page contents
Breaking News

নায়লা

১.
এইচএসসি পরীক্ষা শেষ হওয়ার পর আব্বু আম্মু আমারে না জানাইয়াই ভর্তি করায়া দিল কোচিংয়ে। কিন্তু যেই কোচিংয়ে ভর্তি করাইল সেখানে আমার কলেজের কোনো বন্ধু নাই। তারা অন্য কোচিংয়ে ভর্তি হইছে। এইখানে তাই আমি একা একাই কোচিং শুরু করলাম।

কোচিংয়ে কোনো বন্ধু না থাকাতে সমস্যা হইল কিছু। একদিন কোচিং মিস হইলে পরে আর পড়া বুঝতে পারি না। আর কোচিং এমনিতে ভালোও লাগে না বেশি। সব মিলায়া কয়দিন ক্লাসের পরই বিরক্ত হইয়া পড়লাম।

তখন একদিন কোচিং শেষ কইরা সিঁড়ি দিয়া নামার সময় দেখি আমার স্কুলের বন্ধুরা। তন্ময়, অন‍্যন। অনেকদিন পর সবাই সবাইরে দেইখা খুশি হইয়া গেলাম।

এইখানে আমরা সবাই যদিও একই কোচিংয়ে ভর্তি হইছি কিন্তু তন্ময় আর অন‍্যন বারোটার ব‍্যাচে ভর্তি হইছে আর আমি দশটার ব‍্যাচে। আমারে তখন ওরা বললো বারোটার ব‍্যাচে চইলা আসতে। আমারও যখন ওই ব‍্যাচে কোনো বন্ধু নাই তাই আমিও ব‍্যাচ চেইঞ্জ কইরা বারোটায় শিফট হইয়া গেলাম।

কোচিং করতে অন‍্যন, তন্ময়, আমার কারোরই বেশি ভালো লাগে না। তাই আমরা বেশি সময় ঘুরাঘুরিই করি। কোচিং শেষ কইরা এদিক সেদিক যাই। যাত্রাবাড়ীর জ্যাম ঠেইলা ঘুরাঘুরি সম্ভব না। তাই ফ্লাইওভার দিয়া চইলা যাই হয় শহরের দিকে নয় সোনারগাঁওয়ের দিকে।

সোনারগাঁওর রাস্তা ভাল আর রাস্তার দুইপাশে গাছও আছে। শীতলক্ষ্যা নদী পার হওয়ার পর রাস্তার থেকে একটু নিচে ভাসমান রেস্টুরেন্ট। ওই রেস্টুরেন্টে হরিণ থাকে। মাঝে মাঝে রাস্তা থেকেও হরিণ দেখা যায়। দুই তিন সপ্তাহ টানা ঘুরাঘুরির পর দেখা গেল সোনারগাঁওয়ের আশেপাশের প্রায় সবই ঘুরা শেষ।

এখন কই যাবো? অন‍্যন চায় আমারে নিয়া শাহবাগ, টিএসসি যাইতে। কারণ ওর বাসা‌ ওই দিকে, তাই অনেক কিছু চিনে। ঘুরানোর জায়গারও অভাব নাই। কিন্তু টিএসসি এত গিজ গিজ করে মানুষে যে আমার দাঁড়াইতেই ইচ্ছা করে না।

এরপর একদিন আমি আর অন‍্যন রিকশা কইরা ঘুরতে আর খাইতে গেছি পুরান ঢাকার ওইদিকে। কী সব স্পেশাল খাবার পাওয়া যায়। সেইসব টেস্ট করাইতে অন‍্যন আমারে চানখারপুল নিয়া আসছে। রিকশা কইরা আসার পর আমরা অর্ধেক অর্ধেক কইরা ভাড়া দিয়া দিলাম। কিন্তু সেইখানে যাইয়া কাবাব, নান রুটি আরও অনেক খাওয়া দাওয়ার পর অন‍্যন সব বিল একা দিতে চাইলো।

আমি তখনই ‘না’ ‘না’ শুরু কইরা দিলাম। এক বিষয় নিয়া প্রতিদিন ঝগড়া করতে আমার ভালো লাগে না। রিকশার ব‍্যাপারে আমি অর্ধেক টাকা যেহেতু দেই, নয়তো রিকশায়ই যাই না, তাইলে এইখানেও একই হবে। এই রকম করলে অন‍্যনের সাথে আমি আর খাইতে আসব না।

এরপর অন‍্যন আমারে অনেক সরি টরি বলল। কিন্তু আমি তার সাথে এক রিকশায় যাবো না ঠিক করলাম, অন্তত সেইদিন। কিন্তু ততক্ষণে সন্ধ্যা হইয়া গেছে, এই সন্ধ্যার সময় আমারে সে একলা ছাড়বেও না। তাই অন‍্যনরে আমার রিকশায় নেওয়াই লাগলো। পুরান ঢাকার অলি গলি রাস্তাঘাট শেষ কইরা বাসায় ফিরতেও আমাদের দেরি হইলো।

পরের দিন কোচিংয়ে যাইতে আমার দেরি হইলো একটু। ক্লাস করানোর সময় রনি স্যার আমারে আর অন্যনরে খোঁজ করলেন আর বললেন ক্লাস শেষ হওয়ার পর অফিস রুমে যেন দেখা কইরা যাই। ক্লাস শেষ কইরা রুমে গেলাম। এরপর দেখি মহসিন স‍্যারও আছেন। এরপর রনি স্যার বললেন, “তোমরা প্রেম করতে পুরান ঢাকা যাও কেন? সোনারগাঁও গেলেই পারো।”

আমি তৎক্ষণাৎ উত্তর দিলাম, “স‍্যার সোনারগাঁও আমার বোনের শ্বশুরবাড়ি। তাই সেইখানে যাই না।”

স‍্যার আমার এই স্পর্ধায় রীতিমতো অবাক হইয়া গেলেন। বললেন, “ও, আচ্ছা”। আর বললেন পরবর্তীতে পড়াশুনা বাদ দিয়া এমন ঘুরতে দেখলে বাসায় বইলা দিবেন।

অন‍্যন টেবিলের নিচ দিয়া আমার হাত পায়ে চাপাচাপি শুরু কইরা দিছে, তাই আমিও আর কিছু বললাম না।

রুম থেকে বাইর হওয়ার পরই অন‍্যন বললো, “তুই এমনে উত্তর দিতে গেলি কেন?”

আমি বললাম, “কেমনে উত্তর দিছি? ক্লাসে বলছে না তার গার্লফ্রেন্ড পুরান ঢাকায় থাকে? সারাদিন তো ওইখানেই ঘুরতে থাকে। আমাদের একদিন দেখছে তাতেই দোষ হইয়া গেছে?”

“এখন বাসায় বইলা দিলে তোরে যদি আর না বের হইতে দেয়?”

“তোর দোষ। তুইই তো জোর কইরা আমার রিকশায় উঠছোস।”

রনি স‍্যার, মহসিন স‍্যার বাসায় কিছুই বইলা দিলেন না কিন্তু ক্লাসের মধ্যে রনি স্যার আমাদের উদ্দেশ্য কইরা প্রায়ই বলা শুরু করলেন যে অনেক ছাত্র-ছাত্রী ক্লাস শেষ কইরা অন্য জায়গায় যায়। তা নিয়া কিছু জিজ্ঞাস করলে বেয়াদবিও করে, তাদের এইটা করা ঠিক না ইত্যাদি ইত্যাদি।

এরপর থেকে অন‍্যন আর আমি কাছাকাছি জায়গায় ঘুরতে যাই, অল্প সময় স্টে করি, ধরা পরার ভয়ে। মাঝে মাঝে তন্ময়ও থাকে আমাদের সাথে।

২.
আমি আর অন‍্যন যে যার বাসায় থাকি আর তন্ময় থাকে ওর ফুপুর বাসায়। ওর কলেজে থাকার সময় একটা প্রেম ছিল। কলেজের কারো সাথে না। ওর কাজিন নায়লার সাথে। এখন যেই ফুপুর বাসায় থাকে, উনারই মেয়ে।

তন্ময় প্রায়ই ওর কথা বলে আর এখন যে নায়লা আর তাকে পছন্দ করে না তা নিয়া কষ্ট পায়। আমরা তখন তন্ময়রে সান্ত্বনা দিতে চেষ্টা করি।

কোচিংয়ের অনেক ঝামেলা থাকলেও আমরা ক্লাস, পড়াশোনা, প্রেম সবই ঠিকঠাক চালাইতে থাকলাম।

অন‍্যন আর আমি ঢাকা আর ঢাকার আশপাশ ঘুরলাম অনেক। যেখানের যেই ভালো খাবার সব খাওয়া হইয়া গেল। তবে মোহাম্মদপুরের পরে আমরা আর যাই না। তাইলে বাসায় ফিরতে ফিরতে আমার অনেক দেরি হইয়া যায়। এখন যেইসব জায়গায় যাইতে পারি নাই, বিশ্ববিদ্যালয়ে উঠলে সেইসব জায়গায় যাইতে পারবো, তা ভাইবাই আনন্দিত হই দুইজনে।

৩.
জুলাই এর প্রথম সপ্তাহে আমাদের পুরা পরিবারেরই দাদু বাড়ি যাওয়ার উপলক্ষ হইলো। দাদুর মৃত্যুবার্ষিকীর অনুষ্ঠানে।

যাওয়া আসা মিলায়া তিনদিন লাগবে। সেই হিসাবে দুইটা ক্লাস মিস যাবে আমার। অন‍্যনের কাছ থেকে পরে শিট নিয়া নিব তেমন ঠিকঠাক কইরা আমি বাড়িতে যাবো ঠিক করলাম।

অন‍্যন যাওয়ার আগে বললো, “সবার যাওয়া লাগবে মিলাদে? তুই ক‍্যান্সেল কইরা দে, অনেক ঘুরতে পারবো তাইলে তিনদিনে। গাড়ি নিয়া মোহাম্মদপুরের পরেও ঘুরতে পারবো (ড্রাইভিং শিখার পর থেকেই অন‍্যন খালি গাড়ি নিয়া ঘুরতে চায়)।

“অনেকদিন বাড়িতে যাই নাই আর আমারে একলা ফালায়া যাবেও না।” এই বইলা আমি চ‍্যাপ্টার ক্লোজ কইরা দিলাম।

বাড়িতে নেটওয়ার্ক সমস‍্যার জন্য অন‍্যনের সাথে কথা হইলো না। প্রথম দিন একটু কথা হইলো এরপর ঢাকায় ফিরার পর কথা হইলো। সে বললো, ওর মামা অনেক অসুস্থ, তাই মানিকগঞ্জ আসছে মামাকে দেখতে। আর দুইদিন বন্ধ দিয়া এর পরদিন পরীক্ষা, অন‍্যন আমার শিট তন্ময়ের কাছে রাইখা গেছে, আমি যেন নিয়া নিই।

কিন্তু কোচিং ছাড়া তন্ময়ের সাথে দেখা হওয়ার উপায় নাই। তাই ওর বাসায়ই যাইতে হইলো শিট আনতে।

তন্ময়ের বাসায় প্রথম বার গেলাম। বাসায় যাওয়ার কিছুক্ষণ পর একটা মেয়ে আসলো স্কুলজামা পইরা। তন্ময় পরিচয় করাইয়া দিলো। নায়লা, তন্ময়ের কাজিন। নায়লা বললো, সে খুব ক্লান্ত, তাই স্নান কইরা আইসা চা বানাবে এবং আমি যেন অবশ্যই না যাই, বইলা সে রুমে ঢুকল।

স্নান কইরা আসার পর আমি দেখলাম, নায়লা সুন্দর চেহারার, সুন্দর ত্বকের, সুন্দর চুলের একটা ঝকঝকে মেয়ে।

চা করলো আমাদের জন্য। আমাদের টুকটাক অনেক কথা হইলো। অবশ্য নায়লা তন্ময়ের সাথে বেশি কথা বলে না। কিছু জিজ্ঞাস করলেও বেশিরভাগের উত্তর দেয় না।

এরপর একসময় আমি চইলা আসার জন্য উঠলাম। আসার আগে নায়লা আমার নাম্বারও চাইলো। নাম্বার দিয়া সেদিন চইলা আসলাম।

অন‍্যন ঢাকায় আসার পরদিনই পরীক্ষা হইলো, প্রিপারেশন ভালো না নিতে পারার কারণে ওর রেজাল্টও বেশি ভালো আসলো না। তিনজনের মধ্যে আমার নাম্বারই আসলো বেশি।

৪.
পরের সপ্তাহে নায়লা হঠাৎ ফোন দিয়া বললো, “সময় পাইলে বাসায় আসো, গল্প করবো, ডিসটার্বিং তন্ময় থাকবে না।”

নায়লার কথায় আমি খুব অবাক হইলাম কিন্তু গেলাম ওর বাসায়। তখন নায়লার দুইটা বন্ধু ছিল বাসায়। একটু পরে ওরা চইলা গেলে আমরা গল্প করতে বসলাম। সে নতুন একটা কফি বানাইতে শিখছে, সেইটা বানাইয়া খাওয়াইলো। আর বললো, “তোমরা এই ডিস্টার্বিং ছেলেটার সাথে কীভাবে ক্লাস করো? স‍্যাররাই বা কীভাবে ক্লাস নেয়?”

“তুমি কি তার প্রতি খুব বিরক্ত কোনো কারণে?”

“কেন আমার সাথে তার প্রেম ছিল, বলে নাই তোমাদের? সবাইরেই তো বলে। ওর গ্রামের বাড়ি গেছিল, ওইখানেও বইলা আসছে। এরপর যখন আর প্রেম নাই, তখনও বলে প্রেম আছে। আর সেদিন দেখো নাই কেমন প্রশ্ন করতে করতে বিরক্তি ধরায় ফেলে?”

“কিন্তু আমাদেরকে তো বলছে, প্রেম নাই।”

“ও।”

একটু পর তন্ময় আসলো। আমারে দেইখা একটু হাসল আর কিছু বলল না। সেদিন আমি চইলা আসার আগেই নায়লা গল্প করতে করতে ঘুমায় গেল। আমি আর জাগাইলাম না। চইলা আসলাম দরজা ভিজায়া।

পরের দিন কোচিংয়ে আইসাই তন্ময় আমারে নায়লার কথা জিজ্ঞাস করল। আমি বললাম কী কথা হইছে। এরপর আবার সে মন খারাপ কইরা বইসা থাকল। আর আমিও বুঝলাম না নায়লা কেন তন্ময়রে নিয়া এইসব ভাবে। আসলে তো তন্ময় এই রকম কোনো কিছু বইলা বেড়ায় না। হইতে পারে তন্ময়রে কোনো কারণে সে পছন্দই করে না তাই এমন বা তন্ময় হয়তো অন্যদের কাছে আসলেই এমন বলে।

এর কয়েকদিন পর অন্যন বলল সে তন্ময়ের বাসায় গেছিল। তন্ময় নাকি বলছিল। আমার তখন মনে হইল নায়লা তো দেখতে অনেক সুন্দর, ওর সাথে অন্যনের কিছু হইয়া যায় নাই তো? বললাম, “তন্ময়ের কাজিন যে নায়লা, দেখতে অনেক সুন্দর।”

“হুম সুন্দর এবং মিশুক। আমাদের কফি বানাইয়া খাওয়াইল, গল্প করল।”

তন্ময় তখন বলল নায়লা অন্যনের সাথেও কত কথা বলে কিন্তু তার সাথে তো একটুও কথা বলে না!

এর কিছুদিন পর নায়লা ফোনে আমার অ্যাড্রেস নিয়া বাসায় চইলা আসলো। আইসাই চিৎকার কইরা বললো, “উফফ! তোমাদের এত বড় উঠান! তুমি আমাদের বাসা নিয়া যাও, বদলে আমারে এই উঠানটা দিয়া দাও।”

উঠানে বইসাই আমরা চা খাইলাম, গল্প করলাম।

৫.
তখন নায়লা প্রায়ই আসতো আমাদের বাসায়। গাড়ি নিয়া যখন-তখন চইলা আসত। ওর টুকটাক অনেক কিছু কিনার শখ ছিল, মাঝে মাঝে আমারে যাইতে বলতো ওর সাথে। বাসায়ও নায়লার সাথে যাইতে দিতে বেশি আপত্তি করতো না। তখন কোচিং শেষে ঘুরাঘুরি না কইরা আমরা বিকালে ঘুরতাম। বিকালে রাস্তায় জ্যাম থাকতো বেশি, বাসায় ফিরতেও তাই দেরি হইত প্রায়ই।

কয়েক দিন যাওয়ার পর অন‍্যন একটু আপত্তি করলো। আমারও মনে হইলো, নায়লার সাথে বাইর হওয়া কমাইতে হবে। আর ওর  শপিং করার সময় আমি বোরও হই। কিন্তু বেশি অনুরোধ করে বইলা যাইতে হয়।

অন‍্যনের সাথে আমি ঘুরতে চাইতেছি। কিন্তু নায়লাকে কী বইলা আসতে না করব তা ঠিক করতে পারলাম না। ততদিনে যদিও নায়লা জানে যে অন‍্যনের সাথে আমার প্রেম। তাও সরাসরি বলতে পারবো না ভাইবা ঠিক করলাম নায়লার যেদিন আসার থাকবে, সেদিন ফোন কইরা বলব যে আমার অন‍্যনের সাথে বাইরে যাইতে হইতেছে। সে যেন সেদিন আর না আসে। ফোনে হ‍্যান্ডেল করা সহজ হবে ভাইবা আমি তাই করলাম।

এভাবে দুইদিন অন‍্যনের সাথে ঘুরতে গেলাম। মাঝে নায়লার সাথে একলাও একদিন গেলাম। যাতে তারে অ্যাভয়েড করতেছি এমন না মনে করে।

কিন্তু তৃতীয় বার যেদিন আমি ঠিক করলাম নায়লাকে ফোন দিয়া না করব আসতে, সেদিন সে আগে আগেই চইলা আসলো।

এরপর বাইর হওয়ার সময় যখন অন‍্যনরে ফোন দিয়া না করব, তখন নায়লা বলল, “অন‍্যন ভাইয়াও চলুক আমাদের সাথে? মানে যদি কোনো আপত্তি না থাকে।”

অন‍্যন আসার পর আমরা তিনজনই সেদিন বাইর হইলাম। বিভিন্ন জায়গায় ঘুরলাম। নায়লা অন্যনের বন্ধুর মতই হইয়া গেছে। নিজেরাই অনেক কথা বলে।

৬.
ঈদের আগে আগে কোচিংয়ের চাপ বাইড়া গেল। ক্লাস বাড়ায় দিল দুইদিন, তার উপর পরীক্ষাও শুরু হইলো। তাই অনেকদিন আমি আর অন‍্যন কোথাও যাই না। কোচিং করি, এরপর বাসায় ফিরি। নায়লাও আমাদের ব‍্যস্ততা দেইখা অনেকদিন বাসায় আসলো না। এরপর পরীক্ষা শেষ হওয়ার পর কোচিংয়ে ছুটি দিয়া দিল আর বললো রেজাল্ট দিবে ঈদের পর।

অনেক দিন পর আমরা ছুটি পাইলাম। ঈদের আগে আবার একদিন তিনজন বাইর হইলাম, সেদিন অনেক এলোপাথাড়ি ঘুরলাম। ফিরতে ফিরতে সাড়ে সাতটা অর্থাৎ সন্ধ্যা হইয়া গেল। সেদিন অন‍্যন গাড়ি নিয়া বাইর হইছিল তাই অন‍্যন আমারে নামায় দিয়া আবার নায়লাকেও নামায় দিবে বলল। নামার সময় নায়লা ঈদের দিন ওর বাসায় যাইতে বললো, আর বললো অন‍্যনকেও যেন নিয়া যাই।

আমি আর অন‍্যন ঈদের দিন গেলাম নায়লার বাসায়। ওর বাবা-মা’র সাথে সেদিনই প্রথম দেখা হইলো। খাওয়া দাওয়া হইলে আমরা চারজন একসাথে সিনেমা দেখতে বসলাম। ঘণ্টাখানেক সিনেমা দেখার পর আমারে আর অন‍্যনরে নায়লা বললো, “ছাদে চলো, আমার বাগান দেখবা।”

ছাদে মাচা বাইঁধা, বড় বড় ড্রামের মধ্যে গাছ লাগাইয়া সবজি বাগান। বাগান দেখতে দেখতে খেয়াল করলাম, আমারে বাদ দিয়া অন‍্যন-নায়লা নিজেদের মধ্যেই অনেক কথা বলতেছে।

ছাদ থেকে নাইমা বিদায় নেওয়ার সময় অন‍্যন নায়লারে বললো, “তোমার বাসায় তো আসলাম, তুমি কবে আসতেছ?”

নায়লা কিছুটা লজ্জা মিশ্রিত হাসি হাইসা বললো, “আসবো।”

৭.
অন‍্যন আগে আমারে কোচিংয়ে আনার জন্য যেমন সতর্ক ছিল, ঈদের পর দেখা গেল, তা তো না-ই, বরং সে-ই কোচিংয়ে আসা বন্ধ কইরা দিছে। কোচিংয়ে কেন আসে না জিজ্ঞাস করলাম ফোন দিয়া। সে বললো, কোচিংয়ে আসতে নাকি তার আর ভালো লাগতেছে না, আপাতত আসবে না, বাসায়ই পড়বে। এরপর আর বেশি কিছু বললো না, ফোন রাইখা দিল।

এরপর তন্ময় একদিন ক্লাসে আমারে বলল, “অন্যন কালকে আসছিল বাসায়, পরে নায়লা আর ও বাইর হইল। তুইও গেছিলি কালকে ওদের সাথে?”

“না। আমাকে তো বলে নাই, ওরা ওরাই গেছে মনে হয়।”

“ও।”

মনে মনে আরও কিছু ভাবলাম কিন্তু তন্ময়রে বললাম না।

আর অন‍্যনও অনেকদিন কোচিংয়ে আসে না, ফোন কইরা খোঁজ নেয় না। তাই আমারও মনে হইলো, নায়লার সাথে অন‍্যনের একটা সম্পর্ক হইতেছে বা হইছে।

আর আমার আর অন‍্যনের প্রেম-ভালোবাসা মূলক সম্পর্কটা আদৌ আছে কিনা আর থাকলেও তা কোন জায়গায়, সেইটা বুঝতে আমি ওর সাথে দেখা করতে চাইলাম।

কিন্তু অন‍্যন আর ফোনই ধরে না, ধরলেও খাপছাড়া দুই চারটা কথা বইলা ফোন রাইখা দেয়, আর কখনো কখনো আরেকটা ফোন বাজতে শুরু করে, তখন সে ওই ফোন ধরতে চইলা যায়, পরে ফোন দিবে বইলাও আর ফোন দেয় না।

পর পর দুই দিন কোথায় দেখা করবো, তা ঠিক করলাম আমরা। কিন্তু দেখা হইলো না। দুইদিনই ঘর থেকে বাইর হওয়ার আগ মুহূর্তে সে না করলো। আর দুইদিনে আমি অবস্থাও বুইঝা ফেলছি, তাই বললাম, “আমরা ফোনেই কথা বলতে পারি।” তখন অন‍্যন বললো, দুইদিন সময় দিতে, সে দেখাই করবে।

দুইদিন আর কোনো কথা হইলো না, দুইদিন পর দুইজন দুইজনরে টেক্সট কইরা আমরা বাইর হইলাম।

সুন্দর একটা কফিশপে দুইজন বইসা আছি চুপচাপ, কফিশপের ভিতর থেকে বিকাল দেখা যায় কিন্তু বাইরের কোনো শব্দ আসে না। মাত্র বিকাল হইছে জন্য হয়তো মানুষ কম আর কাজের চাপও কম, মাত্র দুইটা কাপল বইসা কফি খাইতেছে আর কথা বলতেছে আস্তে আস্তে। আমি অন্যনরে বললাম, “নায়লার সাথে তোর কিছু হইছে?”

“হুম, নায়লা প্রপোজ করছে, এখন কথা হয় টুকটাক আর আমাদের সম্পর্কটাও তো ক্লিক করতেছে না।”

আর্ট. শৈলী নাসরিন

“আমাদের মানে কাদের?”

“তোর আর আমার।”

“কেন করতেছে না?”

“যে কোনো কারণেই হোক। করতেছে না ক্লিক।”

‘ক্লিক করতেছে না’ বলার পর আর কিছুই বলার থাকে না। তাই আমরা চুপচাপ বইসা থাকলাম দুইজন দুইপাশে দুইটা কফি নিয়া। একটু পর অন‍্যনের একটা ফোন আসলো, ফোন ধরলো না, কিন্তু একটু পরই উইঠা পড়লো, বললো, “যাই তাইলে, ভালো থাকিস।”

আমি একটু হাইসা, যাইতে বললাম।

রেস্টুরেন্টের ভিতর থেকে বিকাল দেখলাম কিছুক্ষণ। এরপর আসার আগে বিল দিতে গিয়া দেখি অন‍্যন দুইটা কফির দামই বিল-পে তে রাইখা গেছে।

কমেন্ট করুন

মন্তব্য

About Author

শৈলী নাসরিন
শৈলী নাসরিন

জন্ম. ঢাকা, ১৯৯৮। শিক্ষার্থী, স্নাতক, প্রথম বর্ষ, ইউনিভার্সিটি অব লিবারেল আর্টস।

2 Comments

  1. Anonymous Reply

    Comment

    পুরাটাই পড়লাম।বেশ ভাল লাগলো।

  2. Anonymous Reply

    অনেক ভালো লিখছে সে। পইড়া মুগ্ধ হইলাম। এই মেয়ে লেখালেখিতে লাইগা থাকলে অনেক দূর যাবে।

    শুভকামনা জানাই তাঁরে…

Leave a Reply