একেকটা বিষয় নিয়ে ডুবুরির মতো কাজ করেছে অদ্রীশ।

আটের দশকের মাঝামাঝি প্রেসিডেন্সি কলেজে বাংলা বিভাগে পড়তে এসেছিল অদ্রীশ, হুগলী জেলার মাহেশ শহর থেকে।

আমি ছিলাম পরিসংখ্যানতত্ত্বের ছাত্র, কিন্তু সাহিত্যের প্রতি অনুরাগ থাকায় সাহিত্যের ছাত্রছাত্রীদের সঙ্গে আমার খুব মেলামেশা ছিল। এছাড়া আমার বাবা প্রয়াত প্রশান্তকুমার দাশগুপ্ত তখন প্রেসিডেন্সির বাংলার অধ্যাপক, সুতরাং ওই বিভাগের নতুন কোনো ছাত্র ভর্তি পরীক্ষায় কেমন উত্তর লিখেছে, আর ক্লাসে কে কী রকম প্রশ্ন করেছে এই খবর রাতের খাওয়ার টেবিলে আমরা পারিবারিকভাবে উপভোগ করতাম।

ফলে, ইতিহাস পড়তে আসা অচ্যুত মণ্ডল এক বছর পরেই ঢুকে যাবে বাংলা বিভাগে, শম্পা সেন বলে একটি মেধাবী মেয়ের খাতায় অরুণ চক্রবর্তীর কবিতার মুগ্ধকর বয়ান, ‘পথের কবি’র লেখক কিশলয় ঠাকুরের কন্যা স্বাতীর ভর্তি হওয়া, এসব খবর আমার কলেজের গল্পসূত্রে বাড়িতেই জানা হয়ে যেত।

তার সঙ্গে যোগ হত অন্যান্য অধ্যাপক-দের গল্প—কী চমৎকার অনুবাদ করেছেন সুকান্ত চৌধুরি সুকুমার রায়ের কবিতা, অরুণবাবুর (ঘোষ) ক্লাসে কোন ছাত্র গোল করেছে, বাবুরামবাবু এবার বিভাগের লাইব্রেরিতে কী কী বই অর্ডার করলেন, প্রতিষ্ঠাতা দিবসের অনুষ্ঠানে নতুন করে আবার কলেজের ইতিহাস লিখতে হবে তাঁকে, শুনতাম এইসবও।

এইভাবেই শুনেছিলাম বঙ্কিমচন্দ্রের উপন্যাসের পাতার থেকে উঠে আসা রথযাত্রাখ্যাত মাহেশ শহরের বাসিন্দা অদ্রীশের কলেজে ভর্তি হওয়ার গল্প। “এই বয়সেই বিস্তর দেশবিদেশের সাহিত্যের পড়াশোনা করে এসেছে ছেলেটি”, বলে বাবা জানালেন।

অদ্রীশের সঙ্গে প্রথম আলাপ কলেজের ক্যান্টিনে, আমরা দুজনেই তখনও কৈশোর অতিক্রম করি নি, অদ্রীশের কণ্ঠস্বরের লালিত্য তখনও যায় নি, সদ্যবিকশিত শ্মশ্রুগুম্ফমণ্ডিত হাসিমুখ সবার দিকে প্রসারিত।

প্রথম আলাপেই নতুন নতুন সব খবর জানাল সে আমাদের, তার নতুন বন্ধুদের। বিদেশি কোন কবির কবিতা পড়ল সদ্য (লাতিন আমেরিকা ধরেছিল তখন), কলকাতার থেকে অনেক দূরের কোন গ্রামে বসে নতুন এক কবি কী লেখা লিখলেন, কীভাবে লিটল ম্যাগাজিন আন্দোলনের কবিরা নিরন্তর পরীক্ষা নিরীক্ষা করছেন লেখালেখি নিয়ে—এই মেন স্ট্রিম সাহিত্যের হাটবাজারের থেকে দূরে বসে, এইসব নিয়ে তার দারুণ উত্তেজনা।

খুব তাড়াতাড়ি একটা বৃত্ত তৈরি হল আমাদের, এইসব গল্প আর তর্কের প্রয়োজনে। শিলিগুড়ির অচ্যুত মণ্ডল, কলকাতারই বিপ্লব মুখোপাধ্যায়, প্রবীর দাশগুপ্ত, অদ্রীশ, আর আমি। মাঝে মাঝে এই আড্ডায় এসে যোগ দিত শ্রীরামপুরের মেয়ে, স্কটিশ চার্চ কলেজের ছাত্রী মহুয়া চৌধুরী (তাকে মৌহা বলত অদ্রীশ)। তখনই তার কবিতা আমাদের মুগ্ধ করে দেশ পত্রিকায়। আর আসত মেদিনীপুর থেকে করুণাময়ীতে এসে স্থিতু হওয়ার চেষ্টায় বিশ্বজিৎ পণ্ডা , যার ‘শস্যফলনের হাসি’ কবিতাটি আমাদের মুখে মুখে। এই দলে পরে আড্ডায় যোগ দিয়েছে আরো অনেকে, খানিকটা সিনিয়র জয়দেব বসু তাদের অন্যতম।

অদ্রীশ বিশ্বাস ও মৌ ভট্টাচার্য, কলকাতা আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসব, ২০১১

আড্ডা দিতে দিতে মাথায় এল কবিসম্মেলনের পরিকল্পনা। তুমুল উত্তেজনায় বেকার ল্যাবোরেটরির দোতলায় ফিজিক্স ডিপার্টমেন্টের হল-ঘরে কবিতা পড়ার অনুষ্ঠানও করে ফেলা গেল একদিন, সেখানে কবিতা পড়তে এসেছিলেন আমাদের প্রিয় ষাট ও সত্তরের কবিরা—জয় গোস্বামী,‌ মৃদুল দাশগুপ্ত, রণজিৎ দাশ, নিশীথ ভড়, প্রসূন বন্দ্যোপাধ্যায়, ভাস্কর চক্রবর্তী, দেবদাস আচার্য, আরো অনেকে।

তিরিশ বছর আগের কথা, আরো কারা এসেছিলেন মনে পড়ছে না। এই অনুষ্ঠানটির পরিকল্পনা, দৌড়োদৌড়ি, কবিদের সঙ্গে যোগাযোগ করা, হলের ব্যবস্থা করা, চা আর জলখাবারের বন্দোবস্ত করা, সবই অদ্রীশের নেতৃত্বে হয়েছিল। অত অল্প বয়সেই সবাইকে ব্যক্তিগত ভাবে চিনত সে। পরিচয় পত্রিকার সম্পাদক থেকে শুরু করে যে-কোনো বয়সের কবি, গদ্যকার, প্রাবন্ধিক, লিটল ম্যাগাজিনের কর্মী, কলেজ স্ট্রিটের বইয়ের দোকানের কর্মী, কফি হাউসের বেয়ারা, প্রকাশনা সংস্থার মালিক, বই ছাপার দোকান, কাগজের সাপ্লাই, বাঁধাই করার উপযুক্ত ব্যবসায়ী, লিফলেট কোথা থেকে করা যায়, এবং এই বিরাট যোগাযোগবিশ্বের প্রতিটি মানুষ সম্পর্কে তার নিজস্ব বিচার।

কে ভালো, কে ততটা নয়, কার সঙ্গে কাজ করা চলবে না, কার কবিতা না পড়লেও চলবে, কার লেখা না পড়লে মূর্খ থেকে যাবো—এগুলি সে নিজের সৌজন্যপূর্ণ ভদ্রতার সঙ্গেই বলত।

স্টাইলে অনেক বেশি একরোখা আর চরমপন্থী ছিল অচ্যুত, সুধীন্দ্রনাথের দীপ্র লাইন ‘একটি কথার দ্বিধাথরথর চূড়ে/ ভর করেছিল সাতটি অমরাবতী’ বলার সময় গলা ভার হয়ে আসতো তার, বিনয় মজুমদারের ‘একটি উজ্জ্বল মাছ একবার উড়ে/ দৃশ্যত সুনীল কিন্তু প্রকৃত প্রস্তাবে স্বচ্ছ জলে/ পুনরায় ডুবে গেল’—বলতে বলতে সে নিপাত করত পুরস্কৃত বিখ্যাত কবিদের। কিন্তু অতটা ইমোশনাল ছিল না অদ্রীশ, সে কেবল হাসত। একদিন বললো, যাবি, বিনয়দার কাছে, দেখা করতে?

হাসপাতালে যাওয়া হলো একদিন সবাই মিলে। সবাই বলতে অদ্রীশ, অচ্যুত, বিপ্লব, আর আমি। সেখানে গিয়ে দেখলাম বিনয় মজুমদারকে। দেয়াল জোড়া অঙ্কের সমীকরণ লেখা, কোথাও কোথাও অদ্ভুত সব উক্তি। বিড়ি ধরিয়ে কবি পরিচয় করলেন আমাদের সঙ্গে, সম্পূর্ণ সুস্থ মনে হল তাঁকে। এই শুরু, তারপর বেশ কয়েকবার গেছি তাঁকে দেখতে।

বাইরে ইমোশন কম দেখালেও, ভিতরে ভিতরে ভারি অভিমানী ছিল অদ্রীশ। আর, খুব অল্প হলেও, ক্বচিৎ-কদাচিৎ তার একটা প্রকাশ ঘটে গেলে আমরা তার হাস্যোজ্জ্বল ব্যক্তিত্বের সঙ্গে তার এই বেদনাঘন রাগ-কে মেলাতে পারতাম না। অথচ খুব মিষ্টি ছিল এই অভিমানের বিষয়গুলি। যেমন, আমরা মেনস্ট্রিম সাহিত্য পড়ি কিন্তু রমা ঘোষের কবিতা কেন পড়ি নি, এই নিয়ে সে একদিন মুখ গম্ভীর করে রইল। যেন আমাদের ওই ঊনিশ বছর বয়সের পড়ার এত অল্প পরিধি নিয়ে সে অত্যন্ত হতাশ।

যে সময়ের কথা বলছি সে সময়ে ইন্টরনেট ছিল না, মোবাইল ফোন ছিল না, ফেসবুকে সাহিত্যযশোলিপ্সুদের নির্লজ্জ আত্মপ্রচার তখনও শুরু হয় নি, ফলে প্রচারহীন লেখকদের লেখা এইভাবে বন্ধুদের কাছেই জানতে হত। অদ্রীশের ব্যাগ থেকেই বই নিয়ে শুরু করলাম পড়া, রমাদির কবিতা। তার রাগ ভেঙে গেল।

এই এক স্বভাব ছিল তার। নিজের লেখা যত না পড়িয়েছে আমাদের, তার চেয়ে ঢের বেশি অন্যের লেখা পড়ানোর ঝোঁক ছিল। শুধু পড়ানো নয়, অন্যের লেখা প্রকাশ করার উৎসাহ তার এমন ছিল যে সে আমাদের দিয়ে লেখা লিখিয়ে নিত, গুচ্ছ গুচ্ছ লেখা, ডেডলাইন দিত নিজেই, আর নানা কাগজের দফতরে ঘুরে বেড়াত সেগুলি ছাপার জন্য। সম্পাদকদের সঙ্গে সে আলোচনায় বসতো কে কেমন লিখছে এই নিয়ে। ফীডব্যাক সংগ্রহ করত। কখনো কখনো সেইসব ফীডব্যাক শুনে এসে হেসে হেসে বলত—“অমুক বাবু বললেন এ তো সবে তিন/চার বছর লিখছে। বছর পঁচিশ লিখুক, তবে কবি বলা যাবে ’খন, লেখা ছাপা যাবে!”

পরিচয়ের সম্পাদক ছিলেন আমাদের একজন প্রিয় কবি অমিতাভ দাশগুপ্ত। শারদীয় সংখ্যায় তিনি কীভাবে কবিদের কবিতার লাইন ধরে ধরে কেটে দিয়েছিলেন, সেটা রহস্যগল্পের মত শোনাত অদ্রীশ। কিন্তু বন্ধুকৃত্য তার করা চাই। সম্পাদকদের সঙ্গে কথা বলে, তার বন্ধুদের লেখার গুণকীর্তন করে, ছাপিয়ে, নতুন আঠার গন্ধওয়ালা সেই পত্রিকা হাতে নিয়ে হাজির হত সে, মুখে সেই অমলিন হাসি। সে স্বভাব তার কোনোদিনও যায় নি।

২.
কলেজ থেকে বেরোনোর পরপরই আমার বিদেশবাস শুরু। এর ফলে, এবং সেই নয়ের দশকের গোড়ার দিকে আন্তর্জাতিক সহজ যোগাযোগব্যবস্থার অভাবে কয়েক বছর আমার সঙ্গে অদ্রীশের যোগাযোগ ছিল না। যোগাযোগ ফের হল ২০০৩ সালে, আর সঙ্গে সঙ্গে সে প্রস্তাব দিল যে অনেকদিন হয়ে গেছে আমার কোনো বই বেরোয় নি, এবার বেরোনো দরকার।

বিদেশে থাকি, দেশের সাহিত্যজগতের সঙ্গে অল্পবিস্তর চিঠিপত্রের বাইরে কোনো যোগাযোগ নেই তখন, তাই মৃদু প্রতিবাদ করে বললাম, কে পড়বে? এর আগেও তো যুক্তাক্ষর প্রকাশনা থেকে খুব যত্ন করে আমার প্রথম কবিতার বই ‘রাজার জামা পরা মায়াবী সাতদিন’ বের করেছিলেন কবি সঞ্জিত ঘোষ আর কবি গৌতম চৌধুরী, প্রচ্ছদ করে দিয়েছিলেন স্বয়ং কবি মৃদুল দাশগুপ্ত, কেউ কি আর পড়েছে?

ভালো না লিখতে পারলে কেউ পড়বে না, বললাম আমি।

আমার কথাটা যেন কোনো কথাই নয় এইভাবে অদ্রীশ প্রতিযুক্তি দিল যে কেউই যদি না পড়ে তাহলে আর পাওয়া যায় না কেন? কটা নতুন লেখা হয়েছে এই ক-বছরে? জানতে চাইল সে।

ভীতস্বরে বললাম, সব মিলিয়ে কুড়ি বাইশটার বেশি হবে না রে।

তাতে কী আছে, আগের বইটার লেখাগুলোর সঙ্গে এই কুড়ি বাইশটা লেখা মিলিয়ে নতুন বই করব, সিদ্ধান্ত নিল অদ্রীশ।

যেমন ভাবা, তেমন কাজ। যুক্তাক্ষরের সঙ্গে যোগাযোগ করে অনুমতি চাইল সে, আমার লেখা দ্রুত কম্পিউটারে পাঠাতে বলল, আর পরবর্তী কয়েক সপ্তাহ ধরে লাইন ধরে ধরে এডিট করল আমার লেখা, কারণ বহু বিদেশি শব্দ তাতে, আর বিদেশি শব্দের লিপ্যন্তরে বানানবিধি বদলে গেছে এখন।

সেই গুচ্ছের নাম দিল অদ্রীশ আমার একটি লেখা থেকে—‘মহাপৃথিবীর ওয়েবসাইট’, আর এই নাম ধরিয়ে সে হিরণ মিত্রের কাছে চলে গেল প্রচ্ছদ আঁকাতে। তারপর টেলিফোনে উত্তেজিত ভাবে একদিন বর্ণনা করল কীভাবে ওই নাম নিয়ে হিরণদা অনেক ভাবলেন, লেখাগুলি পড়লেন, আর তুলি টেনে নিয়ে তৈরি করলেন অসামান্য এক প্রচ্ছদ।

বইমেলায় বেরোলো সেই বই, আর আমার মনে হল আসলে কবিতা প্রকাশ তো কেবল কবির কাজ নয়, এ তো বন্ধুদের প্রীতিধন্য স্বার্থহীন সমবেত কাজ।

বহু প্রবন্ধ লিখেছে অদ্রীশ, যথার্থ একাডেমিক সেসব লেখা, গবেষণায় এতটুকু ফাঁকি নেই। সারাজীবন যদি সে একটি বিষয়েই গবেষণা করে যেতে পারত, তাহলে বোধহয় খুশি হত সে, কারণ বহুপল্লবায়িত হওয়ার তুলনায় গভীর সমুদ্রে ঝাঁপ দেয়ার প্রবণতা ও আগ্রহ তার বেশি ছিল। ‘বটতলার বই’ নামে দু-খণ্ডে ঊনিশ শতকের দুষ্প্রাপ্য কুড়িটি বই সে সম্পাদনা করে বের করেছিল। কেবল গ্রন্থ সংকলন করা তো নয়, সেই বইয়ের যে যুগ, সেখানে দুঃসাধ্য গবেষণা করে পাঠককে পৌঁছে দেয়া যেন তার ব্রত। প্রথম খণ্ডে তার দুপাতার একটি নিবেদন এবং ছেচল্লিশ পাতার একটি তথ্যবিশ্লেষণসমন্বিত দীর্ঘ ভূমিকা আছে।

মজার কথা হল, জনপ্রিয় সাহিত্যের যে ধারাটিকে অদ্রীশ আমাদের উপেক্ষা করতে বলত, এই বটতলার সাহিত্যে সেই জনপ্রিয় লোকরুচির পুনর্নির্মাণে সে গভীর অনুসন্ধিৎসায় মগ্ন হল। আরো মজার ব্যাপার হল, পরিসংখ্যানের ছাত্র আমি, কিন্তু নিশ্ছিদ্র পরিসংখ্যানে ভরা সাহিত্যের ছাত্র অদ্রীশের ভূমিকা। ১৮০৫ থেকে ১৮৫২ সাল পর্যন্ত বিভিন্ন বই প্রকাশের বার্ষিক হার, বইয়ের জঁর বা ক্যাটেগরি ধরে ধরে তার বিশ্লেষণ, আমাদের তথ্যনির্ভর এক সুনিশ্চিত গন্তব্যে পৌঁছে দেয়, যা কেবল কবিকল্পনায় সম্ভব নয়। বস্তুত, সংখ্যা ও তথ্যনির্ভর এই সাহিত্যগবেষণায় সে দারুণ দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছিল। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছিল তার উদার দৃষ্টিভঙ্গি, যা আমাদের চর্চাকে প্রসারিত করে, কুক্ষিগত করে না।

অদ্রীশ বিশ্বাস সম্পাদিত “বটতলার কুড়িটি বই”এর ঊনবিংশ শতাব্দীর শৈলীর প্রচ্ছদ।

একইরকম ভাবে সন্দীপন চট্টোপাধ্যায়ের গদ্য নিয়ে তার কাজ, ডক্যুমেন্টারি তৈরির উদ্যোগ, নবারুণ ভট্টাচার্যের গদ্য নিয়ে তার চিন্তা, বাংলা সাহিত্যে শ্লীল-অশ্লীল নিয়ে তার গবেষণা, এইভাবে একেকটা বিষয় নিয়ে ডুবুরির মতো কাজ করেছে অদ্রীশ।

যখন যে বিষয়ে ঢুকেছে, প্রশান্ত মহাসাগরের গর্ভে চলে গিয়ে শুক্তি আর মুক্তো নিয়ে এসেছে সে। থেকে থেকে সেইসব গবেষণা প্রকাশ করেছে, সেইসব লেখা যত্ন করে স্ক্যান করে পাঠিয়েছে। ইমেল করেছে, উত্তরের জন্য বসে থেকেছে, আমার আলস্যে উত্তর না পেয়ে রাগ করেছে। কাশীর বাঙালি বিধবা নিয়ে সকালবেলা কাগজের রবিবার সংখ্যায় ২০১২ সালের ১৯ ফেব্রুয়ারি তার রিসার্চ পাঠিয়ে লিখেছে “কাশীর বাঙালি বিধবা লেখাটা পিডিএফ ফরম্যাটে পাঠালাম। পড়তে পারিস কি না দ্যাখ। তুই কেমন আছিস? অনেকদিন যোগাযোগ নেই। আমি আছি মোটামুটি। ভালো থাকিস।”

এর পর অগ্রবীজ নামে একটি চিন্তার পত্রিকার কাজে নেমে পড়া মাত্র অদ্রীশের বিপুল উৎসাহ পাওয়া গেল।  সম্পাদকরা নানা দেশের নানা শহরে থাকেন—আমি ক্যালিফোর্নিয়ায়, সুব্রত অগাস্টিন গোমেজ অস্ট্রেলিয়ার সিডনিতে, তাপস গায়েন নিউ ইয়র্কে, সুবিমল চক্রবর্তী আর চৌধুরী সালাহুদ্দীন মাহমুদ ডালাসে, এবং সাদ কামালী কানাডায়। বিদেশ থেকে বাংলাবিশ্বের চিন্তা নিয়ে কাগজ হচ্ছে, তার লেখকগোষ্ঠী রয়েছেন সারা পৃথিবী জুড়ে, কলেজ স্ট্রিটের বোতল ভাঙবে এইবার, এই উত্তেজনায় অদ্রীশ অনেক উৎসাহ দিল। আমরা একেক সংখ্যা একেকজন সম্পূর্ণ দায়িত্ব নিয়ে সম্পাদনা করি, একেক বিষয়ে। বিশ্বায়ন, প্রান্তিকতা, মৌলিকতা, রাজনৈতিক উপন্যাস—এই সংখ্যাগুলিতে তার পরামর্শ ছিল কাদের লিখতে বলা উচিত সেই বিষয়ে, নিজেও একটি সংখ্যায় লেখা দিয়েছিল। সেই লেখা যত্ন করে ছেপেছি, কিন্তু ফোন করে কেন ব্যক্তিগত ভাবে জানাই নি কেমন লেগেছে, সেই নিয়ে অভিমান করেছিল অদ্রীশ। তারপর আবার একদিন কথা হতেই অভিমান উধাও।

দু হাজার আট সালের একটি ইমেলে দেখছি তার আত্মপরিচয়ে লিখছে অদ্রীশ –

“অদ্রীশ বিশ্বাস। পেশায় বাংলার অধ্যাপক। সমাজ, সাহিত্য সংস্কৃতি বিষয়ে প্রবন্ধ লিখে থাকেন। ব্যক্তিগত গবেষণার বিষয়—জনপ্রিয় বাংলা সাহিত্য—বটতলা থেকে বাঁটুল দ্য গ্রেট। সম্পাদিত বই—সন্দীপন চট্টোপাধ্যায় সম্পর্কিত (১৯৯৬)। সন্দীপনের গল্পসমগ্র ( প্রথম ও দ্বিতীয় খণ্ড ২০০৬), আন্দ্রেই তারকোভস্কি সম্পর্কিত (১৯৯৯), রঙ নাম্বার (হিরণ মিত্রের সঙ্গে কথোপকথন ২০০২)।”

নিজেকে সে প্রধানত গবেষক হিসেবেই পরিচয় দিতে চেয়েছ, এবং এই ব্যাপারে তার ব্যুৎপত্তি প্রশ্নাতীতভাবে প্রমাণ করেছে সে।

মৃণাল সেনের সঙ্গে

নবারুণ ভট্টাচার্য সম্পর্কে সে লিখছে—“আমি লিখবো, আমার নবারুণের লেখায় যে পোস্ট-কলোনিয়াল পলিটিক্স আছে তা নিয়ে লেখার ইচ্ছে আছে। আমাদের যে এনলাইটেনমেন্ট-এর নলেজ পাওয়ার আধিপত্য—তার বাইরে দাঁড়ানোর চেষ্টা আছে ওঁর লেখাতে। আর কাকে লিখতে বলবি, সেটা এই পোস্ট-নন্দীগ্রাম পরিস্থিতিতে বেশ মুশকিল। আমার তো ইচ্ছে দেবেশ রায়কে লিখতে বল, কিন্তু এখন একজন সুশীল, আর একজন হার্মাদ, এরা কি এখন এক ঘাটে জল খাবে? তবে আমি অক্ষরেখা পত্রিকাটা দেখলাম, নবারুণদার ভালো ইন্টরভিউ নেই। যা আছে সেটা ভালো না। গল্পর চেয়ে ওইটা জরুরি—ওঁর জীবনদর্শন, রাজনীতি, লেখালেখির ভেতরের কথা—বেঁচে থাকার কথা, কথোপকথন।”

এত কাজ, কিন্তু কোন প্রগাঢ় অভিমানে সে আমাদের ছেড়ে চলে গেল, কে জানে। আমাদের ওই বন্ধুবৃত্তের অনেকেই আর নেই, অল্পবয়সেই তারা চলে গেলেন। কিন্তু আটের দশকের ওই কয়েকটি বছর আমরা অদ্রীশের মতন স্বার্থহীন সাহিত্যকর্মীর প্রজ্ঞাদীপ্ত মানসবৈদূর্যের জ্যোতিঃছটায় কাটিয়ে ছিলাম, সেই আনন্দ চির অমলিন।

কমেন্ট করুন

মন্তব্য