page contents
লাইফস্টাইল, সংস্কৃতি ও বিশ্ব

নামের সুখদুঃখ

বাবার দেয়া নামের শুরুতে ছিল এ, এইচ, এম। পুরোটা বর্ননা করলে পৃথিবীর কোনো ফর্মে আমার পুরো নাম লেখার স্থান সংকুলান হত না। স্কুলের স্যারেরা নিজেদের মন মত বাবা সেজে আমার মত লক্ষ কোটি বাঙালীর আসল জন্মতারিখ বদলে দিয়ে সবাইকে নিউইয়ার্স বেইবি বানিয়ে দিয়েছিল ,যার কারণে আমেরিকায় বসে আশেপাশে পরিচিত সবার জন্মতারিখ শুনি জানুয়ারির এক তারিখে।

লম্বা নামের যন্ত্রণা থেকে মুক্তি পেতে প্রথম পাসপোর্ট বানানোর সময় নামের আগে এ, এইচ, এম ছেঁটে দিয়ে শুধু ‘এম, ডি’ ( মোহাম্মদের সংক্ষেপ ) লাগিয়ে দিলাম। না বুঝে আবারো বোকামি করলাম। দেশে থাকলে এটা ঠিক ছিল। কিন্তু বিদেশে এসে সমস্যায় পড়ে গেলাম। নাহ, তখন আমি মুসলমান, এজন্য কোনো সমস্যা হত নাই। সমস্যা হয়েছে, এই দেশে শুধু চিকিৎসকদের এম, ডি ( ডক্টর অফ মেডিসিন ) বলা হয়। ওরা নামের পাশে লেখে এম, ডি। আমি তো সেটা না। কিন্তু আমার নামের আগে এম, ডি দেখে সবাই আমাকে জিজ্ঞেস করে বসত ,আমি ডাক্তার কিনা। নাক কান মলে বলতাম, নারে ভাই ,আমি ওসব কিছু না। ওটা আসলে মোহাম্মদ নামের সারসংক্ষেপ মাত্র।

এবার শুনুন এম, ডি লেখায় কী উপকার পেয়েছিলাম। নব্বই দশকের শুরুর দিকে আমেরিকায় বসে বাংলাদেশে প্রেম করতাম টেলিফোনে, যিনি পরবর্তীতে আমার স্ত্রী হয়েছেন দয়া করে তার সাথে। ফোন কার্ড ছিল না। ইন্টারনেট ছিল না। ভরসা ছিল চড়া মূল্যের সরাসরি ডায়ালিং ব্যবস্থা। প্রতি মিনিটে খরচ হত তিন চার ডলারের মত। আয় রোজগার যা হত পুরো সপ্তাহ পরিশ্রম করে ,তার পুরোটাই হয়ত এক রাতের ফোনের বিলে খরচ হয়ে যেত। বিলের মাত্রা ছাড়িয়ে গেলে ফোন লাইন কেটে দেয়ার হুমকি আসত কোম্পানি থেকে।

একদিন ফোন কোম্পানি থেকে ফোন এলো আমার কাছে।

কথা শুরু হয় এভাবে: ডাক্তার হাই, তোমার কি বিদেশেও রোগী আছে নাকি! অনেক কল করো বিদেশে।

প্রথমে থতমত খেয়ে গেলেও বাঙালী বুদ্ধি দিয়ে মুহূর্তে নিজেকে সামলে নিয়ে ঘটনা বুঝে গেলাম। আমার নামের আগে ঐ যাদুকরি ‘এম, ডি’ লেখা দেখে ওরা ধরে নিয়েছে আমি একজন ডাক্তার। বিদেশেও আমার রোগী আছে যাদের সাথে আমি ফোনে কথা বলি। আর সেজন্যই আমার ফোন বিল অনেক বেশি হয়ে যায়।

ওদের কথার উত্তরে আমি খুব ভাব নিয়ে শুধু ‘হুম’ বললাম। বেশি কথা বাড়ালাম না। কিন্তু কাজ হয়ে গেল। এরপর থেকে আর আমার ফোনের লাইন কাটে নাই কখনো।

ফোন কোম্পানির কাছে ডাক্তার সাজলেও কাজের যায়গায়, অফিস আদালতে কাগজপত্র ফিল আপ করতে গিয়ে এম, ডি’র অর্থ ওদের খুলে বলতে হত। দেখা যেত এক রুমের ভিতর আমার মত মানুষ অনেক। এদেশে সবাইকে প্রথম নাম ধরে ডাকে। তাই যখন ‘মোহামেদ’ বলে ডাক দিত, দেখা যেত একসাথে পাঁচ সাতজন উঠে এগিয়ে আসত। এদের ভিতর কেউ বাঙালী, কেউ পাকিস্তানি, কেউ আফ্রিকান। কী মুসিবত রে বাবা! সবাই নাকি মোহামেদ। সে এক যন্ত্রণা ছিল। মুক্তি পেতে যখন নাগরিক হওয়ার ডাক এলো, দেখি নাম সংশোধন করার সুবিধা আছে। অনেকের মত আমি আমার পৈত্রিক বাঙালী মুসলিম নাম বাদ দেই নাই কিংবা সাথে একটা ইংরেজি নাম যোগ করি নাই। শুধু নামের শুরু থেকে ‘এম, ডি’ ছেঁটে ফেলে দিয়েছি। ঝামেলা শেষ। এরপর আর কোনো ঝামেলা হয় নাই কখনো কোথাও।

এত বছর পর ডোনাল্ড ট্রাম্পের মুসলিম ব্যানের কারণে এয়ারপোর্টগুলিতে নামের কারণে অনেক মানুষ হেনস্থার সম্মুখীন হচ্ছে খামোকাই। এই তো গতকাল বিশ্ব বিখ্যাত হেভিওয়েট বক্সিং চ্যাম্পিয়ন মোহাম্মদ আলির ছেলে অন্য দেশ থেকে বেড়িয়ে আমেরিকায় ফিরে এলে তাকে ইমিগ্রেশনে আটক করে জেরা করা হয়। কারন তার নামও মোহাম্মদ আলি। তিনি এই দেশে শুধু জন্মই নেন নাই, জন্ম নিয়েছেন মোহাম্মদ আলির ঔরসে। সেই মানুষ যদি এমন যন্ত্রণার শিকার হন, তাহলে আমি আর আপনি কোন ছার!

গ্রিনকার্ড নিয়ে কারো এখন আন্তর্জাতিক ভ্রমণে যাওয়া বিপদজনক হয়ে যেতে পারে। পাসপোর্ট থাকলেও একান্ত জীবন মরণ সমস্যা না হলে ভ্রমণ না করাই ভাল কিছুদিনের জন্য। এমন অচলাবস্থা তো আর স্থায়ী কিছু হতে পারে না, এটা সবাই বুঝি। ধৈর্য্য ধরতে হবে। আপাতত ঘাপটি মেরে পড়ে থাকাই ভাল।

মায়া লাগছে ,এয়ারলাইন্সগুলির জন্য। প্রায় খালি যাচ্ছে সব ফ্লাইট। বাঙালীরা কাজে-অকাজে সুযোগ পেলেই আট দশটা স্যুটকেইস বোঝাই মালামাল নিয়ে দেশে যায়। এটা এখন কমেছে। তাই বিমান কোম্পানিগুলির বেচাকিনি কম। টিকেটের দাম অনেক কম এখন। কিন্তু লোভে পাপ, পাপে মৃত্যু—এটা মনে রেখে চলাই ভাল।

About Author

মুরাদ হাই
মুরাদ হাই

জন্ম হাতিয়ায়। ১৯৬০ সালের ৯ অক্টোবর। ১৯৭৯ থেকে ১৯৮৫ সাল পর্যন্ত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র ছিলেন। পড়তেন মার্কেটিং বিভাগে। থাকতেন সূর্যসেন হলে। ১৯৮৯ সালে পাড়ি জমান নিউইয়র্কে। সে অবধি সেখানেই আছেন। দুই ছেলে রেশাদ ও রায়ান ছাত্র, স্ত্রী রাজিয়া সুলতানা স্কুলের শিক্ষিকা।