page contents
লাইফস্টাইল, সংস্কৃতি ও বিশ্ব

জুলিয়ান অ্যাসান্জ এখনো কেন লন্ডনের ইকুয়েডর দূতাবাসে!

২০১২ সালের ১৯ জুন উইকিলিকস-এর প্রতিষ্ঠাতা জুলিয়ান অ্যাসান্জ লন্ডনের ইকুয়েডর দূতাবাসে আশ্রয় নেন।  সাড়ে ৩ বছরের বেশি তিনি সেখানে আছেন।  কেন এবং কীভাবে তিনি সেখানে আছেন? তিনি কি কখনো এই জায়গা ছেড়ে অন্য কোথাও যেতে পারবেন?

জুলিয়ান অ্যাসান্জ কে?

জুলিয়ান অ্যাসান্জ উইকিলিকস-এর প্রতিষ্ঠাতা। উইকিলিকস ওয়েবসাইটটি গুরুত্বপূর্ণ গোপন ডকুমেন্ট প্রকাশ করে।

৪৪ বছর বয়সী অস্ট্রেলিয়ান কম্পিউটার হ্যাকার জুলিয়ান  অ্যাসান্জ ২০০৬ সালে এই সাইটের কাজ শুরু করেন। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রের সেনাবাহিনী সম্পর্কে চেলসি ম্যানিং গোপন দলিল প্রকাশ করার আগ পর্যন্ত উইকিলিকস এবং এর প্রধান সম্পাদক অ্যাসান্জকে কেউ চিনত না। ওই ঘটনার পরে উইকিলিকসও অতি পরিচিত নাম হয়ে ওঠে।

জন্ম. টাউনসভিল, অস্ট্রেলিয়া ১৯৭১

জুলিয়ান অ্যাসান্জ। জন্ম . টাউনসভিল, অস্ট্রেলিয়া ১৯৭১

উইকিলিকসে যেসব দলিল লিক বা প্রকাশ করা হয়েছিল তার মধ্যে ‘কোলাটেরাল মার্ডার’ বা ‘নির্বিচারে হত্যা’ নামে একটি ভিডিও ছিল, সেখানে দেখা যাচ্ছিল ইরাকে একটি আমেরিকান হেলিকপ্টার থেকে নিরস্ত্র মানুষদের গুলি করা হচ্ছে। আরো ছিল ইরাক ও আফগানিস্তান যুদ্ধের আসল দলিল। যুদ্ধে প্রকৃতপক্ষে কত মানুষ নিহত হয়েছে তার হিসাব ছিল সেখানে। আড়াই লাখেরও বেশি ডিপ্লোম্যাটিক কেবল ছিল—যাতে যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র নীতি সম্পর্কে অপ্রীতিকর তথ্য ছিল।

কেনিয়াতে বিচারবহির্ভূত হত্যার দলিল, আইভরি কোস্টে বিষাক্ত বর্জ্য অপসারণ, সায়েন্টোলজি ম্যানুয়ালসের চার্চ, গুয়াতনামো বে বন্দিশিবিরের প্রক্রিয়া এবং কাউপথিং ও জুলিয়াস বেয়ারের মত বড় ব্যাংকের গোপন তথ্য প্রকাশ করেন জুলিয়ান অ্যাসান্জ।

অ্যাসান্জের কাজ তাকে সারাবিশ্বে বিখ্যাত করেছে। এক সময়, উইকিলিকস নিয়ে ৫টি বড় ছবির কাজ চলছিল, তাদের মধ্যে দুইটির কাজ সম্পন্ন হয়। ছবি দুটি হলো, উই স্টিল সিক্রেটস নামের ডকুমেন্টারি ও বেনেডিক্ট কাম্বারব্যাচ অভিনীত দ্য ফিফথ ইস্টেট

তবে জুলিয়ান দুইটি ছবির বিরুদ্ধেই কথা বলেছেন, এবং কাম্বারব্যাচের কাছে একটি চিঠিতে জুলিয়ান লিখেছেন, দ্য ফিফথ ইস্টেট ছবিটি একটি সুরক্ষিত, দুর্নীতিগ্রস্ত ও বিপদজনক রাষ্ট্রের সুবিধার জন্য একজন জীবিত রাজনৈতিক রিফিউজিকে খলনায়ক বানাচ্ছে এবং বিপদের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। যিনি সারাবিশ্ব ভ্রমণ করে উইকিলকস ও তার কাজ সম্পর্কে বলেছেন এবং প্রতিষ্ঠানবিরোধী অ্যাকটিভিস্টদের কাছে নায়কে পরিণত হয়েছেন।

তিনি কেন লন্ডনে ইকুয়েডরিয়ান দূতাবাসের ভিতরে?

এই ঘটনার শুরু সুইডেনে। ২০১০ সালের আগস্টে একটি কনফারেন্সে বক্তৃতা দিতে সুইডেন গিয়েছিলেন অ্যাসান্জ। সেখানে দুই মেয়ের সাথে তার পরিচয় হয়। তাদের সাথে যৌন সম্পর্ক তৈরি হয় অ্যাসান্জের। এরপর সেই নারী দুজন অ্যাসান্জের বিরুদ্ধে ধর্ষণ ও যৌন হয়রানির অভিযোগ তোলেন। জুনিয়ান অ্যাসান্জ এই অভিযোগ অস্বীকার করেন। অ্যাসান্জকে জেরা করা হয় কিন্তু তার বিরুদ্ধে অভিযোগ দায়ের করা যায় নি। তিনি সুইডেন থেকে চলে আসেন।

victims-julian

ধর্ষণ ও যৌন হয়রানির অভিযোগ দায়ের করেছেন যারা: অ্যানা আরডিন ও সোফিয়া উইলেন।

২০১০ সালের ২০ নভেম্বর অ্যাসান্জকে গ্রেপ্তার করার জন্য ইন্টারপোল একটি রেড নোটিশ জারি করে। এক সপ্তাহ পরে ওয়েস্টমিনস্টারে একজন বিচারকের কাছে তিনি আত্মসমর্পণ করেন। ২০১০ এর ডিসেম্বরে তার সমর্থকরা তার জামিনের জন্য দুই লাখ চল্লিশ হাজার পাউন্ড জমা দেন এবং তিনি জামিনে বের হয়ে আসেন।

২০১২ সালের জুন পর্যন্ত যুক্তরাজ্যে আইনি জটিলতা চলতে থাকে, সুইডেনের প্রসিকিউটর চান যে অ্যাসান্জকে সুইডেনে হস্তান্তর করা হোক, কিন্তু অ্যাসান্জের আইনজীবীদের ধারণা তাকে সুইডেনে হস্তান্তর করা হলে সেখান থেকে তাকে যুক্তরাষ্ট্রের হাতে তুলে দেওয়ার ঝুঁকি থাকবে।

২০১২ এর ১৯ জুন নাইটসব্রিজের ইকুয়েডর দূতাবাসের মাধ্যমে ইকুয়েডরে আশ্রয়ের আবেদন করেন অ্যাসান্জ। কিন্তু পুলিশ দূতাবাস ঘিরে ফেলে এবং তাকে যুক্তরাজ্য ছাড়তে দিতে অস্বীকৃতি জানায়। যুক্তরাজ্য বলে, কোর্টের আদেশ যে তাকে সুইডেনে হস্তান্তর করতে হবে।

২০১২ সালের আগস্টে ইকুয়েডর তাকে আশ্রয় দিতে স্বীকৃতি জানায়, কিন্তু তিনি দূতাবাস ভবনের বাইরে পা রাখা মাত্রই ব্রিটেন তাকে সুইডেনে হস্তান্তর করবে। সেই থেকে তিনি এখনো লন্ডনের ইকুয়েডরিয়ান দূতাবাস ভবনেই আছেন।

সুইডেন থেকে তাকে যুক্তরাষ্ট্রে হস্তান্তর করার ঝুঁকি সত্যিই আছে কি?

অ্যাসান্জের বিরুদ্ধে কোনো অপরাধের অভিযোগ নেই, কিন্তু ২০১০-এ জারি হওয়া সেই অ্যারেস্ট ওয়ারেন্ট আছে। ২০১৫ এর মে’তে সেই ওয়ারেন্ট উঠিয়ে নেয়ার আবেদন করলে সুইডেনের সুপ্রিম কোর্ট তা নাকচ করে।

১৯৬১ সালের অক্টোবরে যুক্তরাষ্ট্রের সাথে সুইডেনের হস্তান্তর চুক্তি হয় এবং ১৯৮৩ সালের মার্চে তা আপডেট করা হয়। এই চুক্তি অনুযায়ী রাজনৈতিক আক্রমণ এবং রাজনৈতিক আক্রমণ সংক্রান্ত কোনো কারণে এই হস্তান্তর করা যাবে না। কিন্তু অ্যাসান্জের সমর্থকদের ভয় যে চুক্তি অগ্রাহ্য করে সিআইএ অথবা যুক্তরাষ্ট্রের অন্য কোনো হাত তাকে জোরপূর্বক ছিনিয়ে নিতে পারে।

যুক্তরাষ্ট্রে তার বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ নেই, কিন্তু অ্যাসান্জের আশঙ্কা যে তাকে গুপ্তচরবৃত্তির অভিযোগে বিচারের মুখোমুখি করা হতে পারে। তবে ২০১৩ সালে ওয়াশিংটন পোস্টে বলা হয়েছে যে যুক্তরাষ্ট্রের বিচার বিভাগের কাছে তাকে বিচারের মুখোমুখি করার মত কোনো রাস্তাই নেই।

বিচার বিভাগের সাবেক মুখপাত্র ম্যাথিউ মিলার ওয়াশিংটন পোস্টকে বলেন , জুলিয়ান অ্যাসান্জের ক্ষেত্রে বিচার বিভাগের সমস্যা হলো গোপন তথ্য প্রকাশের জন্য আপনি যদি সাংবাদিকদের বিচার না করেন তাহলে অ্যাসান্জের বিচার করাও সম্ভব নয়।

উইকিলিকস-এর মুখপাত্র ক্রিস্টিন হ্রাফনসন বলেছেন তারা কোনো নিশ্চয়তায় বিশ্বাস করেন না যদি না জনসম্মুখে, অফিসিয়াল ও আনুষ্ঠানিক নিশ্চয়তা প্রদান করে বলা হয় যুক্তরাষ্ট্র সরকার উইকিলিকসের বিচার করবে না।

এরপরে কী হবে?

২০১৫ এর মার্চে সুইডেনের পাবলিক প্রসিকিউশনসের ডিরেক্টর ম্যারিয়েন এনওয়াই বলেছেন তিনি অনিচ্ছার সাথে হলেও দূতাবাসের ভিতরে অ্যাসান্জের সাথে প্রশ্নোত্তর পর্বে রাজি আছেন, কারণ আগস্টে কিছু অপরাধের বিচারের সময়সীমা শেষ হয়ে যাবে।

ইকুয়েডরের প্রেসিডেন্ট রাফায়েল কোরেয়া

ইকুয়েডরের প্রেসিডেন্ট রাফায়েল কোরেয়া (জন্ম. ১৯৬৩)। জুলিয়ান অ্যাসান্জকে দূতাবাসে আশ্রয় দিয়ে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বার বার উচ্চারিত হওয়ার মধ্য দিয়ে আভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে লাভবান হন তিনি।

তিনি বলেন, সবসময়ই আমার মত হলো লন্ডনে ইকুয়েডরিয়ান দূতাবাসের ভিতর তার ইন্টারভিউ নিলে তাতে ইন্টারভিউয়ের মান খারাপ হবে, এবং ভবিষ্যতে সুইডেনে বিচার হলে তাকে সুইডেনে হাজির হতেই হবে।

এই ব্যাপারটি অপরিবর্তিতই থাকবে। আর সময়ের ব্যাপারটিও গুরুত্বপূর্ণ, আমার মত হলো, তদন্তের ক্ষেত্রে এই অসুবিধা এখন মেনে নিতেই হবে এবং এই ঝুঁকি নিতেই হবে কারণ ইন্টারভিউ ছাড়া কেসটি আর সামনে আগাচ্ছে না, আর যেহেতু সুইডেনে হাজির হওয়া ব্যতীত অন্য কোনো উপায় নেই, তাই দূতাবাসেই ইন্টারভিউ নিতে হবে।

২০১৫-এর এপ্রিলে ও  মে-তে ব্রিটেন এই ইন্টারভিউয়ের ব্যাপারে সম্মতি দেয়। কিন্তু ইকুয়েডর সম্মতি না দেওয়ায় ইন্টারভিউ নেওয়া যায় নি।

তিনি কতদিন দূতাবাসের ভিতর থাকতে পারবেন?

২০২০ এর আগে অ্যাসান্জের বিরুদ্ধে ধর্ষণের অভিযোগ মেয়াদোত্তীর্ণ হবে না।

ইকুয়েডর কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে তিনি যতদিন ইচ্ছা ততদিন ইকুয়েডরের দূতাবাসে থাকতে পারবেন।

তার সাথে কে কে দেখা করেছেন?

ইয়োকো অনো, লেডি গাগা, এরিক কানটোনা এবং পামেলা অ্যান্ডারসন সহ আরো অনেকেই তার সাথে দেখা করেছেন।

যাতে ব্যায়াম করতে পারেন সে জন্য কেন ফিল্ম ডিরেক্টর কেন লোচ একটি রানিং মেশিন দিয়েছেন।

দূতাবাসের ভিতরে অনেক সাংবাদিক তার ইন্টারভিউ নিয়েছেন, এবং ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমেও দর্শকদের উদ্দেশ্যে তিনি বক্তৃতা দিয়েছেন।

gaga-assange2

অক্টোবর ২০১২। ইকুয়েডর অ্যাম্বাসি থেকে মধ্যরাত্রিতে বের হচ্ছেন লেডি গাগা। তিনি ৫ ঘণ্টা সময় দেন জুলিয়ান অ্যাসান্জকে।

তার বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছেন কে কে?

জেমিমা খান তার জামিনের জন্য প্রথমে টাকা দিয়ে সহায়তা করেছিলেন এবং পরবর্তীতে তার আচরণের সমালোচনা করে একটি লেখা লিখেন, সেখানে তিনি ব্যাখ্যা করেছেন তিনি কেন আর তাকে সমর্থন করেন না।

২০১৩ সালে তিনি লেখেন, অ্যাসান্জের র চার্ম, মেধা ও দূরদর্শিতার ঝলকানি আমি দেখেছি। কিন্তু আমি এও দেখেছি যে খুব দ্রুত পাওয়া রক স্টার স্ট্যাটাসের কারণে কীভাবে একজন পরিষ্কার আদর্শবাদীও  মনে করতে থাকে যে তারা আইনের উর্ধ্বে ও সমালোচনার বাইরে।

দ্য গার্ডিয়ান অ্যাসান্জের শুরুর দিকের কাজ প্রকাশ করেছিল, কিন্তু পরবর্তীতে তারা অ্যাসান্জকে তার কিছু ম্যাটেরিয়াল সমালোচনা করতে বললে ও তা করতে অস্বীকৃতি জানালে গার্ডিয়ানের সাথে অ্যাসান্জের সম্পর্ক নষ্ট হয়ে যায়।

About Author

সাম্প্রতিক ডেস্ক