নিজে কখনও তাঁবুতে রাত কাটাবো এইটা নিয়ে ভাবিও নাই। এর একটা কারণ হতে পারে আমার কল্পনার দৌড়।

এই তো কিছুদিন আগেও আমার কাছে ‘তাঁবু’ বলতে দুইটা ইমেজ ছিল—প্রথমটা ভাল ইমেজ আর পরেরটা খারাপ ইমেজ (পুরাই ব্ল্যাক অ্যান্ড হোয়াইট কোনো মাঝামাঝি নাই)। ভাল ইমেজের এক অংশে ২০-৩০ বছর বয়সী তরুণ। এরা পাহাড়ের উপরে নয়ত বনের ধারে তাঁবু টাঙ্গায়। সারাদিন টই টই করে বনে বাদাড়ে আর পাহাড়ে-পাহাড়ে ঘুরে বেড়ায়। হাতে একটা লাঠি আর পিঠে একটা ব্যাকপ্যাক থাকে। দিনের বেলা এদের শরীরে ঘাম ঝরে, সূর্যের দিকে তাকিয়ে থাকে আর পানির বোতল থেকে ঢক ঢক করে পানি খায়।

আমার মাথার মধ্যে থাকা তাঁবু টাঙ্গানোওয়ালাদের ইমেজ
আমার মাথার মধ্যে থাকা তাঁবু টাঙ্গানোওয়ালাদের ইমেজ (ছবি টা গুগল করে পাওয়া)—লেখক

রাতের বেলা এরা মাছ, পশু, পাখি ঝলসায়ে খায়। সারাদিন আর কী কী খায় তা নিয়ে অবশ্য আমি কখনও ভাবি নাই। করল্লা ভাজি কিংবা ডাল চচ্চড়ি খেতে ইচ্ছা করে কিনা অথবা বাজারে গিয়ে এরা চাল ডালের দাম নিয়ে দোকানির সাথে খ্যাচ খ্যাচ করে কিনা তাও আমার মাথায় আসে নাই কখনও। তবে আমার ভিতরে যে ইমেজ তাতে এরা সবসময়ই শক্তিশালী যুবক পুরুষ মানুষ। খুবই আকর্ষণীয়!

farjina-malek-snigdha-logo

ভাল ইমেজের আর এক অংশ হল কবি সাহিত্যিক—এরা একটু পাগলা টাইপের। নদীর পার, গ্রামের ধার, কিংবা নিরিবিলি যে কোনো জায়গায় এরা তাঁবু খাটায়। “এক পৃথিবী লিখব বলে, ঘর ছেড়ে সেই বেড়িয়ে এলাম”—জয় গোস্বামীর সেই কবিতার মতো এরা। একলা একলা থাকে, বই পড়ে, লেখালেখি করে, নিজেই চা বানায় আর চুক চুক করে চায়ের কাপে চুমুক দেয়। এরা সাত/দশ/তিরিশ বা তারও বেশি দিন ধরে একই জায়গায় তাঁবু টাঙ্গায়ে থাকে; খাতা ও কলম সবসময় হাতের কাছেই রাখে। পাশের বসতির মানুষ গুলার গল্পের বিষয় হয় সে। অন্যদিকে তার চিন্তা থাকে কীভাবে এই মানুষগুলার ভেতর থেকে ‘সাবজেক্ট’ বের করা যায়। দুই পক্ষের কাছেই দুই পক্ষ ব্যাপক বিনোদন! আমি এই অংশের তাঁবু ওয়ালাদেরও চা ছাড়া অন্যান্য খাবার দাবার, বাজার সদাই, টাকার যোগান, জামা কাপড় ধোয়া—এগুলা নিয়ে চিন্তা করি নাই। এগুলা নিয়ে কখনও ভাবি নাই বলেই হয়ত এই তাঁবুওয়ালাদের ইমেজ আমার কাছে ভাল। কে জানে!

আমার কাছে খারাপ ইমেজের তাঁবুওয়ালারাও আছে। সেইটাকে তাঁবু না বলে ক্যাম্প বললে আরও বেশি ভাল হয়। তখনকার পূর্ব পাকিস্তানে পশ্চিম পাকিস্তানিদের ক্যাম্প। এই বিষয়টা নিয়ে কথা বলতে ইচ্ছা করে না আমার। কেমন জানি কষ্ট, ভয়, ঘেন্না আর আড়ষ্ট লাগে।

আমার জীবনের একটা বিরাট সময়ের তাঁবু সংক্রান্ত ভাবনা এই ছিল। নিজে কখনও তাঁবুতে রাত কাটাবো এইটা নিয়ে ভাবিও নাই। এর একটা কারণ হতে পারে আমার কল্পনার দৌড়। সেটা ভীষণ রকমের ছোট। আর আমার কল্পনা করার ক্ষমতার পিছনে একটা পলিটিক্যাল প্রেক্ষাপটও আছে। যেখানকার ভাবনায়, অভ্যাসে শুধুই পুরুষ তাঁবু টাঙ্গায়ে বাইরে রাত কাটায়।

তাই প্রথম যেদিন লাবীব আমাকে ক্যাম্পিং-এর কথা বলল, আমি উৎসাহই দেখাই নি। আমার প্রথম প্রশ্ন ছিল: কত টাকা খরচ হইতে পারে? বাচ্চা-কাচ্চা নিয়ে পারব? ঝামেলা হবে না?

আমাদের দলের অধিকাংশ সদস্য আছে এখানে। ছবি. মো. বদিউল ইসলাম, অক্টোবর, ২০১৫।—লেখক

দেশে থাকলে হয়ত নিরাপত্তা প্রধান ইস্যু হত। সেই ইস্যুটা এখানে অন্তত আমার ক্ষেত্রে নাই। দল বিরাট বড়; ৩০-৩৫ জনের মতো। ফেইসবুকে দল খোলা হল। তুষার দা (আমাদের যে কোনো ক্যাম্পিং এর মূল উদ্যোক্তা) ৪০-৫০ পয়েন্টের চেকলিস্ট তৈরি করলেন। এই মূল পয়েন্টগুলার সাথে আবার শাখা উপশাখার মতো শ’খানেক সাব-পয়েন্টও আছে। তিরিশ পয়ত্রিশ জন মানুষের ৪-৫ বেলার খাবার দাবার। একবেলারটা রান্না করে নিব। সেইটার আবার দায়িত্বের ভাগ বণ্টন আছে। কে কোনটা রাঁধবে, কে কোনটা কিনবে, কে সাইট বুকিং দিবে, আবহাওয়া অনুযায়ী কেমন জামা নেয়া লাগবে এইসব নিয়ে দশ পনের দিন ধরে ঘণ্টায় ঘণ্টায় ফেইসবুকের দলে টেক্সট আসে। আমরা প্রস্তুতি নেই, প্রস্তুতি পাল্টাই আবার নতুন করে প্রস্তুতি নেই।

যাওয়ার কয়েকদিন আগে থেকেই কয়েকজন শুধু বাজারই করলেন—শুকনা খাবার কিনলেন, ভেজা খাবার কিনলেন, ফলমূল কিনলেন, চিপস-বিস্কুট কিনলেন, মাংস কিনলেন। যাই হোক বোঁচকা বাটি বাঁধা হল; ক্যাম্পিং চেয়ার, খাবার দাবার, প্রচুর পানীয়, জামা কাপড়, বাতাস দেয়া ম্যাট্রেস, বালিশ কাঁথা আর তাঁবু। মনে হল এক সংসার নিয়ে রওনা দিলাম। গিয়েই সংসার পাতার আয়োজন শুরু—তাঁবু খাটানো, খাবার দাবার তৈরি, ফ্রেশ হওয়া। দুপুরের খাওয়া শেষ হতেই আমাদের প্রত্যেক ক্যাম্পিং-এর ‘চা মানব’ কাজল ভাই চায়ের আয়োজন নিয়ে বসলেন। সে এক ভীষণ রকমের আয়োজন।

‘চা মানব’ কাজল ভাই আর চাখোরদের আড্ডা
‘চা মানব’ কাজল ভাই আর চাখোরদের আড্ডা। ছবি. মো. বদিউল ইসলাম, অক্টোবর, ২০১৫।—লেখক

মাদুর পেতে তার উপর চা পাতা, চিনি, দুধ, কাপ ইত্যাদি গুছালেন। গ্যাস-এর স্টোভে গ্যাস ভরলেন। এক পাতিলে অর্ধেক দুধ আর অর্ধেক পানি একসাথে মিশিয়ে জ্বাল দেয়া শুরু করলেন। আমরা সবাই তার মাদুর ঘিরে উৎসুক হয়ে বসে আছি। একটু পর শুরু হল কে আগে চা নিবে তার প্রতিযোগিতা। চা পর্ব শেষ হতেই তুষার দা বসে গেলেন মাংস মেরিনেট করার কাজে। রাতের জন্য বারবিকিউ হবে।

আমার এতদিনকার তাঁবুর ইমেজে যেটা একেবারেই ছিল না, এইবার তাঁবুর অভিজ্ঞতায় সেইটাই প্রকট ভাবে উঠে আসলো—খাবার দাবার। প্রস্তুতির সময় বা যে সময়টা থাকলাম সেই সময়টায় আমরা শুধু খেতেই থাকলাম আর কয়েক জনের দিন রাত্রি গেল শুধু সেগুলা আমাদের মুখে খাদ্যপোযোগী করে তুলতে গিয়ে। এর মাঝখানেও আমরা কেউ কেউ ফেইসবুকে ছবি পোস্ট করছি… “having fun at camping! feeling exited with Hubby” টাইপের ছবি।

farjina-2a
আরিশা ও তাঁবু। ছবি. মো. বদিউল ইসলাম, অক্টোবর, ২০১৫।—লেখক

আমি বসে বসে সম্পর্ক খুঁজি—আমার মাথার মধ্যে যে তাঁবুর ইমেজ ছিল সেটার সাথে আমার তাঁবুর অভিজ্ঞতার সম্পর্ক আর আমি ভাবি politics of representation নিয়ে। এই একটা জিনিস, যেইটা নিয়ে আমি কোনোদিনও পড়াশুনা করি নাই। যখন দুই এক বছর নৃবিজ্ঞান পড়ছি—তখনও পড়তে পারতাম। তাও পড়ি নাই কখনও—আবার কখনও পড়তে ইচ্ছাও করে না। কিন্তু নিজের মতো করে politics of representation নিয়ে ভাবতে ভাল লাগে।

আমি ভাবি রোদে তাকানো ঘাম ঝরা তরুণদের নিয়ে, আনমনা কবিটারে নিয়ে, উৎসুক গ্রামবাসীদের নিয়ে, পাকসেনাদের হা হা করা হাসি নিয়ে, আমার সারাটা দিন নিয়ে অথবা ফেইসবুকের ‘feeling exited’ টাইপের ছবিগুলারে নিয়ে। আমি ভাবি।