page contents
সমকালীন বিশ্ব, শিল্প-সংস্কৃতি ও লাইফস্টাইল

তুরাগের পাড়ে

বাসায় অাইপিএস অাসছে অামি যখন সপ্তম শ্রেণিতে পড়ি তখন। এর অাগে জেনারেটর ছিল। তারও অাগে ছিল চার্জার লাইট। তারও অাগে মোমবাতি, হারিকেন।

অামার মনে অাছে, অামার পঞ্চম শ্রেণিতে পড়াকালীন অামরা যেই বাসাটাতে থাকতাম সেইটার চারপাশে প্রচুর বাঁশঝাড়, গাছপালা ছিল। জঙ্গল বললে ভাল। সারাদিনই বাতাস হয়। ঘরের পর্দা ঝড়ের বেগে উইড়া আইসা অাম্মুর ড্রেসিং টেবিল থেইকা জিনিসপত্র ফালায়া দেয়। তিনি পর্দায় ডজনখানেক ক্লিপ মাইরাও নিজের লিপস্টিক, পারফিউমের ঠাস ঠাস কইরা পড়তে থাকা থামাইতে পারেন না।

একটু পর পর রুমে অাসেন, এইটা ওইটা ড্রেসিংটেবিলে তুলেন, নতুন কইরা অারো কয়টা ক্লিপ লাগায় দিয়া যান। অার বাতাসরে গালি দেন।

অামরা তার অবস্থা দেইখা হাসি।

বাতাসের কারণে সারাদিন বাইরে পাতা পড়তে থাকত। বাড়ির সামনে মাটির উঠান। বেশ বড়। বাড়িওয়ালাদের কাজের মেয়ে পুরাটা উঠান একবারে ঝাড়ু দিয়া গোসলে যাইত।

অাইসা দেখত অাবারো যেই সেই। সারা উঠান পাতায় ভর্তি। জানলা খোলা থাকলে এই পাতা ঘরের ভিতরও ঢুকত। তাই, অামাদের জানলা কখনোই পুরাটা মেলা যাইত না। সবসময় অল্প খোলা থাকত। তবুও দেখা যাইত, অাম্মু ঘরে ঢুকলে প্রতিবারই পাতা টোকায়া ফেলতে হইতেছে।

মূল বাড়িটার চারপাশে পুরানো ইটের দেওয়াল দেওয়া। তার মধ্যে দুইটা অ্যাডজাসেন্ট একতলা ফ্ল্যাট অার বাড়িওয়ালাদের পাঁচ রুমের বাসা।  দেওয়ালের ওইপাশে ঘন ঝোপঝাড়। সাপ, গুইসাপ, বিভিন্ন পোকামাকড়ে ভরা।

তবে গুইসাপই ছিল বেশি। এইটা একটা অদ্ভূত জিনিস। দেখলে মনে হইত একটা বিরাট স্বাস্থ্যবান টিকটিকি।

অামাদের বাসাটাও একতলা ফ্ল্যাট। ছোট পরিসরের, কিন্তু খুব সুন্দর।

ঘরের মূল দরজাটা দিয়া বের হইলে সিঁড়িটা সোজা গিয়া উঠানে নামত। হাতের বামে তুরাগ। বর্ষায় তুরাগ কানায় কানায় ভইরা উঠত। অামরা তখন দরজার সিঁড়ি থেইকা সরতেই পারতাম না।

কী বাতাস, পাশে নদীতে উথালপাতাল ঢেউ। অদ্ভূত সুন্দর একটা সময় পার করছি অামরা ওখানে।

তো, তখন অামাদের বাসায় জেনারেটর ছিল। জেনারেটরের অসুবিধা ছিল, যেহেতু এলাকা থেকে দেওয়া হইত, একটা নির্দিষ্ট সময় পর ওরা ওইটা বন্ধ কইরা দিত। মানে যদি সারারাতও বিদ্যুৎ না থাকে, ওই যতটুকু সময় ফিক্স করা, তার বাইরে সরবরাহ একবারেই বন্ধ।

অার চারপাশে ঘন ঝোপঝাড়। রাতের বেলা বিদ্যুৎ গেলে বাড়তি অালো না দিলে ঘরের ভিতরে কিচ্ছু বোঝা যাইত না।

বাইরে কোথাও অালো জ্বললে হয়ত বাঁশঝাড়ের ফাঁকফোকর দিয়া একটু বোঝা যাইত ওইখানে অালো জ্বলতেছে, কিন্তু সেইটা বাড়ির ভিতর পর্যন্ত অাসত না। জোছনা হইলে একটু বোঝা যাইত চারপাশে কী অাছে না অাছে।

এমনও হইছে, জেনারেটর গেল গা, চার্জার লাইটের চার্জ শেষ, ঘরে মোম যা ছিল শেষ।

এখন অন্ধকারে থাকো, যত যাই হোক।

ওই সময়গুলি অামরা প্রায়ই গভীর রাত পর্যন্ত সিঁড়িতে বইসা থাকতাম। অাব্বু ফোনে রেডিও শুনত, অাম্মু হেডফোনে গান শুনত। অামার তো করার কিছু নাই, অামি চুপচাপ বইসা নদী দেখতাম। দেখতে দেখতেই বিভিন্ন কিছু ভাবতাম।

অামি অাবার তখন গান শিখতাম। তো, আম্মু বললে বা কখনো ইচ্ছা হইলে নিজ থেইকাই দুই একটা গান গাইতাম। ধীরে ধীরে গাইতাম। গলা ছাইড়া গাইতে লজ্জা লাগত, কেউ যদি শুনে!

জোছনা হইলে নদীর পানিতে চাঁদের অালো পইড়া চিক চিক করতে থাকত। সেই ছবি খুব সুন্দর। বড় ঢেউ হইলে মন হইত, কারা যেন দূর থেকে অাসতেছে। সময়তে ভয়ও লাগত। এত বড় ঢেউ, যদি বেশি কাছে চইলা অাসে!

কমেন্ট করুন

মন্তব্য

About Author

অর্জয়িতা রিয়া
অর্জয়িতা রিয়া

জন্ম. ঢাকা। কবি ও লেখক।

Leave a Reply