লজ্জায় লাল হওয়া বন্ধ করে আমাদের উচিত এটা নিয়ে খোলাখুলি কথা বলা। এটা লজ্জার বিষয় না, বরং ক্রুদ্ধ হওয়ার মত বিষয়।

আন্তর্জাতিক বিভিন্ন স্বাস্থ্য সংস্থায় শীর্ষ পদে কাজ করছেন বারবারা ফ্রস্ট, উইনি বাইয়ানিমা, করনি উডস, নিক এলিপুই। তাদের এই ভাষ্য দি গার্ডিয়ান ডটকম-এ ১ জুন ২০১৪ তারিখে প্রকাশিত হয়েছে। তা থেকে অনুবাদ করেছেন পারমিতা হিম।

ভারতে দুই কিশোরীকে গণধর্ষণের পর হত্যা করা হয়েছে। তারা বাড়ির বাইরে গিয়েছিল টয়লেট খুঁজতে। আর এ সময় তাদের ধর্ষণ করে নিষ্ঠুরভাবে মেরে ফেলা হয়। প্রাকৃতিক কাজকর্ম সারবার জন্য সারা দুনিয়ায় হরহামেশাই মেয়েদেরকে বাইরে এরকম অরক্ষিত জায়গায় যেতে হয়।

টয়লেট-বাথরুম বা ফ্রেশরুম—আপনি যে নামেই ডাকুন না কেন—ঘরে, স্কুলে, কর্মক্ষেত্রে, শপিং মলে আমরা অনেকেই এ বিষয়ে কথা বলতে দারুণ অস্বস্তি বোধ করি। কিন্তু আমাদেরকে যে কথা বলতেই হবে—
কারণ টয়লেটের অভাবে মেয়েদের জীবন বিপন্ন হচ্ছে।

কাটরা গ্রামে দুই মেয়ে খুন হওয়ার পর রাজনীতিবিদদের আগমন বেড়ে গেছে; হেলিকপ্টারে করে এসেছেন মায়াবতী। পিছনে ধুলায় আম গাছ অস্পষ্ট, যেখানে মেয়ে দুটিকে ধর্ষণ ও হত্যার পর ঝোলানো হয়েছিল। গ্রামের স্কুলের দারোয়ান মহেশ কাশ্যপের বর্ণনায়, বাতাসে মেয়ে দুটি এমন ভাবে দুলছিল যেন তারা পুতুল। ছবি. Jesse Pesta/The Wall Street Journal।)

পৃথিবীতে বর্তমানে আড়াই বিলিয়ন লোক পর্যাপ্ত টয়লেট সু্বিধা ছাড়াই বাস করছে। এর ফলে মেয়েরা বাধ্য হচ্ছে অন্ধকার, বিপদজনক এলাকায় তাদের প্রয়োজনীয় গোপনীয়তা খুঁজে নিতে। আর এ ধরনের জায়গায় পুরুষেরা অপেক্ষা করে মেয়েদেরকে আক্রমণ করার জন্য।

তাই লজ্জায় লাল হওয়া বন্ধ করে আমাদের উচিত এটা নিয়ে খোলাখুলি কথা বলা। এটা লজ্জার বিষয় না, বরং ক্রুদ্ধ হওয়ার মত বিষয়।

ভারতের মেয়ে দুইটি সম্পর্কে আত্মীয়, একজনের বয়স চোদ্দো, অন্যজনের ষোলো। দেশটির উত্তরপ্রদেশের গ্রাম কাটরায় তাদের বাড়ি। তারা বাড়ির বাইরে গিয়েছিল কারণ তাদের বাসায় পায়খানা ছিল না। তারা আর কখনো বাসায় ফেরে নি। নৃশংস হামলার পর তাদের মৃতদেহ গাছে ঝোলানো অবস্থায় পাওয়া যায়।

মাটির দেওয়ালে ছোট মেয়েটির আঁকা ফুল ও পাখি। ছবি. Jesse Pesta/The Wall Street Journal

এ বছরের ফেব্রুয়ারিতে টাইমস অব ইনডিয়া—
তে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে দেখা গেছে, দেশটির উত্তর প্রদেশ এলাকার পঁচানব্বই ভাগ ধর্ষণ এবং নির্যাতনের ঘটনা ঘটে তখন যখন মেয়েরা প্রাকৃতিক ডাকে সাড়া দিতে বাড়ির বাইরে অন্ধকার বা নির্জন জায়গায় যায়।

তবে এ সমস্যা অবশ্যই শুধু ইনডিয়ার সমস্যা না। পৃথিবীর প্রতি তিনজন লোকের মধ্যে একজন স্যানিটেশন সু্বিধা বঞ্চিত। এর মধ্যে এক বিলিয়ন, মানে গোটা পৃথিবীর জনসংখ্যার পনের শতাংশ লোক খোলা জায়গায় পায়খানা করে।

নাইজেরিয়ার লাগোস—
এ ওয়াটার এইডের এক গবেষণায় দেখা গেছে, দেশটিতে স্যানিটেশেনর পর্যাপ্ত অভাব রয়েছে এমন নারীর এক তৃতীয়াংশই প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে হয়রানি, হুমকি কিংবা সহিংসতার শিকার হয়। আর এ ঘটনাগুলি নিরাপদ, গোপন টয়লেটের অভাবেই হয়। কেনিয়া এবং সলোমন দ্বীপের উপর গবেষণায়ও একই রকম ব্যাপার দেখা গেছে্।

নদীর ধারে, মাঠে কিংবা পথের পাশে মলমূত্র ত্যাগ করা শুধু যে মেয়ে আর মহিলাদের যৌন হয়রানি বা সহিংসতার কারণ তা নয়, এটি মারাত্মক স্বাস্থ্যঝুঁকিরও বিষয়।

এর ফলে পানির প্রাকৃতিক উৎসগুলি দূষিত হচ্ছে, রোগ-বালাই বিশেষ করে ডায়রিয়া ছড়াচ্ছে। আর এ ডায়রিয়াই উন্নয়নশীল দেশগুলিতে শিশুমৃত্যুর অন্যতম কারণ। পৃথিবীতে প্রতিদিন ১৪০০ মা তার একটি সন্তানকে হারান এ রোগের কারণে, যার উৎস স্যানিটেশনের অভাব, বিশুদ্ধ পানি এবং পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার অভাব। গবেষণায় আরো দেখা গেছে, খোলা জায়গায় মলমূত্র ত্যাগ বন্ধ করতে পারলে এ মৃত্যু্হার অর্ধেকেরও বেশি কমে আসবে।

এ সমস্যার সমাধান করা যায়। আর সমাধানের প্রথম ধাপ হল আমাদের অস্বস্তি কাটিয়ে ওঠা। জাতিসংঘের ডেপুটি সেক্রেটারি জেনারেল, জ্যান এলিয়াসন, গত সপ্তাহে খোলা পায়খানার ব্যাপারে রহস্যময় নীরবতা ভঙ্গ করার আহ্বান জানান।

তাঁর বক্তব্য এবং ক্যাম্পেইনের উদ্বোধন একদম সঠিক সময়েই হয়েছে। এখন মিলেনিয়াম ডেভেলপমেন্ট গোল-এর আওতাভুক্ত দেশের সরকারগুলি দারিদ্র্য দূরীকরণের নতুন কৌশল গ্রহণ করবে।

জাতিসংঘের ‘আমার বিশ্ব’ নামে জরিপে, যেখানে বিশ্বের কয়েক হাজার কোটি লোক অংশ নিয়েছে, বিশুদ্ধ পানি এবং স্যানিটেশনের সুযোগ পঞ্চম দাবি হিসেবে উঠে এসেছে। ভারতের ভোটাররা ভালো জীবনযাপনের জন্য এটিকে চতুর্থ দাবি হিসেবে অগ্রাধিকার দিয়েছে।

ভারতের একটি বস্তি। সাধারণ পয়ঃনিষ্কাশন ব্যবস্থার অভাবে শিশুরা প্রায়ই রেললাইনের ধারে খোলা জায়গায় মলত্যাগ করে। ছবি : জন স্পাউল/ ওয়াটারএইড

ওয়াটার এইড, ইউনিসেফ, দি ওয়ার্ল্ড হেলথ অর্গাইনাজেশনসহ বিশ্বের আরো কয়েকশ সংগঠন নতুন টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্য নির্ধারণ করছে যেটির আওতায় ২০৩০ সালের মধ্যে দেশগুলি সবার জন্য স্যানিটেশন, বিশুদ্ধ পানি ও পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন পরিবেশ নিশ্চিত করবে।

সারা বিশ্বের এই স্যানিটেশন উন্নয়ন লক্ষ্য নির্ধারণ ভারতের ওই দুই মেয়ের ক্ষেত্রে বড্ড দেরিতে হয়েছে। কিন্তু তাদের এই ঘটনাই চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয় যে কেন এই পানি এবং স্যানিটেশনের অধিকার মানুষের মৌলিক অধিকার! আর কীভাবে এই অধিকারের অভাবে প্রতিদিন হাজার কোটি শিশু, মেয়ে ও নারীকে নিজের জীবনের ঝুঁকি নিতে হচ্ছে।

কমেন্ট করুন

মন্তব্য