page contents
লাইফস্টাইল, সংস্কৃতি ও বিশ্ব

পরচর্চা—সব সময় খারাপ না!

কয়েক শ বছর ধরে পরচর্চাকে বাতিল করা হয়েছে অশ্লীল এবং ক্ষতিকর বিষয় হিসাবে। বেশিরভাগ মানুষ মনে করে পরচর্চা অত্যন্ত বাজে কাজ এবং সময়ের অপচয়। কারণ পরচর্চা আমাদের সম্মান ও বিশ্বাসের জন্যে ক্ষতিকর।

কিন্তু গবেষণা বলছে ভিন্ন কথা।

gossip 12

পরচর্চা—সব সময় খারাপ না


ইউনিভার্সিটি অব ক্যালিফোর্নিয়া, বার্কলি থেকে পরিচালিত একটি গবেষণায় দেখা গেছে, পরচর্চার উপকারী দিক রয়েছে। এর মাধ্যমে অনেক সময়েই খারাপ ব্যবহার নিয়ন্ত্রণে রাখা যায়, যা অন্যের ক্ষতি করার ইচ্ছা এবং মনের উপর চাপ কমাতে ভূমিকা রাখে।

জার্নাল অব পার্সোনালিটি অ্যান্ড সোশাল সাইকোলজি নামক জার্নাল এর সহ-লেখক এবং ইউনিভার্সিটি অব ক্যালিফোর্নিয়ার সামাজিক মনোবিজ্ঞানী রব উইলার বলেন, ‘যদিও গসিপ বা পরচর্চার বেশ কুখ্যাতি আছে, তবু এটা অনেক ক্ষেত্রেই সামাজিক ভারসাম্য রক্ষায় সহায়ক। এক্ষেত্রে তা হতে হবে ‘প্রোসোশ্যাল’ অর্থাৎ সমাজের জন্যে উপকারী’।

গবেষণায় জানা গেছে, পরচর্চা অনেক সময় থেরাপির কাজ করে। অন্য কাউকে অন্যায় করতে দেখার সময় এই গবেষণার ভলান্টিয়ারদের হার্টবিট বেড়ে গিয়েছিল। যখন তারা এ সম্পর্কে অন্যদের বলতে পেরেছেন এবং সাবধান করতে পেরেছেন তখন তাদের হার্টবিট আবার স্বাভাবিক হয়েছে।

gossipimg d

তিন নারী – পরচর্চা, ফটোশপ ইমেজ ম্যানিপুলেশন, শিল্পী. জে ফ্রিম্যান

উইলার বলেছেন, “খারাপ লাগার অনুভূতি প্রকাশ কিংবা অপ্রিয় মানুষদের নিন্দা করার মাধ্যমে মানুষ ভালো বোধ করে এবং হতাশা কমে।”

ইউনিভার্সিটি অব ক্যালিফোর্নিয়ার গবেষণায় দেখা গেছে, খারাপ বা অপ্রিয় চরিত্র সম্পর্কে অন্যদের সতর্ক করার ইচ্ছা এতটাই তীব্র থাকে যে এর জন্যে লোকে আর্থিক ক্ষতির দায় নিতেও রাজি থাকে।

জার্নাল অব পার্সোনালিটি অ্যান্ড সোশাল সাইকোলজিতে প্রকাশিত এ গবেষণা নিবন্ধটির প্রধান লেখক ইউনিভার্সিটি অব ক্যালিফোর্নিয়ার আরেক সামাজিক মনোবিজ্ঞানী ম্যাথিউ ফিনবার্গ বলেন, যেসব অনুভূতি প্রকাশ করলে অন্যের ক্ষতি নয় বরং সচেতনতা সৃষ্টি হয়, সেসব অনুভূতি প্রকাশ করতে কখনোই অপরাধ বোধ করা উচিত নয়।

তাদের গবেষণার কেন্দ্রেও ছিল এইসব প্রোসোশ্যাল অর্থাৎ সমাজবান্ধব পরচর্চা যার কাজ হলো অসৎ অথবা অবিশ্বস্ত মানুষ সম্পর্কে অন্যদের সতর্ক করা। তবে বিভিন্ন বিখ্যাত ব্যক্তিত্বের ব্যক্তিগত জীবনের খুঁটিনাটি বিষয় সম্পর্কে খোঁজ রাখা এবং এ নিয়ে আলাপচারিতার যে আরেকরকম পরচর্চা চালু আছে, এ গবেষণায় সেসব বাদ দেয়া হয়েছে।

gossip 14

পরচর্চা—সব সময় খারাপ না


গবেষণায় ৪টি ভিন্ন ভিন্ন মনস্তাত্ত্বিক পরীক্ষা চালানো হয়। যার একটিতে ‘ট্রাস্ট গেইম’ নামে একটি খেলার আয়োজন করা হয়েছিল। খেলায় অংশগ্রহণকারীরা একে অন্যের প্রতি কতটা সৎ তা মাপা হয় তারা কী পরিমাণ অর্থ ও পয়েন্ট নিজেদের মধ্যে শেয়ার করেছিলন তার ভিত্তিতে। খেলার কয়েক রাউন্ড শেষ হওয়ার পরে সবাই বুঝতে পারেন, খেলোয়াড়দের মধ্যে কেউ একজন অসততা করছেন এবং পয়েন্ট শেয়ার না করে জমিয়ে রাখছেন।

বিশ্বাসঘাতকতার অনুভূতি তাদের হার্টবিট দ্রুততর করে। তখন তাদের ‘গসিপ নোট’ লিখে নতুন খেলোয়াড়দের এ ব্যাপারে জানানোর সুযোগ করে দেয়া হলে তারা খুশি হন। তাদের মধ্যে অধিকাংশই খেলতে আসা নতুন খেলোয়াড়দের ‘গসিপ নোট’ লিখে বিশ্বাসঘাতকতার কথা জানিয়ে দেন। এতে তাদের হার্টবিট স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে আসে। এছাড়াও নিন্দার শিকার হওয়ার ভয় বেশিরভাগ খেলোয়াড়কেই সাধুতার সাথে খেলতে বাধ্য করে।

দ্বিতীয় পরীক্ষায় সততার সাথে খেলার জন্য পয়েন্ট যোগ করার শর্ত দেয়া হলে অধিকাংশ খেলোয়াড়ই অসাধু খেলোয়াড়দের ব্যাপারে আরও সতর্ক হয়ে ওঠেন এবং আরও বেশি ‘গসিপ নোট’ লিখে তাদের অনুভূতি প্রকাশ করতে থাকেন।

তৃতীয় পরীক্ষায় ‘গসিপ নোট’ পাঠানোর জন্যে তাদের নিজেদের পয়েন্ট থেকে নির্দিষ্ট পয়েন্ট কেটে রাখার শর্ত দেয়া হয়। আরও শর্ত দেয়া হয়, অসাধু খেলোয়াড়ের উপর তাদের ‘গসিপ নোট’-এর কোনো প্রভাব পড়বে না।

তারপরও বেশিরভাগ খেলোয়াড়ই ‘গসিপ নোট’ পাঠায়। ফিনবার্গ বলেন, অর্থনৈতিক ক্ষতি হলেও খেলোয়াড়েরা ‘গসিপ নোট’ পাঠিয়ে অন্য খেলোয়াড়দের সতর্ক করেন যদিও তারা জানতেন এতে অসাধু খেলোয়াড়ের উপর কোনো প্রভাব পড়বে না। এক্ষেত্রে পরচর্চার প্রধান কারণ ছিলো অন্যকে সতর্ক করা।

চতুর্থ পরীক্ষা হিসেবে খেলাটি ‘ইকোনোমিক ট্রাস্ট গেইম’ নামে অনলাইনে চালু করা হয় এবং একই ফলাফল পাওয়া যায়। দেখা যায়, গসিপ নোট পাঠানো শুরু করার সাথে সাথে খেলোয়াড়দের মধ্যে সততা বজায় রেখে খেলার আগ্রহ বাড়তে থাকে।

gossip 17

পরচর্চা—সব সময় খারাপ না

চারটি পরীক্ষার ফলাফল থেকে প্রমাণিত হয়, বিশ্বাসঘাতকতার শিকার হওয়ার অনুভূতি মানুষকে হতাশাগ্রস্থ করে। অন্যের কাছে এই অনুভূতি প্রকাশ করার পর তা কমে।

রব উইলার মনে করেন, পরচর্চা বা নিন্দার মাধ্যমে ক্ষতিকর ও অসৎ লোকদের সম্পর্কে বন্ধু ও পরিচিতদের সতর্ক করা একটি চমৎকার উদ্যোগ। তবে যেসব গুজব মানুষের ব্যক্তিত্বের জন্যে হুমকিস্বরূপ—যার শিকার বিখ্যাত ব্যাক্তিরা প্রায়ই হয়ে থাকেন—সেসব গুজব বা পরচর্চায় তিনি সমর্থন দেন নি।

About Author

ফারাহ্ মাহমুদ

জন্ম. ১৯৯৫। অর্থনীতি বিভাগ, বিইউপি, ঢাকা। প্রকাশিত বই: ডানা ভাঙা পাখি (২০১৩)