page contents
লাইফস্টাইল, সংস্কৃতি ও বিশ্ব

টুপি

টুপিকে বিশেষ্য হিসেবেই চেনার সূত্রপাত ঘটেছিল। খুব মনে না পড়লেও আন্দাজ করা যায় বাংলা টুপি এবং ইংরেজি ‘ক্যাপ’ শব্দলাভ কাছাকাছি সময়েই ঘটেছিল, অন্তত আমার বেলায়।

এমনকি এও হতে পারে ইংরেজি শব্দলাভটি ঘটেছিল বাংলালাভের আগেই। বর্ণজ্ঞানের বইগুলোতে ‘সি’তে ক্যাপ যতটা সুলভ, ‘ক্যাট’-এর মত জনপ্রিয় না হলেও, ‘ট’য়ে টুপি মোটেই ততটা সুলভ নয়। ফলত, এটাও প্রায় নিশ্চিত যে বস্তু-টুপির দর্শনের আগেই বোধহয় ছবি-টুপির দর্শন ঘটে গেছিল। টেলিভিশনহীন কালে অবশ্যই মুদ্রিত ছবি।

manosh-chy-914

২০০৭ সালের ডিসেম্বর মাসে ভারতের মানালি বা কুলুতে নৃবিজ্ঞানের শিক্ষার্থীদের সঙ্গে মানস চৌধুরী।

আর এটুকু মনে রাখা দরকার যে আমি জন্মেছিলাম অপেক্ষাকৃত হিন্দু-অধ্যুষিত একটা পাড়ায়, বরগুণা জেলার। প্রার্থনারত মানুষদের টুপি-পরিধান আমার অভিজ্ঞতায় এসেছে পরে।

টুপিকে বিশেষণ হিসেবে ব্যবহার করতে দেখা যায় নাই। তেমন কারো দ্বারাই। টুপিসদৃশ বা টুপি-উদ্ভাসক কোনো দ্রব্যকে, বিশেষত অকহতব্য বলে বিবেচিত কোনো কোনো দ্রব্যকে, টুপি বললে বিশেষণীয় ব্যবহার হয় বটে। তবে সেটা আমার আগ্রহের বিষয় নয়। তবে আমার বড় মামাকেই সর্বপ্রথম, এত বছরে প্রায় একমাত্র, দেখা যায় টুপিকে একটা ক্রিয়াপদ হিসেবে ব্যবহার করতে। সেটাও আমার অতি শৈশবের ঘটনা।

বাংলায় যেহেতু তেমন কোনো কিছুই না-করে করা যায় না তাই তাঁর প্রয়োগেও টুপি ক্রিয়াপদের মর্যাদায় অধিষ্ঠিত হয়েছিল, এখনো আছে, ‘টুপি-পরানো’ হিসেবে। ‘টুপি-পরানো’ তাঁর অভূতপূর্ব প্রয়োগে ক্রিয়া, কখনো এমনকি ক্রিয়া-বিশেষণের মর্যাদা পেয়ে বসে। এই এত বছরে তাঁর এই অনির্বচনীয় শব্দমালা বা ফ্রেইজটির তুলনীয় আমি একটাই ফ্রেইজ তথা ক্রিয়াপদ আবিষ্কার করতে পেরেছে। ‘মুরগি-ধরা’। অর্থবোধকতার দিক দিয়েও এই যুগল তুল্য।

manosh chy logo

বড়মামা নানাবিধ ঐতিহাসিক ও ব্যক্তিগত কারণে প্রায় স্বনির্মিত মানুষ/পেশাজীবী ছিলেন ও আছেন। তিনি ১৯৬৩ বা ৬৪ সালের দিকে তদানীন্তন নামজাদা পূর্ববঙ্গীয়/পূর্বপাকিস্তানীয় শিক্ষা প্রতিষ্ঠান জগন্নাথ কলেজে পড়াকালীন সময়ে, সাম্প্রদায়িক হামলার আশঙ্কা ও সম্ভাবনায়, কোনো এক দিন তড়িঘড়ি ক্যাম্পাস থেকে পালিয়ে ভারতের কোলকাতা চলে যেতে পেরেছিলেন। এন.এস.এফ. ও অপরাপর হিন্দুবিদ্বেষী সংগঠনের ধাওয়া তাঁকে এতটাই দেশবিমুখ করেছিল যে তিনি এত বছর পর্যন্ত এই ভূমিতে না এসে থাকার সংকল্প প্রায় বজায় রাখতে পেরেছেন। এমনকি স্বাধীন বাংলাদেশেও তাঁকে একবারই আসতে দেখা গেছেন। সেটাও তাঁর পিতা তথা আমার নানাজির মৃত্যু পরবর্তী লোকাচার বা ধর্মাচার বা লোকধর্মাচারে বা কিছু একটাতে অংশ নেয়ার জন্য। ১৯৭৪ সালে।

যাহোক, ঢাকার জগন্নাথে পাঠিয়ে বরগুণার একজন পিতা কাম (আর্থিক) অভিভাবকের পক্ষে পুত্রসন্তানকে পড়াতে-পারার সামর্থ্য যে অর্থ বহন করত, বড়মামার ভয়ার্ত ও ক্ষুব্ধ দেশত্যাগ সেই অর্থ ধারাবাহিক রাখে নি। তবে নানাজির সাধ্যানুযায়ী অর্থপ্রদান ও বড়মামার সংগ্রাম তাঁকে পরিশেষে একজন আইনজীবীতে পরিণত করে। বড়মামা কোলকাতার হাইকোর্টে যৌবনে কনিষ্ঠ হিসেবে, এবং পরবর্তীকালে জ্যেষ্ঠ আইনজীবী হিসেবে, কাজ করে চলেছেন। টুপি প্রসঙ্গে বড়মামা বিষয়ক আলাপ খানিক বড়ই হয়ে গেল। তবে ‘টুপি-পরানো’ ক্রিয়াপদের যুগসৃষ্টিকারী প্রয়োগকারী হিসেবে দীর্ঘদেহী বড়মামা দীর্ঘ এই গৌড়চন্দ্রিকার দাবিদার। তিনি ‘টুপি-পরানো’ বলতে বোঝাতেন, এখন আর প্রয়োগ করেন কিনা আমার জানা নেই, ভুজুংভাজুং দিয়ে কাউকে কিছু বোঝানো কিংবা একভাবে ঠকানো। নিজ পেশা নিয়ে তামাশামূলক এই উপলব্ধি ছিল তাঁর।

বস্তুত টুপি-পরানোর সঙ্গে টুপি-পরার খুব সামান্যই সম্বন্ধ। টুপি পরেন এমন লোক, বড়মামা-বর্ণিত পদ্ধতিতে, অন্য লোককে টুপি-পরাতে পারবেন এমন কোনো নিশ্চয়তা নেই। বিপরীতে, একদমই টুপি-পরতে অভ্যস্ত নন বা পছন্দ করেন না, এমন লোকও দক্ষতা অর্জন সাপেক্ষে অন্যকে টুপি-পরিয়ে থাকতে পারেন। বড়মামার বিবরণীকালে, সন্দেহ নেই, আমি এই বিদ্যার বিশেষ তাৎপর্য হৃদয়ঙ্গম করতে পারি নাই। কিছু বড় হবার পর মাথায় যখন পুরো বিষয়টা পর্যালোচনা করলাম, তখন, তখনই কেবল আমি টুপি-পরানোর পুরো মাহাত্ম্য বুঝতে পারলাম। সন্দেহ নেই এভাবে টুপি-পরিহিত হতে, এমনকি টুপি-পরাতে কোনোই উৎসাহ বোধ আমি করি নি উত্তরকালে।

manosh-chy-916

২০০৭ সালের ডিসেম্বর মাসে ভারতভ্রমণরত শিক্ষার্থীদের সঙ্গে শীতকাটানির চাপান। – লেখক

উত্তরকালের টুপিপ্রীতিতে দুটি উল্লেখযোগ্য ইতিহাস-স্মারক রয়েছেন। প্রথমটির নায়ক(বৃন্দ) ওয়েস্ট ইন্ডিজ ক্রিকেট দল। সামান্য যা সেই কালে ছবিছাবা পাওয়া যেত, তাতে তাঁদের মাথায় ক্রিকেটিয় সেই টুপি বা হ্যাট দেখে পুলক আর উত্তেজনায় সেরকম একটা টুপির লোভ না-দেখা দেয়া অসম্ভব ছিল। ওয়ালশ কিংবা এমব্রোসের, কিংবা তারও আগে রিচার্ডসের মাথার হ্যাটখানি আমি পেলেও যে কিছুতেই তাঁদের মতো আমায় দেখাবে না এই বোধ ছিল। তথাপি, এরকম একটা বস্তু আমি মনে মনে খুঁজতাম।

বহুবছর পর আমার শিক্ষার্থীরা ট্যুরে যাবার প্রাক্কালে কিংবা ট্যুরমাঝে আমাকে এরকম একটা টুপি/হ্যাট উপহারিয়েছিল মনে পড়ে। সেটা ছিল চামড়ার। হয়তো তার আগেও কখনো একটা কাপড়ের হ্যাট আমার হয়েছিল। বিশ্ববিদ্যালয়ের আটপৌরে অক্রিকেটীয় জীবনে সেই টুপির কোনোই সদ্ব্যবহার আমি করে সারতে পারি নি। যাহোক চামড়ার বস্তুখানা চোস্ত জিনিস ছিল। কিন্তু মানালি-কুলু’র ওই কনকনে ওই ঠাণ্ডায় কিছুতেই সেটা মাথায় চাপানো সহজ ছিল না। সারা শরীর মুখ পারলে তখন ভালুকের মতো বানানোর অবস্থা। তার মধ্যেও সদ্য উপহৃত অতি-আকাঙ্ক্ষিত বস্তুখানি মাথার উপর চাপিয়ে ঘোরাঘুরি করেছি। লোকজন আমার দিকে তাকাতেনও বটে। সেটা কতটা আমাকে ভাল দেখাচ্ছে বলে, কতটা ভালুকের মতো বস্তাবন্দি আমার মাথার উপর ওই বস্তুখানা কিম্ভূত দেখাচ্ছে বলে তা পুরোটা এখন নিশ্চিত হওয়া সম্ভব নয়।

দুটি উল্লেখযোগ্য ইতিহাস-স্মারকের অন্যটি অবশ্যই চে গেভারা। জগতের হেন অঞ্চল নাই যেখানে এই ভদ্রলোক (বা তাঁর রূপবান চেহারার ছবি) একজন তারকায় পরিণত হন নাই। তাঁর ঐ রূপবান চেহারার ছাড়াও আরেকটি বস্তু প্রায় তাঁরই মর্যাদায় জগদ্ব্যাপী অধিষ্ঠিত হয়েছে। সেটি চে’র টুপি। তবে টুপিটিকে অত সার্বভৌম মনে করার কোনোই কারণ নেই। বরং তাঁর গ্লোবেলাইজড রূপের সঙ্গে টুপিটি, তারকাখচিত অবস্থায়, সারা দুনিয়ায় ছড়িয়ে পড়েছে। অবশ্যই ফ্যাশন-আইটেম হিসেবে। পরিস্থিতি এতটাই গুরুতর যে আমি চীনা লিবেরেশন আর্মির টুপিখানা পরে অনেক বছর পরেছি, সেটিকে লোকে চে’র টুপি হিসেবেই সাব্যস্ত করে থাকেন। অবশ্য চে’র টুপিটিও চূড়ান্তবিচারে মিলিটারি টুপিই। বিপ্লবী মিলিটারি আর কি। আমার টুপিখানি আমার পাহাড়ের বন্ধুরা দিয়েছিলেন। আমার গজায়মান টাকের নিরাময়ে সেটির প্রয়োগও ভাল ছিল, পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া ছাড়াই।

manosh-chy-915

২০০৭ সালের ডিসেম্বর মাসে ভারতে ভ্রমণরত শিক্ষার্থীদের সঙ্গে চা-উত্তর রোদপোহানি। — লেখক

ওয়েস্ট ইন্ডিজের কল্যাণে না হলেও, চে’র কল্যাণে ঢাকার নানাবিধ নাগরিক তরুণরা টুপিতে মাথা ঢেকেছেন বহুকাল। বহুজন। এখনো পুরা বিলুপ্ত নয় সে টুপি। চারুকলার সংস্কৃতিমনষ্করা পরেন। চলচ্চিত্র সংসদকর্মীদের মধ্যকার মাঠ পর্যায়ের কর্মীরা পরেন। বামপন্থী শিক্ষার্থী সংগঠনের ছেলেরা পরেন; বিশেষত যাঁদের সংগঠনের উচ্চতর পদ পাওয়ার মাথাব্যথা কম। এমনকি মডেলরাও অবসরে পরেন। তারপরও একে বিলুপ্তপ্রায় টুপির জাত হিসেবেই ধরে নিতে হবে। আনসার বা কনস্টেবলদের টুপিতে ধাতব তারকা নেই বলে একে এই বর্গে রাখার কোনো মানে হয় না। উপরন্তু, এটি একটি শ্রেণীবাচক টুপি। সাংস্কৃতিক-রাজনৈতিক কিছু অর্থময়তা অতিশয় বিদ্যমান এই টুপিতে, এই টুপি-পরিধানে, টুপিময়তায়। যতই প্রান্তিক মার্ক্সীয় বিপ্লবীরা হোন না কেন, এই টুপি অভিজাতই।

টুপি বিষয়ক আলাপ করতে গিয়ে নানাবিধ প্রসঙ্গসূত্র চলে এল। বলা যায় গৌরচন্দ্রিকা। আসলে এত বড় একটা ভূমিকা আমি মুখ্য বক্তব্যের আগে দিতে চাই নি। টুপির মতো এক ক্ষুদ্রাকার বস্তুর এতটা বড় ভূমিকা মানানসইও নয়। কিন্তু হয়ে গেল। বস্তুত, আমি বর্তমান ঢাকা শহরে টুপির সর্বব্যাপিতা নিয়ে বলতে বসেছিলাম। রোদের হাত থেকে চোখ বাঁচানোর জন্যই হোক, আর গজায়মান টাককে অদৃশ্য রাখতেই হোক, প্রথম বৃষ্টির ছাঁটকে ঠেকানোর জন্যই হোক, আর নেহায়েৎ ফ্যাশন হিসেবেই হোক, টুপি অতি-প্রচলিত একটি পুরুষ-প্রপঞ্চ। এই ঢাকা নগরীতে। এটি নতুন। রিকশাওয়ালা পরছেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের টাকলা-তরুণ পরছেন, চুলঅলা পথচারী পরছেন, বাবরিঅলা পর্যটক পরছেন, কোচ পরছেন, ক্রিকেট খেলোয়াড়রা তো বটেই, তাঁদের ভক্তরাও পরছেন।

টুপিটিও নতুন। এ দফা গলফ টুপি। আমার মনে পড়ে গলফ চক্র থেকে এই টুপিটিকে বৈশ্বিক ক্রীড়ামণ্ডলীতে আনবার ক্ষেত্রে টেনিস খেলোয়াড় জিম কুরিয়ার অগ্রগণ্য ছিলেন। তাঁর সমসাময়িক আন্দ্রে আগাসিও পরেছেন অনেক দিন। হয়তো সেটা তার উত্তরকালের টাক ঢাকবার জন্য। এরপর টেনিস খেলোয়াড় পাওয়া মুস্কিল যাঁরা কখনো পরেন নি। ক্রিকেটে গলফ-টুপি এসেছে রঙিন পোশাকের পাশাপাশি। যখন ওয়েস্ট ইন্ডিজের খেলোয়াড়রাও সেই কার্নিশ-টুপি বাদ দিয়ে গলফ-টুপি পরে মাঠে নামতে শুরু করলেন আমার হতাশার আর সীমা থাকল না।

তবে ঢাকা শহরের আম-টুপি হয়ে পড়বার পর গলফ-টুপি আমার বেদনারাজ্য থেকে উত্তীর্ণ হয়েছে। লাল, নীল, সবুজ, স্টিকার-মারা, চাকতি-লাগানো, ব্রান্ডনাম বসানো—ভূয়া বা প্রকৃত। অজস্র রকমের গলফ-টুপি। টাক মাথায়, বাবরি মাথায়, বুড়া মাথায়, জোয়ান মাথায়। অজস্র মাথায় গলফ-টুপি। রিকশাঅলা, পুঁইশাকঅলা, পেইন্টিংঅলা, বীমার অফারের ফিরিঅলা। অজস্র বর্গের মাথায় গলফ-টুপি।

গলফের মতো একটা খান্দান খেলার টুপির এরকম আম হয়ে পড়া অভাবনীয়!
জা.বি. ও আদাবর, ৪ জুলাই ও ১২ আগস্ট, ২০১৬

About Author

মানস চৌধুরী
মানস চৌধুরী

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে নৃবিজ্ঞান বিভাগে মাস্টারি করে নির্বাহ করি। গল্প, কলাম ইত্যাদি লিখি। সুযোগ পেলে পর্দায় অভিনয়ও করি।