ঘুমের মধ্যেই শুনলাম বাইরে অনেক বৃষ্টি হচ্ছে।

স্নান করে টাওয়াল দুইটা বারান্দায় দেওয়ার সময়ই মনে আসল, যেইদিন আমি টাওয়াল বারান্দায় রেখে বাইরে যাই সেদিনই ঝুম বৃষ্টি হয়। এক ভিজা টাওয়েল শুকাতে লাগে তিন দিন। তবে আজকে রিস্ক ফ্রি। বাসা থেকে বাইর হব না। তাই দুইটাই বাইরে রেখে আসলাম রোদে।

ভাত খাওয়ার পরে শরীর ঝাঁপায়ে আসল মরার ঘুম। ঘুমের মধ্যেই শুনলাম বাইরে অনেক বৃষ্টি হচ্ছে। ঘুমের মধ্যে মনে হইল, আমার টাওয়েল দুইটাই আজকে শ্যাষ, বারান্দার দরজা খোলা—আসবে পানি, ওঠা উচিত-ওঠা উচিত ভাবতে ভাবতে আমি পৃথিবীর সবচেয়ে ক্লাসিক প্রতারণার শিকার হইলাম

আমার ব্রেইন আমাকে নিয়া গেল ছোটবেলায় দাদুর বাড়িতে।

গ্রীষ্মের লম্বা ছুটিতে দাদুর বাড়ির দোতলায় পাটি বিছানো খাটের উপর বেঘোর ঘুমাচ্ছি। আমার সিল্কের (কে জানে কীসের) পিছলা হাফপ্যান্ট আর পিছলা পাটি মিলে ঘুমের মধ্যেই স্ট্রাগল চলতেছে পিছলায়ে পড়ে না যাওয়ার। জানালার পাশে কামরাঙা গাছের ছটফটানি আর নিচে গরুর ঘর থেকে আমাদের লাল গরু রুম্পা, ঝুম্পার গ্যা গ্যা চিৎকার।

আমি সব স্পষ্ট শুনতে পাচ্ছিলাম।

কামরাঙা গাছের ঠিক পাশে সবুজ পুকুরে দিদিমণি বাসন মাজে। নারকেলের ছোবড়া আর চুলার ছাই আর তিব্বত ৫৭০ সাবান দিয়ে পিতলের থালা বাটি কস কস শব্দ করে মাজতে মাজতে কখনো হাতের শাঁখার সঙ্গে পিতলের ঘষা লেগে টুং করে বেজে ওঠে সোজা পৌঁছে যায় দোতলায়—একদম আমার কানের ভিতরে।

আমি পাশ ফিরে ঘুমাইতে গিয়ে আবার পিছলাতে পিছলাতে ঘুমের মধ্যেই খাটের কোণা শক্ত করে চেপে ধরি। আর স্বপ্নে দেখি নৌকার উপরে ঘুমাচ্ছি। নৌকা যাচ্ছে শরৎকালের আকাশের তলে কাশবন ঘেঁষে, আমি নৌকার কাঠগুলি শক্ত করে ধরে রাখি যেন দুলতে দুলতে পড়ে না যাই।

ছবি. পারমিতা হিম

ঘুম ভাঙতে চায় না। দিদিমনি সন্ধ্যাপূজায় ঢং ঢং করে ঘণ্টা বাজায়। উলুলুলু শব্দ শুরু করলেই আমার ঘুম ভেঙে যায়।

দোতলার কোনো ঘরে কেউ নাই। ইলেকট্রিসিটি নাই। বাইরে সন্ধ্যার নীল নীল অন্ধকার। আমি অনেকক্ষণ এমনিই শুয়ে থাকি। কড়িকাঠ গুণি। ধীরে ধীরে নিচে নামি। কাঠের ঘর মচ মচ শব্দ করে তখন।

টানা বৈঠকঘরে সবাই চা-মুড়ি নিয়ে খোশগল্পে ব্যস্ত। আমার ও রকম খাড়া খাড়া লাল চুল আর ঘুমে ডোবা চেহারা দেখে সবাই খিল খিল করে হেসে উঠল। বলল, তুই ঘুমের মধ্যে এত নাড়াচাড়া করিস কেন? মারামারি করিস নাকি ঘুমের মধ্যে? চাইট্যাচাটোনি কোথাকার!

আমি কি পাত্তা দেই এইসব গ্রামের লোকদেরকে? দাঁত ব্রাশ করে না ওরা, আঙুল দিয়ে মাজে। কথাই বলব না আমি এদের সাথে!

চুপচাপ গিয়ে বসি রান্নাঘরে দিদিমণির পাশে। দিদিমণি খই ভাজবে। খইয়ের সাথে মিঠা গলায়ে মিশাবে, তারপর গরম গরম খইয়ের দলা খেতে দিবে আমাকে।

একটা বড় বাটি নিয়ে আমি চুলার পাশে বসে থাকলাম। দিদিমণি তখনও ব্যস্ত গরুর খাবার নিয়ে। ইয়া বড় বড় হাড়িতে ভুষি, মণ্ড হাবিজাবি মিশায়ে ঘুটা ঘুটা আর ঘুটা। সে তাকাচ্ছেই না হাভাইত্যার মত বাটি নিয়ে বসে থাকা আমার দিকে। মাটির চুলার গনগনে আগুনের আঁচ আর আমার মনের রাগ দুটোই আমার চোখেমুখে আঁকা থাকে নিশ্চয়ই।

বৈঠকখানা থেকে আবারো হাসির লহর ভেসে আসে। কে যেন বলে, কীরে তুই কি ঘুম থেকে উঠে গরুর খাবার বানাতে গেছিস?

রাগে আমার গা জ্বলে যায়। মন চায় এক্ষুনি গিয়ে মারতে মারতে ভর্তা করে ফেলি ওই কটুক্তিকারী শয়তানকে। বাইরের নীল অন্ধকার দেখে আলসেমি করে আর যাই না। কাছেই কোথাও ঘঁ ঘঁ শব্দ করে ব্যাঙ ডেকে ওঠে। আমি চুলার পাশেই গালে হাত দিয়ে বসে থাকি।

ঠাট্টা হাসি মশকরার গ্রাম্য লঘু জীবনের অসারত্ব নিয়ে সিরিয়াস ভাবনা ভাবতে থাকি।

শহুরে ঘুম যখন ভাঙল তখন ব্যাঙের মত ডাকতেছে আমার মোবাইল। রুমের অর্ধেক অংশ পানিতে ভেজা। বারান্দায় টাওয়াল দুইখান ভিজে চুপচুপ আর বাইরে এমন ঘনঘোর নীল সন্ধ্যা।

কভার. পারমিতা হিম, ছবি. খাদিজাতুল কোবরা, নভেম্বর ২০১৪