূল্যমান বা ভ্যালু যোগ হয় তার সমষ্টি। কোনো বস্তুর বাজারমূল্য থেকে উৎপাদন ব্যয় বাদ দিলে যা থাকে তা হচ্ছে মুনাফা। মুনাফার সাথে শ্রমিকের মজুরি ও ক্যাপিটেল অ্যাসেটের বাৎসরিক খরচ যোগ করলে ভ্যালু অ্যাডেড বা সংযোজিত মূল্যমান পাওয়া যায়। অন্য কথায় বস্তুর বাজারমূল্য থেকে কাঁচামাল ও জ্বালানি খরচ বাদ দিলে ভ্যালু অ্যাডেড পাওয়া যায়। কোনো বস্তুর বাজার মূল্য হচ্ছে সেই বস্তুর প্রাথমিক, মাধ্যমিক ও চূড়ান্ত উৎপাদন কালে প্রত্যেক স্তরে সংযোজিত মূল্যমান বা ভ্যালু অ্যাডেড এর সমান।

আমরা জিজ্ঞেস করেছিলাম, বাংলায় অর্থনৈতিক আলোচনা কালে জাতীয় আয়ের দুইটি ইংরেজী পরিভাষা ব্যবহার করা হয়। এর একটি হচ্ছে Gross Domestic Product (GDP) বা মোট দেশীয় উৎপাদন; আরেকটি হচ্ছে Gross National Product (GNP) বা মোট জাতীয় উৎপাদন। এই দুইটির মধ্যে বিশেষ পার্থক্য কী?

স্যার বলেছিলেন, প্রথমটিতে (GDP) একটি দেশের ভিতরে নির্দিষ্ট সময়ে (বছরে) উৎপাদিত সমগ্র বস্তু ও সেবার মূল্যমান আর দ্বিতীয়টিতে (GNP) কোন দেশের নাগরিকগরা দেশের ভিতরে বা বাইরে যে পরিমাণ দ্রব্যসামগ্রী উৎপাদন করে তার মূল্যমান বোঝানো হয়।

দেশীয় উৎপাদন বা GDP-র ক্ষেত্রে বাংলাদেশীরা বিদেশে যা উৎপাদন করে তা ধরা হয় না আবার জাতীয় উৎপাদনের ক্ষেত্রে বিদেশীরা বাংলাদেশে যা উৎপাদন করে তা বাদ পড়ে যায়। এই পার্থক্য থাকা সত্ত্বেও দেশীয় উৎপাদন আর জাতীয় উৎপাদন প্রায় একই ভাবে জাতীয় আয়ের সমার্থক হিসাবে ব্যবহৃত হয়ে থাকে।

এবার স্যার ইনকাম পদ্ধতি সম্পর্কে বললেন। সমাজের প্রত্যেক মানুষের আয়ের সমষ্টি জাতীয় আয়। উৎপাদনের উপাদানগুলি সাধারণত চার ভাগে বিভক্ত: জমি, পূঁজি, শ্রম ও উদ্যোগ বা Land, Labour, capital and Organisation.

এই সব উপাদানের যারা মালিক তারা যথাক্রমে জমিদার, শ্রমিক, পুঁজিপতি ও উদ্যোক্তা বা ব্যবসায়ী হিসাবে পরিচিত। জমির মালিকদের আয় আসে রেন্ট বা খাজনা হিসাবে, শ্রমিকের আয় মজুরি, পূঁজিপতির আয় সুদ আর ব্যবসায়ীর আয় মুনাফা। কাজেই খাজনা, মজুরী, সুদ ও মুনাফার যোগফল হচ্ছে জাতীয় আয়।

৩.
এরপর স্যার আমাদের প্রশ্নের দ্বিতীয় অশে মন দিলেন। তিনি বললেন দুই দেশের জাতীয় আয়ের মধ্যে তুলনা করা যায় কি না তা জানার জানার জন্যে জানতে হবে জাতীয় আয় গোনার সমস্যা কী কী?

স্যার বলে চললেন, জাতীয় আয় গণনার ক্ষেত্রে কেবল মাত্র টাকার বিনিময়ে বেচাকেনা হয় এমন সব দ্রব্যসামগ্রী জাতীয় আয়ের অন্তর্ভুক্ত করা হয়। টাকা ছাড়া যে সব কাজ করা হয় যেমন স্বেছাসেবকের কাজ, গৃহিনী নিজের পরিবারের জন্য যে সব কাজ করে তার দাম জাতীয় আয়ের অন্তর্ভুক্ত হয় না।

যে সব দেশে মায়েরা বাইরে কাজ করে, স্বামী স্ত্রী-দুজনেই বাইরে খায়, বাচ্চাদের বেবি মাইন্ডারদের কাছে রাখে সে সব দেশে জাতীয় আয় অপেক্ষাকৃত বেশি হবে। অন্যদিকে যেসব দেশে মায়েরা সম পরিমাণ কাজ কিংবা তার চেয়ে বেশি কাজ ঘরে করে, বাচ্চাদের লালন পালন, পরিবারের রান্নাবান্না, কাপড়-চোপর ধোয়া ও ইস্ত্রী করা তথা যাবতীয় ঘরসংসারের কাজ, বাজার করা, মেহমানদারি ইত্যাদি সব কাজ বিনা পয়সায় করে সেদেশের জাতীয় আয় অপেক্ষাকৃত কম হবে।

এই সব সমস্যা সমাধানের উদ্দেশ্যে ইদানিং কোনো কোনো দেশে গৃহিনীদের কাজের একটা আনুমানিক (implicit) দাম কিংবা কোনো ব্যক্তি নিজের গাড়ি ও নিজের বাড়িতে থাকলেও সেই গাড়ি ও বাড়ির একটা implicit ভাড়া ধরা হয়ে থাকে। কোনো দুই দেশের জাতীয় আয়ের মধ্যে তুলনা করতে গেলে এই implicit দাম ধরার কোনো বিকল্প নাই।

অনেক কাজ আছে যা টাকার বিনিময়ে করা হয়ে থাকে কিন্ত এই কাজের মাধ্যমে কী উৎপাদন করা হয় তা সম্পূর্ণ বোধগম্য নয়। যেমন সিভিল সার্ভিস, পুলিশ কিংবা সেনা সার্ভিস। আমরা সবাই জানি তাদের সার্ভিস অতি গুরুত্ত্বপূর্ণ কিন্তু তাদের উৎপাদিত দ্রব্যের পরিমাণ কিংবা বাজারদাম কত তা নিরূপণ করা খুবই কঠিন। এমতাবস্থায় এই সব সার্ভিসের জন্যে যা খরচ করা হয় তাই জাতীয় আয়ের অন্তর্ভুক্ত হয়।

স্যার আরও বলছিলেন, আর্ট কিংবা অ্যান্টিকের দামে হ্রাসবৃদ্ধি হলেও জাতীয় আয়ে হ্রাসবৃদ্ধি হয় না কারণ যেই বিশেষ বছরের জন্যে জাতীয় আয় গোণা হবে কেবল মাত্র সেই বছরে উৎপন্ন হয়েছে এমন সব জিনিস পত্রই জাতীয় আয়ের অন্তর্ভুক্ত হবে। একই কারণে শেয়ারের দাম হ্রাস বৃদ্ধি হলেও জাতীয় আয়ে হ্রাসবৃদ্ধি হবে না।

৪.
পরবর্তী কালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রফেসার মাহমুদ আমাদের মাইক্রো ইকনমিক্স পড়াতেন। এর আগে আমরা শতাব্দীর নিষ্ঠুরতম রসিকতা ‘if wishes were horses beggars would ride’-এর সাথে পরিচিত ছিলাম।

অর্থনীতি সম্পর্কে প্রথম যখন পড়াশোনা শুরু করি আমাদের কোন এক শিক্ষক বলেছিলেন অর্থনীতি হচ্ছে এমন এক বিষয় যদি কোন তোতা পাখিকে তিনটি শব্দ শিখিয়ে দেওয়া যায় তা হলে পাখিটি একজন অর্থনীতিবিদ হয়ে যাবে। শব্দ তিনটি হচ্ছে Demand, Supply and Elasticity অর্থাৎ চাহিদা, সরবরাহ এবং স্থিতিস্থাপকতা। কিন্তু চাহিদা কাকে বলে?

চাহিদা বলতে আমাদের বোঝানো হয়েছিল desire to get something backed by purchasing power অর্থাৎ কেনার সামর্থ না থাকলে কোনো কিছু পাওয়ার ইচ্ছেকেই চাহিদা বলা যাবে না। সাথে সাথে এই ইংরেজি প্রবাদটিও বলা হতো ‘if wishes were horses beggars would ride’। ইচ্ছার নাম যদি ঘোড়া হত তা হলে ঐ ঘোড়ার ওপর ভিক্ষুকরা সওয়ার হত। ঘোড়া কেনার সামর্থ না থাকলে কেবল ঘোড়ায় চড়ার ইচ্ছা হলেই ঘোড়ায় চড়া যাবে না।

প্রফেসার মাহমুদ আমাদের পরিচয় করালেন তাঁর বিখ্যাত ‘ক্রিটিক্যাল মিনিমা’ থিওরির সাথে। তিনি বললেন, না, জীবনধারণের জন্য অপরিহার্য সব কিছুই চাহিদার অন্তর্ভুক্ত। ক্রেতার পকেটে টাকা না থাকলে সরকারের তরফ থেকে সেই টাকা আসতে হবে। মানুষ অর্থনীতিবিদ যিনি তাকে সামাজিক চাহিদার কথা ভাবতে হবে। সেই চাহিদার পেছনে কেনবার সামর্থ না থাকলে সামাজিকভাবেই সেই সামর্থের যোগাড় করতে হবে।

৫.
পরবর্তীকালে প্রেসিডেন্ট এরশাদের সময়ে স্যারকে প্রফেসার এমিরেটাস করে আবার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে আনা হয়েছিল। কিন্তু এ সময়ে বিশ্ববিদ্যালয়ে তাঁর অবস্থান খুব সুখের হয় নি। অবসর গ্রহণের পরে তিনি তাঁর শান্তিনগরের বাসায় থাকতেন। প্রায়ই দেখা হতো রমনা পার্কে হাঁটতে গেলে।

একবার আমাকে বলেছিলেন, ‘শুনেছি তুমি নাকি প্রায়ই বিদেশে যাও’।

বললাম, জ্বী যাওয়া হয় মাঝে মাঝে। আপনার কিছু দরকার?

তিনি একটি ফিজিক্সের বইয়ের নাম দিয়েছিলেন। জিজ্ঞেস করলাম, ফিজিক্সের বই দিয়ে কী করবেন আপনি?

তিনি বললেন, “পড়তে ইছে হয়। কত জিনিস রয়ে গেল অজানা।”

বহু দিন হয়েছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছেড়েছি। প্রফেসার মাহমুদ বহু আগেই এই পৃথিবী ছেড়ে চলে গেছেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পরেও ডিগ্রির জন্যে আরও পড়াশোনা করতে হয়েছে। তার অনেক কিছুই এখন আর মনে নেই। কিন্তু ডিগ্রির জন্যে পড়ি নি এমন অনেক কথা এখনও মনে আছে। সেই সব কথা এখন অন্যদের সাথে শেয়ার করতে ভাল লাগে।

About Author

আলী আহমাদ রুশদী
আলী আহমাদ রুশদী

ড. আলী আহমাদ রুশদীর কর্মজীবন শুরু হয়েছিল ১৯৬৬ সালে কুমিল্লার নওয়াব ফয়জুন্নেসা কলেজে শিক্ষকতার মধ্য দিয়ে। পরবর্তীতে তিনি ঢাকা কলেজে কিছুদিন শিক্ষকতা করেছেন এবং বাংলাদেশের স্বাধীনতা পরবর্তী সময়ে করোটিয়ার সাদত কলেজে বেশ কয়েক বছর অধ্যক্ষ হিসাবে কাজ করেছেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অর্থনীতিতে সহযোগী-অধ্যাপক ছিলেন বহুদিন। ১৯৮৯ সাল থেকে অস্ট্রেলিয়া প্রবাসী। মেলবোর্নে অবস্থিত Australian Competition and Consumers Commission এ অর্থনৈতিক উপদেষ্টা হিসাবে কাজ করেছেন প্রায় ১৫ বছর। সেখান থেকে অবসর গ্রহণের পরে ঢাকার AIUB ও নর্থ-সাউথ ইউনিভার্সিটিতে কিছুদিন অধ্যাপনা করেছেন। এছাড়াও বিভিন্ন সময়ে UNDP, ILO, World Bank ইত্যাদি প্রতিষ্ঠানের কাজে গবেষণা করেছেন। বর্তমানে মেলবোর্নে অবসর জীবন যাপনের ফাঁকে তাঁর সময় কাটে অর্থনৈতিক বিভিন্ন বিষয়ের উপর লেখালেখি করে।