অস্ট্রেলিয়ান কনজারভেটিভ সিনেটর কোরি বার্নার্ডির মতে, এল-মুয়েলহি’র মত লোকদের জন্যই অস্ট্রেলিয়ার অভিবাসন ব্যবস্থা সংস্কার করা দরকার।

সম্প্রতি পশ্চিমের দেশগুলিতে পুরুষদের স্পার্ম সংখ্যা ব্যাপক হারে হ্রাস পাওয়ার খবরে সিডনির একজন ইসলামিক নেতা দাবি করছেন—অস্ট্রেলিয়ান নারীদের গর্ভবতী হবার জন্য মুসলিম পুরুষ প্রয়োজন।

হিব্রু বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকদের সাম্প্রতিক একটি গবেষণাপত্র ‘হিউম্যান রিপ্রোডাকশন আপডেট’ জার্নালে প্রকাশিত হয়। এতে আমেরিকা, ইউরোপ, অস্ট্রেলিয়া ও নিউজিল্যান্ডের পুরুষদের স্পার্ম সংখ্যা হ্রাসের উল্লেখ ছিল।

সিডনি কেন্দ্রিক ‘হালাল সার্টিফিকেশন অথরিটি’র এই নেতা মোহামেদ এল-মুয়েলহি সেই গবেষণার বরাত দিয়ে বলেছেন, “হিব্রু বিশ্ববিদ্যালয়ের তথ্যমতে, অস্ট্রেলিয়ান পুরুষদের স্পার্ম সংখ্যা গত ৪০ বছরে ৫২ শতাংশ হ্রাস পেয়েছে। কাজেই এখানকার পুরুষদের মৃত্যু আসন্ন। অস্ট্রেলিয়ান নারীদের গর্ভবতী হবার জন্য  আমাদেরকে দরকার যাতে করে তারা মুসলিম শিশু দিয়ে নিজেদেরকে ঘিরে রাখতে পারেন।”

জনাব এল-মুয়েলহি মনে করেন, অস্ট্রেলিয়াকে এসব ‘গোঁড়া’ ব্যক্তিদের হাতে ছেড়ে দেওয়া হলে আগামী ৪০ বছরের মাঝে সাদা চামড়ার এই জাতি বিলুপ্ত হয়ে যেতে পারে। তাই জাতির ভবিষ্যৎ প্রজন্ম ধরে রাখার জন্য মুসলিমদের দায়িত্ব রয়েছে। তিনি বিশ্বাস করেন, এই সঙ্কীর্ণমনাদের নিজেদের কবরের জন্য গোরস্থানে জমি বাছাই করে রাখা দরকার। আর নয়ত “সস্তা বিকল্প হিসাবে আত্মহত্যা” করা উচিত।

ডেইলি মেইলের তথ্যমতে, একটি  ফেসবুক কমেন্টে এসব বিতর্কিত মন্তব্য করেছেন এল-মুয়েলহি। কমেন্টটি ডিলেট করে দেওয়া হয়।

অস্ট্রেলিয়ান পুরুষদের প্রজনন ক্ষমতা সম্পর্কিত এল-মুয়েলহি’র বিতর্কিত ফেসবুক কমেন্ট

পরে নিউজ ডট কম অস্ট্রেলিয়াকে ই-মেইলে তিনি জানান, তার সেই পোস্টের উদ্দেশ্য ছিল সঙ্কীর্ণমনাদের মাঝে আলোড়ন তৈরি করা। তারা নাকি এই ঘটনার পর ফেসবুক পেইজে এসে তাকে অকথ্য ভাষায় গালাগালির পাশাপাশি শারীরিক আক্রমণের হুমকিও দিয়েছেন।

“গতকাল রাতে ‘ফেসলেসবুক’ আমার পোস্ট ডিলেট করে দিলেও ইসলাম এবং আমাকে নিয়ে যেসব রসবোধহীন বিদ্বেষপূর্ণ মন্তব্য করা হয়েছে, সেগুলি ঠিকই রয়ে গেছে,” বলেন তিনি।

ই-মেইলটির সাথে তিনি তার মূল পোস্টের একটা পরিবর্ধিত সংস্করণ সংযুক্ত করে দেন। সেখানে তার আগের প্রসঙ্গের সাথে আরো যোগ করা হয়:

“মহিলাদের জন্য হিজাব অথবা প্রয়োজনে বোরকা পরা বাধ্যতামূলক করা হবে। বিকিনি থাকবে কেবল জাদুঘরে, আবেদনময়ীদের দেহে না। এই ব্যবস্থাগুলি নেওয়া হলে অস্ট্রেলিয়ার সব কিছু ‘হালাল’ এর মাধ্যমে বিধিসম্মত করা হবে। গোঁড়া এবং শূকরদেরকে হারাম ঘোষণা করা হবে, ওরা  থাকবে ওদের মত।… ডাটন সাহেবকে মানুস দ্বীপে নির্বাসিত করা হবে। তিনি আর কখনোই অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে পা ফেলতে পারবেন না। চারিদিকে মসজিদ থাকবে আর ধর্মীয় পুলিশরা খেয়াল রাখবেন যাতে করে নামাজের সময় কোনো ব্যবসা-বাণিজ্য না চলে। প্রতিদিন ভোরবেলায় লাউড স্পিকারে আজান দেওয়া হবে, যেন অলস বেকার ব্যক্তিরা সেই ডাকে সাড়া দিয়ে চাকরির সন্ধানে বের হতে পারেন। জ্যাকি ল্যাম্বি’কে শরিয়া আইনের রক্ষাকারী হিসাবে নিয়োগ দেওয়া হবে। আর পুলিন থাকবেন অভিবাসন মন্ত্রীর দায়িত্বে, যেন সাদা চামড়ার নপুংসক সঙ্কীর্ণমনারা আমাদের এই সমুদ্রে ঘেরা দেশের ভেতর ঢুকতে না পারেন।”

এল-মুয়েলহি’র সেই ফেসবুক কমেন্টের কিছুটা পরিবর্ধিত সংস্করণ

অস্ট্রেলিয়ান কনজারভেটিভ সিনেটর কোরি বার্নার্ডির মতে, এল-মুয়েলহি’র মত লোকদের জন্যই অস্ট্রেলিয়ার অভিবাসন ব্যবস্থা সংস্কার করা দরকার, “সত্যি কথা বলতে, তার চরমপন্থী বিদ্বেষ ও ‘হালাল’ নিয়ে অযথা হৈ চৈ এই দেশে আমি চাই না।”

মুয়েলহি সাহেব ১৯৭৫ থেকে অস্ট্রেলিয়ায় বাস করছেন। ১৯৮১ সালে তাকে নাগরিকত্ব দেওয়া হয়। তার হালাল সার্টিফিকেশনের বিরুদ্ধে যারা ক্যাম্পেইন করছেন, তাদেরকে তিরস্কার করে তিনি বলেন, “ওরা শোচনীয়ভাবে ব্যর্থ হয়েছে। হালাল সার্টিফিকেশনের কার্যক্রম দিন দিন ব্যাপক হারে বৃদ্ধি পাচ্ছে। সবাই এখন আগের চাইতে অনেক বেশি হারে হালাল খাবার খাবে। এই বাড়তি কাজের দায়িত্ব অর্পণের জন্য আমরা আরো তিন জন অডিটর নিয়োগ দিয়েছি। মুসলিম-বিরোধীরাও হালাল’কে সমর্থন দিবেন, তাই তাদেরকে আমি অগ্রীম ধন্যবাদ জানাই।”

সিডনি কেন্দ্রিক ‘হালাল সার্টিফিকেশন অথরিটি’র নেতা মোহামেদ এল-মুয়েলহি

২০১৫ সালে হালাল সার্টিফিকেশন ইন্ডাস্ট্রির ব্যাপারে অস্ট্রেলিয়ান সিনেট একটি তদন্তের আয়োজন করে। এতে নেতৃত্ব দেন সিনেটর বার্নার্ডি। অনুসন্ধানের ফলাফলে বলা হয়, হালাল সার্টিফিকেশনের কার্যক্রম বিভ্রান্তিকর এবং সম্পূর্ণ বিধিসম্মত নয়। যার ফলে তাদের প্রক্রিয়াসমূহের শুদ্ধতা নষ্ট হয়েছে। এর ফলশ্রুতিতে, সার্টিফিকেশনের দায়িত্বে থাকা কর্মকর্তাদের যোগ্যতা ও উদ্দেশ্য নিয়ে প্রশ্ন থাকা সত্ত্বেও তারা আচরণবিধি বহির্ভূত কাজের সুযোগ পেয়ে যান।

কিন্তু সেই তদন্তে হালাল সার্টিফিকেশন ইন্ডাস্ট্রির সাথে সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডকে অর্থসাহায্য দেওয়ার কোনো প্রকার যোগসাজশ পাওয়া যায় নাই।

সে সময় সিনেটর বার্নার্ডি এল-মুয়েলহি’র কার্যক্রমে বেশ অসন্তুষ্টি প্রকাশ করে জানান, কমিটির শুনানিতে তাকে ডাকা হলেও এল-মুয়েলহি উপস্থিত হন নাই। তার ওপর তদন্ত পেশকারী কয়েকজনকে অপমান করেছেন।

এর আগে, হিব্রু বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণায় স্পার্ম সংখ্যা হ্রাসের পেছনে কোনো নির্দিষ্ট কারণ চিহ্নিত করা যায় নাই। তবে সম্ভাব্য কারণ হিসাবে স্থূলতা এবং প্লাস্টিকে উপস্থিত হরমোন-বিক্ষিপ্তকারী কেমিক্যালের কথা বলা হয়। ডক্টর শ্যানা এইচ সোয়ান বলেন, “৪৫ বছর আগে যখন এই ব্যাপারে আশঙ্কা সৃষ্টি হয়, তখন থেকেই স্পার্ম সংখ্যা হ্রাসের ব্যাপারটিকে অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে বিবেচনা করা হচ্ছে।”

ফ্লিন্ডারস ইউনিভার্সিটির রিপ্রোডাক্টিভ মেডিসিনের অধ্যাপক কেল্টন ট্রেমেলেন বলেন, “এই চূড়ান্ত গবেষণার মাধ্যমে আমরা জানতে পারলাম যে, স্পার্ম ক্ষয়ের মাত্রা দিন দিন আরো শক্তিশালী হারে বৃদ্ধি পাচ্ছে। যেহেতু ঘটনাটি পশ্চিমা দেশগুলিতেই ব্যাপক হারে দেখা গেছে, তাই এটা নিশ্চিত যে এতে বাণিজ্যিক কেমিক্যালের ভূমিকা রয়েছে। একান্তই পশ্চিমা সমাজের পরিবেশগত বিষয় ও জীবনযাপনের ধারা এর পেছনে মূল কারণ।”

“স্পার্ম সংখ্যা প্রায় অর্ধেক হ্রাস পাবার পেছনে সবচাইতে সম্ভাব্য কারণ হলো স্থূলতা। শরীর চর্চার অভাব ও অস্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস—এ দু’টি পশ্চিমের দেশগুলিতে ব্যাপক হারে বাড়ছে। ফলে তিন ভাগের দুই ভাগ পুরুষ স্থূল আকার ধারণ করেছেন। আর টেস্টোস্টেরনের মাত্রা ও স্পার্ম সংখ্যা কম হবার পেছনে স্থূলতা একটি প্রধান কারণ।”

এল-মুয়েলহির ফেসবুক কমেন্টের পর কয়েকজন  টুইটার ব্যবহারকারী তাকে ‘শূকর’, ‘রেসিস্ট কুকুর’, ও ‘সঙ্কীর্ণমনা’ বলে টুইট করেছেন। তার ‘বিরুদ্ধে বিক্ষোভ করা’ ও তাকে ‘একঘরে করে ফেলা উচিৎ’ বলে মন্তব্য তাদের।