page contents
লাইফস্টাইল, সংস্কৃতি ও বিশ্ব

পেন, পুশি ও এক্সপ্রেশন

প্রবেশ

“The award will be given. PEN is holding firm. Just 6 pussies. Six Authors in Search of a bit of Character.”
– Salman Rushdie on Twitter on 27 April

প্রথমে গল্প। লেখকদের সংগঠনের নাম ‘পেন’—দৃশ্যকল্প হিশেবে চমৎকার, সিম্বল হিসেবে বেশ আদিমও বটে। কালিতে কঞ্চির পেন চুবিয়ে লিখছেন গিলগামিশ, এইরকম একটি দৃশ্য মনে পড়ে, যদিও, গিলগামিশ সম্ভবত ওরাল ট্রেডিশনের কবি ছিলেন। তাই কি?

অবশ্য পেন সর্বার্থে আধুনিক লেখকদের সংগঠন; ফ্রী এক্সপ্রেশন এবং লিটারেচার নিয়াই পেনের কারবার। মুক্তমনা? হাঃ, কাছাকাছি শব্দ এটি, বাংলাদেশের আম সমাজেও এর পরিচিতি তৈরি হয়েছে সম্প্রতি। হেইট স্পিচ, বিজ্ঞানমনস্কতা ও টলারেন্ট সোসাইটির ঊনতা ও সমস্যাগুলো মোকাবেলা করতে হচ্ছে আমাদেরকেও। তাই এটি পপুলার বিতর্ক এখানে।আমরা আপাতত সেদিকে না যাই। সেইসবরে আমাদের অভ্যন্তরীন ঝগড়াঝাটির জন্য রেখে দেওয়া যেতে পারে, এই আলাপের সময়টিতে।

এই সংগঠনটি বর্তমান দুনিয়ায় মোটামুটি বিখ্যাত। সালমান রুশদি—সেই নির্বাসিত ভারতীয় লেখক, স্যাটানিক ভার্সেস লেইখা একই সাথে নাম ও দুর্নাম কুড়িয়েছিলেন যিনি—একদা এই সংগঠনের প্রেসিডেন্ট ছিলেন। এমনকি ভদ্রলোক এই সংগঠন প্রবর্তিত ‘ফ্রিডম অব এক্সপ্রেশন কারেজ এওয়ার্ড’ও পেয়েছিলেন একদা। তো, বর্তমান গল্পটি হল, পেন এর আমেরিকান চাপ্টার ২০১৫ সালে এই ‘ফ্রিডম অব এক্সপ্রেশন কারেজ এওয়ার্ডে’র জন্য মনোনীত করেছে শার্লি হেবদো নামের ফরাসি স্যাটায়ার ম্যাগাজিনকে, যা ইসলামের নবীর কার্টুন ছাপিয়ে বিতর্কিত, এর জের ধরেই ইসলামপন্থী আততায়ীদের হামলায় কিছুদিন আগে ম্যাগাজিনটির সম্পাদকসহ বারোজন কর্মী নিহত হয়েছেন। ৫ মে, মানে আজ নিউইয়র্ক সিটিতে একটি অনুষ্ঠানের মাধ্যমে হেবদোকে এই পুরস্কার প্রদান করা হচ্ছে। পাঁচ মে অবশ্যই আমাদের অন্য গল্প আছে, আমরা যেন এ বিষয়ে স্মৃতিকাতর না হই দ্রুতই। দুই বছর আগে দুনিয়ার অন্য প্রান্তে বাংলাদেশ নামের একটি রাষ্ট্রের রাজধানী শহরে রাষ্ট্রীয় বাহিনীর দ্বারা এই দিনে যে হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছিল, তার বিষয়ে অবশ্যই এই উৎসবে কোনো আলাপ বা সমবেদনা হওয়ার সম্ভাবনা কম।

আমরা সেইসব নিয়ে ভাবব না, উপরে যেমন শুরুতেই বলে নিয়েছি। যদিও পেন এর এক্সিকিউটিভ ডিরেক্টর সুজানা নসেল এক পত্রে লেখিকা ডেবোরাহ এ্যাইজেনবার্গকে লেখেন: শার্লি হেবদোর প্রতি আমাদের এই মনোনয়ন একই সাথে ডেনমার্কের কার্ট ওয়েটগার্ড, ফিন নরগার্ড এবং বাংলাদেশের অভিজিত রায়সহ ধর্মীয় ইনটলারেন্সের কারণে দুনিয়ার অন্যান্য হঠকারী খুনগুলোরও প্রতিবাদ।

মানে, আমরা বাংলাদেশরে আপাত এই নোটের মধ্যে এড়াতে চাইলেও, বাংলাদেশ এই আলাপের ভেতরেই ঘুরে ফিরে নিরঞ্জন হিসেবে আছে, থাকবে।

যাই হোক, হেবদোর মনোনয়নের প্রতিবাদে বুকার বিজয়ী লেখক পিটার কেরি এবং ইংলিশ পেশেন্ট এর লেখক মাইকেল অনডাটজে সহ পেন এর ছয়জন গুরুত্বপূর্ণ মেম্বার যারা এই অ্যাওয়ার্ড অনুষ্ঠানের আমন্ত্রিত অতিথি ছিলেন, বয়কটের ঘোষণা দেন। যার কারণ হিসেবে তারা উল্লেখ করেন: যদিও তারা হেবদোর কর্মীদেরকে হত্যা করা কোনোমতেই জাস্টিফায়েড মনে করেন না, একই সাথে তারা মনে করেন হেবদোকে পুরস্কার প্রদানের এই সিদ্ধান্ত পেন এর মৌলিক নীতিমালার সাথে সাংঘর্ষিক। কারণ এর মাধ্যমে হেবদোর অফেন্সিভ কনটেন্টকে প্রমোট করা হয়—যা ফ্রান্সের প্রান্তিক, সংখ্যালঘু ও অনগ্রসর জনগোষ্ঠির প্রতি অবমাননাকর ও নিপীড়ণমূলক।

সর্বশেষ তথ্যমতে প্রায় দেড়শ লেখক এই পুরস্কারের প্রতিবাদে একটি চিঠিতে স্বাক্ষর করেছেন, যা পেনের কাছে পাঠানোর কথা রয়েছে। পেন কর্তৃপক্ষ অবশ্যই আত্মপক্ষ সমর্থনে এক বিবৃতিতে বলেছে, এটি কনটেন্ট নয় কারেজ অ্যাওয়ার্ড। তারা নীতিগতভাবে হেবদোর কার্টুন যাতে ফ্রান্সের জনগণের সংখ্যালঘু ও প্রান্তিক অংশের প্রতি অবমাননা হয়েছে বইলা অভিযোগ উঠেছে, তারে অসমর্থনযোগ্য মনে করে। কিন্তু এই অ্যাওয়ার্ড হলো এক্সট্রিমিস্টদের হুমকি ও সন্ত্রাসের মুখে তারা মত প্রকাশের যে সাহস দেখিয়েছেন—তার জন্য।

পেন আরো জানাচ্ছে, যাদের সাথে তারা একমত হতে পারবেন না, তাদের এক্সপ্রেশনকেও সম্মান জানাতে তারা কুণ্ঠিত নন। এটাই ফ্রিডম অব এক্সপ্রেশনের সৌন্দর্য।

হাঁ, সৌন্দর্যই বটে। এদিকে, বয়কটরত লেখকদেরকে পুশি বইলা গালি দিয়েছেন সালমান রুশদি ২৭ তারিখের এক টুইটার বার্তায়, যিনি পেন এর অন্যতম সদস্য ও এই অনুষ্ঠানে আমন্ত্রিত অতিথিদের একজন, এই অ্যাওয়ার্ডের পক্ষে জোরালো অবস্থান ব্যক্ত করে পেন কর্তৃপক্ষকে চিঠি দিয়েছেন। চিঠিতে তিনি উল্লেখিত লেখকদের মৌলবাদীদের অনুসারী বইলা কটাক্ষও করেছেন।

সালমান রুশদির টুইটার বার্তা

এইটুক পইড়া আমার মাথায় ঘুরছে পেন ও পুশি। মানে, কখন আপনার পেনের মাথায় পুশি উইঠা আসে? এবং পুশিই আপনার এক্সপ্রেশন বা এক্সপ্রেশনের সমার্থক হয়ে ওঠে?

তালাশ: আইন, দর্শন ও ধর্ম
শুরু করা যাক এভাবে। যখন আপনি মত প্রকাশের স্বাধীনতা বইলা কিছু ভাবেন বা অইটা নিয়ে কনসার্নড, এই ভাবনার মাটি কী। কোন ভিত্তিমূলে দাঁড়িয়ে ভাবেন? এই মত প্রকাশের স্বাধীনতা কি আইনের আলোচনা, নাকি দর্শনের। নাকি ধর্মের। আরো পরিষ্কারভাবে বললে, আপনি যখন স্বাধীনতা বলেন, তার ভেতরে একজন স্বাধীনতা দেনেওয়ালা লুকিয়ে থাকে। এই দেনেওয়ালাটি কে?

ধরা যাক, আইনি ব্যাপার। আইনি ব্যাপার হয়ে থাকলে এই দেনেওয়ালাটি হয় আধুনিক রাষ্ট্র। এই রাষ্ট্র হল মত প্রকাশের প্রপাগেটর ফরাসি বিপ্লবোদ্ভূত যে আধুনিকতা, তার ফসল। একই সাথে প্রাণভোমরাও বলা যায়। পুরস্কারপ্রাপ্ত শার্লি হেবদো যে সাংস্কৃতিক ও রাষ্ট্রীয় হেজিমনির ভেতরে বইসা স্বাধীনভাবে মত প্রকাশ (কার্টুন আঁইকা) কইরা থাকে, তার মানমন্দির এই ফরাসি বিপ্লব।

আচ্ছা, যদি রাষ্ট্র হয়ে থাকে, তাইলে পরের প্রশ্ন হল: রাষ্ট্রে আপনি সার্বভৈৗম, নাকি রাষ্ট্র নিজেই? রাষ্ট্র যদি সার্বভৈৗম হয়, নিশ্চিতভাবেই আপনি তার অধীন। এই অধীনতামূলক সম্পর্কে এখানে স্বাধীনতা কই থাকে? বরং রাষ্ট্র থেকেই আপনারে এই স্বাধীনতা যাচতে হয়। এবং বলতে হয়, এইটা আমার সার্বভৌম অধিকার। এইটার জন্য অবশ্যই সোশাল কনট্রাক্টের শরণ নিতে হয়, যা একটা কল্পনা বিশেষ। মানে, আপনি পরিপূর্ণভাবে সার্বভৌম কোনোভাবেই নন, শুধু রাষ্ট্র আপনারে যেটুকু দিতে সম্মত থাকে।

যদিও ফরাসি বিপ্লব একটা ধর্মীয় ভাবাবহে ম্যান অ্যান্ড সিটিজেন চার্টার ঘোষণা করেছে। নিতান্ত বৈষয়িক প্রশ্নের থেকে এই ছদ্ম ধর্মীয় প্রশ্ন হাজির হইছে। ফিউডাল শ্রেণীর বিপরীতে বুর্জোয়া ও পাতিবুর্জোয়া শ্রেণীর ক্ষমতায়নের প্রশ্ন। মত প্রকাশের স্বাধীনতার প্রশ্নটির উদ্ভব এখানেই। কারণ ফিউডাল সমাজে এই শ্রেণীর ক্ষমতা ছিল না, সেই ক্ষমতা তৈরির লক্ষ্যে আধুনিক রাষ্ট্রব্যবস্থার ভেতরে ফ্রিডম অব এক্সপ্রেশন একটা জরুরি উপাত্ত ছিল। ১৭৮৯ সালের ২৬ আগস্ট ফরাসিরা ডিকলারেশন অব দ্য রাইটস অব ম্যান অ্যান্ড দ্য সিটিজেন নামের যে ঘোষণা প্রণয়ন করে, তা বেশ মজার। তার মধ্যে রয়েছে নাগরিকদের স্বাধীনতা, সমতা, সম্পদের অলঙ্ঘনীয়তা, এবং নিপীড়ণের বিরুদ্ধে প্রতিরোধের অধিকার। কিন্তু এই ফরাসি ম্যান এর ধারণা থেকে উইম্যান এক্সক্লুডেড, তা হয়ত আমরা খেয়াল করি না। কারণ ১৯৪৪ সালের আগ পর্যন্ত খোদ ফ্রান্সে নারীর সমান ভোটাধিকার ছিল না, যেখানে ফরাসিদের এই চার্টার ১৭৮৯ সালের। ১৮৯৩ সালে সর্বপ্রথম একটি স্বায়ত্বশাসিত বৃটিশ কলোনি নিউজল্যান্ড প্রথম নারীর সমান ভোটাধিকারের কথা ঘোষণা করে। তাই, একদিকে যখন আধুনিকতার প্রফেটগণ ম্যান বলেন, তখন এই ম্যান স্রেফ পুরুষ বৈ কিছু নয়। আবার ভাবটি হল, এই ম্যান বলিতে সমগ্র হিউম্যান কাইন্ড, যা ইউনিভার্সাল ব্যাপার। মানে, ম্যান বলিতে একটা কিছু প্রিজিউম করা, ধর্ম যেভাবে করে, আশরাফুল মখলুখত। কিন্তু, আপনি যখন হিউম্যান কাইন্ড বলেন, তারে কি রাষ্ট্রে বাঁধা যায়? কারণ, একটা ইউনিভার্সেল হিউম্যান কাইন্ডের ধারণা রাষ্ট্রগঠনের না, রাষ্ট্রের আগল ভাঙার ধারণারে রিলেট করে বেশি। রাষ্ট্রে বাঁধলে যে হিউম্যান হয় নাগরিক, মানে সিটিজেন। তো, সিটিজেনের বাইরে যে ম্যান, তারে রাষ্ট্র কীভাবে আলাপ করবে?

অধিকার, আইন ও কল্পনা
ফ্রিডম অব এক্সপ্রেশন বিষয়ে আমাদের সব আলাপগুলো আইনকেন্দ্রিক। মানে অধিকার। কিন্তু ওখানে ভাবটা যেন দর্শন, মানুষের কোনো একটি ইনহারেন্ট স্বাধীনতা বা সার্বভৌম অবস্থারে প্রিজিউম করা হয়। ধরুন, যা আইনপ্রদত্ত নয়, গড থেকে পাওয়া, কিন্তু আইন দ্বারা হয়ত নির্ণীত হবে। হাবে-ভাবে দর্শন, কিন্তু আইনি আলোচনা। আইন তো ভালগার ব্যাপার। আইন বা সংবিধান তো কোনো কিছুর বিবরণ দেয় না, সেন্সর করাই এর কাজ। কিন্তু পিওর দর্শনগত জায়গা থেকে এর আলাপ তোলারও বিপদ আছে।

ধরুন আপনি দর্শনের পরিসরে এই আলাপটি তুলতে চান। মানুষের এক ইনহারেন্ট সার্বভৌমর কথা আসতে পারে, যার আলোচনা দর্শনে শুরু বা সমাপ্ত হতে পারে না। ধর্মে যেতে হয়। মানে এই স্বাধীনতা দেনেওয়ালা গড। তাইলে অধিকার প্রশ্নটি অবসলুট হয়ে যায়। মানুষের কোন ইনহারেন্ট অধিকার আছে, বা থাকা প্রয়োজন, এই ভেল্যুজ সেকুলার না, ধর্মীয়। কেন না, স্বাধীনতা, সমতা এইসব ভেল্যুজ তো মানুষ সম্পর্কিত প্রিসাপোজিশন তৈরি করে অগ্রসর হয়। আবার এইসব যেহেতু সেক্যুলার পরিমণ্ডলের আলাপ হিসেবে হাজির থাকে, আদতে থিওলজির বাইরে নতুন কোনো আলাপ হাজির করে না। মানে স্রেফ নাগরিক ব্যাপারে শেষ হয়।

ইসলামে মানুষের এক ইনহারেন্ট ফিতরতের কথা বলা হয়েছে, যার মুক্তভাবে সিদ্ধান্ত নেবার, পছন্দ করবার স্বাধীনতা আছে। মুক্ত, মানে দাস অবস্থার বাইরে থেকে চিন্তার ক্ষমতা। তাই ভাল ও মন্দের বিচার করতে সক্ষম মানুষ, মানে জাস্টিস। ইরেসপেকটিভ অব এনি টেক্সট। এই স্বাধীনতা ঠিক অধিকার-উদ্ভূত না, সার্বভৌম-উদ্ভূত, যার কারণে মানুষ বিচার করতে সক্ষম।

আবার, আইনি ইনসট্রুমেন্ট হিসেবে ফ্রিডম অব এক্সপ্রেশনকে ব্যবহারের ঝামেলা আছে প্রচুর। যেমন ১৭৮৯ সালের ফরাসি চার্টার, যার থেকে ফ্রিডম অব এক্সপ্রেশন নিয়ে আমাদের আধুনিক চিন্তা-ভাবনা শুরু হয়, আর্টিকেল ১১ তে প্রথমে ম্যানকে বয়ান করছে এভাবে: The free communication of ideas and opinions is one of the most precious of the rights of man. পরে সিটিজেনের রাইট ডিফাইন করছে এভাবে: Every citizen may, accordingly, speak, write, and print with freedom. কিন্তু হুশিয়ার করে দিচ্ছে: shall be responsible for such abuses of this freedom as shall be defined by law. আপনি যদি আরো পরে যেতে চান, তাইলে ইউনিভার্সাল ডিকলারেশন অব হিউম্যান রাইটসের আর্টিকেল নাইনটিন পইড়া দেখতে পারেন, যা ১৯৪৮ সালে গৃহীত হইছে, যা শুরুতেই বলছে: All human beings are born free and equal in dignity and rights. They are endowed with reason and conscience and should act towards one another in a spirit of brotherhood. তারপরে আর্টিক্যাল ১৯ এ বলছে: Everyone has the right to freedom of opinion and expression; this right includes freedom to hold opinions without interference and to seek, receive and impart information and ideas through any media and regardless of frontiers. তারপরে আর্টিকেল ২৯ এ বলছে: In the exercise of his rights and freedoms, everyone shall be subject only to such limitations as are determined by law solely for the purpose of securing due recognition and respect for the rights and freedoms of others and of meeting the just requirements of morality, public order and the general welfare in a democratic society.

আইন মানেই সীমা ও নিয়ন্ত্রণ। তাই দেখা যায়, রাষ্ট্রগুলো সাধারণত মত প্রকাশকে বাধাপ্রদান করে অনেকগুলো সীমা বেঁধে দিয়ে। যার মধ্যে আছে, রাষ্ট্রদ্রোহ, উস্কানি, ক্লাসিফায়েড ইনফরমেশন, কপিরাইট লঙ্ঘন, বাণিজ্যিক গোপনীয়তা, অপ্রকাশযোগ্য চুক্তি, ব্যক্তি গোপনীয়তার অধিকার, জননিরাপত্তা, পাবলিক অর্ডার, পাবলিক উৎপাত ও ভায়োলেন্স। এইসব লিমিটেশন হার্ম প্রিন্সিপল দিয়ে জাস্টিফায়েড করা হয়, যেখানে কিনা মত প্রকাশ সমাজ, স্পেশাল ইন্টারেস্ট গ্রুপ বা ব্যক্তির জন্য আক্রমণাত্মক বিবেচিত হয়।

সালমান রুশদি

কনটেন্ট, এক্সপ্রেশন, সাহস ও স্বাধীনতার বাহাস

“If we only endorsed freedom of speech for people whose speech we liked that would be a very limited notion of freedom of speech. It’s a courage award, not a content award.”
-Andrew Solomon, president of PEN

এই পুরস্কার সুনির্দিষ্টভাবে কার্টুনের জন্য, নাকি কার্টুন প্রকাশে যে মত প্রকাশের সাহস তারা দেখিয়েছে তার জন্য? এইটা একটা মজার তর্ক বৈকি।

শার্লিরে পুরস্কার দেওয়া ব্যাপারে পেন এর আত্মপক্ষ সমর্থন ছিল, এটি সাহসের জন্য পুরস্কার। কনটেন্ট নিয়ে তাদের সমর্থন এখানে জরুরি নয়।

তাই কি?

ফ্রান্সিন পোজ (বয়কটকারী)

তাইলে তো যারা শার্লি হেবদোর স্টাফদের হত্যা করেছে তারাও সাহসের কাজই করেছে। রাষ্ট্রশক্তিরে বা ডমিনেন্ট শক্তিরে ইগনোর করে, শাস্তির ভয়কে পাত্তা না দিয়ে প্রকাশ্য দিবালোকে হত্যা করতে যাওয়া, এইটা তো সাহসই। বিপরীতে শার্লি হেবদো একটা রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা বলয়ে বইসা ফ্রিডম অব এক্সপ্রেশন প্রয়োগ করে, যাতে অন্যরা হার্ট হয়।

এখানে পরস্পর বৈপরীত্যগুলোরে নোট করা যেতে পারে। যেমন, ফ্রিডম অব এক্সপ্রেশন এর স্পিরিটে কি একই সাথে অন্যরে হার্ট না করার স্পিরিটটাও যুক্ত নেই? আবার, ইউএন চার্টারে একই সাথে রাইট টু রেসিস্ট অপ্রেশনের কথাও বলা আছে, যা স্টেট পাওয়ারের সাথে সংশ্লিষ্ট।

শার্লি হেবদো এক ধরনের ফ্রান্সের স্টেট পাওয়ার বা ডমিনেন্ট পাওয়ারের কালচারাল হেজিমনি সার্ভ করে, যেখানে শার্লির বিদ্রূপের বিষয়বস্তু ক্ষমতাহীন মুসলিমরা, যারা অপ্রেসড। তো, এখানে বরং হত্যাকারীরা একটু বেশি সাহসী, যেহেতু পেন শুধু সাহসরে বিবেচনা করছে। হাঁ, এইটা ফেনাটিক ব্যাপার বটে, অন্য এক ফেনাটিসিজিমের বিরুদ্ধে। ভায়োলেন্সও বটে, যা রীতিমত খারাপও, আপনারা যেহেতু মনে করেন।

আর একটি বিষয় আলাপে আসতে পারে। এক্সপ্রেশনের উত্তরে অ্যাসল্ট, শারীরিক আঘাতরে অবমূল্যায়ন। ধরুন, আমি আপনারে গালি দিলাম, পুশি, আর আপনি আমারে মারতে পারবেন না, এই ভেলুজের মূল ভিত্তি হলো—বডি এবং মাইন্ড আলাদা।

রেনে দেকার্তের এই প্রত্যয় মডার্নিজমের প্রধান প্রিসাপোজিশনগুলোর একটি। ফলে আপনি যখন কাউরে গালি দেন, হার্ট করে কথা বলেন, আর সে যদি আপনারে শারীরিকভাবে আঘাত করে, ঘুষি মারে প্রত্যুত্তরে, আপনি তার ব্যাপারে অভিযোগ করেন যে, আমার মুখের কথার জন্য অন্যায্যভাবে শারীরিকভাবে আঘাত করা হল। কথা বলা, মত প্রকাশ—স্রেফ এইটারে একটা পবিত্র ব্যাপার বইলা যে মত, তার ইতিহাস অল্প দিনের, ভলতেয়ারের দেশের আলাপ এটি, এইটা আমরা উপরে মনে রেখেছি।

মডার্ন ফেনোমেনার এই ঝামেলা আপনি ইসলামিস্টদের উত্যক্ত করার ঘটনায় বুঝবেন না, কিন্তু নারীকে উত্ত্যক্ত করার ঘটনায় কেন নারীবাদীরা শরীরের উপরে শাস্তি প্রদানকে গুরুত্বপূর্ণ করে তোলে, শাস্তিকে আলোচনায় আনে, তা ভেবে উঠতে পারবেন।

আমরা উপরে বলেছি, ফ্রিডম অব এক্সপ্রেশনের সাথে রাষ্ট্রের প্রিসাপোজিশন জরুরি। আবার, রাষ্ট্ররে বৈধতা দেওয়ার জন্য রাষ্ট্রের মধ্যে ফ্রিডম অব এক্সপ্রেশনের প্রবক্তারা একই সাথে সামাজিক চুক্তির কথা বলেন। কিন্তু, সামাজিক চুক্তি আপনারে একই সাথে লিমিট কইরা দেয়। সবার আগের লিমিটেশন হল রাষ্ট্র—মানে স্বয়ং এই চুক্তি। তারপরে লিমিটেশন হল—এই চুক্তি ভাইঙ্গা যায়, এমন কোনো ফ্রিডমরে এলাও করবে না এই ফ্রিডম অব এক্সপ্রেশন।

তার মানে, আপনি ফ্রিডম অব এক্সপ্রেশনকে পুরস্কার দানের নামে এমন কিছুরে প্রমোট করতে পারেন কি, যা অন্যের এক্সপ্রেশনকে অসম্মান করে, যা এই সামাজিক চুক্তিরেই ভাইঙ্গা ফেলতে উসকে দেবে—এমন পরিস্থিতি আনবে?

সম্ভবত না। কারণ তখন রাষ্ট্র থাকবে না, যে আপনার এই স্বাধীনতা দেনেওয়ালা।

পেন ও পুশির সংলাপ
পেন ও পুশি, এই লেখার শুরুতে লেখক সালমান রুশদির টুইট বার্তাটির কথা উল্লেখ করেছি। তিনি পেনের অনুষ্ঠান বয়কটকারী ছয়জন লেখককে পুশি বইলা গালি দিয়েছেন।

কখন আপনার পেনের মাথায় পুশি উইঠা আসে? এবং পুশিই আপনার এক্সপ্রেশন হয়ে ওঠে? মজার ব্যাপার হচ্ছে, ইউরোপ বা আমেরিকান ফ্রিডম অব এক্সপ্রেশনবাদীরা আমাদেরকে যে এক্সপ্রেশনের প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে বলছে, এটি তাই। শার্লি হেবদোর কার্টুনও ছিল যা। বা, রুশদি যখন পুশি বইলা গালি দেন, পুশি—এইটা শুধু গালি না, একই সাথে সেক্সিস্ট ও জেন্ডার্ড কমেন্টও। বা, আপনি ধরুন, ধর্মরে বিদ্রূপে উদার, কিন্তু নারীরে বিদ্রূপে উদার তো? আরো পরিষ্কারভাবে বুঝলে, এই পরিস্থিতিতে আমাদের প্রশ্ন হতে পারে, পেন ও পুশির সংলাপকে আপনারা কীভাবে সম্ভব কইরা তুলতে চান? আপনি যেভাবে বলেন, এক্সপ্রেশনের বিপরীতে আঘাত নয়। কিন্তু পুশিরে কি এক্সপ্রেশন হিসেবেই নেবেন? এই এক্সপ্রেশন ধুইয়া আপনারা পানি খাইতে পারেন, কিন্তু বর্ণবাদ, পুরুষতন্ত্র ও ঘৃণার বিরুদ্ধে মানুষের মানবিক মর্যাদার লড়াইয়ের প্রশ্ন সমাধা হয় না, বরং তা ফুলে ফেঁপে লেভিয়াথানের মত জুড়ে বসে মাত্র।

আমেরিকার মন: ইউরোমেরিকা
আমেরিকার মনটি কেমন? দাস? এইটা একটা অবদমনের মন অবশ্যই, যার স্বর্গভূমি ছিল আমেরিকা। ইউরোপ থেকে আসা বর্ণবাদের আলো, আমেরিকাকে আলোকিত করেছিল। কলোনির দাস, এমন একটি মন আমেরিকার হওয়া সম্ভব, কারণ কলম্বাসের আমেরিকা আবিষ্কারের ধারাবাহিকতায় ভিন্ন ভিন্ন সময়ে স্প্যানিশ, ফরাসি, ইংরেজ ইত্যকার ইউরোপিয়ান কলোনি হিসেবে ছিল। এই কলোনিয়াল মাইন্ড তো আমেরিকার আছে।

টেজু কোলে (বয়কটকারী)

তো, শার্লি হেবদোর এই মনোনয়নের মূলে থাকতে পারে আমেরিকান জাতির কলোনির পুরনো প্রভুদের প্রতি দাসভাব ও কৃতজ্ঞতাবোধ। আমেরিকান যে গণতন্ত্র বা কন্সটিটিউশন তাও তো ফরাসি বিপ্লবের কাছে ভাবগতভাবে ঋণী। এমন কি তার স্বাধীনতাও, আমেরিকার স্বাধীনতাযুদ্ধে ফ্রান্সের গুরুত্বপূর্ণ অবদান ছিল। ফরাসি ও অন্যান্য ইউরোপীয় কলোনির অধীনেও ছিল আমেরিকা অনেকদিন। যে স্ট্যাচু অব লিবার্টি আমেরিকার স্বাধীনতার পবিত্র প্রতীক, তা আমেরিকানদের প্রতি ফ্রান্সের উপহার ছিল, তা তো আপনারা জানেনই। পেন আমেরিকার এই পুরস্কার কি ফরাসি রেভলুশনের প্রতি আমেরিকানদের কৃতজ্ঞতাস্বরূপ?

পেন এর লিডারশিপের প্রতি এক ইমেইলে ৫ মের পুরস্কার অনুষ্ঠান বয়কটকারী লেখক দের অন্যতম রাচেল কুশনার পেনের এই পুরস্কার মনোনয়নকে ফ্রেঞ্চ জাতির কালচারাল এলিটিজম ও দাম্ভিকতার প্রতি পেনের অন্ধ ভক্তি বইলা অভিহিত করেছেন, যে জাতি তার পপুলেশনের বড় অথচ অনগ্রসর প্রান্তিক জনগোষ্ঠির প্রতি দায়কে অসম্মান ও অস্বীকার করে। এইটা তাহলে অত্যুক্তি নয়, বরং ঐতিহাসিক পরম্পরা?

কুশনার আরো বলেন, তার উইথড্রর কারণ হল, হেবদোর এই ব্যাপারটির প্রতি অস্বস্তি , যাতে ওরা সাংস্কৃতিক অসহিষ্ণুতা ও আরোপিত সেকুলার দৃষ্টিভঙ্গির প্রয়োজনে শক্তি প্রদর্শনকে প্রমোট করে। এখানে অবশ্যই আরো একটি অপ্রকাশ্য কারণের কথা বলা যায়, যা নাসরিন মল্লিক নামে সুদানী বংশোদ্ভূত লন্ডনের বসবাসকারী লেখক তার দি গার্ডিয়ানের কলামে উল্লেখ করেছেন: হেবদো এখন—ইউরোপ জুড়ে ইমিগ্রেন্টদের প্রতি বিদ্রূপ এবং আক্রমণাত্মক যে ভঙ্গি, তা রিপ্রেজেন্ট করে, যার কারণে এই অ্যাওয়ার্ড দেওয়া হতে পারে।

লক্ষণীয়, এই নতুন ইমিগেগ্রন্টদের বেশির ভাগই মুসলিম। ইউরোপে মুসলমানদের ব্যাপারে যে আদারনেসের ধারণা, সেই ঘৃণা ও তৎপ্রসূত ভয়ের সংস্কৃতি? অরিয়েন্টালিস্টদের ইসলাম বা প্রাচ্যমূর্তি তৈরির বিস্তারিত বিবরণ আমরা ফিলিস্তিনী লেখক অ্যাডওয়ার্ড সাঈদে পেয়েছিলাম। ইসলাম কোনো না কোনো ভাবে যে আদার পজিশনে ছিল ইউরোপের মন মানসিকতায়, এটি তাই প্রমাণ করে।

আমরা এবং ওরা
গার্ডিয়ানে সালমান রুশদির পুশি বিষয়ক নিউজের নিচে কমেন্টগুলো পড়ছিলাম। এক আমেরিকানের কমেন্ট: মুসলমান কখনোই সাচ্চা আমেরিকান বা ইউরোপিয়ান হয়ে উঠতে পারে না, অতএব, রুখতে হবে ওদের।

এই প্রশ্নের উত্তরটা সহজ। তাদের কখনোই জায়গা দেওয়া হবে না। মূলত মুসলমানদের জন্য এইটা খুব একটা গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন না যে, আমেরিকা বা ফ্রান্স রাষ্ট্র হিসেবে কতটা ইসলামিক চরিত্র ধারণ করে। বরং মুসলমানদেরকে রাষ্ট্র হিসেবে আমেরিকা বা ফ্রান্স ফেসিলিটেট করতে উদার বা গণতান্ত্রিক কিনা, মর্যাদাপূর্ণ ভাবে সমতার ভিত্তিতে গ্রহণে প্রস্তুত কিনা, যার গালভরা বুলি দিয়ে উপরে এতসব তত্ত্বালোচনা, সেইটাই গুরুত্বপূর্ণ।

আমরা এবং ওরা—এই ভাব অবশ্যই একটা জেহাদি পরিস্থিতি। এবং এই আদারনেসের মধ্য দিয়ে বেড়ে ওঠা যে দূরত্ব, তা মত প্রকাশের স্বাধীনতা, স্বাধীন মানুষ ভাবনা, এইসব ফুলানো বেলুন নিয়ে সমাধা করা রীতিমত অসম্ভব। যেখানে কিনা, এর প্রপাগেটরদের মধ্যেই বর্ণবাদ ও জাতিগত ঘৃণার অসুখ লুকিয়ে আছে।

পরিশিষ্ট

পিটার কেরি, মাইকেল অনডাটজে, ফ্রান্সিন পোজ, টেজু কোলে, রাচেল কুশনার এবং টেইয়ি সেলাসির মতো বিখ্যাত লেখকদের পেন আমেরিকার ঘোষিত ফ্রিডম অব এক্সপ্রেশন কারেজ অ্যাওয়ার্ড বয়কট ঘোষণার খবর নিশ্চিত করেছে নিউইয়র্ক টাইমস, দি গার্ডিয়ান এবং স্বয়ং পেন আমেরিকার ওয়েবসাইট। এই বয়কটের কারণ হিসেবে তারা দেখিয়েছেন পুরস্কারের জন্য মনোনীত ম্যাগাজিনটির কালচারাল ইনটলারেন্সে। ফ্রান্সের এই স্যাট্যায়ার ম্যাগাজিনটি এর আগে উপর্যুপরি ইসলামের নবীর ছবি ও কার্টুন ছাপিয়েছে, যাকে মুসলমানরা অফেনসিভ মনে করেছে সব সময়। এ বছর জানুযারিতে দুজন মুসলিম গানম্যান দ্বারা শার্লি হেবদোর অফিস আক্রান্ত হয় এবং এতে হেবদোর ১২ জন কর্মী মারা যায়। এই দুই গানম্যান যাদের নাম সাঈদ এবং শেরিফ খোয়াছি, প্যারিসের পুলিশের গুলিতে তৎক্ষনাৎ মৃত্যুবরণ করে। এর পরেই শার্লি হেবদো তার পত্রিকার প্রচ্ছদে ফের নবীর কার্টুন ছাপায়, যাতে ক্রন্দনরত নবীর হাতে একখানা ব্যানার জুড়ে দেয়া হয়। ব্যানারে লেখা: ‘আমিই শার্লি’।

rachel-kushner

লেখকদের বয়কট ঘোষণার পরে পেন এর বর্তমান প্রেসিডেন্ট অ্যান্ড্রু সলোমন পেন এর ট্রাস্টিদের কাছে এক পত্রে বলেন, পেন মত প্রকাশের স্বাধীনতা এবং শার্লি হেবদো বাস্তবে যা প্রকাশ করেছে বিভিন্ন সময়ে—তার মধ্যে প্রভেদ করে। এই পুরস্কার শার্লি হেবদো যা প্রকাশ করেছে, তার সাথে একমত নয়।

২৬ তারিখে এক পত্রে সলোমন বলেন, চরমপন্থীদের ভায়োলেন্ট থ্রেটকে উসকে দেওয়া ছাড়াও হেবদো কার্টুন অন্য মুসলিমদের ও অন্য কমিউনিটির সদস্যদেরও আঘাত করেছে। কিন্তু, তাদের নিজেদের স্টেটমেন্ট এর উপরে ভিত্তি করে আমরা বিশ্বাস করি যে, শার্লি হেবদোর উদ্দেশ্য মুসলিমদের একঘরে করে রাখা ও বিদ্রূপ করা নয়, বরং স্বল্পসংখ্যক মৌলবাদী চরমপন্থী কর্তৃক কথা বলার বড় পরিসরকে সীমাবদ্ধ করে দেবার যে চেষ্টা, তাকে রিজেক্ট করা। কথা বলার সে পরিসরের বিষয়, উদ্দেশ্য বা ফলাফল যাই হোক না কেন।

তিনি যোগ করেন, এখানে নিষিদ্ধ এক্সপ্রেশনের আইডিয়াকে অস্বীকার করার সাহসের ব্যাপার আছে, যা আপনাকে বলতে নিষেধ করা হয়েছে, তা বলতে পারার ক্ষমতা।

সলোমন একই সাথে পেন এর সিদ্ধান্তের সমর্থনে বিভিন্ন চিঠি পেশ করেছেন, যেখানে নির্বাসিত ভারতীয় লেখক সালমান রুশদির মতামতও রয়েছে। রুশদি বলছেন, বিরক্তিকর ‘কিন্তু’গুলোরে প্রশ্রয় না দিয়ে পেন এর উচিত শার্লি হেবদোর ত্যাগের প্রতি সম্মান করা এবং তাদের হত্যার প্রতিবাদ করা।

রুশদির মতে, এই ইস্যুটির অপ্রেসড এবং প্রান্তিক বা সুবিধাবঞ্চিত সংখ্যালঘুর বিষয়ে কোনো কাজ নেই। বরং এর অবশ্যই ফ্যানাটিক ইসলামের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার সব রকমের দায়িত্ব রয়েছে, যা হাইলি অর্গানাইজড, ওয়েল ফান্ডেড এবং যা আমাদের সবাইকে আতঙ্কিত করতে ব্যস্ত, মুসলমান, একই সাথে নন মুসলমানদেরকে, একটি ভীতিকর নিরবতা তৈরির মাধ্যমে।

বুকার বিজয়ী লেখক পিটার কেরি, বয়কটকারী লেখকদের অন্যতম, নিউইয়র্ক টাইমসকে বলেছেন, একটি ভয়ঙ্কর অপরাধ ঘটেছে, কিন্তু এই প্রশ্নটি পেন আমেরিকার সেলফ রাইশাস হিসেবে বিবেচনা করা উচিত, পেন আমেরিকার জন্য আদৌ এই বিষয়টি মত প্রকাশের স্বাধীনতার ইস্যু কিনা।

টেইয়ি সেলাসি (বয়কটকারী)

লেখিকা ডেবোরাহ অ্যাইজেনবার্গ, যিনি তার নামের পরে ইহুদি ও এথিস্ট বইলা পরিচয় দিতে পছন্দ করেন, পেন এর এক্সিকিউটিভ ডিরেক্টর সুজানা নসেলের কাছে এই মনোনয়নের সমালোচনা করে চিঠি লেখেন। চিঠিতে তিনি বলেন: একসেপটেবল মাত্রাকে ভায়োলেট করে এমন এক্সপ্রেশনকে সমর্থন করা আর সেই এক্সপ্রেশনকে সোৎসাহে পুরস্কার দেওয়ার মধ্যে ক্রিটিক্যাল পার্থক্য রয়েছে। দেখে শুনে মনে হয়, এই ম্যাগাজিনটি সংগঠিত ধর্মগুলোকে বিদ্রূপ ও অবজ্ঞা করার নিজেদের এনার্কিস্ট তরিকার প্রতি খুবই যত্নশীল। কিন্তু একটি অসমতাপূর্ণ সমাজে আক্রমণের সমান সুযোগ সুবিধা একই ফলাফল আনে না। ক্ষমতা প্রশ্নটি হল সবচেয়ে জরুরি বিবেচ্য। স্যাটেয়ারসহ যে কোনো রকমের ডিসকোর্সকে বিবেচনা করার সময় এই ক্ষমতা ব্যাপারটি অবশ্যই চিহ্নিত করতে হবে।

ফ্রেঞ্চ সমাজের একটি নির্দিষ্ট অংশ, যারা ফ্রান্সের বিভিন্ন কলোনিয়াল আগ্রাসনের ভিকটিম ও ইতিহাসজাত, এবং যাদের মধ্যে রয়েছে ধর্মপ্রাণ মুসলমানদের বড় অংশ—শার্লি হেবদোর অঙ্কিত নবীর কার্টুন হল উদ্দেশ্যপূর্ণভাবে তাদেরকে আরো অপমান ও ভোগান্তির মধ্যে ফেলা।

অ্যাইজেনবার্গের মতে, হেবদো শুধু বর্ণবাদী ও বিদ্রূপাত্মক কার্টুনই আঁকে নাই, সেখানকার রাজনৈতিক, সামাজিক ও ভাষাগত এসটাবলিশমেন্টকে হেবদো এই বিদ্রূপের আওতামুক্ত করে রেখেছে।

এই বয়কটের মধ্য দিয়ে মত প্রকাশের স্বাধীনতা তর্কের সমস্ত সীমাবদ্ধতা ও নিরর্থকতাগুলো সামনে এসেছে, সুনির্দিষ্টভাবে মুসলমান এবং সাধারণভাবে সংখ্যালঘু প্রশ্নকে মুখোমুখি করার মাধ্যমে।

কার্টুনিস্ট গেরি ট্রুডুর মতে, দুর্বল, অধিকারহীন সংখ্যালঘুদেরকে স্থূল ও রুচিহীন অংকনের মাধ্যমে যা ঠিক কার্টুন নয়, গ্রাফিটির পর্যায়ে পড়ে, শার্লি হেইট স্পিচের ডোমেইনে সচেতনভাবে ঢুকে পড়েছে।

About Author

রিফাত হাসান

জন্ম ১৭ জানুয়ারি, ১৯৮০। কবিতা, ধর্ম, আইন ও রাজনীতিতে আগ্রহ। ভাষা চাটগাঁইয়া ও বাংলা। প্রকাশিত গ্রন্থ: 'সম্পর্ক, বন্ধুত্ব ও রাজনীতি'—দুয়েন্দে পাবলিকেশনস, ফেব্রুয়ারি ২০১৪। 'এই সময়টি আপনি কীভাবে উদযাপন করবেন’—দুয়েন্দে পাবলিকেশনস, ফেব্রুয়ারি ২০১৫। পারসোনাল ব্লগ: rifathasan.info