page contents
লাইফস্টাইল, সংস্কৃতি ও বিশ্ব

ধনী হওয়ার বিজ্ঞান (২)

(আগের পর্ব)

অধ্যায় ২

ধনী হওয়ার একটা বিজ্ঞান আছে

ধনী হওয়ার একটা বিজ্ঞান আছে। পাটিগণিত বা বীজগণিতের মতই সুনির্দিষ্ট এই বিজ্ঞান। কিছু নির্দিষ্ট নিয়ম টাকা কামানোর পদ্ধতিকে নিয়ন্ত্রণ করে; আর সেই নিয়মগুলি ভালোমত জেনে সেই অনুযায়ী কাজ করতে পারলেই আপনার ধনী হওয়ার ব্যাপারে একেবারে গাণিতিক নিশ্চয়তা দেওয়া সম্ভব।

টাকা কামানো ও সম্পদ জমানো একজন মানুষের ‘কাজ করার ধরন’-এর উপর নির্ভর করে। যারা এই ‘নির্দিষ্ট ধরন’ অনুযায়ী কাজ করে, তাদের ধনী হওয়ার উদ্দেশ্য থাকুক বা না-ই থাকুক, তারা ধনী হতে বাধ্য। অন্য দিকে টাকা কামানোর আশায় এই ‘নির্দিষ্ট ধরন’ এর বাইরে থেকে দিনরাত কঠোর পরিশ্রম করলেও আপনি ধনী হতে পারবেন না।

প্রকৃতির নিয়ম বলে, যে কোনো ক্রিয়া তার অনুরূপ প্রতিক্রিয়ার জন্ম দেয়। অতএব, যারা এই নির্দিষ্ট ধারায় তাদের সমস্ত কাজ করার পদ্ধতি শিখতে পারবেন, তাদের ধনী হওয়া কেউ ঠেকাতে পারবে না।
নিচের ঘটনাগুলি লক্ষ করলেই উপরের বক্তব্যটির সত্যতা যাচাই করা সম্ভব হবে:

ধনী হওয়া কোনো নির্দিষ্ট পরিবেশের উপর নির্ভর করে না। যদি তা-ই হতো, তাহলে কোনো এলাকার সবাই ধনী হতো আর অন্য একটা এলাকার সবাই হতো গরীব। কোনো কোনো শহরের সব বাসিন্দার কাছেই যথেষ্ট টাকা থাকত, আর অন্যদিকে কোনো শহরের সবাই থাকত দারিদ্রে।


ধনী হওয়ার বিজ্ঞান

ওয়ালেস ডি ওয়াটলস

অনুবাদ: আয়মান আসিব স্বাধীন


কিন্তু সমাজের সব স্থানেই ধনী-গরীব পাশাপাশি বাস করে। কখনো কখনো দেখা যায় তারা একই পরিবেশে, একই রকম পেশায় রয়েছে। যখন একই এলাকার দুইজন লোক একই রকম কাজের মধ্যে থাকার পরও একজন ধনী হয়ে যায় ও অন্যজন গরীবই থাকে—তখন ব্যাপারটা স্পষ্ট হয় যে, ধনী হওয়ার সাথে প্রাথমিকভাবে পরিবেশের কোনো সম্পর্ক নাই। হ্যাঁ, কিছু কিছু পরিবেশ তুলনামূলকভাবে টাকা কামাইয়ের ব্যাপারে সুবিধাজনক হতে পারে, কিন্তু দুইজন ব্যক্তি একই এলাকায় থেকে একই রকম কাজ করার পরও যখন একজন ধনী হয়ে যায় আর অন্যজন পারে না, তখন বুঝতে হবে যে, একটা ‘নির্দিষ্ট ধরন’ মেনে কাজ করার মাধ্যমেই কেবল মানুষ ধনী হতে পারে।

আর তাছাড়া, এই ‘নির্দিষ্ট ধরন’ অনুযায়ী কাজ করার জন্য আপনার কোনো প্রতিভার দরকার নাই। কারণ অনেক প্রতিভাবান মানুষই সারাজীবন গরীব থেকে যায়, অন্যদিকে অনেকেই এমন আছে যাদের প্রতিভার ব্যাপারে ঘাটতি থাকার পরও তারা প্রচুর টাকা কামাই করে।

এই ধনী ব্যক্তিদের ভালো মত পর্যবেক্ষণ করলে দেখা যায়, তারা সবদিক থেকেই আপনার আমার মত সাধারণ মানুষ। তাদের কোনো অতিমানবীয় ক্ষমতা বা প্রতিভা নেই। কাজেই এটা স্পষ্ট যে তারা অন্য সব মানুষের চাইতে বেশি প্রতিভাবান বা ক্ষমতাশালী বলেই তারা ধনী হন নি, বরং সেই ‘নির্দিষ্ট ধরনে’ তাদের কাজগুলি করেছিলেন বলেই তারা ধনী হতে পেরেছেন।

শুধু হিসাব করে খরচ করলেই যে আপনি ধনী হয়ে যাবেন তা না। অনেক মিতব্যয়ী মানুষ এখনও গরীবই রয়ে গেছে, আবার অনেক বেহিসাবি খরুচে লোকও ধনী হয়ে যায়।

অন্য লোকেরা যেসব কাজ করতে পারে নি, সেই কাজগুলি করতে পারার সাথেও ধনী হওয়ার সম্পর্ক নাই। কারণ দুইজন মানুষ যখন একই পেশায় থাকে, তারা বেশিরভাগ ক্ষেত্রে ঠিক একই রকম কাজ করার পরও অনেক সময় দেখা যায়, একজন ধনী হয় কিন্তু আরেকজন হয় না।

কাজেই আমরা এই সিদ্ধান্তে আসতে পারি যে, একটা ‘নির্দিষ্ট ধরন’ মেনে কাজ করার মাধ্যমেই আপনার ধনী হওয়ার নিশ্চয়তা দেওয়া যায়।

এখন ধনী হওয়া যদি কোন ‘নির্দিষ্ট ধরন’ অনুযায়ী কাজ করার উপর নির্ভর করে, আর প্রতিটি ক্রিয়াই যদি তার অনুরূপ প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি করে, তাহলে গোটা বিষয়টাকেই সুনির্দিষ্ট বিজ্ঞানের আওতায় নিয়ে আসা যাচ্ছে।

প্রশ্ন উঠতে পারে—এই ‘নির্দিষ্ট ধরনে’ কাজ করা এতটাই কঠিন কিনা যে শুধু অল্প কিছু ব্যক্তির পক্ষেই তা মেনে চলা সম্ভব। সব মানুষের সামর্থ্যের কথা বিবেচনা করলে, এ রকম হওয়ার কোনো সম্ভাবনাই নাই। কারণ প্রতিভাবান মানুষেরাও ধনী হয়, যারা স্থূলবুদ্ধির তারাও ধনী হয়; বুদ্ধিমান লোকদেরকেও প্রচুর কামাই করতে দেখা যায়, যারা নির্বোধ তারাও অনেক টাকা কামায়। যারা শারীরিকভাবে শক্তিশালী আর যারা অসুস্থ দুর্বল—এই দুই দলেই ধনীদের অভাব নাই।

হ্যাঁ, একটা নির্দিষ্ট পর্যায়ের সামর্থ্য ও বোধশক্তির দরকার আছে। তবে যারা ন্যূনতম এই লেখাগুলি পড়তে ও বুঝতে পারেন—তারা সবাই ধনী হওয়ার সুযোগ পাবেন।

সেই সাথে আমরা এটাও দেখলাম যে পরিবেশের সাথেও ধনী হওয়ার সম্পর্ক নাই। পরিবেশের কিছু প্রভাব অবশ্যই আছে, যেমন আপনি সাহারা মরুভূমিতে বসে বসে নিশ্চয়ই ব্যবসায় সাফল্য আশা করতে পারেন না।

ধনী হওয়ার জন্য মানুষের সাথে একসাথে কাজ করার দরকার পড়ে। ফলে আপনাকে এমন জায়গায় থাকতে হবে যেখানে সম্পর্ক স্থাপনের উপযুক্ত মানুষ আছে। আর আপনি যেভাবে কাজ করতে চান, তারাও যদি একই ভাবে আপনার সাথে কাজ করতে চায়—তাহলে তো কথাই নাই। কিন্তু পরিবেশের প্রভাব এই পর্যন্তই।

আপনার শহর বা রাজ্যের অন্য কেউ যদি ধনী হতে পারে, তাহলে আপনিও পারবেন।

আবারও বলছি, ধনী হওয়ার জন্য আপনার কোনো নির্দিষ্ট পেশা বা ব্যবসা বেছে নিতে হবে না। যে কোনো পেশা, যে কোনো ব্যবসাতেই আপনি ধনী হতে পারবেন। অথচ আপনার পাশের বাসার লোকজন একই রকম কাজের মধ্যে থেকেও দারিদ্র কাটাতে পারে না।

আপনি যে কাজ করতে পছন্দ করেন বা যে পেশা আপনার অনুকূলে, সেখানেই আপনার সর্বোচ্চ উন্নতি করার সুযোগ থাকে—এটাও ঠিক। আপনার যদি নির্দিষ্ট কিছু প্রতিভা থাকে, তবে যে ব্যবসা বা পেশায় আপনার সেই প্রতিভা কাজে আসবে, সেখানে যাওয়াই আপনার জন্য সুবিধাজনক হবে।

আবার যেসব ব্যবসা আপনার এলাকার উপযোগী, সেগুলিতে ভালো করার সুযোগ থাকে বেশি। যেমন গ্রিনল্যান্ডের বদলে কোনো গরম অঞ্চলে আইসক্রিমের দোকান দিলে সেখানে বেচাকেনার সম্ভাবনা বেশি থাকবে। আবার সালমোন মাছের চাষ ফ্লোরিডায় না করে নর্থওয়েস্টে করাই বুদ্ধিমানের কাজ। কারণ ফ্লোরিডায় সালমোন পাওয়াই যায় না।

এসব সাধারণ সীমাবদ্ধতার কথা বাদ দিলে, কোনো নির্দিষ্ট পেশা বা ব্যবসায় যুক্ত হলেই ধনী হওয়ার সুযোগ আসে না। বরং সেই সুযোগ আসে ‘নির্দিষ্ট ধরনে’ কাজ করার মাধ্যমে। আপনার এলাকার একজন লোক আপনার সাথে একই রকম কাজের মধ্যে থেকেও তিনি ধনী হয়ে যাচ্ছেন, অথচ আপনি পারছেন না—তার মানে তিনি যে ‘ধরন’ মেনে তার কাজগুলি করছেন, আপনি সেইভাবে করছেন না।

মূলধনের অভাবে কারো ধনী হওয়া আটকে যায় না। হ্যাঁ, মূলধন থাকলে আয় করা আরো সহজ ও দ্রুত হয়। কিন্তু যার মূলধন আছে, সে তো এমনিতেই ধনী। তার ধনী হওয়ার পদ্ধতি জানার কোনো প্রয়োজন নাই। আপনি যতই গরীব হন না কেন, যদি সব কাজ এই ‘নির্দিষ্ট ধরনে’ করতে শুরু করেন, আপনি ধনী হওয়া শুরু করবেন; ধীরে ধীরে আপনার মূলধন আসবে। ধনী হওয়ার যে প্রক্রিয়া, মূলধন পাওয়া সেই প্রক্রিয়ারই একটা অংশ। আপনি হয়তো আপনার মহাদেশের সবচেয়ে গরীব লোক, চারিদিকে অনেক ঋণ জমে গেছে; প্রতিপত্তি, সম্পত্তি, বন্ধু—এর কোনোটাই আপনার নাই। কিন্তু আপনি যদি এই পদ্ধতি মেনে আপনার সব কাজ শুরু করে দেন, তাহলে ধনী হওয়া শুধু সময়ের ব্যাপার। কারণ সব ক্রিয়াই অনুরূপ প্রতিক্রিয়ার জন্ম দেয়। মূলধন না থাকলে তা জোগাড় হয়ে যাবে; ভুল কাজে থাকলে ঠিক কাজের মধ্যে আসবেন; যদি ভুল এলাকায় থাকেন, তাহলে ঠিক এলাকায় চলে যাবেন; এর সবই সম্ভব হবে আপনার বর্তমান পেশা ও বর্তমান এলাকার মধ্যে থেকেই। আর ‘নির্দিষ্ট ধরন’ মেনে কাজ শুরু করে দিলেই সেই সাফল্য আসবে।

(চলবে)

About Author

আয়মান আসিব স্বাধীন
আয়মান আসিব স্বাধীন

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ডেভেলপমেন্ট স্টাডিজ বিভাগে পড়াশোনা করছেন। বই : সিনে-লয়েড (২০১৭, চৈতন্য)