page contents
লাইফস্টাইল, সংস্কৃতি ও বিশ্ব

টেইলর সুইফটের যৌন হয়রানি মামলার বিস্তারিত

২৭ বছর বয়সী টেইলর সুইফট আমেরিকার অন্যতম জনপ্রিয় একজন পপ তারকা। লাভ স্টোরি, ইউ বিলং উইথ মি, শেইক ইট অফ, ব্ল্যাংক স্পেইস, ব্যাড ব্লাড ইত্যাদি জনপ্রিয় গানের জন্ম দেয়া এই সিংগার-সংরাইটার ২০১৫ সালে জায়গা করে নেন ফোর্বস এর ১০০ জন ক্ষমতাধর নারীর তালিকায়। সাম্প্রতিক সময়ে তার যৌন হয়রানির এই মামলা ও তার বিচারকার্য বিশ্ব সংবাদমাধ্যমে অন্যতম সাড়া জাগানো ঘটনাগুলির মধ্যে উল্লেখযোগ্য।

সুইফটের বিরুদ্ধে উত্থিত আলোচিত এই মামলার বিচারকার্য অবশেষে শেষ হয়েছে। এবং সেই মামলার রায় গেছে সুইফটের পক্ষে। ফলে তার বিরুদ্ধে আনা সকল অভিযোগ থেকে মুক্তি পেলেন ১০ টি গ্র্যামি অ্যাওয়ার্ড বিজয়ী এই পপ তারকা।

কিন্তু কী নিয়ে ছিল সেই মামলা? কে কাকে কী অভিযোগ করেছিলেন? আসুন তার বিস্তারিত ফিরিস্তি শোনা যাক।

কভার, টাইম। ১৩ নভেম্বর ২০১৪ ইস্যু।

কে কাকে কী অভিযোগ করেছিলেন?

ডেভিড ম্যুলার নামের এক সাবেক রেডিও সঞ্চালক ২০১৫ সালে সুইফটের বিরুদ্ধে মামলা করেন। মামলার সময় ডেনভারের বয়স ছিল ৫১ বছর। ২০১৩ সালে তিনি অনৈতিক আচরণের অভিযোগে চাকরি হারান। ম্যুলারের বক্তব্য, টেইলর সুইফটের মিথ্যে অভিযোগের কারণেই তিনি চাকরি হারিয়েছেন।

সুইফটের ‘রেড’ ট্যুরের সময় সুইফট, তার মা এবং সুইফটের ম্যানেজার মিলে ম্যুলার এর বিরুদ্ধে অভিযোগ করেন যে কনসার্টের আগে ভক্তদের সাথে সাক্ষাতের একটি ইভেন্টে টেইলর সুইফটের শরীরে আপত্তিকর স্পর্শ করেছেন ম্যুলার। তার দুইদিন পরেই চাকরি হারান ম্যুলার।

ম্যুলারের ভাষায়, এটি ‘মিথ্যে’ অভিযোগ। ম্যুলার তার অভিযোগপত্রে বলেন, তিনি সুইফটকে স্পর্শ করেন নি। আদালতের ডকুমেন্টে লেখা হয়েছে, “আমি নিশ্চিত যে আমি করি নি।” তিনি আরো বলেন, সুইফট এবং অন্যান্যরা মিলে তার বিরুদ্ধে মিথ্যে অভিযোগ এনে তাকে অপমান করেছেন এবং তার চাকরি খেয়েছেন।

ম্যুলারের অভিযোগের প্রেক্ষিতে ম্যুলারের মামলার এক মাস পর তার বিরুদ্ধে পাল্টা মামলা করেন সুইফট। তার বয়স তখন ২৩ বছর। সুইফট প্রথমবারের মতো পাবলিকলি অভিযোগ করেন, সেই ইভেন্টে ছবি তোলার সময় ম্যুলার ইচ্ছাকৃতভাবে তাকে আপত্তিকর স্পর্শ করেছিলেন। পরবর্তীতে এক বিবৃতিতে এ ব্যাপারে তিনি বলেন, “জীবনে কোনো কিছুর ব্যাপারে এতো নিশ্চিত হই নি আমি।” এছাড়াও সুইফটের বক্তব্য, ম্যুলারের চাকরি হারানোর ব্যাপারে তার কোনো হাত নেই।

বিচারকার্যের বিবরণ

গত মে মাসে (২০১৭) বিচারক উইলিয়াম মার্টিনেজকে এই মামলার সংক্ষিপ্ত একটি রায় প্রকাশ করতে বলা হলে তিনি তার অপারগতা জানিয়ে দেন। তবে ম্যুলারের অপমানজনক অভিযোগ উড়িয়ে দেন তিনি তখন।

আগস্টের ৭ তারিখ বিচারক প্যানেল নির্বাচনের মাধ্যমে আনুষ্ঠানিকভাবে এই মামলার বিচারকার্য শুরু হয়।

ডেনভার ফেডারেল আদালতে আট সদস্যের প্যানেল গঠনের জন্য ওইদিন ৬০ জন সম্ভাব্য বিচারকদের সাক্ষাৎকার নেয়া হয়। এই প্রক্রিয়ার প্রথম দিন আদালতে উপস্থিত ছিলেন টেইলর সুইফট। সুইফটের গায়ে ছিল সাদা পোশাক আর কালো জ্যাকেট। তার সাথে ছিলেন তার মা আন্দ্রে সুইফট।

সাক্ষাৎকারে সম্ভাব্য বিচারকদের কিছু প্রশ্ন করা হয়। তার মধ্যে একটি ছিল, দুই পক্ষের মধ্যে কারো পক্ষে বা বিপক্ষে তাদের অবস্থান আছে কি না। টেইলর সুইফটকে “নীচ ও হিংসুটে দেখাচ্ছে” মন্তব্য করায় এক বিচারককে বাদ দেয়া হয়। আরো দশজনকেও অবিলম্বে বাদ দেয়া হয়। শেষমেষ ৬ নারী ও ২ পুরুষসহ ৮ সদস্যের বিচারক প্যানেল গঠন করা হয়।

টেইলর সুইফট

ডেভিড ম্যুলার

মামলাটি ফেডারেল আদালতের অধীনে থাকার কারণ ম্যুলার ও সুইফটের আলাদা স্টেইটে থাকা। ফেডারেল আদালতের নিয়মানুসারে বিচারকার্য চলাকালীন সময়ে আদালতে সকল ধরনের ক্যামেরা নিষিদ্ধ করা হয়েছিল। সুইফটের মত বড় পপ তারকা থাকায় নিরাপত্তা বলয়ও বাড়ানো হয়েছিল আদালতে।

 

কী সাক্ষ্য দিয়েছিলেন ম্যুলার?

আগস্টের ৮ তারিখে আদালতে সাক্ষ্য দেন ম্যুলার। আত্মপক্ষ সমর্থন করে ম্যুলার বলেন, সুইফটের সাথে চলতে থাকা পুরো ব্যাপারটি ‘অদ্ভুত আর বিব্রতকর’।

তার বিরুদ্ধে আনা অভিযোগটি মিথ্যে দাবি করে তিনি বলেন, ২০১৩ সালের ইভেন্টটিতে তিনি সুইফটকে আপত্তিকর স্পর্শ করেন নি। তার মতে, তিনি কেবল সুইফটের হাত স্পর্শ করেছিলেন। আর সেটা, তার ভাষায়, ছবি তোলার জন্য জোরাজুরি করতে গিয়েই ঘটেছে।

ম্যুলার বলেন, “আমি বুঝতে পারছিলাম আমার হাত তার স্কার্ট স্পর্শ করেছিল। এবং সেটি পিছনে চলে যায়। কিন্তু তার হাতও আমার পিছনে চলে আসে।”

ম্যুলারের আইনজীবী তাকে প্রশ্ন করেন, তিনি আদৌ সুইফটের নিতম্ব স্পর্শ করেছিলেন কি না। জবাবে ম্যুলার নির্বিকারভাবে বলেন, “না, আমি করি নি।”

কোর্টরুম স্কেচে ডেভিড ম্যুলার

সাক্ষ্য দেয়ার আগে থেকেই ম্যুলার এর দাবি করে এসেছেন, সেই ইভেন্টটিতে তিনি তার গার্লফ্রেন্ডকে নিয়ে উপস্থিত ছিলেন। গার্লফ্রেন্ডসহ চলে যাওয়া পর্যন্ত নাকি সুইফট তার সাথে আন্তরিক ছিলেন। কিন্তু তিনি যখন গাড়ি নিয়ে সেই জায়গায় আবার ফিরে আসেন, তখনই সুইফটের নিরাপত্তারক্ষীরা তাকে ঘিরে ধরে।

ম্যুলারের যুক্তি, ছবি তোলার সময় গার্ডগুলি কোনোরকম প্রতিক্রিয়া দেখায় নি এবং ম্যুলার চলে যাওয়ার পর আরও অন্তত ২০ জন মানুষ সুইফটের সাথে ছবি তুলেছে।

আগস্টের ৯ তারিখ তার সাক্ষ্য দেয়া শেষ করে ম্যুলার বলেন, “আমি এখানে এসেছি নিজেকে নির্দোষ প্রমাণ করতে। রেডিওতে আমার একটা ভাল রেপুটেশন ছিল। আমি সেটা ফেরত চাই।”

 

কী সাক্ষ্য দিয়েছিলেন সুইফট?

২৭ বছর বয়সী পপ তারকা সুইফট আদালতে সাক্ষ্য দেন আগস্টের ১০ তারিখে। আত্মবিশ্বাসী সুইফট বলেন, “ওটা মোটেই জোরাজুরি ছিল না। সে আমার হাত স্পর্শ করে নি। সে আমার নিতম্ব স্পর্শ করেছিল।”

তিনি বলেন, “স্পর্শটি নিঃসন্দেহে আপত্তিকর ছিল। এবং তা অনেকক্ষণ স্থায়ী ছিল।” সুইফট আরো বলেন, “পুরো ব্যাপারটি ইচ্ছাকৃত ছিল। সে আমার স্কার্টের নিচে স্পর্শ করেছে। স্কার্টের নিচে হাত নিয়ে গিয়ে আমার নিতম্ব স্পর্শ করেছে সে।”

কোর্টরুম স্কেচে টেইলর সুইফট

ম্যুলারের আইনজীবীর প্রশ্নের জবাব দিতে গিয়ে সুইফট বলেন, “আমি তার হাত ছাড়ানোর চেষ্টা করেছি। কিন্তু পারি নি। পুরো ব্যাপারটি ভীষণ শকিং ছিল। আমি আমার জীবনে কখনও এমন পরিস্থিতির শিকার হই নি।”

ম্যুলারের আইনজীবী গ্যাব্রিয়েল ম্যাকফারল্যান্ড সুইফটকে জিজ্ঞেস করেন ঘটনার সময় কেন তার দেহরক্ষীরা কোনো পদক্ষেপ নেয় নি। জবাবে সুইফট বলেন, “কেউই এমন কিছু ঘটতে পারে তা প্রত্যাশা করে নি। এরকম কিছু এর আগে কখনও ঘটে নি। পুরো ঘটনাটা খুবই ভয়ঙ্কর আর শকিং একটা ব্যাপার ছিল।”

তিনি হয়ত অন্য কারো জায়গায় ম্যুলারকে ভুলভাবে চিহ্নিত করেছেন বলে অভিযোগ করা হলে তা জোর দিয়ে অস্বীকার করেন সুইফট।

এছাড়াও সুইফট বলেন, ম্যুলারের চাকরি হারানোর ব্যাপারে তার কোনো যোগসাজশ নেই।

 

সুইফট কি ঘটনাটির ব্যাপারে পুলিশকে জানিয়েছিলেন?

টেইলর সুইফটের সাবেক দেহরক্ষী গ্রেগ ডেন্ট, রায় ঘোষণার পরে।

যদিও এমন ঘটনা আঞ্চলিক আইন অনুসারে অপরাধ বলে বিবেচিত হত এবং অপরাধীকে কারাগারে যেতে হত, সুইফট পুলিশকে সেই ঘটনার সময় কিছুই জানান নি। তার পরিবর্তে তিনি তার দেহরক্ষী এবং প্রত্যক্ষদর্শী একজন ফটোগ্রাফারকে জানিয়েছিলেন, এবং তার মা ও তার ম্যানেজমেন্ট দলের সাথে এ নিয়ে আলাপ করেছিলেন।

এ ব্যাপারে যুক্তি দিয়ে সুইফটের আইনজীবী ডগলাস বালড্রিজ আদালতকে বলেন, সুইফট এই পরিস্থিতিকে ‘নিরব ও গোপন’ রাখতে চেয়েছিলেন।

 

সুইফটের মা’র বিবৃতি

ভয়াবহ সেই অভিজ্ঞতার বর্ণনা দিয়ে টেইলর সুইফটের মা আন্দ্রে সুইফট আদালতকে বলেন, আমি ড্রেসিংরুমে গিয়ে তার মুখের দিকে তাকাই। আমি বুঝতে পারছিলাম খুব বাজে কিছু একটা ঘটেছে। সে আমাকে বলে, “মা, এক লোক আমার নিতম্ব স্পর্শ করেছে।” শুনে আমার বমি চলে এসেছিল। একই সাথে আমার প্রচণ্ড কান্না পাচ্ছিল।

অশ্রু মুছে আন্দ্রে সুইফট আরো বলেন, “প্রচণ্ড একটা ধাক্কা খেয়েছিল সে। একদমই বিধ্বস্ত হয়ে গিয়েছিল।”

পুলিশকে রিপোর্ট না করা সম্পর্কে সুইফটের মা জানান, “আমি চাই নি এই ঘটনা আমার মেয়ের জীবনের মূল বিষয় হয়ে উঠুক। এ ঘটনার পর বিকৃত ছবিসহ ট্যাবলয়েড এবং ইন্টারনেটে যে অসংখ্য জিআইএফ এবং ট্রলগুলি বের হবে, আমি চাই না সেগুলির মাধ্যমে আমার মেয়ে সেই বাজে অভিজ্ঞতার স্মৃতিতে বার বার ফিরে যাক।”

সুইফটের আইনজীবী বলছেন এই ছবিটি নিশ্চিতভাবে প্রমাণ করে যে ম্যুলার সুইফটকে আপত্তিকরভাবে স্পর্শ করেছেন।

সুইফটের অভিযোগের অনুকূলে যায় এমন একটি ছবি আদালতের কাছে রয়েছে। ২০১৩ সালের সেই ইভেন্টে তোলা ছবিটিতে সুইফট, ম্যুলার এবং ম্যুলারের গার্লফ্রেন্ড রয়েছেন। ছবিটিতে ম্যুলারের হাত সুইফটের শরীরের কোথায় স্পর্শ করছে তা স্পষ্ট না থাকায় দুপক্ষের মধ্যে রয়েছে বিতর্ক। সুইফটের আইনজীবী বলছেন এই ছবিটি নিশ্চিতভাবে প্রমাণ করে যে ম্যুলার সুইফটকে আপত্তিকরভাবে স্পর্শ করেছেন। কিন্তু ম্যুলারের পাল্টা যুক্তি, ছবি দেখে তেমন কিছুই বোঝা যায় না।

ম্যুলারের আইনজীবী সুইফটকে জিজ্ঞেস করেন, তার অভিযোগ যদি সত্যি হত, সুইফটের স্কার্ট উপরে উঠে থাকত এবং তা ছবিতে দেখা যেত।

ছবিতে স্কার্টের কেবল সামনের দিক দেখা যায় বললে সুইফট জানান, “আমার নিতম্ব সামনে নয়, পিছনের দিকে।”

সুইফটের দেহরক্ষী গ্রেগ ডেন্ট এবং ফটোগ্রাফার স্ট্যাফানি সিমব্যাক (যিনি সেই ছবিটি তুলেছিলেন) প্রত্যক্ষদর্শী হিসেবে জানান, তারা ম্যুলারকে আপত্তিকর স্পর্শ করতে দেখেছেন।

মায়ের সঙ্গে টেইলর সুইফট

বিচারের রায়

অবশেষে গত ১৪ আগস্ট টেইলর সুইফটের অনুকূলে এ বিচারের রায় দেয়া হয়।

এর ফলে টেইলর সুইফট তার প্রাপ্য প্রতীকী ১ ডলার জিতে গেলেন যা তিনি মামলা শুরুর আগে ক্ষতিপূরণ হিসেবে দাবি করেছিলেন।

আদালত একই সাথে সুইফটের মা আন্দ্রে সুইফট এবং রেডিও লিয়াজোঁ ফ্রাংক বেলের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগগুলিও নাকচ করে দেয়।

রায়ের পর মাকে জড়িয়ে ধরেন সুইফট।

About Author

সাম্প্রতিক ডেস্ক