page contents
লাইফস্টাইল, সংস্কৃতি ও বিশ্ব

জেফ নিকোলসের পারিবারিক সাই-ফাই — ‘মিডনাইট স্পেশাল’

সন্তানের সাথে মা-বাবার সম্পর্কের শুরু যদি হয় একটি জন্ম থেকে, তাহলে শেষ হয় কোথায়? হয়তো জন্মান্তরে। অন্তত জেফ নিকোলসের নতুন ছবি মিডনাইট স্পেশাল (২০১৬) আমাকে সে রকম কিছুই বলেছে, বাকিদের কথা জানি না।

পরিচালক জেফ নিকোলস আমেরিকার সাউথের বাসিন্দা ছিলেন, তার ছবিগুলিতে তাই সেই জায়গা ঘিরেই গল্প জমে ওঠে বারবার। আর গল্পের মাঝখানে থাকে সাধারণ কিছু ভাবনা, যার একটি হলো পিতা ও তার সন্তানদের নিয়ত বোঝাপড়া।

midnight-s7

অতিপ্রাকৃতের মুখেও সে স্তিমিত—লেখক

প্রথম ছবি শটগান স্টোরিজ (২০০৭) ছিল মৃত বাবার রেখে যাওয়া আঘাত ছেলেদের বয়ে নিয়ে যাওয়ার গল্প, পরের ছবি টেক শেলটার (২০১১) দেখিয়েছে মানসিক বিপর্যয়ে একজন বাবার সাথে পরিবার ও আশেপাশের সবার চাপা দ্বন্দ্ব, আর তিন নম্বর ছবি মাড (২০১২) ছিল মূলত দুই কিশোরের বাবার অভাব দূর করার ধান্দা।

তারপরও জঁনরার হিসাবে ছবিগুলি কিন্তু একে একে কেবল দূরেই সরেছে। প্রথমটা সোজাসাপ্টা ক্রাইম ড্রামা, দ্বিতীয়টা সাইকোলজিক্যাল হরর, তার পরেরটা কামিং অফ এইজ। সেই ধারা ধরে রাখতেই এবার নিকোলস সাহেব বহুদূর এসে ঠেকলেন একেবারে সায়েন্স ফিকশনে। জঁনরার মাঝে লাফালাফি করলেও প্রতিটি ছবিতেই নিকোলসের চলার ধরন একই, আর তার শুরুটা হয় জঁনরার ধরাবাঁধা গণ্ডি পার করার চেষ্টা দিয়ে।

movie-review-logo

মিডনাইট স্পেশাল-এর গল্প অনেক আগেই শুরু হয়েছিল, কিন্তু আমাদেরকে যেন মাঝামাঝি কোনও অংশে এনে বসিয়ে দেওয়া হয়। শুরুতেই দেখি টিভিতে একটি বাচ্চা ছেলের কিডন্যাপিংয়ের খবর শোনা যাচ্ছে। আট বছরের সেই ছেলে একটা মোটেল রুমে বসে আছে চুপচাপ। এক হাতে কমিক বই, অন্যটায় টর্চলাইট আর চোখে সাঁতারুদের স্বচ্ছ চশমা। দুজন মধ্যবয়সী লোক ব্যাগপত্র গুছিয়ে তাকে নিয়ে গাড়িতে চড়ে বসে। তাদের মাঝে কিডন্যাপারদের খিটখিটে মেজাজ নেই, উৎকণ্ঠা আছে। আর ছেলেটা অস্বাভাবিক রকম শান্ত।

midnight-s1

প্রত্যেকটি ঘটনাকে সবচেয়ে কাছে থেকেও নিরপেক্ষভাবে দেখেছে লুকাসই।—লেখক

একটা চার্চের মত জায়গায় বেঞ্চের উপর বসা সারি সারি মানুষ। মঞ্চের উপর বয়স্ক এক ভদ্রলোক। মাইকের সামনে দাঁড়াতেই মনে হলো তিনি হয়তো যাজক, এবার অভিভাষণ রাখবেন। কিন্তু বাইবেলের উক্তির বদলে কয়েকটি নাম্বার আওড়ানো শুরু করলেন তিনি, বাকিরাও যোগ দিল তার সাথে।

হঠাৎ তাদের আস্তানায় এফবিআইয়ের হানা। একে একে সবাইকে জিজ্ঞাসাবাদ শুরু হলো। পল সেভিয়ে নামের একজন এনএসএ এজেন্ট সেই দায়িত্ব নিলেন। আর সেই সুবাদে আমরা গল্পের পেছন দিকটার আভাস পেলাম।

jef-nicols

ছবির পরিচালক জেফ নিকোলস (জন্ম. ১৯৭৮)

রয় টমলিন ও তার বন্ধু লুকাস মিলে অ্যাল্টন নামের এই ছেলেটিকে ধরে নিয়ে গেছে। রয়ের একমাত্র সন্তান অ্যাল্টন। তবে তার অপহরণের পেছনের কারণ ছেলেটির অতিপ্রাকৃত কিছু ক্ষমতা।

জন্মের পর থেকেই তার অস্বাভাবিক কিছু আচরণ সবাইকে তাক লাগিয়ে এসেছে। সেই অপার্থিব প্রদর্শনীগুলির জন্যই এই ধর্মীয় সঙ্ঘটি তাকে ঈশ্বরের দূত বলে ধরে নিয়েছিল। ছেলেটির আনমনে বলা বুলি তাদের কাছে হয়ে গেছে ত্রাণকর্তার বাণী।

এদিকে অ্যাল্টনের মুখ দিয়ে বেরোনো সেই কথাগুলিই তাকে সরকারের কুনজরে এনেছে। সরকারি কিছু সংস্থার গোপন অনেক তথ্যই কোনও অজানা উপায়ে প্রতিদিন ছেলেটি জেনে যাচ্ছে। তাই তাকে খুঁজে আনার দায়িত্ব চেপেছে এফবিআই এর উপর। আর এই দুই পক্ষের হামলা থেকে বাঁচাতেই হয়তো রয়ের নিজ ছেলেকে নিয়ে পালিয়ে যাওয়া।

কাহিনী এগোতে এগোতে একসময় অ্যাল্টনের মায়ের দেখাও পাওয়া যায়। কাজেই ছবিটির মুখ্য চরিত্রগুলি একটি প্রথাগত পরিবারে পাল্টে যেতে থাকে। ফলে গল্পের বিশদ সব অনুষঙ্গ আমরা পুরোদমে ব্যক্তিক জায়গা থেকে দেখার সুযোগ পাই। ছেলেটার অতিমানবীয় ক্ষমতা নিয়ে তার বাবা-মার দুঃশ্চিন্তার সাথে অসুস্থ কোনও বাচ্চাকে নিয়ে হন্যে হওয়া বাপ-মার সাদৃশ্য একদমই স্থূল, যেন সাই-ফাইয়ের আড়ম্বরে রোজকার আপদের প্রকাশ।

midnight-s-2321

ছবির পোস্টার

সেই আড়ম্বরকে নিজ পায়ে দাঁড়া করাতে অবশ্য আবহ সঙ্গীত আর দৃশ্যায়ন সাহায্য করেছে। জেফ নিকোলসের নিয়মিত সহকর্মী ডেভিড উইংগোর ইলেক্ট্রিক পিয়ানোর একটানা সুর আর চিত্রগ্রাহক অ্যাডাম স্টোনের ক্যামেরায় ধরা ফাঁকা রাস্তা ও বিশাল আকাশের দৃশ্যগুলি চাপা এক অনুনাদে পুরো ছবিটিকে আটকে রাখে।

মিডিয়াম আর লং শটের প্রাচুর্য চরিত্র আর দর্শককে নির্দিষ্ট দূরত্বে রেখেছে সবসময়, যা চিত্রনাট্যের সাথে মিলে পরিচিত সব ঘটনার ক্লিশেগুলি সরিয়ে দিয়েছে।

ছবিটির মুখ্য চরিত্রগুলি একটি প্রথাগত পরিবারে পাল্টে যেতে থাকে।—লেখক

ছবিটির মুখ্য চরিত্রগুলি একটি প্রথাগত পরিবারে পাল্টে যেতে থাকে।—লেখক

সঙ্গীত পরিচালক আর চিত্রগ্রাহক ছাড়াও জেফ নিকোলসের আরেক সঙ্গী অভিনেতা মাইকেল শ্যানন। বড় বাজেটের হলিউডি ছবিগুলিতে পাগলাটে পার্শ্বচরিত্রে টাইপকাস্ট হয়ে যাওয়া শক্তিমান এই অভিনেতা এই পরিচালকের সঙ্গ পেলেই গা ঝাড়া দেন। শুধু চোখের কোণের চামড়া কুঁচকে আর ঠোঁটের পরিধি বাড়িয়ে-কমিয়ে অগণিত অনুভূতিকে পাল্টে ফেলেন অভিব্যক্তিতে।

জেফ নিকোলস যে ফিল্ম স্কুলের ছাত্র ছিলেন, সেখানকার এক টিচারের কাছের বন্ধু শ্যানন। বন্ধুর কথায় তরুণ ছাত্র নিকোলসের প্রথম ছবিতে কাজ করার সুযোগ পান। সেই থেকে প্রতিটি ছবিতে একই সাথে নিকোলসের অভিভাবক ও সহযোগীর কাজ করে আসছেন। এই ছবির শুরুর দিকে রয়ের চরিত্রে তার একগুঁয়েমি সঙ্গত হয়েছে ছেলের প্রতি ভালোবাসার বহিঃপ্রকাশ দিয়ে। নিকোলসের স্বভাবসিদ্ধ সরল সংলাপে শ্যাননের উপযুক্ত ডেলিভারি তার সবচেয়ে বড় কারণ।


Midnight Special Official Trailer

জোয়েল এজার্টন রয়ের বন্ধু লুকাসের ভূমিকায় বাপ মা আর ছেলের ছোট পরিবারটিকে একজন বহিরাগতের মুগ্ধতা নিয়ে দেখেছেন, যা তাকে ফেলেছে দর্শকের সারিতে। এমনকি প্রত্যেকটি ঘটনাকে সবচেয়ে কাছে থেকেও নিরপেক্ষভাবে দেখেছে লুকাসই। তাই পর্দার এপাশে বসে আমাদের মন ঠিক করে নিতে সুবিধা হয় অনেক। পল সেভিয়ের চরিত্রে অ্যাডাম ড্রাইভারকে এই ছবির কমিক রিলিফ বলা যায়, যদিও কেবল তার ভঙ্গিমাই গোমড়া এই ছবিতে কিছুটা হাসি আনার জন্যে যথেষ্ট ছিল। জেডেন লীবারহার এর অ্যাল্টন গম্ভীর, ইঁচড়েপাকামির দোষ তাতে দেখা যায় না। অতিপ্রাকৃতের মুখেও সে স্তিমিত, তবে আগ্রহী।

midnight-s542

জন্মের পর থেকেই তার অস্বাভাবিক কিছু আচরণ সবাইকে তাক লাগিয়ে এসেছে।

পরিচালক জেফ নিকোলস মাত্র দুই কোটি ডলারেরও কম বাজেট নিয়ে ছবিটিতে ভিজ্যুয়াল ইফেক্টের কারিকুরি দেখিয়েছেন, অথচ দক্ষতার অভাব ফোটে নি কোথাও। যদিও কিছু জায়গায় আরো একটু দেখতে চাওয়ার একটা চাহিদা তৈরি হয়, যা বাজেটের স্বল্পতার চাইতে নির্মাতাদের পরিমিত সিদ্ধান্তের ফল বলেই মনে হয়েছে আমার কাছে।

উনিশ শতকের আমেরিকায় একটা মধ্যরাতের ট্রেন সার্ভিস ছিল, নাম ‘মিডনাইট স্পেশাল’। জেলখানার কয়েদিরা সারারাত বসে থাকত সেই ট্রেনের আলোর ঝলক চোখে মাখার জন্য। তাদের বিশ্বাস ছিল—সেই আলো যার কপালে পড়বে, খুব তাড়াতাড়িই ছাড়া পাওয়ার খবর আসবে তার। মুক্তির এই আকাঙ্ক্ষা ‘মিডনাইট স্পেশাল’ ছবির বাবা-মার মাঝে থাকলেও তা নিজেদের জন্য নয়। বরং ছেলের প্রতি তাদের যে বিশ্বাস, তা শুরু হয় এই আস্থা থেকে। এই শুরুর তফাৎই ভাগাভাগি করে দেয় বাকিদের সাথে তাদের ব্যর্থতা আর সাফল্য।

About Author

আয়মান আসিব স্বাধীন
আয়মান আসিব স্বাধীন

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ডেভেলপমেন্ট স্টাডিজ বিভাগে পড়াশোনা করছেন। বই : সিনে-লয়েড (২০১৭, চৈতন্য)