page contents
সমকালীন বিশ্ব, শিল্প-সংস্কৃতি ও লাইফস্টাইল

প্রমীলা

১.
অামি কলেজের ফার্স্ট ইয়ারে পড়ি  তখন, প্রমা ছিল অামাদের প্রতিবেশী। অামাদের কলেজও ছিল রাস্তার এই পাড় ওই পাড়। অামি পড়তাম সিদ্ধেশ্বরীতে অার ও ভিকারুন্নেসায়। নরমালি ভিকারুন্নেসার মেয়েরা সিদ্ধেশ্বরীর মেয়েদের সাথে মিশত না, দূর থেকে দেখলে হাসি-ঠাট্টা করত। ওদের মতে সিদ্ধেশ্বরীর মেয়েরা হইল দুনিয়ার খ্যাত, এতই খ্যাত যে প্রেমও করে সব খ্যাত পোলাদের সাথে, খায় খারাপ রেস্টুরেন্টে, প্রত্যেকেই কলেজে রঙিন রাবার ব্যান্ড পইরা অাসে অার টিফিনে ভাত খায়। প্রমার মধ্যে ভিকারুন্নেসায় পড়া জনিত কোনো অহংকার কখনোই ছিল না। বরং ওর সামনে কেউ অামাদের কলেজ নিয়া বাজে কিছু বললে ও অারো উল্টা শুনায়া দিত।

প্রমারে অামি চিনি এক কোচিং-এ পড়ার কারণে। আমরা পড়তাম খিলগাঁও সফস-এ। দেখতাম একটা শান্তশিষ্ট মেয়ে অাইসা যখন যেখানে জায়গা পাইত বইসা পড়ত। কখনো কথা হয় নাই। একদিন কোচিং-এ যাইতেছি বিকাল বেলা, রিকশা দিয়া, দেখি প্রমা ওর মায়ের সঙ্গে দাঁড়ায়া অাছে। রিকশা পাইতেছে না, অামি রিকশা থামাইতে বইলা প্রমারে তুইলা নিলাম। তখন থেইকাই অামাদের যোগাযোগ। প্রমা প্রায়ই বলত, ওইদিন অামি রিকশা থামায়া ওরে না নিলে আমাদের এই বন্ধুত্বটা হইত না।

কলেজে আমার ক্লাস শুরু হইত অাটটায়, ওরটা সাড়ে অাটটায়।

অামার কারণে ও অাধা ঘণ্টা আগে বের হইত। এইটা অবশ্য সুবিধাজনকই ছিল ওর জন্য। ছুটির টাইমও প্রায় এক হওয়াতে অামরা বাসায়ও ফিরতাম একসাথে। তবে ফিরার বেলাতে সময় নিয়া একটু গণ্ডগোল হইত। কারণ, অামাদের কলেজে প্রতিদিনই সাইন্সের প্র্যাকটিকাল থাকত। অার ওদের থাকত সপ্তাহে একদিন। হইত কী, প্রমার কলেজ শেষ হইলেও অামার কলেজে অাইসা অামার জন্য ওরে অনেক্ষণ ধইরা অপেক্ষা করতে হইত। অামি বের হয়ে দেখতাম প্রমা অসহায়ের মতো দাঁড়ায়া অাছে,  প্রচণ্ড ক্লান্ত। ও একটু বেশি হাড় জিরজিরা ছিল তখন, তাই দেখতে অারো বেশি অসহায় লাগত।

অামি শাহেনশার মতো ড্যাং ড্যাং করতে করতে বের হইতাম। ওরে দেখা মাত্রই জিজ্ঞেস করতাম, ওই, অামার জন্য টিফিন রাখছোস? ও জিরো ভলিউমে বলত, রাখছি। তারপর ওর কান্ধে হাত রাইখা অাজকে কী কী মজার ঘটনা ঘটল কলেজে, কী কী বদমাইশি করছি, কয়টা ক্লাস বাং মারছি সবকিছু তোতা পাখি মতো বলতে বলতে রিকশায় উঠতাম।

উঠার পর ও অাগে অামারে  ওর টিফিন বক্স বাইর করে দিত। প্রমার এই ব্যাপারটা অামার ভালো লাগত। আমাদের কলেজ আলাদা হইলেও ও অামারে না দিয়া কখনো খাইত না।

ওদের বাসায় যখনই পুডিং রান্না হইত প্রমা ওদের বিল্ডিংয়ের চারতলা থেইকা আমাদের বিল্ডিংয়ের নিচতলায় ফোন করত। কইরা বলত, টিয়ামণি, তোমার পুডিং রান্না হইছে, জলদি অাসো! শুইনাই অামি ফোন রাইখা পায়ে স্যান্ডেল দিয়া এক দৌড়ে ওদের বাসায় গিয়া পৌঁছাইতাম। অান্টি আমারে অাদর কইরা টেবিলে নিয়া বসাইতেন, তারপরে প্লেটে সাজানো সুন্দর কইরা কাটা পুডিং ফ্রিজ থেইকা বের কইরা আমার সামনে রাইখা বলতেন, রিয়া, মা একদম হেযিটেট করবা না কিন্তু! যতটুকু ইচ্ছা খাবা। প্রমা, দেইখো রিয়ার অার কিছু লাগে কিনা।

অামি প্রমারে নিচু স্বরে বলতাম, অার কিছু লাগবে না অান্টি, খালি এই পুডিং পরিবাররে অামার হেফাজতে দিলেই হবে। প্রমা হাসত।

অামাদের কমন ফ্রেন্ড ছিল তৃণা, ও অামার কলেজে গ্রুপ টু-তে পড়ত। মাঝেমধ্যে অামাদের গ্রুপের সাথে ওদেরটার এক সময়ে  ছুটি হইলে তৃণার সাথে প্রমার দেখা হইত।

অামি প্রমারে ডাকতাম ‘প্রমীলা’ বইলা। এইটাতে প্রমা দেখাইতো যে সে খুব বিরক্ত হইতেছে। কিন্তু ‘প্রমীলা’ ডাক শুনতে যে তার খুবই ভালো লাগত এটা বুঝাই যাইত। যখনই ওরে প্রমীলা বইলা ডাক দিতাম, ও ন্যাকামি করতে শুরু করত। ঢং কইরা বলত, প্রমীলা!  এহ্‌, প্রমীলা কোনো নাম হইল? খ্যাত নাম!

তৃণা সবসময় চেষ্টায় থাকত এই নাম অাসলে ওরই দেওয়া এইটা প্রমাণ করতে। অামাদের বন্ধুমহলে ‘প্রমীলা’ জনপ্রিয় হওয়ার পর ও এর ক্রেডিটটা প্রায় জোর কইরা নিজের দিকে কইরা নিতে চাইত। এইটা নিয়া প্রমা অার অামি খুব হাসাহাসি করতাম।

প্রমারে অামি প্রচুর খ্যাপাইতাম। কেননা, সে ছিল পুরা আমার উল্টা। শান্তশিষ্ট, নম্র। অামি যত যা অত্যাচার করতাম ওর উপর ও সব মুখ বুইজা সহ্য করত। নোট চাইলে নোট দিত, ম্যাথ না পারলে বুঝায়া দিত।

একবার মনে অাছে কলেজ শেষে রিকশা কইরা অামরা বাসায় ফিরতেছি। হঠাৎ রিকশার পিছনে ঠাস কইরা একটা শব্দ হইলো অার প্রমা ‘ও মাগো’ বইলা চিল্লায়া উঠল। রিকশাওয়ালা  সঙ্গে সঙ্গে রিকশা থামায়া অামাদের দিকে ঘুরলেন, ঘুইরা বললেন, কী হইছে অাম্মা?

অর্জয়িতা রিয়া; ছবি. লুবনা ফেরদৌস, ২০১৬

রিকশা থামামাত্র অামি লাফ দিয়া নাইমা গেলাম, পিছনে তাকায়া দেখি ফুটপাত দিয়া আগে পিছে কইরা তিনটা ছেলে যাইতেছে। দুইজন সামনে, তারা শিস বাজাইতেছে। পেছনের জন খুব অ্যাটিটিউড নিয়া সামনের দুইজনের পিছনে পিছনে হাঁটতেছে। আমি প্রমারে জিগাইলাম, কী হইছে? চিল্লাইছোছ ক্যান?

প্রমা হেব্বি ভয় পাইছে। সে কাঁপতেছে, আমারে বলে, অামার বেণী ধইরা টান দিছে অার পিঠে থাপ্পড় দিছে।

এই কথা শুইনা অামি সঙ্গে সঙ্গে দৌড়ায়া গিয়া লাফ দিয়া ফুটপাতে ওই পিছনের পোলার সামনে গিয়া দাঁড়াইলাম। গিয়া একটা ধমক দিয়া বললাম,  এই তুমি অামার বান্ধবীরে থাপ্পড় দিছো?

সে এমন ভঙ্গি করল যেন এতক্ষণ সে দুনিয়াতেই ছিল না। খুব ঢং দেখায়া এক্সপ্রেশন দিয়া বলল, হোয়াট! থাপ্পড়? আমি? তোমার বান্ধবীকে? নেভার! থাপ্পড় কেন মারব?

অামি বললাম, থাপড়ায়া তোমার নেভার ছুটায়া দিব শয়তান পোলা! বেয়াদব! এইখানে তুমি ছাড়া অার কে ছিল? হ্যাঁ?

ছেলে খুবই বিরক্ত হওয়ার ভান দেখাইল, বলল, এক্সকিউজ মি, ভদ্রভাবে কথা বলো। আমি তোমার বান্ধবীকে থাপ্পড় মারি নাই। অামি এমন ছেলে না!

তো কেমন ছেলে তুমি? মেয়েদের পিঠে থাপ্পড় মারো, বেণী ধইরা টান মারো—এমন ছেলে তুমি? বলো! শয়তানের শয়তান!

অামার মেজাজ বিগড়াইল এইবার। কাঁধ থেইকা ব্যাগ খুইলা হাতে নিলাম। যে কোনো মুহূর্তে এরে পিটাইতে হইতে পারে।

সে বলল, তোমরা কি দেখছো অামি থাপ্পড় মারছি যে? দেখো তো নাই! না দেইখাই রাস্তায় একজন মানুষের সাথে এইভাবে অভদ্রের মতো কথা বলতেছো কেন, হ্যারেস করতেছো, বেয়াদব!

অামি কন্ট্রোল হারায়া ফেললাম, ব্যাগ ফালায়া পোলার দিকে অারো অাগায়া গেলাম—কী! কারে বেয়াদব বললা!

প্রমা নিজের কাঁপাকাঁপি বাদ দিয়া রিকশা থেইকা নাইমা অাইসা অামারে টাইনা সরানোর চেষ্টা করল ওইখান থেইকা। ওই পোলা সাথে সাথে সামনে অাগায়া গিয়া ওই বাকি দুই পোলার সাথে স্বাভাবিকভাবে হাঁটতে শুরু করল। যেন কিছু হয়ই নাই!

আমি রাগে ফুঁসতেছি, আর ওই ছেলের দিকে তাকায়া অাছি। ছেলেটা মূল রাস্তা ধইরা অাগায়া একটা গলিতে ঢুকার ঠিক অাগে পিছনে ফিরা তাকাইলো অামাদের দিকে। তাকাইয়া একটা ইঙ্গিতপূর্ণ হাসি দিলো। অামি চিল্লায়া উঠলাম, ‘দেখছোস? দেখছোস? হারামজাদা হাসে! বললাম না এই পোলাই থাপ্পড় মারছে!

প্রমার ভয় তখন অারো বাড়ছে। অামি যদি এই পোলার সাথে মারামারিতে জড়াই, এইখানে যে ওই ছেলের অারো সাঙ্গপাঙ্গ নাই তা কে জানে! ও গায়ের সমস্ত জোর দিয়া যেইভাবে পারে অামারে রিকশায় তুলল। রিকশাওয়ালাও দ্রুত টান দিল!

ওইদিন বাসায় যাইতে যাইতে পুরা রাস্তা প্রমা অামারে রাস্তাঘাটের ম্যানার বুঝায়া গেল। অামার মন চাইতেছিল, ওই পোলার জায়গায় ওরে কতক্ষণ পিটায়া লই!

২.
প্রমা অার অামি বাসায় একই স্যারের কাছে পড়তাম। স্যারের নাম ছিল রাফি। সে বুয়েটে পড়ত। প্রথমদিন যেদিন অামাদেরকে পড়াইতে অাসে স্যারের মুখে দাড়িগোফের জংলা। প্রমা দেইখাই বলছিল, অামাদের স্যারের মুখ নাই রে!

অামার সিরিয়াস পরিস্থিতি হাইসা ফেলার রোগ আছে। অামি পুরাটা সময় স্যারের সামনেই মিটি মিটি হাসতেছিলাম। বুঝাই যাইতেছিল স্যার তাতে অস্বস্তি বোধ করতেছেন। প্রমা যতটা সম্ভব চেষ্টা করতেছিল অামার দিকে না তাকাইতে। স্যার যাওয়ার পর ও অাবার আমারে জিগেস করে, মুখবিহীন স্যার পছন্দ হইছে মিনিয়ন?

পরের দিন স্যার ক্লিন শেইভ কইরা অাসছিলেন। অামি বা প্রমা কেউই স্যাররে দেইখা প্রথমে চিনতে পারি নাই।

পড়তে বসলে অামরা সবসময় ফাইজলামি করতাম। স্যার হয়ত অামাদেরকে অঙ্ক করতে দিয়া মোবাইলে গেম খেলতেছেন, অামরা তখন ইশারায় কথা বলতাম। মাঝে মাঝে খাতা দিয়া বিভিন্ন ভঙ্গি কইরা বুঝাইতাম।

একদিন সন্ধ্যায় পড়া শেষে অামি প্রমারে বললাম, প্রমীলা অামার হাঁটতে মন চাইতেছে। প্রমা বলল, বাইরের গলিতে হাঁটবি? অামি বলললাম, না, অন্য কোনোখানে। প্রমা ধমক দিল, এই সময় তোমারে ড্যাং ড্যাং করতে হবে না, এখন অামরা বাইরে দশ মিনিট হাঁটব, তারপর সোজা গিয়া পড়তে বসবি!

অামরা সোসাইটির মেইন গেইট লাগায়া দিয়া গলিতে হাত ধইরা হাঁটা শুরু করলাম। অামরা দুইজন একসাথে হইলেই গান গাইতাম। প্রমা যদি একটা গান গাওয়া শুরু করত, অামি বলতাম, ছিঃ! প্রমীলা, তোমার গানের রুচি তো সিরিয়াস রকমের খারাপ। প্রমা বলত, খারাপ রুচি মেইন্টেইন করা প্রতিভার বিষয়, এইটা তোমার নাই টিয়া। তারপর অাবার ওই গানেই ওর সাথে তাল দিতাম।

তো, একদিন এরকম হাঁটতেছি অামরা। মেইন গেইট দিয়া তখন অামাদের বাসার বাড়িওয়ালার নাতি ঢুকল, সাথে ওর চ্যালা। অামি ওরে জিগেস করলাম, কী রাইয়ান, কই গেছিলা? রাইয়ান বলে, ফেইক বিয়া খায়া অাসলাম, অাপু। প্রমা অার অামি মুখ চাওয়াচাওয়ি করলাম।

অামি রাইয়ানরে জিগাইলাম, ফেইক বিয়া কী? ওখানে  কোনো নাটক হইতেছে?

প্রমা বলে, অারে ধুর, ছাগল! ওরা অতিথি সাইজা গিয়া বিয়া খায়া অাসছে এইটা বুঝাইতে চাইছে।

অামি বললাম,  ও, কোথায়? স্কুলের পাশেরটায়?

রাইয়ান বলল, হ!

অামি অাবার হাঁটা শুরু করলাম। এমন সময় প্রমা বলল, বিয়া খাবি টিয়া?

শুনামাত্র অামি লাফায়া উঠলাম, ভুয়া অতিথি হইয়া?

প্রমা বলল, হ!

অবশ্যই!

অামরা সাথে সাথে বাইর হইয়া গেলাম।

কমিউনিটি সেন্টারটা ছিল অামাদের বাসার সামনে। অামি যাইতে যাইতে প্রমার পরিবর্তন নিয়া ভাবতেছিলাম। পরে মনে হইল, ও অাসলে এরকমই ছিল, মিচকা। অাগেও অামরা বিভিন্ন বাসায় বেল বাজায়া দৌড় দিছি। বিশেষত রাফিদের (স্যার না, অন্য রাফি) বাসার বেল। রাফি ছিল অামার প্রণয়প্রার্থী। কিন্তু ওরে অামি পাত্তা দিতাম না। প্রমা প্রতিটা অাকামের বেলাতেই  “করব না, করব না” বইলাও পার্টিসিপেট করত, খালি মানুষের সামনে অমন মাসুম সাইজা থাকত। কিন্তু, অামার জানামতে অামি ওর থেইকা একশগুণ বেশি শয়তান। তা সত্ত্বেও এমন চমৎকার অাইডিয়া অামার মাথায় না অাইসা অাসল ওর মাথায়। এইটা অামি মানতে পারলাম না। ওখানে যাইতেই যাইতেই তাই ভাবতেছিলাম কীভাবে ওর এই প্ল্যান ভণ্ডুল করা যায়।

হাঁটতে হাঁটতে অামি হঠাৎ থাইমা গেলাম, প্রমারে বললাম, তুই এক মিনিট দাঁড়া, অামি এখনই অাসতেছি। ওরে কিছু বলার সুযোগ না দিয়া দৌড়ায়া বাসায় গেলাম। গিয়া নিজের জুতা খুইলা রাইখা অাব্বুর লোটোর স্যান্ডেল পায়ে দিয়া অাসলাম।

ফিরার পরে প্রমা অার কিছু না জিগায়া তাড়া দিতে লাগল। আর বুঝাইতে লাগল ওখানে কীভাবে অ্যাক্ট করব।

অামি ওর সব কথায় হুঁ হুঁ করি, অার প্রত্যেকবারের হুঁ হুঁতে এক কদম পিছাই। কমিউনিটি সেন্টারের গেটে আইসা ও অামারে দেইখা বলল, পিছে পিছে হাঁটছ্‌ ক্যান তুই! অামার সাথে হাঁট্‌। এমনে বুইঝা যাবে না, ছাগল!

অামি অাব্বুর স্যান্ডেল পায় দিয়া অাসছি, দেখলে বুঝবে না?

কই? তুই না নিজেরটা পইরা ছিলি? যাই হোক, বাদ দে। ওইটা নিয়া কোনো চিন্তা দেখাবি না আর কনফিডেন্স নিয়া ঘুরবি। কেউ দেখলেও কিছু বুঝবে না।

অাচ্ছা!

সিঁড়ি দিয়া উঠার পথে একজন ভদ্রলোক বসা, যিনি সব গিফট রাখার দায়িত্বে অাছেন। উঠার অাগে অামি ইচ্ছা কইরা প্রমার থেইকা আরো পিছায়া গেলাম। এমন ভঙ্গিতে উঠতেছিলাম যাতে অামার পায়ে স্যান্ডেল জোড়া অালাদাভাবে চোখে পড়ে। ওই লোকের পড়ল। সে অামার জুতা দেইখা একটু কেমনভাবে তাকাইল, তারপরও কিছু বলল না। প্রমা ততক্ষণে প্রায় উইঠা গেছে।

সিঁড়ির অর্ধেকে উইঠা গিয়া অামি ওই লোকরে জিগাইলাম, এইখানে কার বিয়া হয় অাঙ্কেল?

উনি চেয়ার ছাইড়া উইঠা দাঁড়াইলো, বলল, কার বিয়া মানে? অাপনারা অতিথি না?

অামি বললাম, না, অামরা তো এমনেই বিয়া দেখতে অাসছি!

প্রমা দ্রুত নাইমা অাসল, লোকটারে বলল, না অাঙ্কেল, অামরা অতিথিই, ও ফাইজলামি করতেছে।

বইলা অামারে টানতে শুরু করল। অামি খাম্বার মতো দাঁড়ায়া মজা দেখতেছি।

ভদ্রলোক এইবার অামার স্যান্ডেল দেইখা কনফার্ম হইলেন। উনি প্রমার কথায় কান না দিয়া বললেন, না, অামন্ত্রিত না হইলে ঢুকা যাবে না। প্লিজ, বের হন।

বইলা অামাদেরকে বাইর কইরা দিলেন।

৩.
তখন বৃষ্টির সিজন। বৃষ্টি হইলে অামাদের কলেজের অাশেপাশের অবস্থা একেবারে করুণ হইত! দেখলে  মনে হইত একটা বিরাট নালা। চারদিকে পানি অার পানি। ফুটপাত কই, অার রাস্তা কই! সব পানির তলে। এমন অবস্থায় বিশেষ কইরা যখন কলেজগুলা ছুটি হইত অামার মনে হইত একটা দোজখখানায় অাইসা পড়ছি। কোনো রিকশা নাই, কিচ্ছু নাই। বাসায় যাবা তো পানি পাড়াইতেই হবে। এখন এই পানি কীসের পানি কোত্থেইকা অাসছে তা দেখার বিষয় না।

অামার তখন প্রতিদিন একটা কইরা বই কিনার অভ্যাস ছিল। কিন্তু বৃষ্টি হইলে তো অার লাইব্রেরি পর্যন্ত যাওয়া যাইত না! প্রমা তখন ভেংচি কাটত, “টিয়া পাখি এখন বই পড়বে কেমনে, হিহিহিহি!”

অামার ওরে থাপ্পড় লাগাইতে মন চাইত। অামি পারি না বই কিনতে যাইতে, সে এহেনে তামাশা করে!

এমনও সময় গেছে, কাঁধে ব্যাগ, হাত বইপত্র অার প্র্যাকটিকাল খাতায় ভর্তি। তার উপরে অামরা কেউই নেই নাই সঙ্গে ছাতা! তখন, একটাই রাস্তা খোলা থাকত—যেই দিকে দুই চোখ যায় সেই দিকে হাঁটো। কোনোদিকেই রিকশা নাই, এবং অামাদের বাসায় যাওয়ার অনেক রাস্তা! সবখানেই ড্রেনের সুগন্ধযুক্ত ফিল্টারের পানি। প্রমা তখন কান্দার বাকি রাখত!

একদিন, পুরা কলেজ টাইম মানে সকালে অামরা কলেজে অাসার পর থেইকাই বৃষ্টি শুরু হইলো। শিলাবৃষ্টি হইছিল সেদিন। থামছিল গিয়া দেড়টার পরে। রাস্তায় পানি হাঁটুর উপ্রে। প্রমা অাগেই ওইসব দিয়া রাস্তা পার হইয়া আমাদের গেইটের সামনে অাসছে। ওর অবস্থা দেইখা আমার ভয়াবহ হাসি পাইলো। অামি হাসতে হাসতেই ওরে বললাম, কী গো প্রমীলা, কীসের পানি পাড়াইলা?

প্রমা বলল, তোমারে তো এখনই নামতে হবে, নিজেই নাইমা অাইসা দেখো কীসের পানি পাড়াইলাম!

বইলা কপাল কুঁচকাইলো। অামরা তারপর দুইজনই ওই ‘কীসের পানি’ পাড়ায়া চাইর রাস্তার মোড়ে আইসা দাঁড়াইলাম। ওইখানে জনমানবের ঢল দেইখা অামার মনে হইছিল যেন কোনো ওয়াজ মাহফিলে অাসছি। অামি প্রমারে বললাম, প্রমীলা ঘোমটা দাও। ওয়াজ মাহফিল চলতেছে!

প্রমা অামারে ঝাড়ি দিয়া উঠল, চুপ থাক বেয়াদব, টিয়ার বাচ্চা টিয়া! ধাক্কা মাইরা একদম পানিতে ফালায়া দিব অার একটা কথা বললে!

অামি মুখে অাঙুল দিলাম। ওইদিন অামাদের বাসায় পৌঁছাইতে প্রায় তিন ঘণ্টা লাগছিল!

এর কিছুদিন পরের ঘটনা। প্রমা সেদিন কলেজে যাবে না। তাই অামি সাদিয়ার সাথে ফোনে কথা বইলা ঠিক করলাম পরেরদিন ওর সাথে যাবো।

সেইদিনও ওইরকম টানা বৃষ্টি হইল, বেইলি মাতা গাঙ্গে ডুইবা গেল। প্রমা নাই। অামি ছুটির পরে সাদিয়ার সাথে কলেজের গেইটে রিকশার জন্য দাঁড়ায়া অাছি। তখন সাদিয়ার ফ্রেন্ড তুলতুল অাসল। তুলতুল তৃণাদের গ্রুপে পড়ত। অাইসা বলল, ওর ভাই অাজকে ওকে নিতে অাসতে পারবে না। তো ও কি আমাদের সাথে যাইতে পারবে কিনা? সাদিয়া বলার অাগেই অামি রায় দিলাম, অালবৎ! এসো হে তুলতুল! তুলতুল অার সাদিয়া হাসা শুরু করল। সাদিয়ার হাসি রোগ আছে। সে হাসতে শুরু করলে এক সময় গিয়া তার অার ব্যালেন্স থাকে না। এই খবর সারা দুনিয়া জানে। তুলতুল বলল, সাদিয়া, সাবধানে হাইসো, এই পানিতে পড়লে কিন্তু তোমার দুধে অালতা গায়ের রঙ ‘গুয়ে অালতা’ হয়ে যাবে! সাদিয়া অারো বিপজ্জনকভাবে হাসতে শুরু করল।

অনেক কষ্টে সেইদিন ডাবল ভাড়া দিয়া একটা রিকশা পাইলাম অামরা। তুলতুল উপ্রে, অামি আর সাদিয়া সিটে। শন্তিনগর মোড়ে একটা ছোট গর্ত ছিল, রাস্তায় পানি জমার কারণে সেইটা অদৃশ্য হইয়া গেছিল। রিকশাওয়ালাও খেয়াল করেন নাই। অার অামাদের রিকশার চাকা গিয়া পড়ল ওই গর্তে। ধাক্কায় রিকশার এক সাইড উঁচা হয়ে গেল। যেইদিকে অামি বসছি। এই ঘটনায় আমি অার তুলতুল ব্যাপক মজা পাইলাম, কিন্তু সাদিয়া ভয়ে বিড় বিড় করতে শুরু করল, আাল্লাহ, অামরা জানি গর্তে না পড়ি! আল্লাহ, অামরা জানি গর্তে না পড়ি!!

অামি বললাম, তুলতুলি, একটা গান গাও।

তুলতুল বলে, কী গান গাবো?

বৃষ্টির গান! খবরদার রবীন্দ্রসঙ্গীত গাবা না!

পারি না! পাস! তুমি গাও।

অামি গাওয়া শুরু করলাম, তুল-তুল বারসা পানি, পানি মে…

সাদিয়া দোয়া পড়া বাদ দিয়া পাগলের মতো হাসতে শুরু করল, সাথে তুলতুলও।

তুলতুল বলল, ওইটা ‘তুল তুল’ না রিয়া, ‘টিপ টিপ’ হবে!

৪.
প্রমা রুয়েটে চইলা গেছে। ওখানে যাওয়ার পর ওর সাথে মাত্র একবারই ফোনে কথা হইছে অামাদের। পরদিন ওরে নিয়া একটা কবিতাও লিখছি আমি। প্রমা ফোনে অামারে বলছিল ওইখানে ওর একা খারাপ লাগে, কই অামাদের পরিচিত বেইলি রোড অার কই রাজশাহী!

অামারে ও রুয়েটে ঘুইরা আসতে দাওয়াত দিছিল। অার বলছিল, অল্প কয়দিন পরেই ও ঢাকায় অাসবে, তখন অামরা দু্জন মিলা পিজ্জা খাইতে যাবো।

প্রমা গত সপ্তাহে ঢাকায় অাসছিল। চইলাও গেছে। অামি তা জানছি ওর ছোটবোনের প্রোফাইলে ওদের ছবি দেইখা। ও অাসার পর ওরা ছাদে কীসের জানি পার্টি করছে, তার ছবি!

কমেন্ট করুন

মন্তব্য

About Author

অর্জয়িতা রিয়া
অর্জয়িতা রিয়া

জন্ম. ঢাকা। কবি ও লেখক।

1 Comment

  1. মহিন Reply

    পড়ে সুখ পাইছি।

Leave a Reply