page contents

জীবন সুন্দর

শেয়ার করুন!

বাবার মতো মানুষ এমন ভুল করবে—আগে ভাবতেও পারতাম না। বিশেষত সময়ের ব্যাপারে বাবা খুব বেশি সচেতন। অথচ আজ বাবার দেরিতেই লঞ্চ মিস হলো।

খালামণি মারা গেছে একচল্লিশ দিন, আজকে মিলাদ। এ খালামণি সেজো, বয়স ষাটের বেশি। শোকের তেমন কিছু নেই, আম্মুরা ছয় বোন। এখন তিন খালা জীবিত। সবার বয়সই পঞ্চাশের ওপারে, নাতিনাতনি আছে।

লঞ্চ মিস হওয়ায় বাবা সিদ্ধান্ত নিতে দু’ মিনিট দেরি করলো না। খালামণির শ্বশুরবাড়ি গ্রামে, মিলাদ সেখানেই। সুতরাং তাড়াতাড়ি গিয়ে তাড়াতাড়ি ফিরতে হবে। নৌকায় ওপারে যেতে হবে, তারপর লঞ্চ ধরতে হবে।

একবার শুধু জিজ্ঞেস করেছিল বাবা, “পারবা?” আমি দেখলাম না পারার কিছু নেই তেমন, বাবা তো রইলোই।

নৌকায় উঠতে না উঠতেই বাবার জরুরি ফোন। কিছুক্ষণ এক কথা বার বার বলতে শুনলাম। সে কথা বলতে পারছিল না মানুষের নিরবচ্ছিন্ন কোলাহলে। সরে গিয়ে কথা বলতেই নৌকা ছেড়ে দিলো। অনভ্যস্ত আমি এবার সত্যিই খানিক ভয় পেলাম, সাঁতার জানি না—এইজন্য আরও ভয় জেঁকে ধরলো। নৌকার ধাক্কায় পড়ে যাবার ভয়েই হাত চেপে ধরলাম পাশের নব্য বিবাহিত (!) আধঘোমটা দেয়া আন্টির। উনিও একরকম ভাবে তার স্বামীর হাত ধরে দাঁড়িয়ে ছিলেন। হাত ধরতেই ড্যাব ড্যাব করে তাকালেন জর্জেট শাড়ির আধ ঘোমটা তুলে। যেন বিষম অপরাধ হয়েছে! অবস্থা দেখে হেসেই বললাম, আমি আসলে এসবে অভ্যস্ত না। বলে হাত ছেড়ে দিলাম। উনি কিছু না বলে বিষদৃষ্টি নিক্ষেপ করে পাষাণবৎ ঠাঁয় দাঁড়িয়ে রইলেন। ভাবছিলাম—ধাক্কা খেয়ে যদি উনার স্বামীর হাতটা ধরে ফেলতাম তাহলে উনি কি পুরো ঘোমটাটা তুলেই তাকাতেন! উল্লেখ্য, নামার সময়েও আমি বাবার সাহায্য না নিয়ে ওনার হাত ধরে নেমেছি।

কীর্তনখোলা। ছবি. সানজিদা আমীর ইনিসী, ২০১৭

যাক, লঞ্চ পাওয়া গেল। মামা আগে থেকেই ওখানে। সিট ছেড়ে দিয়ে সে বাইরে হাঁটাহাঁটি করছিল। সামনে বেশ কয়েকজন আত্মীয়ের সাথে চোখাচোখি হলো। কথা বলতে ভাল্লাগছিল না। বাবার সহজাত কথাবার্তা শুনছিলাম। মানুষটা মিশুক, কখনও চোখমুখ কুঁচকে কথা বলে না—দেখতে ভাল্লাগছিল। লঞ্চ ভ্রমণ সুখকর নয় তাই সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের উপন্যাস ‘সেই সময়’ সাথে নিয়ে গেছিলাম। কমলাসুন্দরী লখনৌর নবাবের আমন্ত্রণে অসম্মতি জানিয়েছে পর্যন্ত পড়তেই লঞ্চ এসে পৌঁছে। বাবা ডেকে বই বন্ধ করে উঠতে বলল।

এবার বিশ মিনিট/ত্রিশ মিনিট হাঁটা! সাথে দু’ জন মামা, একজন মামি, বাবা আর মামার টুকটাক কাজ করে দেয়া চেনা এক লোক, ব্যাগভর্তি জামাকাপড় টানার জন্যই তাকে আনা হইছে মনে হয়। হাটা শুরু, সাথে কথাও।

বাবা—এইটা বদুর বাড়ি না?

রব মামা—আস্তে কও, শুনলে মাইন্ড করবে।

মেঝো মামা—মাইন্ডের কী আছে? ওগো তো ওই নামেই গ্রামের মানুষে চেনে। হাওলাদার বাড়ি কয় কেউ?

রব মামা—কওয়া লাগে আবদুল হাওলাদার বাড়ি। হা হা হা হা!

মেঝো মামা—মজনুরেও তো কেউ চেনে না! কইতে হয় পাগলা মজনু!

ছোট মামি—হা, ইংরেজ আমলে ইংরেজি শিকখা আবোলতাবোল ইংরেজি কইত।

রব মামা—এহন তো অবস্থা ভালোই হইছে মনে হয়, বাড়িটাড়ি পাকা করছে।

মেঝো মামা—মজনু যাই করুক, মাইয়াপোলাগুলারে শিক্ষিত করছে। মাইয়া জামাইরাও শিক্ষিত।

ছোট মামি—তালে ঠিক আছিল বরাবরই!

কথাবার্তা পছন্দ হলো না। আমি এগিয়ে গেলাম। জামাকাপড়ের ব্যাগ টানা লোক তাড়াতাড়ি হাঁটছেন। এগিয়ে গিয়ে তার পাশেই হাঁটছিলাম। রাস্তা পাকা, হাঁটতে সমস্যা হচ্ছিল না। রাস্তা গ্রামের চেয়ে বেশ উঁচু করে বানানো হইছে। দু’ পাশের নিচু গ্রাম দেখছিলাম। ঘরগুলোও বেশ উঁচু করে বানানো, বর্ষায় পানি উঠে প্লাবিত হয়ে যায় প্রতিবারই। গ্রাম অপছন্দের সব সময়, কিন্তু আজকে আসতে আগ্রহ হচ্ছিল। সকালে যাবো, বিকেলে আসব। যাওয়াই যায়! হাঁটছি বেশ দ্রুত। রোদের প্রখরতা ছিল বেশ, তাই তাড়াতাড়ি হাঁটছিলাম। চোখমুখে রোদের উত্তাপ অসহনীয় লাগছিল। অনেকখানি হাঁটার পর পাশের ব্যাগ টেনে আনা মামা হাঁপিয়ে জিরিয়ে বললেন—এটাই বাড়ি।

ঢুকতেই মধ্যবয়সী এক মহিলা ডেকে বলল, “তুমি ঝর্ণার মাইয়া না?”

ঠোঁটে হাসি ফুটিয়ে ম্লানভাবে উত্তর দিলাম, “হ্যাঁ।” বলে সামনে এগিয়ে গেলাম। এখানে এসেছিলাম আরও একবার। তখন বয়স চার অথবা পাঁচ। তখনকার কোনো কথাই যেহেতু মনে নেই, মনে হচ্ছিল এবারই প্রথম এসেছি। গ্রামের বাড়ি যেমন হয় তেমনই, পাঁচ ছয়টা টিনের ঘর। সামনে উঠান। অনেক মানুষ, অনেক শোরগোল। চাপাস্বরে কথা, চেঁচামেচি, দুই এক জনের আহাজারির ভিড়ে আমি পরিচিত কাউকেই দেখছিলাম না।

ঘরে গিয়ে খানিক বেগ পেতে হলো খালাতো বোন আর ভাগ্নিদের খুঁজে বের করতে। তারা পুকুরে গোসলের জন্য গিয়েছিল, শহরে পুকুরে গোসলের মত বেহেশতি জিনিস নাই। তাই তারা একঘণ্টা ধরে পুকুরে সাঁতার কেটে, ডুব দিয়ে, পানি ছোড়াছুড়ি করে পুকুর বিলাস সম্পন্ন করল। পাড়ে বসে বসে ভাবছিলাম, এই ডিসকালার পানিতে সাঁতার কেটেও কত্ত মজা পায় মানুষ। একজন এসে এক আপুকে বলে গেল, বাবা বলে গেছে আমাকে নাস্তা করাতে, কারণ আমি না খেয়েই সকালে রওনা দিয়েছি। তাকে ডেকে জিজ্ঞেস করলাম, “বাবা আসে নাই?” সে জানালো, বাবা এসে তারপর কোথাও একটা বেরিয়ে গেছে।

খাওয়া শেষ, রওনা দিলাম। বিশ মিনিট হাঁটা, এরপর অপেক্ষা লঞ্চের জন্য।

লঞ্চে ওঠাটা যুদ্ধ জয়ের কাছাকাছি! এবার দুঘণ্টা বসে থাকা। আমার পেছনে বাবা, আমার পাশে বৃদ্ধ এক লোক। বই খুললাম। সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের লেখার সুরে পা ফেলে সেই সময়েই চলে গেলাম। দুই ঘণ্টা চলে গেল। লঞ্চ আসার পাঁচ মিনিট আগে বই বন্ধ করলাম, বাইরে তাকালাম। এখন দৃশ্যটা শহর আর গ্রামের মিশে যাওয়া এক আবহের সৃষ্টি করেছে। মনে হচ্ছে, এখানেই গ্রামের শেষ, আবার এইখান থেকেই গতিময়তা শুরু। ইটের ভাটার কালো ধোঁয়া আর সন্ধ্যার নিষ্কলঙ্ক আবছায়া ভাসিয়ে নিচ্ছে সব জলযান—লঞ্চ, ট্রলার, নৌকা সবাইকে। চশমা খুলে লঞ্চের জানালার কাছে আরও এগিয়ে বসলাম। অদ্ভুত! অদ্ভুত!

হুট করে যেন সব জলস্রোত উল্টো দিকে বইয়ে দিতে ইচ্ছে হলো। মনের স্রোত শহর আর গ্রামের সন্ধিস্থল থেকে গ্রামে ফিরে যেতে চাইছে। যেন গ্রামের প্রতি ভালোলাগা জলকণায় ভেসে এসেছে এতদূর, হঠাৎ আমাকে স্পর্শ করেই মিলিয়ে নিতে চাইলো ওদের সাথে।

লঞ্চজার্নি সুখকর নয় বলে যে ধারণা ছিল পুরোটাই ভুল, বড়সড় ভুল! জীবন সুন্দর, অনেক বেশি সুন্দর। কেন মরে যেতে চাই? কত কিছু দেখা বাকি, কত সুখ অপেক্ষা করে আছে, কে জানে!

যাওয়ার আগে বৃদ্ধ বলে গেল, এরকম ছোট অক্ষরের গল্পের বই এভাবে টানা পড়তে থাকলে শীঘ্রই আরেকটা চশমা লাগবে আমার। হাসলাম। বাঁচতে ইচ্ছে হলে আমি চোখের কম জ্যোতি নিয়েও প্রতিদিন বাঁচতে পারি, এই পাঁচ মিনিটে জার্নি ভালো লাগার মত ব্যাপার। একবার যদি বুঝে যাই বাঁচতে কেন হবে, আমাকে কেন দরকার, তাহলে আমি বাঁচবোই। প্রতিদিন মরে মরে না, প্রকৃতির মায়ায় জীবন্ত হয়ে বাঁচবো!

কমেন্ট করুন

মন্তব্য

About Author

সানজিদা আমীর ইনিসী
সানজিদা আমীর ইনিসী

জন্ম. বরিশাল ১৯৯৮। শিক্ষার্থী, বরিশাল সরকারি মহিলা কলেজ, উচ্চ মাধ্যমিক (দ্বিতীয় বর্ষ)।

Leave a Reply