page contents
লাইফস্টাইল, সংস্কৃতি ও বিশ্ব

দোলা’র নভেরা, নভেরা’র দোলা

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে ২০০২-২০১০ এর মধ্যে পড়ছেন থাকছেন কিংবা পড়েন নাই কিন্তু নিয়মিত থাকছেন বা আড্ডা দিছেন এমন সকলেই দোলারে চিনবেন।

আমার বন্ধু বইলা পাবলিসিটি করতেছি না,কথাটা সত্যি। আবাসিক বিশ্ববিদ্যালয় হওয়াতে ভিন্ন ভিন্ন ব্যাচের শিক্ষার্থীদের পরস্পরেরে চিনা তেমন কোনো বড় ঘটনা না। এখন নাকি ছাত্রছাত্রী বাড়াতে অবস্থা পালটাইছে, কিন্তু আমাদের সময় এমনিতেই প্রায় সবাই সবাইরে চিনত। তবে দোলার খ্যাতিটা অন্য রকম। পিউরিটান এবং অর্থোডক্স আর হিপোক্রিটদের জন্যে এই খ্যাতির সামনে নেতিবাচক উপসর্গ যুক্ত হইতে পারে অবশ্য।

দোলা পড়ত নাটক ও নাট্যতত্ত্ব বিভাগে। তার লগে আমার পরিচয় হইছিল ২০০৩ এর শীতকালে জাহানারা ইমাম হলের বি ব্লকের ৪১৯ নম্বর রুমে। এত দীর্ঘদিনের বন্ধুত্বে তার লগে আমার একবারও ঝগড়া লাগে নাই। এইটা একটা বিরল ঘটনা। আমার যত কাছের লোকই হোক কোনো না কোনো কারণে ঝগড়া লাগেই, বিশেষত যেই বন্ধুর লগে একপাতে খাওয়া হয়, এক বিছনাতে ঘুমানো হয়, তার ক্ষেত্রে সম্ভাবনা আরও বেশি।

আমাদের ইংরেজি বিভাগে যেমন লিটারেচার আর লিংগুইস্টিকস দুইটা গ্রুপ, ড্রামাটিকসে ছিল তিনটা। অ্যাক্টিং, ডিরেকশন আর স্ক্রিপ্ট রাইটিং। দোলা ছিলো প্রথম গ্রুপে। অর কোন এক প্র্যাকটিক্যাল পরীক্ষায় ও ‘হাতহদাই’ থাইক্যা চুক্কুনির একটু অংশ অভিনয় করছিল। সেইখানে মূল টেক্সটে চুক্কুনির নাকে নীল রঙের নাকফুলের উল্লেখ আছে। দোলার কোনো নীল পাথরের নাকফুল আছিল না, তাই সে আমার বেগুনি নাকফুল পিন্দা অভিনয় করছিল।

umme-farhana-logo

নাসিরউদ্দিন হোজ্জার বন্ধু আবদুর রহমানের জামার গল্প মনে আছে নিশ্চয়ই? হোজ্জা তৃতীয় ব্যক্তির লগে পরিচয় করায়া দেওনের সময় কইছিল “ইনি আমার বন্ধু আবদুর রহমান, ইনার গায়ের জামাটা নিয়া আমি কিছু বলতে চাই না।”

চুক্কুনির নাকফুলের কথা কওনের কারণ আছে। দোলার অভিনয় আমি আগেও আরো দেখছি। ‘নিমজ্জন’ নাটকে যে বাচ্চা মেয়েটার জিহবা কাইট্টা দেওয়া হয় তার চরিত্রে দেখছি দোলারে, এক্সপেরিমেন্টাল হলে। এ ছাড়াও অদের বিভাগের বিভিন্ন বর্ষের পরীক্ষাগুলায় যে ছোট ছোট স্কিট বা সিনিয়রদের ডিরেকশনের পরীক্ষায় যে সম্পূর্ণ নাটক অদের থিয়েটার ল্যাবে হইত যেগুলাতে জুনিয়রেরা অ্যাক্টিং করত সেইগুলাও কয়েকটা দেখছি। সাধারণত বিভাগের বাইরের কারো থিয়েটার ল্যাবে ঢুকার অনুমতি ছিল না, আমি চামে ঢুইকা যাইতাম। ‘ধাবমানে’ দোলা ছিল, আরেকটা পুরাণভিত্তিক নাটকে তক্ষকের চরিত্রে ছিল। কিন্তু চুক্কুনির অভিনয়টা আমার অনেক মনে আছে। সংলাপ মনে নাই কারণ সেইটা নোয়াখাইল্লা ভাষায় লেখা একটা টেক্সট। পড়তে গিয়াও শুরুতে কঠিন লাগে, মনোযোগ দিলে অবশ্য বুঝা যায়। চুক্কুনির পরে দোলা ‘চিত্রাঙ্গদা’ করছিল সম্ভবত ফাইনাল পরীক্ষায়। কিন্তু কোনো এক অজ্ঞাত কারণে দোলার করা চুক্কুনিরে আমি ভুলতেই পারি নাই।

dola-7680

মঞ্চে নভেরা চরিত্রে সামিউন জাহান দোলা। ছবি. আমিনুল হক শাফায়েত

অভিনয়শিল্পী তার নিজ সত্তার বাইরে যাইতে পারলে সেইটা তার কৃতিত্ব হিসাবে বিবেচনা করা হয় কিনা তা আমি জানি না। ভাল অভিনেতা আমরা কাদেরে বলি? ধরেন হুমায়ুন ফরিদী বা নাসিরুদ্দীন শাহ্‌। উনারা ভাল অ্যাক্টর কেন? যে কোনো চরিত্রে সাবলীল অভিনয় করার জন্যে? নাকি অনেক রকম ভিন্ন চরিত্রে অভিনয় করতে পারার জন্যে? কিংবা ফেরদৌসি মজুমদার কেন প্রায় কিংবদন্তি হইয়া গেছেন? উনার চেয়ে ভাল কইরা লেডি ম্যাকবেথ কি আর কেউ করেন নাই? নাকি হুরমতির চরিত্র উনি ছাড়া আর কেউ পারতেন না?

আমি এই সূত্রটা বুঝি না। ধরেন একজন অভিনেতা আসলে এলিট শ্রেণির কিন্তু চোর বা গাড়োয়ান বা জেলের চরিত্রেও ভালো অভিনয় করলেন কিংবা উল্টাটা, কেউ গরীবের ঘরে জন্মাইছেন কিন্তু অভিজাত লোকের চরিত্রে এমন অভিনয় করলেন যে বুঝাই গেল না উনি রাজা-জমিদার না, তাইলেই কি তাদেরে ভাল অভিনয়শিল্পী বলা যায়?

দোলার অভিনয়ের গুণে হোক বা দোষে হোক, আমার চুক্কুনির নাম মনে পড়লেই ধারণা হয় দোলার মতন একটা মেয়ে সে। ছোটখাট, কালো গায়ের রঙ, মাথায় লম্বা ঘন চুল, পান চিবাইতে চিবাইতে সে কোনো একটা গিরস্তালি কাম করতেছে। এইটা চরিত্রের আগে অভিনয় শিল্পীর লগে পরিচয় ঘটবার কারণে হইতে পারে। খুব চেনা চরিত্রে যদি কোনো অচেনা ব্যক্তি অভিনয় করেন তাইলে হয়ত ওই ব্যক্তিরে মনে হবে সেই চরিত্রের মতন। দোলা আর চুক্কুনি হয়ত অনেকটা একই রকম, যদিও দোলা উচ্চশিক্ষিত আর বিলাতফেরত মেয়ে আর চুক্কুনি ফেনীর কোনো গ্রামের একটা সাধারণ মেয়ে, শিল্পী বা পারফর্মার না।

dola-321

মঞ্চে দোলা। ছবি. আমিনুল হক শাফায়েত

‘নভেরা’ নামের নাটকটা দোলার নিজের লেখা, হাসনাত আবদুল হাইয়ের উপন্যাস অবলম্বনে। নির্দেশনা দিছেন সাজ্জাদ রাজীব, অভিনয় করছে দোলা একা। নামেই বুঝা যাইতেছে এটা ভাস্কর নভেরারে নিয়া নাটক।

ব্যক্তি দোলার সঙ্গে ব্যক্তি নভেরার মিল আছে কি নাই সেইটা বলা মুশকিল কিন্তু শিল্পী নভেরার সঙ্গে শিল্পী দোলার কিছু হইলেও মিল আছে নিশ্চয়ই। কোন এক নাটক বা নাচের পারফর্মেন্সের আগে দোলার কোনো এক সহপাঠী দোলার পায়ে আলতা লাগায়া দিতে গিয়া মন্তব্য করছিলেন, “তর পায়ে আলতা দেওয়া আর গরুর ক্ষুরে আলতা দেওয়া সমান কথা।” দোলার পায়ের পাতা সুন্দর না দেইখ্যা সে চেতানের লাইগ্যা কইছিল। দোলা আবার দুঃখের চোটে এই কথা সোমা (মমতাজ) ম্যাডামের কাছে কইছে। ম্যাডাম তখন বলছেন, “মোর কা প্যার কাভি সুন্দর নেহি হোতা।” এরপর থাইক্কা দোলা এই কথাটা বহুবার কোট করছে। ময়ূর তার নাচের লাইগ্গা বিখ্যাত, তার পা কুচ্ছিত হইলেও কিচ্ছু আইসা যায় না।

এইটা বলার সময় দোলারে দেইখা মনে হয় সে অত্যন্ত আনন্দিত যে তার পায়ের পাতা দুইটা সুন্দর না। ময়ূরের লগে তুলনা দিয়া তার নৃত্য প্রতিভারে যে স্বীকৃতি দেওয়া হইল তাতেই সে যার পর নাই আহ্লাদিত। আর কোনো প্রশংসা সে চায় না। সত্যিকারের শিল্পীরা হয়তো তাই, তাদের ব্যক্তিসত্তার চাওয়াপাওয়া বা ভালোলাগা মন্দলাগা ছাপাইয়া তাদের শিল্পীসত্তার আশা-আকাঙ্ক্ষা তৃপ্তি অতৃপ্তি বড় হইয়া ওঠে।

‘নভেরা’ নাটকের শো হইছে এই নিয়া তিনটা। প্রথমটা এই বছরের মে মাসের ১৩ তারিখ মহিলা সমিতিতে, দ্বিতীয়টা ১১ জুন শিল্পকলার এক্সপেরিমেন্টাল হলে আর তৃতীয়টা জুলাইয়ের ২৯ তারিখ মহিলা সমিতি মঞ্চে। প্রথমটা ছাড়া আর কোনোটাতেই আমি যাইতে পারি নাই। আমি জাহাঙ্গীরনগরের ছাত্র হওয়ার সুবাদে অনেক নাটক দেখছি, মুক্তমঞ্চে প্রতি বসন্তে দুইটা নাট্য উৎসব হয়। কিন্তু একক অভিনীত নাটক আগে আর দেখি নাই। দোলার ‘নভেরা’ই আমার দেখা প্রথম সোলো পারফর্মেন্স। এই নাটকে নভেরার চরিত্রে অভিনয় করতে গিয়া দোলা দোলারে ছাড়াইয়া কতটা নভেরা হইয়া উঠতে পারছে তা আমি বিচার করতে পারমু না কারণ নভেরারে আমি দেখি নাই।

dola-3

দ্য টেম্পেস্টে’র যে শো গ্লোব থিয়েটারে হইছিলো সেখানে ট্রিংকুলোর চরিত্রে দোলা।—লেখক

যে কোনো কাল্পনিক চরিত্ররে নিজের মতন কইরা মঞ্চে উপস্থাপন করার কিছুটা হইলেও স্বাধীনতা নিশ্চয়ই অভিনেতার থাকে। অনেক ক্লাসিক গল্প বা উপন্যাস থাইকা সিনেমা বানাইবার সময় পরিচালক ইচ্ছামত চরিত্রদেরে পাল্টান, ভাঙেন আবার নিজের খুশি মত গড়েন। মঞ্চেও এমন স্বাধীনতা থাকার কথা। কিন্তু ভাস্কর নভেরা আহমেদ যেহেতু কাল্পনিক চরিত্র না তাই এই অভিনয় কঠিন ছিল বলাই বাহুল্য।

‘নভেরা’ নাটকের যে ব্যাপারটা আমার সবচাইতে ভাল লাগছে সেইটা হইল, নাটকে কোনো উচ্চ সুরের নারীবাদী আলাপ নাই। এমন না যে আমি নারীবাদী কথাবার্তা অপছন্দ করি। কিন্তু শিল্পসাহিত্য কোনো তত্ত্ব কপচানোর এলাকা না বইলা আমার বিশ্বাস। তত্ত্ব কপচানোর উদ্দেশ্যে যা নির্মাণ করা হয় তা প্রপাগান্ডা বা ডকুমেন্টারি হইতে পারে, আর্ট হয় না। হাসনাত আবদুল হাইয়ের উপন্যাসের টোন পুরুষতান্ত্রিক বইলা অনেকে মন্তব্য করছেন। আমি উপন্যাসটা পড়ি নাই বইলা জানি না। কোনো পুরুষতান্ত্রিক উপন্যাস থাইকা নারীবাদী নাটক বানানো যাবে না তাও না। ডিকনস্ট্রাকশনের মাধ্যমে তা খুবই সম্ভব। কিন্তু তত্ত্ব ফলানো যে এই নাটকের উদ্দেশ্য না সেই জন্যেই নাটকটা ভালো।

এই উদ্দেশ্যের ব্যাপারে সালমান রুশদীর একটা কথা আমার খুব মনে ধরছে। উনি কইতেছিলেন যে সাহিত্যের সবচে’ সুন্দর অংশ হইল যে সাহিত্যের কোনো উপযোগিতা নাই বা বাস্তব মূল্য নাই। কী হবে যদি আপনি হোমারের ওডিসি পড়েন বা জেমস জয়েসের ইউলিসিস পড়েন কিংবা না পড়েন? আপনার জীবনে কী এমন ব্যাপক পরিবর্তন সাধিত হবে? শুধু ব্যক্তিগত না, সামাজিক আর রাজনৈতিক জীবনেও পরিবর্তন আনার ক্ষেত্রে সাহিত্যের ভূমিকা অল্প। উনি উদাহরণ দিয়া কইতেছিলেন, ‘আঙ্কল টমস কেবিন’ ছাড়া আর কোনো সাহিত্যই নাকি দুনিয়ায় সেই রকম কোনো বিরাট পরিবর্তন আনতে পারে নাই।

পড়ুন: উম্মে ফারহানা’র আরো লেখা

ইদানীং অনেক কথা শুনি, “চলচ্চিত্র হোক দিন বদলের হাতিয়ার” কিংবা “নাটক মানুষকে ঋদ্ধ করে/শুদ্ধ করে” জাতীয় শ্লোগান , আবদুল্লাহ আবু সায়ীদের বই পড়ায়া মানুষরে আলোকিত করার মিশন তো ছোটকাল থাইকা দেখতেছি। অনেক নাট্যব্যক্তিত্ব নাটককে সামাজিক স্কুল হিসাবেও দেখছেন, ব্রেখটের মতন নাট্যকার থিয়েটারকে রাজনৈতিক ধ্যানধারণার চর্চা করার জায়গা হিসাবেও এক্সপ্লোর করতে চাইছেন। এই নিয়া হয়তো বিস্তর বাহাস হইতে পারে। কিন্তু দোলার ‘নভেরা’ কোনো শিক্ষামূলক নাটক না বইলাই আমার মনে হইছে।

যেহেতু নারীবাদ আসলে একটা রাজনৈতিক আন্দোলন আবার একই সঙ্গে একটা দার্শনিক অবস্থান তাই ব্রেখটের কথা মানলে মঞ্চে এই ব্যাপারটা প্রচার বা উত্থাপন করা যাইতেই পারে। কিন্তু আমার মনে হয় এই দেশের মঞ্চে নারীবাদ প্রপাগেট করার চেষ্টাও ঝুঁকিপূর্ণ। যে জাতিরে খাওনের আগে আর বাথরুম থাইকা আসার পরে হাত ভাল কইরা সাবান দিয়া ধুইতে হইব এই কথা জাতীয় টিভিতে দুইবেলা ডকুমেন্টারি দেখায়া শিখাইতে হয় সেই জাতির তুলনামূলক শিক্ষিত অংশেও নারীবাদ প্রচার করা মুশকিলের কাজ।

dola-7

নভেরার প্রথম শোয়ের পরে আমি মুমু সুরভী কেয়া গায়ত্রী আর রাজিবের সঙ্গে দোলা, কারো একটা মোবাইলে তোলা সেলফি।—লেখক

আমি আনন্দিত যে দোলা সেই ‘মহান’ দায়িত্ব কান্ধে তুইলা নেয় নাই। সে শিল্পী নভেরার ব্যক্তিগত জীবনের দিকে কম মনোযোগ দিয়া তার কাজ এবং কাজ নিয়া তার যে প্যাশন ছিল সেইটাই দেখাইতে চাইছে। শিল্পী নভেরার যাত্রায় তিনি নারী হিসেবে যা মোকাবিলা করছেন সেই সকল প্রতিবন্ধকতার কথা কিছু আসছিল কিন্তু সেইটাও খুবই ম্যাটার অফ ফ্যাক্ট ভাবে।

দোলার ‘নভেরা’র আগামী শোগুলা আপনারাও দেখেন। আমিও ‘নভেরা’র দোলারে আবার দেখতে যাইবার আশা রাখি।

About Author

উম্মে ফারহানা

জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক। ইংরেজি সাহিত্য পড়ান। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়েছেন ২০০৩ থেকে ২০০৯ পর্যন্ত। জন্ম ময়মনসিংহ শহরে, ৬ অক্টোবর ১৯৮২। প্রকাশিত গল্পগ্রস্থ: দীপাবলি। shahitya.com-এ ধারাবাহিক উপন্যাস লিখছেন: লৌহিত্যের ধারে।