‘ডানকার্ক’—ক্রিস্টোফার নোলানের ভিন্নধর্মী সিনেমা

শেয়ার করুন!

তিন-চারটা সিক্যুয়েন্স একসাথে চলছে। কোনোটাতে মূল চরিত্র ভিলেনের পেছনে ধাওয়া করাতে ব্যস্ত, কোনোটায় ভিলেন তার কৌশলের ব্যাপারে সিদ্ধান্তে আসছে আবার কোনোটায় ঘটছে সেই পরিকল্পনার বাস্তবায়ন। আর পরস্পর সম্পর্কযুক্ত এই দৃশ্যগুলির অগ্রগমন সিনেমাতে দেখানো হচ্ছে সমান্তরাল ভাবে।

এটা ক্রিস্টোফার নোলানের নতুন সিনেমা ‘ডানকার্ক’ (২০১৭) এর কোনো বিশেষ অংশের বর্ণনা না। এটাকে বরং নোলানের যে কোনো সিনেমার ক্লাইম্যাক্সের একটা নমুনা ধরে নিতে পারেন। ক্রসকাটিং (ভিন্ন ভিন্ন ঘটনাকে একই সাথে দেখানোর জন্য ফিল্ম এডিটিংয়ের একটি পদ্ধতি, যেখানে পরিচালকের চাহিদামত এক দৃশ্য থেকে আলগোছে অন্য দৃশ্যে চলে যাওয়া হয়) এর মাধ্যমে নোলান তার প্রায় সব ছবিতেই গল্প বলে এসেছেন। তার পেছনের মূল উদ্দেশ্য ছিল—ভিন্ন ভিন্ন ঘটনাগুলিকে তাদের চরিত্রের ও তীব্রতার দৃষ্টিকোণ থেকে দেখার চেষ্টা করা। গল্প বলার এই সাবজেক্টিভ অ্যাপ্রোচ তাকে সবসময়ই সাহায্য করে বলে মনে করেন তিনি, তাই তার নতুন সিনেমায় এটি পেয়েছে পূর্ণাঙ্গ অভিব্যক্তি।

মোটা দাগে নোলানের ছবিগুলি একই জঁনরায় ঘুরপাক খেয়ে এসেছে এতদিন; ক্রাইম, থ্রিলার ও সায়েন্স ফিকশন। তাই যুদ্ধের সিনেমা অবলম্বন করে প্রথম বারের মতো তার চলচ্চিত্র বিরাট কোনো মোড় নিল। সেই মোড়ের আকস্মিকতা রোধ করার জন্যে নোলানও তার কৌশলে পরিবর্তন আনলেন।

বলা যায়, ‘ডানকার্ক’ এর শুরু হয় ক্রিস্টোফার নোলানের সিনেমার সহজাত ক্লাইম্যাক্স থেকে। ক্রেডিটের লেখা দিয়ে আমাদেরকে বোঝানো হল, এর গল্প বলা হবে তিনটা আলাদা আলাদা জায়গায়—সমুদ্র সৈকত, মাঝসমুদ্র এবং আকাশে ভাসমান যুদ্ধবিমান থেকে।

ফ্রান্সের ছোট বন্দরনগরী ডানকার্কের সৈকতে ব্রিটেন, ফ্রান্স, বেলজিয়াম ও কানাডার সৈন্যরা জার্মানিদের কবলে অসহায় অবস্থানে। তখন দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের এক রকম শুরুর পর্যায়; ১৯৪০ সালের মাঝামাঝি। জার্মান যুদ্ধবিমান থেকে তাদের ওপর নিয়মিত বিরতিতে বোমাবর্ষণ চলছে। রয়্যাল এয়ার ফোর্স তাদের মত করে সেই আক্রমণ সামাল দেওয়ার চেষ্টা করছে পালটা আক্রমণের মাধ্যমে। আর অন্যদিকে একজন বয়স্ক ব্যক্তি তার কিশোর বয়সী ছেলে ও ছেলের এক বন্ধুকে সাথে নিয়ে ইয়টে করে রওনা দিয়েছেন ডানকার্কের উদ্দেশ্যে—অবরুদ্ধ ব্রিটিশ সেনাদের উদ্ধার কাজে যতটা সম্ভব সাহায্য করবেন তারা।

এই তিনটা সময় ধারার সাথে এক দফা পরিচয় করিয়ে দেওয়ার পর শুরু হয় সমান্তরালভাবে তাদের গল্প বলা। একবার সৈকতের কাহিনী, একবার আকাশে যুদ্ধরত বিমান, আরেকবার বাবা-ছেলের মাঝসমুদ্র অভিযান। এরকম অবস্থান্তর চলে পুরো সিনেমা জুড়েই।

নোলানের সিনেমায় কাহিনিগত আড়ম্বরের পাশাপাশি থাকে বাগাড়ম্বর। কাহিনীকে যতটা সম্ভব বোধগম্য করার জন্য চরিত্ররা দর্শকদের খাতিরে ব্যাখ্যামূলক সংলাপ আওড়ায় প্রচুর। আর নোলানের সমালোচকদের কাছে এটা তার অন্যতম বিরক্তিকর দিক। তবে এই ছবির প্রেক্ষাপট তার অন্যান্য ছবিগুলির মত না—যেখানে সময়ের সাথে প্লটের সবকিছুই জটিলতর হতে থাকে। যুদ্ধের বাস্তবিকতার সৌজন্যে এবার সেই বৈশিষ্ট্য থেকে নিজেকে সরিয়ে এনেছেন তিনি। আর তাই গোটা সিনেমায় সংলাপের পরিমাণ সামান্য।

যেহেতু এর আগে তার ছবিতে চরিত্রদের বেশিরভাগ যোগাযোগ সংলাপের সাহায্যেই হত, তাই নোলানের শট কম্পোজিশনেও একটা প্রবণতা ছিল লক্ষণীয়—সিঙ্গেল শট—যখন যে চরিত্রের কোনো সংলাপ বা কার্যকলাপ দেখাতে হবে, শুধু সেই চরিত্রকেই আলাদাভাবে ফ্রেমের ভেতর রাখা। এভাবে এক-এক করে দেখানোয় তার দৃশ্যগুলি ভিজ্যুয়ালি হত বেশ নীরস।

কিন্তু এইবার সংলাপের বাহুল্য না থাকায় চরিত্ররা সংযুক্ত হয়েছেন তাদের অবস্থানগত সঙ্কটের মাধ্যমে। এখানে আবার সাবজেক্টিভিটির প্রসঙ্গ আসে। ‘ডানকার্ক’ আসলে ওয়ার সিনেমার আবরণে একটা সারভাইভ্যাল থ্রিলার। যেহেতু সরাসরি যুদ্ধের ময়দান থেকে সিনেমার সূত্রপাত, তাই কোনো চরিত্রের ব্যক্তিগত ইচ্ছা বা অনুরাগ সম্বন্ধে আমাদের ধারণা নাই। এমনকি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ নিয়ে আলাদা কোনো বিবৃতি নাই; রণকৌশল জাতীয় কোনো আলোচনাও নাই। যেন ধরেই নেওয়া হয়েছে আমরা জানি কী দেখানো হচ্ছে, আলাদাভাবে কিছু দেখানোর নাই আর। আর যারা জানেন না, তারা এই যুদ্ধকে যে কোনো যুদ্ধ ধরে নিতে পারেন—তাতেও সবকিছু প্রাসঙ্গিকই হবে।

তিনটা ভিন্ন টাইমলাইনের সহাবস্থানে বিচক্ষণ এডিটিংয়ের চাইতেও বেশি ভূমিকা রেখেছে চিত্রনাট্যের একাত্মবোধ। বিচ্ছিন্ন এই দৃশ্যগুলির বুননে যুদ্ধকালীন সামগ্রিক উৎকণ্ঠার সর্বোচ্চ ব্যবহার করা হয়েছে। আর হানস জিমারের আবহ সঙ্গীতে অনবরত ঘড়ির টিক-টিক শব্দ যেন ছবির ইমোশনাল পটভূমি (ঘড়ির শব্দটা নাকি ক্রিস্টোফার নোলানের পকেটওয়াচ থেকে রেকর্ড করে সিন্থেসাইজ করেছিলেন জিমার)। প্রায় প্রতিটা দৃশ্যেই চরিত্ররা থাকেন উৎকণ্ঠায়, সেই সাথে থাকেন দর্শকরাও—যে কোনো সময় অক্ষবাহিনীর তোপে নামতে পারে ধ্বংসস্তূপ, বেঁকে ডুবে যেতে পারে জাহাজ বা ক্র‍্যাশ ল্যান্ডিং করতে পারে যুদ্ধবিমানটি।

নোলানের পূর্ববর্তী সব সিনেমায় আবেগের কেন্দ্রবিন্দু স্পষ্ট। সেই কেন্দ্রকে ঘিরে গল্প না এগোলেও দর্শকরা তাতে সাগরের মাঝে বয়ার মতো আঁকড়ে থাকতে পারেন। ‘ইনসেপশন’-এ গল্পের কারিকুরিতে কিছুটা হারিয়ে গেলেও ‘দ্য প্রেস্টিজ’ (২০০৬) বা ‘ইন্টারস্টেলার’ (২০১৪) এ তা যথেষ্ট প্রকট। অথচ ডানকার্কের চিত্রনাট্যে সে রকম কোনো সম্ভাবনাই রাখা হয় নি। দর্শকদেরকে খানিকটা বুদ্ধিবৃত্তিক জায়গা থেকেই নিজেদের আবেগকে প্রণোদিত করে নিতে হবে। আসলে নোলানের কোনো সিনেমায় এটা বিস্ময়কর সংযোজন। সমালোচক ম্যাট জলার সাইৎজ ডানকার্কের বর্ণনা দিয়েছেন “টেরেন্স মালিকের অস্থিরচিত্ত আত্মীয়” বলে। মালিকের ‘দ্য থিন রেড লাইন’ যেমন যুদ্ধের সিনেমায় দার্শনিক উৎকর্ষ তুলে ধরেছিল, তেমনি নোলান যুদ্ধের ব্যাপকতায় এক ক্ষুদ্র জগতের সামগ্রিকতা তুলে ধরতে চেয়েছেন।

 

এত সব কিছুর পর ‘ডানকার্ক’ এর উদ্দেশ্য ও সাফল্য স্পষ্ট। এটা বিশাল বাজেটে একরকম ‘আঁভা-গার্দ’ বা নিরীক্ষাধর্মী সিনেমা—যেখানে পরিচালকের উপস্থিতি মুখ্য। দর্শকরা নোলানের ছবিতে প্লট নিয়ে মেতে এসেছেন সবসময়। গল্পের জটিলতা আর অস্পষ্টতার দরুন ছোটখাটো ইস্যু নিয়ে গবেষণা হয়েছে প্রচুর, অথচ তার চিত্রনাট্যের ভেতরের কাঠামোগত অবস্থানের দিকে খেয়াল করা তাদের হয়ে ওঠে না। এইবার তিনি গল্পের সব অঙ্গসজ্জা ছুঁড়ে ফেলে দিয়ে নিতান্তই তার চিত্রনাট্যের অত্যাবশ্যক অনুষঙ্গগুলি ধরে রেখেছেন। এর ফলে তিনি অনেক দর্শক হারালেও আমি অবাক হব না।

ছবির শেষ দিকে এসে মনে হল, নোলান যেন বাঁধ ভেঙে দিয়েও পানিতে ভেসে থাকা দুই একটা টুকরা কুড়িয়ে নিলেন। এতে আমি কিছুটা আশাহত ঠিকই, কিন্তু অনেকে তাতে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলবেন হয়ত। তবে তার আগ পর্যন্ত এই সিনেমা থেকে আমি যে অভিজ্ঞতা পেয়েছি, তাদেরটা হতে পারে তার সম্পূর্ণ উল্টা।
– – –
ইউটিউবে ছবির ট্রেইলার:

কমেন্ট করুন

মন্তব্য

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here