page contents
লাইফস্টাইল, সংস্কৃতি ও বিশ্ব

দুই লেখকের কথাবার্তা—ডেভিড ফস্টার ওয়ালেসকে নিয়ে ছবি

দুইজন মানুষ শুধু নিজেদের মাঝে কথা বলে যাচ্ছে। কথার বিষয় তাদের সুবিধামত পাল্টাচ্ছে। মানুষরা কথা বললে যা হয়—বাকবিতণ্ডাও হচ্ছে মাঝে মাঝে। সময় কাটছে।

এ রকম পরিস্থিতি নিয়ে নাটক খুব ভালো হয়। কিন্তু চলচ্চিত্রে যেহেতু মঞ্চের চেয়ে সুযোগ অনেক বেশি, তাই এরকম কোনো প্লট নিয়ে বানানো মুভি দেখলে অনেকের হাসফাঁস লাগে। স্বাভাবিক। ক্যামেরার ঘুরে বেড়ানোর জায়গার তো অভাব থাকার কথা না। তাহলে দুইজন মানুষের আলাপের মধ্যেই আটকে থাকতে হবে কেন!

end-t1

ছবির পোস্টার

স্বীকার করি, এরকম ছবির প্রতি আমার দুর্বলতা আছে। চরিত্র যত কমতে থাকে, সৃজনশীলতার চাহিদা ততই বাড়ে। তাই এই ধরনের ছবিগুলিতে নির্মাতাদের ভঙ্গুর অবস্থায় পাওয়া যায়। যারা শক্তিশালী, তারাই শুধু বেরিয়ে আসে। বা এমনভাবেও বলা যায়, শক্তিশালীরা ছাড়া এ রকম ছবি বানাতেই যায় না কেউ।

movie-review-logo

২০১৫ সালের দ্যা এন্ড অফ দ্যা ট্যুর জীবনীমূলক ছবি। আসলে জীবনীমূলক বলতে যেমনটা ধারণা হয়, তাও না। বলা যায়, বাস্তব জীবনের কতগুলি বাস্তব ব্যক্তির কয়েকদিনের কিছু ঘটনা। আর ঘটনাগুলির ফোকাস দুইজন মানুষের উপর।

david-foster-w-2

ডেভিড ফস্টার ওয়ালেস এর উপন্যাস ‘ইনফিনিট জেস্ট’।

একজন ডেভিড লিপস্কি। ১৯৯৬ সালে রোলিং স্টোন ম্যাগাজিনের হয়ে কাজ করতেন এই লেখক। আরেক লেখক ডেভিড ফস্টার ওয়ালেস এর উপন্যাস ইনফিনিট জেস্ট তখন পুরো আমেরিকায় সাড়া ফেলে দেয়। লিপস্কি এই জনপ্রিয় লেখকের সাক্ষাৎকার নেওয়ার তাগাদা দিতে থাকেন তার সম্পাদককে। সন্দিহান সম্পাদক এক সময় রাজি হন, আর লিপস্কি এসে যোগ দেন ওয়ালেসের ‘বুক ট্যুর’-এ।

ওয়ালেস এবং লিপস্কি’র একসঙ্গে কাটানো সেই পাঁচ দিন থেকে লিপস্কি তার আর্টিকেল লিখে ফেলার আশায় থাকেন। যদিও তিনি শেষ পর্যন্ত ম্যাগাজিনে আর্টিকেলটি ছাপাতে দেন নি। প্রায় পনেরো বছর পর ডেভিড ওয়ালেস আত্মহত্যা করলে তাদের দু’জনের সেই কথোপকথন নিয়ে একটি বই লেখেন লিপস্কি। এবার তার এই ‘নন-ফিকশন’ বই সাড়া ফেলে দেয় চারিদিকে।

লিপস্কি’র লেখা বইটি থেকে চিত্রনাট্য লিখেছেন পুলিৎজার জয়ী নাট্যকার ডনাল্ড মারগিউলিস। ডনাল্ডের একসময়ের ছাত্র পরিচালক জেমস পনসোল্ডকে চিত্রনাট্যটি থেকে ছবি বানাবার দায়িত্ব দেওয়া হয়। জেমস পনসোল্ড সহজ সুন্দর ছবি বানাতে পছন্দ করেন। তার দ্যা স্পেক্ট্যাকুলার নাউ (২০১৩) রোমান্টিক কমেডিগুলির মধ্যে সবচাইতে তৃপ্তি দিয়েছিল। এইবার রোমান্টিক কিছু নেই, যদিও সহজ সুন্দর বলা যায় আবারও। কমেডি আছে—তবে সচেতন কিছু না—দুই মূল চরিত্রের নাম ‘ডেভিড’ হওয়া পর্যন্তই কমেডির দৌড়।


The End of the Tour Official Trailer

ছবিতে ওয়ালেস তার জীবনের ঘটনার সাথে সাথে নিজের ভাবনা-চিন্তা-ধারণা-দুঃশ্চিন্তা নিয়ে যতটা সম্ভব খোলামেলা আলাপ করে গেছেন।

লিপস্কি কখনো পেশাদার রিপোর্টার, কখনো বন্ধুর মত প্রশ্ন করে করে কিংবা নিজের বক্তব্য দিয়ে ওয়ালেসের কাছ থেকে তার কথাগুলি বাড়িয়ে নিয়েছেন। তাদের মাঝে সবসময়ই দুই প্রান্তের দুই লেখকের চাপা সংঘাত ছিল—একজন, যাকে মিডিয়া তারকা তকমা দিতে উঠে পড়ে লেগেছে। আরেকজন, যে লেখালেখির সামান্য অনুপ্রেরণা পেতেও হিমশিম খাচ্ছে ।

end-of-t543

ছবির দৃশ্য।

লিপস্কির এই হীনম্মন্যতা স্পষ্ট হয় তার গার্লফ্রেন্ড দিয়ে। ওয়ালেস এর ইনফিনিট জেস্ট বইটি যখন সব জনপ্রিয়তা কেড়ে নেওয়া শুরু করে, তখন লিপস্কির নিজেরও একটি বই বেরিয়েছিল। নিজের গার্লফ্রেন্ড এর মুখ থেকে ওয়ালেস এর গুণগান শুনেই তিনি এই সাক্ষাৎকার নিতে ব্যস্ত হয়ে পড়েন।

অন্তত ছবিতে ঘটনাগুলি এভাবেই সাজানো হয়েছে, যদিও বাস্তবের ব্যাপারগুলিতে নাকি নাটকীয়তার কিছুই ছিল না।

ছবির একেবারে শেষ পর্যন্ত গেলে অবশ্য বোঝা যায়, এটা আর যাই হোক—কোনও বাস্তব লেখকের জীবনী হিসেবে বানানো না। বরং যে কোনো মানুষের জীবনী নিয়ে অন্য একজনের মন্তব্য ধরে নিতে পারেন; নিগূঢ় সব মন্তব্য।

lipsky-2

লেখক ডেভিড লিপস্কি (জন্ম ১৯৬৫)

লিপস্কি যখন সাক্ষাৎকারটিকে স্মৃতিকথা ধরে লিখেছিলেন, তখনই হয়ত এই পরিবর্তনটা এসেছিল। চিত্রনাট্যকার আর পরিচালকের ভিন্ন ভিন্ন দর্শনে সেই পরিবর্তনটা শুধুই গভীর হয়েছে।

জেসি আইজেনবার্গ লিপস্কি’র মত চরিত্রে আদর্শ। খিটখিটে, চাপা স্বভাব। রিপোর্টারের পেশাদারি ভাব ধরে রাখা, আবার একই সাথে ওয়ালেসের আড়ষ্টতা কাটানোর চেষ্টায় সহানুভূতি দেখানো—সবকিছু ভালো একটা আর্টিকেল পাওয়ার আশাতেই। নিজেও একজন লেখক, তাই বড় মাপের লেখকের সান্নিধ্যে নিজেকে যাচাই করে নেওয়া।

জ্যাসন সিগেল এখন পর্যন্ত শুধু কমেডি ছবিই করে এসেছেন। সেসব ছবিতে তাকে মানায়ও চমৎকার। এখানে প্রথমবারের মত গম্ভীর কোনো চরিত্রে; তাও একেবারে আমেরিকার গত বিশ বছরের অন্যতম জনপ্রিয় ঔপন্যাসিকের ভূমিকায়। সিগেল এর লুকানো অভিনয়-প্রতিভা দেখাটা তাই অবাক করেছে বেশি। যদিও এক মুহূর্তের জন্যেও তাকে অযাচিত মনে হয় নি। বরং রকস্টারদের মত বড় চুলের মাথায় ব্যান্ডেনা বেঁধে ঘুরে বেড়ানো সাহিত্যিক হিসেবে সিগেলের চেয়ে উপযোগী কাউকে খুঁজে পাওয়াই কঠিন।

david-walace

লেখক ডেভিড ফস্টার ওয়ালেস (১৯৬২ – ২০০৮)

পাঠকদের সাথে অকপট থাকতে সাক্ষাৎকারের কোনো কোনো সময় নিজের অতীতের কথা বলেছিলেন ওয়ালেস। ছোট বেলায় টিভি দেখতেন সারাদিন। তাই এখন যেখানে থাকেন, সেই বাসায় টিভি রাখেন নি। নিজের রুক্ষ অভিজ্ঞতার সূত্র ধরেই মানুষের প্রযুক্তির প্রতি অগাধ বিশ্বাস নিয়ে রূঢ় কিছু মন্তব্য করেন। তিনি ভয় পান, টেকনোলজির দেওয়া কৃত্রিম সুখের আধিপত্যে স্বতঃস্ফূর্ত আবেগগুলি ইচ্ছা করেই দূর করে দেওয়া শুরু হবে। তার কাছে টেকনোলজি অনেকটা জাংক ফুডের মত। সপ্তাহে এক দুইবার সবাই মিলে খাওয়া যেতে পারে, কিন্তু সারাদিন শুধু জাংক ফুড খাওয়ায় যেমনটা হয়—টেকনোলজি ধরে সারাক্ষণ পড়ে থাকাও ততটাই ক্ষতি করে।

শেষমেশ আমি তার এই কথাগুলি আমার কম্পিউটার দিয়েই শুনেছি, আর আপনিও আমার এই লেখা মোবাইল বা কম্পিউটারে শুয়ে বসে পড়ছেন।

About Author

আয়মান আসিব স্বাধীন

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ডেভেলপমেন্ট স্টাডিজ বিভাগে পড়াশোনা করছেন। বই : সিনে-লয়েড (২০১৭, চৈতন্য)