page contents
লাইফস্টাইল, সংস্কৃতি ও বিশ্ব

ডার্ক চকোলেটের ৭টি স্বাস্থ্যগত উপকার

পৃথিবীতে অ্যান্টি অক্সিডেন্টের সেরা উৎস ডার্ক চকোলেট। গবেষণায় দেখা গেছে, স্বাস্থ্যের বিবিধ উন্নতি ঘটানোর সঙ্গে সঙ্গে হৃদরোগের ঝুঁকিও কমায় ডার্ক চকোলেট। কালো, দুধ ও সাদা এই তিন ধরনে চকোলেট তৈরি হয়। ডার্ক চকোলেটে হয় কোনো দুধ থাকে না বা খুব অল্প পরিমাণে থাকে। এই চকোলেটকে প্লেইন চকোলেটও বলে।

মার্কিন সরকারের নিয়ম অনুসারে ডার্ক চকোলেটে কমপক্ষে ১৫% চকোলেট দ্রবণ থাকতে হবে। আর ইউরোপিয়ান নিয়মে থাকতে হবে ৩৫% কোকোয়া উপাদান।

কাকাও গাছের কাকাও ফলের ভিতরে থাকে কোকোয়া বীজ। তা ভেজে গুড়া করে তা থেকে চকোলেট তৈরি হয়। চকোলেটে দুধ, চিনি ও অন্যান্য মিশ্রণ থাকা না থাকা দিয়ে ডার্ক বা মিল্ক বা হোয়াইট চকোলেট হয়। কোকোয়াকে প্রক্রিয়াজাত করে এর সাথে কোকোয়া বাটার ও সম্পূর্ণ গুড়া করা চিনি মিশিয়ে ডার্ক চকোলেট বানানো হয়। ডার্ক চকোলেটে কোকোয়ার পরিমাণ অনুযায়ী ডার্ক চকোলেটের ধরন ঠিক হয়। বলা দরকার, চকোলেটের নামকরণ প্রায়শই সরকারের নীতি নির্ধারণী পর্যায়ের বিষয়।

cocoa-tree-1

কাকাও গাছের কাকাও ফলের ভিতরে থাকে কোকোয়া বীজ।

ডার্ক চকোলেটকে ব্ল্যাক চকোলেটও বলে। ডার্ক চকোলেট এমনি বা রান্না করেও খাওয়া যায়। যেসব ডার্ক চকোলেটে ৭০% থেকে ৯০% কোকোয়া থাকে সেগুলির দাম বেশি।

ডার্ক চকোলেট আংশিক মিষ্টি স্বাদের হয়। আর এক্সট্রা ডার্ক ধরনের চকোলেট তিতা স্বাদযুক্ত মিষ্ট হয়ে থাকে।

১. ডার্ক চকোলেট খুব পুষ্টিকর
বেশি পরিমাণে কোকোয়া সমৃদ্ধ ভালো মানের ডার্ক চকোলেট খুবই পুষ্টিকর। এতে যথেষ্ট পরিমাণে ফাইবার ও খনিজ উপাদান থাকে।

শতকরা ৭০-৮৫ ভাগ কোকোয়া সমৃদ্ধ একটি ১০০ গ্রাম ডার্ক চকোলেট বারে থাকে:

  • ১১ গ্রাম ফাইবার
  • আয়রনের জন্য আরডি এর শতকরা ৬৭ ভাগ
  • ম্যাগনেসিয়ামের জন্য আরডি এর শতকরা ৫৮ ভাগ
  • কপারের জন্য আরডি এর শতকরা ৮৯ ভাগ
  • ম্যাঙ্গানিজের জন্য আরডি এর শতকরা ৯৮ ভাগ
  • এছাড়াও ডার্ক চকোলেটে প্রচুর পরিমাণে পটাসিয়াম, ফসফরাস, জিঙ্ক এবং সেলেনিয়াম থাকে

কিন্তু এই ১০০ গ্রাম বা ৩.৫ আউন্স ডার্ক চকোলেট পরিমাণ হিসাবে খুব বেশি। প্রতিদিন এই পরিমাণ ডার্ক চকোলেট খাওয়া যাবে না। কারণ, ১০০ গ্রাম ডার্ক চকোলেটে এইসব পুষ্টি উপাদান ছাড়াও থাকছে ৬০০ ক্যালরি এবং প্রচুর পরিমাণের চিনি। তাই ডার্ক চকোলেট একটি নির্দিষ্ট পরিমাণে খেতে হবে।

ডার্ক চকোলেট এবং কোকোয়াতে খুব অল্প মাত্রার পলিউনস্যাচুরেটস দ্বারা স্যাচুরেটেড অথবা মনোস্যাচুরেটেড ফ্যাটি এসিড থাকে।

ডার্ক চকোলেটে ক্যাফেইন এবং থিওরোব্রোমাইন এই দুটি উদ্দীপক উপাদানও থাকে। তবে কফিতে যে পরিমাণ ক্যাফেইন থাকে সে তুলনায় ডার্ক চকোলেটে ক্যাফেইনের পরিমাণ অল্প।

কোকোয়া বীজ।

২. ডার্ক চকোলেট অ্যান্টি অক্সিডেন্টের দারুণ উৎস
ওআরএসি (ORAC) হচ্ছে অক্সিজেন র‍্যাডিক্যাল অ্যাবসরবেন্স ক্যাপাসিটি বা অক্সিজেন সরাসরি গ্রহণের ক্ষমতা। এই ওআরএসি একক দিয়ে খাদ্যের অ্যান্টি অক্সিডেন্ট পরিমাপ করা হয়।

সাধারণত কোনো একটা খাদ্যের স্যাম্পলের কাছে কিছু পরিমাণ ফ্রি র‍্যাডিক্যাল রাখা হয়। এরপর দেখা যায় ওই খাদ্যের অ্যান্টি অক্সিডেন্ট ফ্রি র‍্যাডিক্যালটাকে কতটা নিষ্ক্রিয় করতে পারে।

এই পরীক্ষায় সবচেয়ে এগিয়ে থাকা খাদ্যের তালিকায় রয়েছে সরাসরি, অপ্রক্রিয়াজাত কোকোয়া বীজ।

ডার্ক চকোলেটের পলিফেনলস, ফ্ল্যাভানলস, ক্যাটেচিনস এইসব যৌগ শক্তিশালী অ্যান্টি অক্সিডেন্ট হিসাবে কাজ করে।

গবেষণায় দেখা গেছে অন্যান্য ফলের চেয়ে কোকোয়া বীজ এবং ডার্ক চকোলেটে পলিফেনলস, ফ্ল্যাভানলস এবং আরো অ্যান্টি অক্সিডেন্ট উপাদান অনেক বেশি থাকে।

কোকোয়া।

৩. ডার্ক চকোলেট রক্তপ্রবাহ বাড়ায় এবং রক্তচাপ কমায়

ডার্ক চকোলেটের ফ্ল্যাভানলস আর্টারির সংযোগ এন্ডোথেলিয়ামকে উদ্দীপিত করে। ফলে নাইট্রিক অক্সাইড গ্যাস তৈরি হয়।

নাইট্রিক অক্সাইডের কাজগুলির একটা হচ্ছে আর্টারিকে রিলাক্স করার সংকেত পাঠানো। এতে রক্ত প্রবাহের বাধা কমে যায় এবং সেইসাথে রক্তচাপও কমে।

কিন্তু কোকোয়া বা ডার্ক চকোলেট রক্তপ্রবাহ বা রক্তচাপে যে প্রভাব ফেলে তা যথেষ্ট নয়।

৪. ডার্ক চকোলেট অক্সিডেশনের বিরুদ্ধে এইচডিএল (HDL) বাড়ায় এবং এলডিএলকে বাধা দেয়
ডার্ক চকোলেট হৃদরোগের অনেকগুলি ঝুঁকি থেকে বাঁচাতে পারে। দেখা গেছে, কোকোয়া পাউডার পুরুষ মানুষের শরীরের অক্সিডাইজড এলডিএল কোলেস্টেরল মারাত্মকভাবে কমিয়ে ফেলে। এই অক্সিডাইজড এলডিএল কোলেস্টেরল হৃদরোগের ঝুঁকি বাড়ায়। বিপরীতে ডার্ক চকোলেট পুরুষ মানুষের শরীরে এইচডিএল বাড়ায়। এটা এলডিএল কোলেস্টেরলের বিপরীতে কাজ করে।

অক্সিডাইজড হওয়ার পর এলডিএল কোলেস্টেরল কণাগুলি হৃদপিণ্ডের আর্টারির টিস্যুগুলিকে ক্ষতিগ্রস্ত করে।

কোকোয়া বীজে বা ডার্ক চকোলেটে এক ধরনের শক্তিশালী অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট থাকে। এই অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট রক্ত প্রবাহে মিশে লিপোপ্রোটিন টিস্যুগুলিকে অক্সিডেশনের ক্ষতি থেকে বাঁচায়।

ডার্ক চকোলেট শরীরের ইনসুলিন রেজিস্ট্যান্সও কমায়। ইনসুলিন রেজিস্ট্যান্স হৃদরোগ এবং ডায়াবেটিসের ঝুঁকি বাড়ায়।

৫. ডার্ক চকোলেট কার্ডিওভাসকুলার রোগের সম্ভাবনা কমায়
ডার্ক চকোলেটের যৌগগুলি এলডিওএলের অক্সিডেশন থেকে রক্ষা করে এটা আমরা আগেই দেখেছি।

এর ফলে আর্টারিতে কোলেস্টেরল জমতে পারে না বা একদম কম জমে। ফলে পরবর্তীতে হৃদরোগের সম্ভাবনা কমে যায়।

৪৭০ জন প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের উপর পরীক্ষা করে দেখা গেছে কোকোয়া বীজের কারণে ১৫ বছরে কার্ডিওভাসকুলার মৃত্যুর ঝুঁকি শতকরা ৫০ ভাগ কমে গেছে।

আরেকটি গবেষণায় দেখা গেছে সপ্তাহে দুইবার বা তার চেয়ে বেশিবার ডার্ক চকোলেট খেলে আর্টারিতে ধাতব আবরণ তৈরি হওয়া শতকরা ৩২ ভাগ কমে যায়। তবে চকোলেট অনিয়মিত খাওয়ার ক্ষেত্রে কোনো প্রভাব দেখা যায় নাই।

নিয়মিত ডার্ক চকোলেট খেলে সত্যিকার অর্থেই হৃদরোগের সম্ভাবনা কমে যায়।

৬. সূর্যের আলো থেকে ত্বক রক্ষা করে ডার্ক চকোলেট
ডার্ক চকোলেটে এমন কিছু উপাদান রয়েছে যা মানুষের ত্বকের জন্য খুবই উপকারী।

ফ্ল্যাভানলস অন্য অনেক কাজের সাথে ত্বককে সূর্যের আলোর দ্বারা ক্ষতি হওয়া থেকে রক্ষা করে। এটা ত্বকে রক্তপ্রবাহও বাড়ায়। ত্বকের ঘনত্ব ও ত্বকের জলীয় অবস্থা ঠিক রাখে ফ্ল্যাভানলস।

মার্কিন সরকারের নিয়ম অনুসারে ডার্ক চকোলেটে কমপক্ষে ১৫% চকোলেট দ্রবণ থাকতে হবে। আর ইউরোপিয়ান নিয়মে থাকতে হবে ৩৫% কোকোয়া উপাদান।

এমইডি (MED) বা মিনিমাম এরিথেমাল ডোজ হচ্ছে সূর্যের অতি বেগুনী রশ্মির ন্যূনতম পরিমাণ। এই পরিমাণ অতি বেগুনী রশ্মি ত্বকে লালচে ভাব তৈরি করে। পরীক্ষায় দেখা গেছে ১২ সপ্তাহ নিয়মিত ডার্ক চকলেট খেলে এর ফ্ল্যাভানলসের কারণে মানুষের শরীরে এই এমইডি দ্বিগুণেরও বেশি হয়ে যায়। অর্থাৎ আগের ন্যূনতম পরিমাণের অতি বেগুনী রশ্মির দুই গুণ পরিমাণও ত্বকের ক্ষতি করতে পারছে না।

৭. ডার্ক চকোলেট মস্তিষ্কের কার্যকারিতা বাড়ায়
ব্রেনের কার্যকারিতা বৃদ্ধির জন্য ডার্ক চকোলেট উপকারী।

ডার্ক চকোলেটের ফ্ল্যাভানল ব্রেইনে রক্তপ্রবাহ ঠিক মাত্রায় রাখে।

ডার্ক চকোলেট খেলে মস্তিষ্কের কার্যকারিতা বৃদ্ধির সাথে সাথে প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের মানসিক দুর্বলতা কমে যায়। ডার্ক চকোলেট মানুষের ভার্বাল ফ্লুয়েন্সি বা কথা বলার প্রবাহ স্বাভাবিক রাখে।

কোকোয়াতে ক্যাফেইন এবং থিওব্রোমাইনের মত উদ্দীপক উপাদান থাকায়, খুব অল্প সময়ের জন্য ডার্ক চকোলেট ব্রেইনের ফাংশন বাড়ায়।

তবে এই অল্প সময়ের জন্য মস্তিষ্ককে উত্তেজিত করা বা মস্তিষ্কের কার্যকারিতা বৃদ্ধি ধীরে ধীরে অন্যান্য রোগের জন্য ঝুঁকিবহুল হয়ে উঠতে পারে।

About Author

সাম্প্রতিক ডেস্ক