page contents
লাইফস্টাইল, সংস্কৃতি ও বিশ্ব

জার্নি বাই ছাদ অ্যাট শবে বরাতের রাত অ্যান্ড মিটিং উইথ অ্যান ওল্ড আংকেল

স্কুলে পড়ার বয়সে স্বাধীনভাবে বাইরে রাত কাটানোর সুযোগ কেউই তেমন পায় না। আমিও পাইতাম না। কিন্তু এটা আমার খুব রোমান্টিক লাগত ভাবতে যে, রাতের বেলা আমি একা একা বাইরে ঘুরতেছি। নাজির রোডে আমাদের বাড়িওয়ালার মেয়ে উর্মি আপুর বিয়েতে ঢাকা থেকে আসা ভার্সিটি পড়ুয়া কয়েকজনের সঙ্গে আমার বন্ধুত্ব হয়। থাকার জায়গার সংকট বশত ওদেরকে আমাদের বাসায় পাঠানো হইছিল, ওদের তিনজনের সঙ্গে ছিলাম আমি। ফাইনালি রুমে আইসা ঘুমাইয়া পড়ার আগে তারা চাইল, রাতের ফেনী শহরটা একটু ঘুইরা দেখবে। আব্বু-আম্মুরে বইলা আমারেও তারা সাথে নেয়। সেই যে রাতের শহরে ঘুইরা বেড়ানোর মজা টের পাইলাম—অনেকদিন পর্যন্ত সেই মজা আমার গায়ে গায়ে হইয়া থাকল।

tanimlogo2

রিকশা নিয়া আমরা সারাটা শহর ঘুরলাম। রাজাঝির দীঘি, বিজয়সিংহ দীঘি, রেলস্টেশন, বাসস্ট্যান্ড ইত্যাদি জায়গা রাতের বেলা অন্য একটা চেহারা নিয়া যে ওইরূপে বিরাজমান থাকে—আগে কোনওদিন সেটা আমি ভাবতেই পারি নাই।

আমার, স্বাধীনভাবে বাইরে রাত কাটানোর সুযোগ হয় পরবর্তী কোনও এক বছরের শবে বরাতের রাতে। বিশেষ ওই রাতে সব বছরই আব্বুর সাথে সাথে আমারে মসজিদে মসজিদে ঘুরতে হইত। এবং মাজারেও। পাগলা মিয়ার মাজারে। কিন্তু সেবার আব্বু অসুস্থ জন্য আর বাইর হইতে পারল না। ফলে আমিও তক্কে তক্কে আবদারটা পাড়লাম, “আপনের লগে ঘুইরা ঘুইরা তো সব মসজিদ মাজারই আমার চেনা। আমি যাই, নামাজ পইড়া আসি। পাগলা মিয়ার মাজারেও না হয় যাব।”

প্রথমে আপত্তি করলেও পরে রাজি হইছিল আব্বু। আমারে মসজিদে-মাজারে ঘুরাঘুরি ও হোটেলে সেহরি খাওয়ার খরচ হিসেবে ১০০ টাকা দিয়া বলল, ফজরের নামাজ শেষেই যেন চইলা আসি।

Chad Theke Dakatia Rail Bridge

ছাদ থেকে ডাকাতিয়া রেলব্রিজ

কিন্তু পাপিষ্ঠ মন মসজিদ-মাজার পাশ কাটাইয়া আমারে নিয়া চলল রেলস্টেশনের দিকে। রাতের রেলস্টেশনে সম্পূর্ণ একা একা স্বাধীনভাবে হাজির হইতে পাইরা নিজেরে আমার মুসাফির মুসাফির লাগল। গায়ে পাঞ্জাবি, মাথায় টুপি।

যেন এই বাহিরই আমার গন্তব্য, অথচ কোনো এক শাস্তি হিসেবে ঘরের ভিতরেই আমারে থাকতে হইল জীবনভর! বহু আকাঙ্ক্ষিত সেই মুক্তি আমার পায়ের নিচের ইট কংক্রিটের প্ল্যাটফর্ম হইয়া হাসতেছিল যেন।

স্টেশনব্যাপী কয়েকটা চক্কর দিলাম। চা দোকানগুলিতে বসলাম। অর্ডার দিয়ে চা খাইলাম। সিগারেটও টানতে ইচ্ছা করল বড়দের মতো। মনে হইল, আচ্ছা! প্রত্যেকবার ঘোড়াশাল যাওয়ার সময় আম্মু-আব্বু-বোনদের সঙ্গে ওয়েটিংরুমে বইসা পুলিশ ফাঁড়ির ভেতর থেকে আসা যে হাস্নাহেনার গন্ধ পাই, সেই গন্ধ কি এখনও পাব?

ওয়েটিংরুমে গিয়া জানালার পাশে বসলাম—আহ! কী ঘ্রাণ—পাইলাম, আর মনে হইল এতদিন এই ঘ্রাণ আমি নিতে পারি নাই। কারণ আব্বু-আম্মু সঙ্গে ছিল, যেন তারা তো মুরব্বী, তাদের সামনে কি সবটা ঘ্রাণ আর নিতে পারছি নাকি এতদিন! শরমের ব্যাপার না সেটা?

অনেকক্ষণ পর্যন্ত ওয়েটিংরুমে বইসা থাকলাম। একপর্যায়ে ঢাকা মেইল আর তূর্ণা নিশিথা ট্রেনের যাত্রীরা আইসা জড়ো হইতে লাগল ওয়েটিংরুমে। মজার ব্যাপার হইল তাদের সঙ্গে তাদের—আমার বয়সী ছেলেরাও ছিল। যারা টান টান মোজার ওপর কেডস আর বছরের পর বছর তুইলা রাখা দামি জামাকাপড় পইরা বাধ্য ছেলের মতো হাস্নাহেনার নিয়ন্ত্রিত ঘ্রাণ নিতেছিল 😛 খুব মজা কইরা আমি সবগুলা ফ্যামিলি দেখতেছিলাম। কয়েকটা ফ্যামিলির মধ্যে শবে বরাতের রাতেই উক্ত ট্রেনযাত্রার অনিবার্যতা নিয়া কথা হইল। যেন তারা একে অপরের কাছে কৈফিয়ত দিতেছে, আল্লাহর শোকরগুজার না কইরা, নামাজ কলমা না পইড়া এই যে ট্রেনযাত্রা—এ ভিন্ন আর কোনও উপায় ছিল না তাদের। হঠাৎ আংকেল জাতীয় এক উদ্ভিদ আমার দিকে তাকায়, বলে, তুমি কই যাচ্ছো? তোমার আব্বু-আম্মু কই? আমি উনার প্রশ্নের জবাব না দিয়া জানালা দিয়া পুলিশ ফাঁড়ির বাগানে তাকাই। অর্ধেক সাদা রং করা অনেকগুলা ইট তেরছাভাবে হাস্নাহেনার গাছটাকে ঘিরে মাটিতে গাঁথা। আমার মনে হইল, ইটগুলাও হয়ত হাস্নাহেনাই :/

ওয়েটিংরুম থেকে বাইর হয়ে সোজা চলে যাই ওভারব্রিজের উপর। ওভারব্রিজের প্রত্যেকটা সিঁড়িতে অভাবী গরীব-দুখিরা ঘুমাইতেছিল। শবে বরাতের রাতে আল্লাহর প্রতি তাদের মনে হয় কোনও কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করার ছিল না। সারা বছরের জন্য নতুন কিছু চাওয়ারও ছিল না মেবি, নয়ত ওইরম নাক ডাইকা ঘুমানোর কথা না। গরীব-দুখি ডিঙ্গাইয়া আমি ওভারব্রিজে উঠলাম আর অনেক দূর থেইকা ধীরে ধাবমান একটা লাইট ক্রমশই পষ্ট হইতেছিল। “ঢাকা মেইল কিছুক্ষণের মধ্যে এক নাম্বার প্ল্যাটফর্মে এসে দাঁড়াবে”—ঘোষণা দিল মাইকে। আউটারে আইসা হুইসেল দিতেই ওভারব্রিজের ওপর ঘুমন্ত কয়েকজন একযোগে জাইগা উঠল। যেন তাদের এতক্ষণের ঘুমাইয়া থাকাটা একটা ফাইজলামি ছিল। ট্রেন প্ল্যাটফর্মে আইসা দাঁড়ানো মাত্রই ঝাপঝুপ কইরা লাফাইয়া ওরা ট্রেনের ছাদে গিয়া পড়ল। আর ছাদে নাইমাই ট্রেন ছাড়ার আগেই ওরা লাইন ধরে শুয়ে পড়ল। একজন যে সবার পরে শুইতে নিতেছে—তারে বললাম, “ভাই শোনেন। আমাকে একটু হেল্প করবেন? আমি কোনওদিন ট্রেনের ছাদে উঠি নাই।”

ট্রেন ছাড়লে লোকটা আমারে অভয় দিল। বলল, প্রয়োজনে তারে ধইরা বইসা থাকতে। কিন্তু সেটার দরকার পড়ল না। বাইরে থেকে যতটা ভয়ঙ্কর মনে হয়, চলতি ট্রেনের ছাদ আসলে মোটেই ততটা ভয়ঙ্কর কিছু না। দুলুনি আছে সত্য, কিন্তু তা ছাদে বইসা থাকার বাস্তবতা অনুযায়ী অনেক কম—যতটা না বাইরে থেকে মনে হয়।

Chad Theke Feni-Laksam Rail Section

ছাদ থেকে ফেনী-লাকসাম রেল সেকশন

ট্রেনটা যখন রেলগেট পার হইতেছে, দুই হাতে নিজের চেহারা ঢাকলাম আমি, যাতে পরিচিত কেউ দেইখা আবার বাসায় গিয়া বইলা না দিতে পারে।

শহর অঞ্চল পার হইয়া ট্রেনটা বেশ জোরে চলতে শুরু করল, আর খানিকটা নার্ভাসও করতে পারল আমারে। ছাদের লোকটা শুয়ে পড়ছে ততক্ষণে। তার আগে আমারে সাবধান করছে, গাছগাছালির ডালপালা ছুটে আসতে দেখলে যেন আমিও শুয়ে পড়ি। কিছুক্ষণ পর সত্যিই ওই বাস্তবতা আইসা হাজির হয়। হুট কইরা কী এক গাছের একদলা পাতা আইসা সমানে চড় থাপ্পড় দিল। একটা করে থাপ্পড় খাই আর হতভম্ব হই। দিশেহারা অবস্থা। পরামর্শ মতো শুইয়া পড়লাম লোকটার পাশে।

কী! কইছিলাম না?

হুম। কিন্তু এসব ডালপালা কাটে না কেন। কেউ তো মারাও যাইতে পারে।

ছাদের যাত্রীগো সুবিধার লাইগা গাছ কাটবে যে?

হ্যাঁ!

হা হা, ছাদের যাত্রীগো লাইগা সরকারের ভালোবাসা নাই!

কেন?

পইড়া মরলেও জরিমানা।

মানে?

ছাদেত্তে পইড়া বা গাছের বাড়ি খাইয়া তুমি যদি মইরা যাও, তোমার আব্বা আম্মারে জরিমানা দেওন লাগব।

ওমা! তাদের দোষ কী?

তাগো দোষ তারা এরম ছাওয়াল পয়দা করল ক্যা, যে ছাওয়াল ট্রেনের ছাদে উইঠা গাছের বাড়ি খাইয়া মইরা যায়!

খুব অদ্ভুত।

হ ভাই। তা তুমি যাইবা কই?

পরের স্টেশন। লাকসাম।

লাকসামে কী?

কিছুই না। শবে বরাতের নামাজ পড়তে বাইর হইয়া ট্রেনের ছাদে উঠে গেছি।

সর্বনাশ!

ফেরত যাব আবার। লাকসাম থেকে অন্য ট্রেনে করে ফেনী।

ও আচ্ছা, তাইলে ভালো। কিন্তু রাইত কইরা ট্রেনের ছাদে ঘুরাঘুরি ঠিক না।

আমাকে ছাদ থেকে নামিয়ে দিবেন তো? ছাদ থেকে নামি নাই কখনও।

যেভাবে উঠছো, সেইভাবেই নামবা। ওভারব্রিজ দিয়া। লাকসাম আসলে আমারে ডাইকো। নামাইয়া দিব।

Feni St

ফেনী ষ্টেশন

আচ্ছা।

অসংখ্য তারার আকাশের দিকে তাকাইয়া পিঠের নিচে ট্রেনের ঠাণ্ডা ছাদ টের পাইতে থাকি। মাঝেমাঝেই বুকের এক দেড় হাত উপর দিয়া সাঁইসাঁই কইরা গাছগাছালির ডালপালা সমানে ছুইটা যায়। মনে হইল, এই যা যা ঘটতেছে ট্রেনের ছাদে—এগুলা নিশ্চয়ই খুব মহৎ কোনও ঘটনা।

অনেকক্ষণ ধরে বিপদজনক ডালপালা ছুটে আসতেছে না দেইখা আবার আমি উইঠা বসলাম। লাকসামের আগের কোনও একটা ছোট স্টেশন পার হইতেছিল তখন ট্রেনটা। পাশের লাইনে দাঁড়ানো ছিল একটা তেলবাহী ট্রেন। নক্ষত্রের আবছা আলোয় তেলের ট্রেনের ন্যাড়া বগিগুলাকে অত্যন্ত ভুতুড়ে লাগতেছিল।

স্টেশন পার হইয়া কিছুক্ষণ বাদে ট্রেনটা একটা ব্রিজে ওঠে। দুইপাশে নদী—ট্রেনটারে অদৃশ্য ভাবলে মাঝখান দিয়া বলতে গেলে ম্যানুয়ালি উইড়া গেলাম আমি। তারপর রেলবাঁক। ঘন ঘন হুইসেল। হারিকেন হাতে নিয়া একটা লোকের কই যেন যাইতে থাকা—ঘোরাচ্ছন্ন হইয়া গেলাম পুরা। মনে হইল, এই যে এসব, এগুলা নিশ্চয়ই গায়েবি কোনও ব্যাপার। যেন আশ্চর্য জায়নামাজে চইড়া জ্বিনের গ্রাম কি ইবলিশের মফস্বল পার হইতেছি আমি।

কোলে তুইলা আমারে লাকসাম স্টেশনের ওভারব্রিজের রেলিংয়ের ফাঁক দিয়া ঢুকাইয়া দিল ওই লোক। গিয়া পড়লাম ঘুমন্ত কোন বুইড়ার গায়ের ওপর। চিৎকার দিয়া জাইগা উঠল সেই বুইড়া। বুইড়ার অকথ্য গালাগাল আর লাঠি উঁচাইয়া মারতে আসার ভঙ্গিকে পিছে রাইখা সিঁড়ি ধইরা প্ল্যাটফর্মে নাইমা আসলাম। ওভারব্রিজের ঠিক নিচ বরাবর একটা খোলা চায়ের দোকানে গিয়া বসলাম।

Laksam St Overbridge View

লাকসাম ষ্টেশন ওভার ব্রিজ

টিভি চলতেছিল দোকানে, পাঞ্জাবি ও টুপি পরা কয়েকজন মুসল্লি বইসা চায়ের মধ্যে গুলগুলা ভিজাইয়া খাইতেছে। আমিও গুলগুলা আর চা দিতে বললাম। টিভিতে মণীষা কৈরালার একটা গান চলতেছিল—ভিজা গুলগুলা চায়ের থেকে উঠাইয়া মুখে পুরবার মধ্যবর্তী একটা অবস্থায় পজ হইয়া লোকেরা মণীষা কৈরালার সেই গান দেখতেছে। হিন্দি নায়িকাদের মধ্যে মণীষা কৈরালা আর জুহি চাওলারেই আমি চিনতাম তখন। কাজলরেও চিনতাম হয়ত। যাই হোক, এরমধ্যে প্ল্যাটফর্মে ঢোকার ঘণ্টি বাজাইতে বাজাইতে প্ল্যাটফর্মে ঢুকল তূর্ণা নিশিথা। কিছু লোক অত্যন্ত তাড়াহুড়া কইরা ট্রেন থেইকা নাইমা আইসা কয়েকটা পটেটো চিপস আর পানির বোতল কিইনা পুনরায় ট্রেনের ভিতর ঢুইকা গেল। এ দৃশ্যের কোনও মানে আছে? বিরক্ত লাগল, স্টেশন থেইকা বাইর হইয়া আসলাম।

রাস্তার মাথায় দেখলাম একটা ভ্যানগাড়িকে কেন্দ্র কইরা কিছু লোক গোল হইয়া দাঁড়াইয়া আছে। নিকটে গিয়া দেখি সবাই মিলে সেমাই খাইতেছে।

কাহিনী কী? কোন ভাই নাকি মিলাদ দিছে, মিলাদের খাওয়া। আমারেও অফার করল, ‘সেমাই খাও?’ আমি হ্যাঁ সূচক মাথা নাড়লাম। নারকেলের মালায় করে আমারেও সেমাই দেওয়া হইল। কিন্তু চামচ নাই। মালা থেকেই ফুরুৎ করে টান দিয়ে খাইতে হবে। বাকিরাও সেভাবেই খাইতেছে। আমিও একইরকমভাবে খাইলাম। মানে, ওইটা যে আসলে কী ছিল আল্লাই ভালো বলতে পারে। আমার পরে ধারণা হয় যে, লোকগুলা আসলে মানুষই ছিল না। ফেরেশতা ছিল। আর সেই সেমাই, নিশ্চয়ই বেহেশত থেকে পাঠানো হইছিল—নয়ত সেমাই কী করে অত মজা হয় আমার মাথায় ঢুকে না।

ভরপেট সেমাই খাইয়া আবার স্টেশনে ফিরা আসতে থাকি। ঠিক ঢোকার মুখেই ডান দিকে রিকশা টেম্পু চলার উপযোগী একটা রাস্তা দেইখা উৎসাহিত হই। সেইদিকে হাঁটতে শুরু করি। মিনিট বিশেক হাঁটার পর কেউ একজন চোখে টর্চের আলো ফেলল। থামলাম। প্লাস্টিকের বুট পরা ছাগল দাড়ির লিকলিকে একটা লোক। বলল, কী ব্যাপার?

কই কী ব্যাপার, নামাজ পড়তে যাই।

কই যাস?

তুই তোকারি করেন কেন। কই আর, মসজিদে যাই।

কোন মসজিদে যাস, এটা তো সিনেমা হল।

অ্যাঁ!

তাকাইয়া দেখি আসলেই তাই। পলাশ সিনেমা হল।

তো কী, আমি তো সামনেই যাচ্ছি।

কোন মসজিদে যাস, বল শুনি?

জানি না, যেই মসজিদ পাব সেই মসজিদে যাই।

লিকলিকে হাসল। বলল, তার পরিবার ইন্ডিয়ায়। সে এখানে সিনেমা হলের প্রহরী।

ও আচ্ছা। পরিবার ইন্ডিয়ায়, আপনি লাকসামে কেন?

Pagla Miar Mazar

পাগলা মিয়ার মাজার

ভাগ্যের ফেরে। হা হা হা—অনেকক্ষণ ধরে হাসল সে। বলল, মদের গন্ধ পাস?

কি জানি, মদের গন্ধ আমি চিনি না।

একটা টক টক গন্ধ পাস না?

হু, আপনার মুখ থেকে বাইর হয়।

ঠিক ধরছোস। বাংলা মদের গন্ধ।

শবে বরাতের রাতে মদ!

রাখ তোর শবে বরাত… (সেন্সরড)

আচ্ছা আমি যাই।

যাবি ক্যান, থাক। সিনেমা দেখবি না?

এত রাতে সিনেমা চলে না, আমি জানি। আমার আব্বু সিনেমা হলের ম্যানেজার।

তোর আব্বু! কোন হলের?

ফেনীর, বিলাসী সিনেমা হলের।

কী নাম তোর আব্বুর?

আলমগীর কবির।

ও! তুই আলমগীর ভাইয়ের ছেলে? পড়শী সিনেমা হলে চাকরি করছিল কিছুদিন।

পড়শী সিনেমা হলটা কোথায়?

লাকসামে, আর কিছুক্ষণ মসজিদ খুঁজতে থাকলে ওই হলও পাইয়া যাবি।

আপনি চিনেন আব্বুরে?

আরে হ। নাইনটিন এইট্টি থ্রি কি ফোর। আমিও তখন পড়শী হলে।

আপনি তো বুড়া, আব্বুরে ভাই ডাকতেছেন যে?

হা হা হা—তোর আব্বু তো অ্যাসিস্ট্যান্ট ম্যানেজার ছিল, আমি ছিলাম গেইটম্যান। ছোট চাকরি করলে সবাইরেই ভাই ডাকতে হয়।

ও আচ্ছা। তো আব্বু চাকরি ছাড়ছিল কেন জানেন?

ছুটি নিছিল তোর আব্বু। সে বছর বন্যা হইল। যে কয়দিনের ছুটি নিছিল তারচেয়ে কয়েকদিন বেশি ছুটি কাটাইতে হইছিল। মাস শেষে বাড়তি ছুটির বেতন কাটা হইছে দেইখা চাকরি ছাইড়া চইলা গেল।

উচিৎ কাজ করছে।

হা হা, বেতন কাটছিল ম্যানেজার। পরে হল মালিক শুইনা তো মহা ক্ষেপা! আমারে ফেনী পাঠাইল তোর আব্বুরে গিয়া নিয়া আসার জন্য।

তারপর! গেছিলেন?

হ। ততদিনে তোর আব্বু দাউদকান্দির ঝুমকা সিনেমা হলে জয়েন কইরা ফেলছে।

মানে আপনি আমাদের বাড়িতে গেছিলেন?

হ। গিয়া তোর দাদার কাছ থেকে জানতে পারলাম।

তার মানে আপনি আমার দাদারেও দেখছিলেন?

হ।

তাহলে আপনাকে একটা খবর দিই, দাদা মারা গেছেন দুই বছর আগে।

Chad Theke Tanim Kabir (Boro Hoye)

ছাদ থেকে তানিম কবির (বড় হয়ে)

ইন্নালিল্লাহ। বড় ভালো লোক ছিলেন।

সেটা তো সবাই বলবে। আপনি মদ খাইয়া আর কিছু বলতে পারেন না?

আর কিছু কী শুনতে চাস, তোর আব্বু যে প্রেম করত সেটা জানিস? সিনেমা হলে বইসা কত যে চিঠি লিখত। চিঠির জবাব আসলে খুব খুশি হইয়া যাইত। হা হা হা।

কারে চিঠি লিখত আব্বু!

কারে যেন… নরসিংদী ডিস্ট্রিকের এক মাইয়া, জোৎস্না কয়ে নাম। দেখিস আবার তোর আম্মুরে কইয়া দিস না!

হা হা হা—এবার আমি হাসি। ‘শোনেন আংকেল, ওই মাইয়াই বর্তমানে আমার আম্মু।’

কিন্তু হাইসা টাইসা বেশ একটা অবাক হইয়া যাই। তার মানে বিয়ার আগে আম্মু-আব্বু প্রেম করত! :O

তানিম কবিরের আরো লেখা

About Author

তানিম কবির

জন্ম ফেনী জেলার পরশুরাম-বিলোনীয়া এলাকায়। কবিতা ও গল্প লেখেন। প্রকাশিত কবিতার বই তিনটি, ‘ওই অর্থে’ (শুদ্ধস্বর ২০১৪), ‘সকলই সকল’ (শুদ্ধস্বর ২০১৫) ও 'মাই আমব্রেলা' (আদর্শ ২০১৬) এবং একটি গল্পের বই 'ইয়োলো ক্যাব' (ঐতিহ্য ২০১৬)। সম্পাদনা করেন দৈনিক ভোরের পাতার সাপ্তাহিক সাহিত্য ম্যাগাজিন ‘চারুপাতা’। এর আগে অনলাইন নিউজ পোর্টাল বাংলানিউজ ও প্রিয়.কমে সাহিত্য সম্পাদক হিসেবে কর্মরত ছিলেন। প্রকাশিতব্য বই, ‘ঘরপলায়নসমূহ’ (ফেব্রুয়ারি ২০১৭) ফেসবুক পেজ: Tanim Kabir (Writer)