page contents
সমকালীন বিশ্ব, শিল্প-সংস্কৃতি ও লাইফস্টাইল

পদার্থবিজ্ঞানে ২০১৭ সালের নোবেল পুরস্কার দেওয়া হল যে কারণে

ভূমিকা ও অনুবাদ

আশরাফুল আলম শাওন


ভূমিকা

৩ অক্টোবরে ২০১৭ তে পদার্থবিজ্ঞানে নোবেল পুরস্কার ঘোষণা করা হয়েছে। লিগো’র মাধ্যমে গ্র্যাভিটেশনাল ওয়েভ বা মহাকর্ষীয় তরঙ্গ শনাক্তকরণের জন্য যুক্তরাষ্ট্রের তিনজন বিজ্ঞানীকে এবারের নোবেল পুরষ্কার দেওয়া হয়েছে।

তারা হলেন রেইনার ওয়ীস, ব্যারি সি. ব্যারিশ ও কিপ এস. থ্রোন।

গ্র্যাভিটেশনাল ওয়েভ কী ও লিগো’র মাধ্যমে কীভাবে শনাক্ত হল সেটা কীভাবে সহজে বোঝানো যায়?

আলবার্ট আইনস্টাইন যখন জেনারেল থিওরি অব রিলেটিভিটির মাধ্যমে গ্র্যাভিটি’র কারণ সম্পর্কে বলেছিলেন তখন সর্বপ্রথম গ্র্যাভিটেশনাল ওয়েভের ধারণাটি আসে। আমাদের ইউনিভার্সের এই মহাশূন্য হচ্ছে স্পেস-টাইমের একটা বিশাল ফেব্রিক। মানে কাপড়ের মত ফেব্রিক। সাধারণ ফেব্রিকের মত এটায়ও ভাঁজ বা গর্ত হয়। এবং এতে তরঙ্গ বা ঢেউ তৈরি হয়।

ধরেন, একটা বিছানার চাদরের চারকোণা চারজন ধরল, এবার চাদরটিকে কোনোকিছুর উপরে না রেখে শূন্যে রাখা হল। চারজন চারকোণা ধরে আছে। চাদরটি একেবারে  সোজা টান টান। এরপরে চাদরটার মাঝখানে একটা খুব ভারি লোহার বল ছেড়ে দেওয়া হল। এতে কী হবে? বলটা চাদরের মাঝখানে একটা গর্ত তৈরি করে নিচের দিকে পড়বে, চাদরটি আর টান টান সোজা থাকবে না। এখন এই চাদরের কোথাও কোনো মার্বেল ছাড়লে, মার্বেল গড়িয়ে গড়িয়ে সেই গর্তে পড়বে। বলটির চেয়ে হালকা যে কোনো বস্তু ছাড়লেই সেটি এই গর্তের দিকে পড়তে থাকবে। এটাই গ্র্যাভিটেশন্যাল ফোর্স বা মহাকর্ষীয় বল।

আইনস্টাইনের ধারণা ব্যাখ্যা করলে, আমাদের ইউনিভার্সের এই স্পেস-টাইম এই বিছানার চাদরের মত একটা ফেব্রিক। এই স্পেস-টাইম ফেব্রিকে ভারি কিছু, যেমন গ্রহ-নক্ষত্র থাকার কারণে ফেব্রিকে গর্ত বা ভাঁজ তৈরি হয়। যত ভারি বস্তু, গর্ত বা ভাঁজ তত বেশি গভীর। এই গর্তের আশেপাশে থাকা অপেক্ষাকৃত কম ভারি বস্তু এই গর্তে পড়তে থাকে, আর এটাই হচ্ছে গ্র্যাভিটেশন্যাল ফোর্স । যেমন আমাদের সূর্যের কারণেও গর্ত তৈরি হয়েছে, পৃথিবীর কারণেও স্পেস-টাইম ফেব্রিকে গর্ত তৈরি হয়েছে—সূর্য পৃথিবীর তুলনায় ভারি হওয়ার কারণে গর্ত বেশি গভীর এবং পৃথিবীর চেয়ে গ্র্যাভিটেশন্যাল ফোর্স বেশি।

আইনস্টাইন আরো বলেন যে, এই গর্ত বা ভাঁজ তৈরি হওয়ার সময় স্পেস-টাইম ফেব্রিকে তরঙ্গ তৈরি হয়, যত ভারি বস্তু, তরঙ্গ তত বেশি ও বেশি দূর পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়ে। এই তরঙ্গই হচ্ছে গ্র্যাভিটেশনাল ওয়েভ বা মহাকর্ষীয় তরঙ্গ।

পরবর্তী পদার্থবিজ্ঞানীরা দেখেন যে, দুটি বিশালাকার ম্যাসিভ ব্ল্যাক হোল যদি কাছাকাছি আসার কারণে একটা আরেকটার গ্র্যাভিটেশনাল ফিল্ডকে আকর্ষণ করে, তাহলে ব্ল্যাকহোল দুটি একটা আরেকটার চারদিকে স্পাইরাল আকারে  ঘুরতে থাকে। এবং এর ফলে স্পেস-টাইমের ফেব্রিকে প্রচণ্ড শক্তিশালী অনেক ঢেউ বা তরঙ্গ তৈরি হয়।

এই ওয়েভ বা তরঙ্গ সমগ্র ইউনিভার্সের স্পেস-টাইম ফেব্রিকে ছড়িয়ে পড়তে থাকে। কোটি কোটি বছর ধরে এই ওয়েভ ছড়িয়ে পড়তে থাকে, এবং যত বেশি দূরত্ব অতিক্রম করতে থাকে, এই তরঙ্গ তত বেশি হাল্কা হতে থাকে। এই গ্র্যাভিটেশনাল ওয়েভ পৃথিবী পার হওয়ার সময়ে, ২০১৫ সালের ১৪ সেপ্টেম্বর LIGO তে ধরা পড়ে।

এখন এই LIGO কী জিনিস?

গ্র্যাভিটেশনাল ওয়েভ ধরার জন্যই LIGO তৈরি করা হয়েছিল। LIGO মানে হচ্ছে, Laser Interferometer Gravitational wave Observator.

LIGO তে যেটা করা হয়েছে, একটা লেজার বীম বা লেজার রশ্মিকে প্রথমে দুই ভাগ করে আলাদা আলাদা দুইটা ভ্যাকুয়াম টিউবের মধ্য দিয়ে দুই দিকে পাঠানো হয়েছে। সেই ভ্যাকুয়াম টিউবের মধ্য দিয়ে এই লেজার রশ্মি দুটি অনেক দীর্ঘ দূরত্ব অতিক্রম করে, এরপরে ভ্যাকুয়াম টিউব দুইটির শেষ মাথায় দুইটি মিররের  মাধ্যমে লেজার রশ্মি দুটিকে ফেরত পাঠানো হয়। তারা যে জায়গা থেকে আলাদা হয়েছিল সেই জায়গায় ফেরত পাঠানো হয়। এখন, যে দুটি লেজার রশ্মি আয়নায় প্রতিফলিত হয়ে ফিরে এসেছে, তাদের তরঙ্গের আকার একটা আরেকটার বিপরীত, একটা আরেকটাকে ক্যান্সেল আউট করে। এর মানে, লেজার রশ্মি দুইটির কোনো পরিবর্তন হয় নি।

 

লিগো, লিভিংস্টোন অবজারভেটরি

হ্যানফোর্ডের লিগো ডিটেকটর

এবার সেই গ্র্যাভিটেশনাল ওয়েভ পৃথিবী দিয়ে পার হওয়ার সময়, টিউব দুটিকে বড় করা হয়, দূরত্ব আরো বাড়ানো হয়। এরপরে ঠিক আগের মত করেই লেজার রশ্মিকে দুই ভাগ করে ভ্যাকুয়াম টিউব দুটির মধ্যে আয়নার মাধ্যমে ঘুরিয়ে আনা হয়। এবার একটার তরঙ্গ আরেকটার তরঙ্গকে ক্যান্সেল আউট করতে পারে না, কারণ, গ্র্যাভিটেশনাল ওয়েভের কারণে তরঙ্গের আকার বা ওয়েভ শেপ বদলে গেছে।

এইভাবে গ্র্যাভিটেশনাল ওয়েভ ধরতে পারার পিছনে তাদের দীর্ঘদিনের অবদান রাখার জন্য তিনজন পদার্থবিজ্ঞানীকে এবারের নোবেল পুরষ্কার দেওয়া হল। তাদের নোবেল পুরস্কারের ঘোষণা দিয়ে nobelprize.org  ওয়েবসাইটে প্রকাশিত প্রেস রিলিজের বাংলা অনুবাদ এখানে থাকছে।

 

পদার্থবিজ্ঞানে ২০১৭ সালের নোবেল প্রাইজ

রেইনার ওয়ীস, ব্যারি সি. ব্যারিশ, কিপ এস. থ্রোন

 

প্রেস রিলিজ

৩-১০-২০১৭

দ্য রয়্যাল সুইডিশ একাডেমি অব সায়েন্সেস পদার্থবিজ্ঞানে ২০১৭ সালের নোবেল প্রাইজ তিনজন বিজ্ঞানীকে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে

পুরস্কারের অর্ধেক পাচ্ছেন রেইনার ওয়ীস, লিগো/ভার্গো কোলাবরেশনের জন্য

এবং লিগো/ ভার্গো কোলাবরেশনের জন্য যৌথভাবে ব্যারি সি. ব্যারিশ ও কিপ এস. থ্রোন পাচ্ছেন বাকি অর্ধেক পুরস্কার

“ লিগো ডিটেক্টর ও গ্র্যাভিটেশনাল ওয়েভস বা মহাকর্ষীয় তরঙ্গ পর্যবেক্ষণের ক্ষেত্রে তাদের চূড়ান্ত অবদানের জন্য”

 

গ্র্যাভিটেশনাল ওয়েভ শেষ পর্যন্ত ধরা পড়েছে

২০১৫ সালের ১৪ সেপ্টেম্বর, প্রথমবারের মত মহাবিশ্বের গ্র্যাভিটেশনাল ওয়েভ বা মহাকর্ষীয় তরঙ্গ পর্যবেক্ষণ করা হয়। একশ বছর আগে আলবার্ট আইনস্টাইন এই তরঙ্গের কথা বলেছিলেন, দুইটি ব্ল্যাক হোলের সংঘর্ষের ফলে এই তরঙ্গ তৈরি হয়। যুক্তরাষ্ট্রের লিগো ডিটেক্টর পর্যন্ত পৌঁছাতে এই তরঙ্গ সময় নিয়েছে ১.৩ বিলিয়ন বছর।

পৃথিবীতে যখন পৌঁছেছে তখন এই তরঙ্গের সিগন্যাল খুবই দুর্বল ছিল, তবে সেটা জ্যোতির্পদার্থবিজ্ঞানের জন্য খুবই সম্ভাবনাময়। মহাকাশের সবচেয়ে সহিংস ঘটনাগুলিকে বোঝার জন্য এবং আমাদের জ্ঞানের সীমানা পরীক্ষা করার জন্য এই গ্র্যাভিটেশনাল ওয়েব সম্পূর্ণ নতুন একটি উপায়।

লিগো, দ্য লেজার ইন্টারফেরোমিটার গ্র্যাভিটেশনাল-ওয়েভ অবজার্ভেটরি,  ২০টিরও বেশি দেশের এক হাজারেরও বেশি গবেষকদের একটি সম্মিলিত প্রজেক্ট। পঞ্চাশ বছর আগের একটি লক্ষ্যকে তারা একসাথে উপলব্ধি করেছেন। ২০১৭ সালের নোবেল লরিয়েটরা প্রত্যেকেই প্রচণ্ড উদ্দীপনা ও সংকল্পের সাথে লিগোর সাফল্যে অমূল্য অবদান রেখেছেন। দুজন পথিকৃৎ রেইনার ওয়ীস ও কিপ এস. থ্রোন, এই প্রজেক্ট সম্পূর্ণ করার নেতৃত্বে থাকা বিজ্ঞানী ব্যারি সি. ব্যারিশের সাথে মিলে নিশ্চিত করেছেন যে চার দশকের পরিশ্রম যেন সফল হয়, গ্র্যাভিটেশনাল ওয়েভ যেন ধরা পড়ে।

১৯৭০ এর দশকের মাঝামাঝি সময়ে, যেসব ব্যাকগ্রাউন্ড নয়েজ সিগন্যাল পরিমাপের ক্ষেত্রে সমস্যা তৈরি করছিল, সেইসব ব্যাকগ্রাউন্ড নয়েজের সম্ভাব্য উৎস বিশ্লেষণ করে দেখেছিলেন রেইনার ওয়ীস, এবং তিনি তখন একটা ডিটেক্টরও ডিজাইন করেছিলেন। সেই ডিটেক্টরটি ছিল লেজার দিয়ে তৈরি একটা ইন্টারফেরোমিটার। এই জিনিস ব্যাকগ্রাউন্ড নয়েজকে বাদ দিয়ে সিগন্যাল শনাক্ত করতে পারত। এর আগে, কিপ থ্রোন এবং রেইনার ওয়ীস দুজনের দৃঢ়ভাবে উপলব্ধি করেছিলেন যে গ্র্যাভিটেশনাল ওয়েভ শনাক্ত করা যাবে এবং এটা মহাবিশ্ব সম্পর্কে আমাদের জ্ঞানের জগতে একটা বিপ্লব নিয়ে আসবে।

জেনারেল থিওরি অব রিলেটিভিটিতে আলবার্ট আইনস্টাইন যেভাবে ব্যাখ্যা করেছিলেন, সমগ্র মহাবিশ্বে এই গ্র্যাভিটেশনাল ওয়েভ বা মহাকর্ষীয় তরঙ্গ আলোর বেগে ছড়িয়ে পড়ে। যখন কোনো ভারি জিনিস গতিশীল হয় তখনই এই ধরনের তরঙ্গ তৈরি হয়, যেমন, যখন কোনো আইস-স্কেটার এক পায়ে ভর দিয়ে ঘুরতে থাকে তখন, অথবা যখন দুটি ব্ল্যাকহোল একে অন্যের চারদিকে ঘুরতে থাকে তখন। আইনস্টাইন মনে করেছিলেন যে এই গ্র্যাভিটেশনাল ওয়েভকে কখনো পরিমাপ করা সম্ভব হবে না। লিগো প্রজেক্টের অর্জন হল, গ্র্যাভিটেশনাল ওয়েভ পৃথিবীর উপর দিয়ে পার হওয়ার সময়, দুটি বৃহদাকার লেজার ইন্টারফেরোমিটার একটা পরমাণুর নিউক্লিয়াসের চেয়ে হাজার গুণ ছোট একটি পরিবর্তন শনাক্ত করতে পেরেছে বা পরিমাপ করতে পেরেছে।

এখন পর্যন্ত, মহাবিশ্ব অনুসন্ধান বা পর্যবেক্ষণ করার জন্য সব ধরনের ইলেক্ট্রোম্যাগনেটিক র‍্যাডিয়েশন ও পার্টিকেল, যেমন কসমিক রশ্মি অথবা নিউট্রিনো ব্যবহার করা হয়েছে। তবে, স্পেসটাইম বা স্থান-কালের মধ্যে কোনো ভাঁজ বা বিঘ্ন তৈরি হওয়ার সরাসরি প্রমাণ হচ্ছে এই গ্র্যাভিটেশনাল ওয়েভ। এটা সম্পূর্ণ নতুন ও আলাদা একটা কিছু, অদেখা অনেক জগত খুলে দিচ্ছে এটা। যারা এই তরঙ্গ ধরতে পেরেছেন এবং এর বার্তা অনুধাবন করতে পেরেছেন তাদের জন্য আরো অনেক আবিষ্কার সম্পদ হিসেবে অপেক্ষা করছে।

রেইনার ওয়ীস

 রেইনার ওয়ীস ১৯৩২ সালে জার্মানির বার্লিনে জন্মগ্রহণ করেন। ১৯৬২ সালে যুক্তরাষ্ট্রের ম্যাসাচুসেটস ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজি (এমআইটি) থেকে পিএইচডি অর্জন করেন। বর্তমানে এমআইটিতে পদার্থবিজ্ঞানের অধ্যাপক হিসেবে নিযুক্ত আছেন।

ওয়েবসাইট: http://web.mit.edu/physics/people/faculty/weiss_rainer.html B

ব্যারি সি. ব্যারিশ

ব্যারি সি. ব্যারিশ ১৯৩৬ সালে যুক্তরাষ্ট্রের নেভাডার ওমাহাতে জন্মগ্রহণ করেন। ১৯৬২ সালে তিনি ক্যালিফোর্নিয়ার বার্কলের ইউনিভার্সিটি অব ক্যালিফোর্নিয়া থেকে পিএইচডি অর্জন করেন। তিনি এখন ক্যালিফোর্নিয়া ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজিতে পদার্থবিজ্ঞানের অধ্যাপক হিসেবে নিযুক্ত আছেন।

ওয়েবসাইট- https://labcit.ligo.caltech.edu/~BCBAct/ K

কিপ এস. থ্রোন

কিপ এস. থ্রোন ১৯৪০ সালে যুক্তরাষ্ট্রের উটাহ’র লোগানে জন্মগ্রহণ করেন। ১৯৬৫ সালে তিনি নিউ জার্সির প্রিন্সটন ইউনিভার্সিটি থেকে পিএইচডি অর্জন করেন। বর্তমানে তিনি ক্যালিফোর্নিয়া ইন্সটিটিউট অব টেকনোলজিতে থিওরেটিকাল ফিজিক্সের ফেইনম্যান প্রফেসর হিসেবে নিযুক্ত আছেন।

ওয়েবসাইট- https://www.its.caltech.edu/~kip/index.html/

কমেন্ট করুন

মন্তব্য

About Author

আশরাফুল আলম শাওন
আশরাফুল আলম শাওন

সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ার। জন্ম টাঙ্গাইলে। পড়াশোনা করেছেন ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ে, কম্পিউটার সায়েন্স ও ইঞ্জিনিয়ারিং এ।

Leave a Reply