কর্লির মতে, ধনীরা মূলত ৩ ধরনের বই বেশি পড়ে থাকে—সফল ব্যক্তিদের জীবনী; আত্মোন্নয়নমূলক বই;  এবং ইতিহাস।

ধনীরা কেন ধনী হয়? ধনীদের দৈনন্দিন অভ্যাস কেমন হয়? এর সাথে তাদের ধনী হওয়ার কি কোনো সম্পর্ক আছে?

থমাস সি. কর্লি মনে করেন, আছে।

শূন্য থেকে শুরু করে ধনী হয়েছেন এমন ১৭৭ জন ব্যক্তির দৈনন্দিন অভ্যাস ৫ বছর ধরে গবেষণা করেছেন কর্লি। কর্লির ধারণা, ধনী ব্যক্তিদের কমন কিছু দৈনন্দিন অভ্যাস রয়েছে যা তাদেরকে বাকিদের চাইতে আলাদা করে তোলে।

তিনি এই অভ্যাসগুলির নাম দিয়েছেন ‘ধনী অভ্যাস’।

তার মতে, আমাদের দৈনন্দিন অভ্যাসগুলিই আসলে ঠিক করে দেয় আমরা জীবনে কতটুকু সফল হব। আমাদের জীবনে যা কিছুই ঘটে তার মূলে রয়েছে আমাদের দৈনন্দিন অভ্যাস। ভাল লাগা, বিষণ্নতা, স্ট্রেস, ভাল সম্পর্ক, খারাপ সম্পর্ক, সুস্বাস্থ্য, খারাপ স্বাস্থ্য সবকিছুরই কারণ আমাদের অভ্যাস।

থমাস সি. কর্লি

তবে কর্লি একই সাথে মনে করেন, আমাদের সব অভ্যাসই পাল্টানো সম্ভব।

নিচে কর্লির গবেষণা থেকে পাওয়া ১৩টি ‘ধনী অভ্যাস’ দেয়া হল যা চর্চা করা শুরু করলে পাল্টে যেতে পারে আপনার জীবন।

১. নিয়মিত বই পড়া

ধনীরা নিয়মিত বই পড়ে। বিনোদনের চাইতে নতুন জ্ঞানের প্রতি বেশি ঝোঁক থাকে ধনীদের।

প্রায় ৮০ শতাংশ ধনী প্রতিদিন অন্তত ৩০ মিনিট বই পড়ে থাকে। আর ধনীদের এই পাঠ অভ্যাসের লক্ষ্য বিনোদন নয়। মূলত নতুন জ্ঞান নেয়ার জন্য তারা বই পড়ে থাকে। কর্লির মতে, ধনীরা মূলত ৩ ধরনের বই বেশি পড়ে থাকে—সফল ব্যক্তিদের জীবনী; আত্মোন্নয়নমূলক বই;  এবং ইতিহাস।

২. নিয়মিত ব্যায়াম

৭৬ শতাংশ ধনী প্রতিদিন ৩০ মিনিট বা তারও বেশি সময় অ্যারোবিক ব্যায়াম করে থাকেন।

হাঁটা, জগিং করা, দৌঁড়ানো বা সাইকেল চালানো সবই অ্যারোবিক ব্যায়ামের অন্তর্ভুক্ত। এই ধরনের ব্যায়াম হৃদযন্ত্রের ক্রিয়া বাড়িয়ে তোলে বলে একে কার্ডিওভাস্কুলার এক্সারসাইজ বা সংক্ষেপে কার্ডিও বলা হয়ে থাকে।

কার্ডিও কেবল শরীরের জন্য নয়, মস্তিষ্কের জন্যও ভালো। কারণ এতে মস্তিষ্কের নিউরণের সংখ্যা বাড়ে। আর ব্যায়াম এমনিতেই গ্লুকোজ উৎপাদন বাড়িয়ে দেয়। গ্লুকোজ মস্তিষ্কের জ্বালানি। মস্তিষ্কে বেশি জ্বালানি মানে বেশি বুদ্ধি। সহজ হিসাব।

৩. অন্য সফল ব্যক্তিদের সাথে মেলামেশা

আপনি কাদের সাথে মিশছেন তা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। আপনি যাদের সাথে মিশছেন তারা যতটুকু সফল, আপনিও আসলে ততটুকুই সফল। ধনীরা তাদের সাথেই বন্ধুত্ব করতে চায় যারা আশাবাদী, উদ্যমী, লক্ষ্য অর্জনে মরিয়া আর সব মিলিয়ে পজিটিভ মানসিকতার।

একই সাথে নেতিবাচক মানুষদের সঙ্গ এড়ানোটাও সমান জরুরি। কেবল নেতিবাচক মানুষ নয়, নেতিবাচক যে কোনো কিছুই এড়ানো উচিত। কারণ নেতিবাচক এবং গঠনমূলক না এমন কোনো অযথা সমালোচনা আপনাকে হতাশ করে দিতে পারে। আপনি লক্ষ্যচ্যুত হয়ে যেতে পারেন খুব সহজেই।

৪. নিজের স্বপ্ন পূরণ

ধনীরা সব সময় নিজের স্বপ্ন আর লক্ষ্য পূরণে ছুটে থাকে।

অনেক মানুষ তার বাবা-মা কিংবা প্রিয়জনের স্বপ্ন পূরণে সারা জীবন কাটিয়ে দেয়ার মতো ভুল করে থাকেন। অন্য কারো স্বপ্ন বা লক্ষ্য পূরণে ভিতর থেকে ততটা তাগিদ আর প্রেরণা পাওয়া যায় না যতটা পাওয়া যায় নিজের স্বপ্ন পূরণে নামলে।

ধনীরা শুরু থেকেই নিজের স্বপ্ন আর লক্ষ্য ঠিক করে নেয়। আর তার পিছনেই জীবনের পুরোটা ঢেলে দেয়।

৫. সকালে ঘুম থেকে জাগা

প্রায় ৫০ শতাংশ ধনী ব্যক্তি স্বাভাবিক সময় থেকে অন্তত ৩ ঘণ্টা আগে ঘুম থেকে উঠে যায়।

প্রতিদিন অপ্রত্যাশিতভাবে আমাদের অনেক সময় নষ্ট হয়। যেমন, কোনো কোনো মিটিং অনেক দীর্ঘ হয় এবং নির্ধারিত সময়ের পরও চলতে থাকে। কখনও ট্রাফিক জ্যামে আমাদের অনেক সময় নষ্ট হয়। কখনওবা সন্তান হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়লে তাকে স্কুল থেকে নিয়ে আসতে হয়। হঠাৎ আসা এইসব ঝামেলাগুলি মোকাবেলা করতেই ভোরে ওঠার এই কৌশল।

কারণ এই ঝুটঝামেলাগুলির একটা বাজে প্রভাব পড়ে আমাদের অবচেতনে। আমাদের মনে বিশ্বাস জন্মাতে শুরু করতে পারে যে জীবনের উপর আমাদের কোনো নিয়ন্ত্রণ নেই। কিন্তু ভোর ৫টায় উঠে গেলে বাড়তি ৩ ঘণ্টা কাজে লাগিয়ে জীবনের উপর আপনার নিয়ন্ত্রণ আবারও চলে আসবে। তখন আত্মবিশ্বাস চলে আসবে যে আপনিই আপনার জীবনটাকে সাজিয়ে নিচ্ছেন নিজের মতো করে।

৬. অনেকগুলি আয়ের উৎস

ধনীদের কেবল একটা আয়ের উৎস থাকে না। তারা বিভিন্ন খাত থেকে আয় করে থাকে। ৬৫ শতাংশ ধনীর অন্তত ৩টি আয়ের উৎস থাকে। মূল একটি আয়ের উৎসের পাশাপাশি বাড়তি আয়ের উৎস হতে পারে রিয়েল এস্টেট, স্টক মার্কেটে বিনিয়োগ বা কোনো অংশীদারি ব্যবসার মালিকানা ইত্যাদি।

৭. মেন্টর খুঁজে নেয়া

ধনী হওয়ার দ্রুত উপায়ের একটি হল একজন মেন্টর বা পরামর্শদাতা খুঁজে নেয়া।

এই ধরনের মেন্টর আপনার জীবনে ইতিবাচক প্রভাব নিয়ে আসে। তারা আপনাকে পরামর্শ দেয় কী করা উচিত আর কী করা উচিত না। তারা তাদের নিজের জীবনের অভিজ্ঞতা থেকে আপনাকে পথ দেখায়।

৮. ইতিবাচক মন

আপনি কেবল তখনই সফল হতে পারবেন যখন আপনার একটি ইতিবাচক মন থাকবে। ধনীদের মধ্যে কমন একটি ব্যাপার হল এই পজিটিভিটি।

বেশিরভাগ মানুষের সমস্যা হল তারা বুঝতে পারে না তাদের চিন্তাভাবনা পজিটিভ নাকি নেগেটিভ। কেউ যদি তার নিজস্ব চিন্তাভাবনা দিয়ে প্রভাবিত না হয়ে একটু সচেতনভাবে খেয়াল করে, তারা দেখবে যে তাদের বেশিরভাগ চিন্তাভাবনাই নেতিবাচক। এই সচেতনটাই আসল। এভাবে সচেতনভাবে খেয়াল না করলে, কখনই উপলব্ধি করা সম্ভব না যে আপনার মন নেগেটিভিটিতে ভরা।

৯. ভিড়ের মধ্যে আলাদা

ধনী ও সফল ব্যক্তিরা ভিড়ের মধ্যে হারিয়ে যায় না। তাদেরকে বরং অনেক ভিড়েও আলাদাভাবে চোখে পড়ে।

বেশিরভাগ মানুষ চায় সমাজে খাপ খাইয়ে নিতে। এর ফলে তারা ভিড়ের মধ্যে মিশে যায়। আলাদা হওয়া মানেই তাদের কাছে বাড়তি ঝামেলা। তাই বেশিরভাগ শান্তিপ্রিয় মানুষ সমাজের আর দশটা মানুষের মতই হয়ে ওঠে ধীরে ধীরে। কিন্তু নিজেকে বাকিদের তুলনায় আলাদা করতে না পারাটাই বরং বেশিরভাগ মানুষের সফল না হওয়ার প্রধান কারণ।

আর সফল যারা, তারা আলাদা। তারা অন্য পথে হাঁটে। পরবর্তীতে অনেকেই তাদের অনুসরণ করে এবং তাদের হেঁটে যাওয়া পথে হাঁটে।

১০. ভদ্রতা ও সৌজন্য বোধ

ধনীদের ভদ্রতা ও সৌজন্য বোধ চোখে পড়ে খুব সহজেই।

থ্যাংক্স জানিয়ে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করা, ভদ্র ও মার্জিতভাবে খাওয়া, বিভিন্ন সামাজিক অনুষ্ঠানে যথাযথভাবে পোশাক পরা সবকিছুই এর অন্তর্গত।

১১. অন্যকে সফল হতে সাহায্য করা

ধনীরা সফল-হতে-চায় এমন মানুষকে তার লক্ষ্য অর্জন ও স্বপ্ন পূরণে সাহায্য করে থাকে।

সফল ব্যক্তিদের সঙ্গ ছাড়া সফল হওয়া সম্ভব না। সফল ব্যক্তিদের এমন সঙ্গ বা বন্ধুত্ব গড়ে তোলার প্রাথমিক শর্ত তাদেরকে সফল হতে সাহায্য করা।

তবে যে কাউকে সাহায্য করে বেড়াবেন ব্যাপারটি তেমন নয়। যারা সত্যি সত্যি সফল হতে চায়, যারা আশাবাদী, লক্ষ্য অর্জনে মরিয়া এবং পজিটিভ, কেবল তাদেরকে সাহায্য করুন।

১২. প্রতিদিন ১৫-৩০ মিনিট একা সময় কাটানো ও চিন্তা করা

ধনীদের সফল হওয়ার অন্যতম গোপন রহস্য চিন্তা করা। ধনীরা প্রতিদিন সকালে অন্তত ১৫ মিনিট সময় সম্পূর্ণ একা কাটায়। এই সময়টুকুতে তারা পুরো পৃথিবী থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে গভীর মনোযোগ দিয়ে চিন্তা করে।

তারা নিজেদের সাথে কথা বলে, বিভিন্ন বিষয় নিয়ে চিন্তা করে ও নতুন ভাবনার জন্য ব্রেইনস্টর্মিং করে। ক্যারিয়ার থেকে শুরু করে স্বাস্থ্য, সমাজসেবা সবকিছু নিয়েই তারা ভাবে। কীভাবে আরো ধনী হওয়া যায়? আমি কি আমার চাকরি নিয়ে সন্তুষ্ট? আমি কি ঠিকঠাক ব্যায়াম করছি? ধনীরা নিজেদেরকে এইসব প্রশ্ন করে আর তার উত্তর খোঁজে।

১৩. অন্যের ফিডব্যাক নেয়া

সমালোচনার ভয়ে আমরা অন্যের ফিডব্যাক নিতে চাই না। কিন্তু অন্যের ফিডব্যাক ছাড়া কোনটা ঠিক হচ্ছে বা কোনটাতে সমস্যা আছে তা বোঝা সম্ভব নয়। আপনি ঠিক পথে এগোচ্ছেন কি না তা বোঝার জন্য ফিডব্যাকের বিকল্প নেই।

ফিডব্যাক হচ্ছে অন্যের চোখে নিজেকে দেখা। আমাদের চোখে পড়ে না এমন অনেক কিছুই ফিডব্যাক নিলে বোঝা যেতে পারে। নতুন কোনো এক্সপেরিমেন্ট করা বা নতুন ক্যারিয়ার বা ব্যবসা শুরু করার ক্ষেত্রেও ফিডব্যাক সহায়ক।