নওরীন

0
16
শেয়ার করুন!

মানবিকে আমরা স্টুডেন্ট ছিলাম মোট সাতাশি জন‌। দুই বারে স্টুডেন্ট ভর্তি হওয়ায় প্রথম বারে পঁয়ষট্টি জন ভর্তি হইছে এরপরের বারে বাকিরা।

আমরা যারা প্রথম দফায় ভর্তি হইছি তাদের দেইখা স‍্যার-ম‍্যাডারা বললেন আমাদের ভাগ্য ভাল যেহেতু আমরা ক্লাস বেশি পাইতেছি। কিন্তু তখনও আমরা বেশিরভাগ বইই পাই নাই। তাই ক্লাসে টুকটাক পড়ানো হইলে টিচাররা কে কী পারে জাইনা, স্টেজে (স‍্যাররা যেখানে দাঁড়াইয়া লেকচার দিতেন) গিয়া তা করতে বলতেন। সব টিচাররা অবশ্য না, কয়েকজন প্রথম থেকেই খালি পড়াইতেন। আর বলতেন যেন তাড়াতাড়ি বই কিনি আর না হয় পুরাতন বই জোগাড় করি।

তো ক্লাস যখন ভাল কইরা শুরু হয় নাই, তখন বেশিরভাগ সময় ক্লাস টাইম এমন বিভিন্ন কিছু কইরা কইরাই পার হইত। সুখি বেশিরভাগ সময় কৌতুক বলত আর অভিনয় করত কৌতুকের সাথে। আর যারা স্টেজে উঠত, বেশির ভাগই গান গাইত। একদিন মীম গান গাইতেছিল, আর ওই গানটা আমিও পারি বইলা বেঞ্চে বইসাই অল্প অল্প ঠোঁট নাড়তেছিলাম। এরপর যখন মীমের গান শেষ হইল, তখন স‍্যার বললেন, “এইবার শৈলী আসো, মীমের সাথে তুমিও গান গাইতেছিলা, মানে তুমিও গান জানো। এখন আমাদেরকে গান শুনাও।”

কোনো রকমে একটা গান গাইয়া ওইদিন স্টেজ থেকে নাইমা পরলাম। এরপর থেকে ঠোঁট যেন কখনো না নড়ে তা নিয়া সবসময় তটস্থ হইয়া থাকতাম।

এইভাবে কম চাপ, কম পড়াশোনা কইরা অনেকদিন কাটল। আর ততদিনে ক্লাসের সবাই সবার মত বন্ধু-বান্ধব বানায় ফেলছে। আর আমার সবার সাথেই কথা হয়, বিশেষ কোনো বন্ধু নাই। একেকদিন একেক জনের সাথে বসি, গল্প করি, এমন কইরা নওরীনের সাথেও বসি।

তখন সবাই জানে কে কী পারে, কার কীসে আগ্রহ ইত‍্যাদি ইত‍্যাদি। তখন নওরীনরে দেখলাম যে সে গান গাইতে পারে আর ডাকলে স্টেজে উইঠা গান শোনায়ও। নওরীন সবসময় রবীন্দ্র সঙ্গীত গায় আর ওর কণ্ঠও অনেক সুন্দর।

তো নওরীনের সাথে যখন বসতাম, দেখতাম ও অনেক গানই ভুল সুরে গায়। সুর ঠিক করার চেষ্টাও নাই। ইন্টারনেটে রবীন্দ্র সঙ্গীত শুনার জন্য বসলেও, নতুন হিন্দি গান শুনতে শুনতে তারই রিহার্সাল করতে থাকে, হিন্দি গান থেকে নাচেরও প্র‍্যাকটিস করে আর এরপর রবীন্দ্র সঙ্গীতের কথা ভুইলা যায়।

এরপর নওরীনের সাথে আমার যখন বেশ সখ্য হইছে তখন বললাম, “তুমি গান শিখো?”

“না।”

“কেন শিখো না?”

“গান শিখব কেন, মানে আমি তো এমনিই গাই।”

“তা তো গাওই, কিন্তু শিখতে তো দোষ নাই।”

এরপর থেকে আমি প্রায়ই নওরীনরে বলতে শুরু করলাম যে সে কেন গান শিখে না? তার কণ্ঠ এত ভালো, শিখা তারে আরো ভালো করতে কী সমস্যা?

কিছুদিন পর মনে হইল নওরীনেরও গান শিখার ইচ্ছা আছে। তখন আমি বেশ আগ্রহ নিয়াই বললাম যে আমার পরিচিত স‍্যার আছে গান শিখায় আর এখানে গানের একটা ছোট ইন্সটিটিউটও আছে, সে ওইখানে শিখতে চাইলে আমি অ্যাড্রেসও জোগাড় কইরা দিতে পারব।

তখন নওরীন বলল, “আমার বাসায় দিবে না, মানে গান টান শিখা, এগুলা তো নাই আমাদের ফ‍্যামিলিতে। আমার আব্বু অনেক ধার্মিক। আমরা কেউ গান শিখব, এমন কথা কখনো বাসায় তোলার কথা ভাবতেও পারি না।”

তখন নওরীনের মনও খারাপ হইত কারণ ততদিনে তার শিখার ইচ্ছা আরো বাড়ছে, কিন্তু এই প্রস্তাব যে সে বাবার কাছে তুলতেও পারবে না তাও বুঝতে পারছে। তাই আমিও আর কিছু বলতাম না।

কিন্তু গান শিখার ব‍্যাপার ছাড়াও নওরীনের পরিবার যে যথেষ্টই কনজারভেটিভ আর অদ্ভুত এইটা বুঝতে পারলাম ওর বাসায় গিয়া।

ওর বাসায় আমরা কয়েকজন বান্ধবী গেলাম একবার এমনিতেই। ওর রুমেই বইসা আছি। আবার মাঝে মাঝে বাইরও হইতেছি। তখন নওরীন বারান্দায় কাপড় আনতে গেছে আর আমাদের বান্ধবী মুনতাহাও নওরীনের সাথে গেছে। তখন নওরীনের ভাই ওরে বাহির থেকে দেইখা ঘরে আইসা সরাসরি বারান্দায় গিয়াই ওরে বকাঝকা শুরু কইরা দিছে যে সে তো জানে যে তাদের বারান্দা থেকে ছেলেদের জিম দেখা যায়, তাইলে কেন সে বারান্দায় গেছে!

নওরীন বলল যে সে কাপড় আনতে গেছে। তখন ওর ভাই বলে বাসায় কাপড় আনার মানুষের অভাব নাই। তার কাপড় আনা লাগবে না।

এইসব বইলা ওর ভাই গট গট কইরা গেল গা। আর আমরা দরজা জানালা লাগাইয়া বইসা থাকলাম।

এমনিতে নওরীন পর্দা করত, নামাজ পড়ত, বাসার চাপেও থাকত কিন্তু কলেজের অনুষ্ঠানে মাঝে মাঝে কিছু করতও। কখনো কখনো পারমিশন পাইত এইগুলা করার আবার কখনো পাইত না, একবার পিকনিকে যাইতে দিত ওরে বাসা থেকে আরেকবার দিত না। এক বছর নবীন বরণে নাচতে দিলে হয়ত পরের বছর পিকনিকে আর নাচতে দিত না।

তো কলেজের শেষ দিন, তার পরদিনই বিদায়, তখন আগের দিন রেজাল্ট কার্ড আর এইচএসসির প্রবেশপত্র নিতে কলেজে গেছি, কোনো ক্লাসটাসও নাই। সবাই যার যার মত বসছে। আমি, নওরীন, মুমু, অণু সবাই একসাথে বসছি, তখন মুমু হঠাৎ নওরীনরে বলল, “তোরে তো মনে হয়, এইচএসসির পরই বিয়া দিয়া দিবে, না?”

“হ রে, আমারে মনে হয় বিয়া দিয়া দিবে। মনে হয় না, দিয়াই দিবে।”

নওরীন এমন ক্লান্ত ভাবে হাইসা বলল কথাগুলি যে সবাই খুব অবাক হইয়া হাসাহাসি করল যেন নওরীনের বিয়া হবে, এইটা সে নিজে তো জানেই কিন্তু তার কোনো হ‍্যাঁ নাই, না-ও নাই, কারণ এইগুলা থাইকা তার কোনো লাভ নাই। সে মাইনা নিছে। তখন মুমু বলল যে আকাশ নাকি নওরীনরে এখনো অনেক পছন্দ করে।

নওরীনও তখন অবাক হইয়া বলল, এখনো পছন্দ করে!

আকাশরে যেহেতু আমরা কেউ চিনি না, খালি মুমু আর নওরীনই চিনে তাই কিছুই বুঝতে পারলাম না।

তখন নওরীন বলল, আকাশ নাকি মুমুর বয়ফ্রেন্ড, রিফাতের কাজিন। নওরীনের সাথে ফেইসবুকে কথা হইত, দেখাও হইছে ওদের। আকাশ নওরীনরে পছন্দ করে, প্রেমও করতে চায়। কিন্তু নওরীনের ফ‍্যামিলি থেকে কখনো মানবে না বা বিয়া দিবে না বুঝতে পাইরা প্রেমের ইচ্ছা বাদ দিছে। কিন্তু এখনো পছন্দ করে।

মুমু বলল, ফার্স্ট ইয়ারে থাকার সময় থেকেই নাকি পছন্দ করে আর মুমুর সাথে দেখা হইলেই নাকি নওরীনের কথা জিজ্ঞাস করে।

তখন আমি বললাম, বিয়া যখন তোমারে দিয়াই দিবে তাইলে যে পছন্দ করে তার সাথে দিলেই তো পারে, আকাশের সাথে বিয়া দিয়া দিক, তাইলেই তো হয়।

নওরীন বলল যে, আকাশ মাত্র ইউনিভার্সিটিতে পড়তেছে, তারে তো আর স্টুডেন্টের কাছে বিয়া দিবে না, চাকরি করে এমন ছেলের কাছেই বিয়া দিবে, ওর বড় বোনরেও পড়ার সময়ই বিয়া দিয়া দিছে চাকরি করে এমন ছেলের সাথে। তাই আকাশের সাথে বিয়ার কোনো সম্ভাবনা নাই। কিন্তু নওরীনও খুশি হইত যদি আকাশের সাথে ওর বিয়া হইত, যেহেতু ওর কোনো পছন্দ অপছন্দই নাই তাইলে ওরে যে পছন্দ করে আগে থেকেই, তার সাথে বিয়া হওয়াই ভাল, অন‍্য ছেলে তো আকাশের মতো তারে ভাল না-ও বাসতে পারে।

পড়ুন: শৈলী নাসরিনের আরো লেখা

এইসব কথা বলতে বলতে নওরীন বেঞ্চে মাথা রাইখা ঘুমায় পড়ল।

পরের দিন অর্থাৎ বিদায়ের দিন কলেজে যাইয়া দেখি, আমি আর নওরীন দুইজনই বেগুনি রঙের জামা পইরা আসছি। নওরীনেরটা গাউন, আর আমারটা সালোয়ার কামিজ। নওরীন গাউনের উপর দিয়া সুন্দর হিজাবও পরছে বেগুনি রঙের। আমার ফোনের ক্যামেরা ভাল বইলা আমার ফোন দিয়া সে সব ছবি তুলল। গ্রুপ ছবি তুলল আবার একলাও তুলল।

ছবি তুলতে তুলতে নওরীন‌ মনে হয় আকাশের কথা, ওরে বিয়া দিয়া দেওয়ার কথা, গান না শিখতে দেওয়ার কথা, বারান্দায় যাইতে না দেওয়ার কথা সবই ভুইলা গেল।

এরপরও অনেক দিন ছিল আমার কাছে ওই ছবিগুলা।

পরীক্ষা শেষ হওয়ার পর নওরীনের সাথে একদিন কথা হইল। ও বলল, ওর নাকি বিয়া হইছে ওর ভাইয়ার বন্ধুর সাথে। ছেলে ব‍্যাংকে চাকরি করে। সে খুব খুশি কারণ তার শ্বশুর বাড়ি থেকে বাবার বাড়ি কাছেই। এরপর বলল, বিয়ার সময় অনেক ছবি তোলা হইছে, সেইগুলা পাঠাবে।

কিন্তু আগের ওই ছবিগুলা তো এখন আর নাই। থাকলে নিশ্চয়ই আমি আজকে নওরীনের ছবি দেখাইতে পারতাম।

কমেন্ট করুন

মন্তব্য

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here