ফেসবুক এআই রোবটেরা নিজেদের ভাষা আবিষ্কার করেছে—মিডিয়ার এই রিপোর্ট যে কারণে সত্য নয়

শেয়ার করুন!

১৯৩০, ১৯৪০ ও ১৯৫০ এর দশকে যখন ফিজিক্সের দুনিয়া ডমিনেট করছে কোয়ান্টাম থিওরি, তখন আলবার্ট আইনস্টাইন অন্য কিছু নিয়ে ব্যস্ত ছিলেন। এই তিন দশক ফিজিক্সের দুনিয়ার ডমিনেটিং ফোর্সের সাথে আইনস্টাইনের সরাসরি কোনো সম্পর্ক ছিল না। আইনস্টাইন তখন লাইট আর গ্র্যাভিটিকে থিওরেটিক্যালি একত্রিত করার চেষ্টা করছেন।

তখন মিথ তৈরি হয়ে গেল, আইনস্টাইনের জীবনের সবচেয়ে বড় ভুল কোয়ান্টাম মেকানিক্সকে বাতিল করা। আসলে এই মিথ তৈরি হয়েছে সায়েন্স হিস্ট্রিয়ান ও সায়েন্স জার্নালিস্টদের মাধ্যমে। এবং তারাই এখন পর্যন্ত এই মিথটাকে টিকিয়ে রেখেছেন। এই সময়ের এক থিওরেটিক্যাল ফিজিসিস্ট বলেছেন, এই মিথ টিকে আছে কারণ যেসব ম্যাথমেটিক্যাল টার্ম দিয়ে ইউনিফায়েড ফিল্ড থিওরিকে বর্ণনা করা হয় তারা সেগুলি বুঝতে পারে না।

ইউনিফায়েড ফিল্ড থিওরি থেকে বোঝা যায় আইনস্টাইন কোয়ান্টাম থিওরিকে বাতিল করেন নি, মনে করেছেন কোয়ান্টাম মেকানিক্স অসম্পূর্ণ। ইউনিফায়েড ফিল্ড থিওরি কী বলে এবং কতটা অগ্রসর সেটা বুঝতে পারলে নিশ্চয়ই এই মিথ তৈরি হত না।

এই কথাগুলি বলার পিছনের উদ্দেশ্য হল অন্য একটা কথা বলা। বিজ্ঞানের ক্ষেত্রে এরকম জনপ্রিয় মিথ এবং জনপ্রিয় এক্সাইটমেন্ট তৈরি হওয়া খুবই সাধারণ ঘটনা।

এরকম মিথ কীভাবে তৈরি হয় সেটা খুবই রিসেন্ট একটা ঘটনা থেকে বোঝা যাবে।

দুই-তিনদিন আগে একটা খবর প্রকাশিত হয়, ফেসবুক তার একটা রোবট প্রজেক্ট বা আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স প্রজেক্ট বন্ধ করে দিয়েছে, কারণ সেই প্রজেক্টের দুটি রোবট নিজেদের আবিষ্কৃত ভাষায় নিজেদের মধ্যে যোগাযোগ করছিল। স্বাভাবিকভাবেই মানুষ সোশ্যাল মিডিয়ায় প্রচুর শেয়ার করতে থাকে নিউজটি। মানুষের আর কী দোষ! এরকম খবরে মানুষ এই প্রতিক্রিয়াই দেখাবে। আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স নিয়ে  মিডিয়া ও সাধারণ মানুষের মধ্যে অলরেডি যে উৎসাহ এবং উত্তেজনা!

“দুই-তিনদিন আগে একটা খবর প্রকাশিত হয়, ফেসবুক তার একটা রোবট প্রজেক্ট বা আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স প্রজেক্ট বন্ধ করে দিয়েছে, কারণ সেই প্রজেক্টের দুটি রোবট নিজেদের আবিষ্কৃত ভাষায় নিজেদের মধ্যে যোগাযোগ করছিল।”

কিন্তু, ফরচুনেটলি অর আনফরচুনেটলি, আসল ঘটনা অন্য। এই ধরনের নিউজের কারণে আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স রিসার্চাররা মিডিয়ার উপরে অনেক বিরক্ত হয়েছেন।

গত জুন মাসে ফেসবুক তাদের একটা সায়েন্টিফিক এক্সপেরিমেন্ট নিয়ে একটা একাডেমিক পেপার প্রকাশ করে। এক্সপেরিমেন্টটা ছিল দুটি রোবটের নিজেদের মধ্যে চ্যাট করা নিয়ে। মানুষেরা কীভাবে আলাপ করে বা নেগোশিয়েট করে সেটা দেখানোর পরে দুটি রোবটকে নিজেদের মধ্যে নেগোশিয়েট করতে দেওয়া হয়েছিল। সেই দুই রোবট বা দুটি এজেন্ট ট্রায়াল এবং এররের মাধ্যমে আস্তে আস্তে উন্নতি করতে থাকে।

রোবট দুটি যখন চ্যাট করছিল তখন তাদের ইংরেজিতে ভুল হয়। এবং ভাষার সিনট্যাক্স বা গ্রামারের ক্ষেত্রেও কিছু ভুল হয়। এই এক্সপেরিমেন্টের প্রধান উদ্দেশ্য ছিল রোবট দুটিকে ভালোভাবে নেগোশিয়েট বা সমঝোতা করানো। এবং সেক্ষেত্রে এই এক্সপেরিমেন্ট মোটামুটি সফল। কোনোকিছুতে আগ্রহ না থাকলেও সেটার প্রতি আগ্রহ দেখানোর ভান করেছে রোবট দুটি। অর্থাৎ নেগোশিয়েট করার ক্ষেত্রে কম্প্রোমাইজ করার ব্যাপারটি ধরতে পেরেছে তারা।

আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স বা রোবটেরা নিজেদের ভাষা আবিষ্কার করে নিজেরা যোগাযোগ করছে—মিডিয়াতে এই নিউজ প্রকাশিত হয়।

নিউজ প্রকাশিত হওয়ার পরে, সেই রিসার্চ গ্রুপের একজন রিসার্চার, ধ্রুব বাত্রা ফেসবুকে লিখেছেন, এই ফিল্ডের বাইরের মানুষজনের কাছে ব্যাপারটি অপ্রত্যাশিত হলেও এআই এজেন্টদের নিজেদের ভাষা আবিষ্কার করার ব্যাপারটি অনেক অনেক বছর আগে থেকেই গবেষণার বিষয়। রিওয়ার্ড ফাংশন বিশ্লেষণ করা এবং প্যারামিটার পরিবর্তন করা মানে সেই আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স বন্ধ করে দেওয়া নয়।

খুব সিম্পলি বললে, কোনো এআই এজেন্টকে যে গোল বা কাজ দেওয়া হয়, এজেন্ট যে পদ্ধতিতে বা যে ফাংশন অনুযায়ী সেই কাজগুলি সফলভাবে করে সেটা রিওয়ার্ড ফাংশন। আর যে ইনপুট ও অন্যান্য জিনিস এজেন্ট কোনো একটা কাজ করতে এক্সটার্নাল বা ইন্টার্নাল উপাদান হিসেবে ব্যবহার করে সেগুলি প্যারামিটার।

এই রিওয়ার্ড ফাংশন অনেক সময় এমনভাবে কাজ করতে পারে যে এগুলি নিজেরাই আবার নতুন কোনো রিওয়ার্ড ফাংশন তৈরি করবে। এবং প্রোগ্রামাররা বা রিসার্চাররা সেগুলিকে মডিফাই করতে পারবে।

ফেসবুক তাদের এআই শাটডাউন করেছে এই ধরনের নিউজকে আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স রিসার্চাররা ‘দায়িত্বজ্ঞানহীন’ কাজ বলেছেন।  

 

এজেন্ট-টু-এজেন্ট চ্যাট করা নিয়ে অলরেডি কয়েকটি প্রজেক্ট চালু আছে। যেমন অ্যালফাবেট ও ওপেনএআই অর্গানাইজেশনের প্রজেক্ট আছে।

ফেসবুকের এআই এজেন্ট দুইটি যে ডাটাসেট এবং সফটওয়্যার দিয়ে কাজ করছিল সেগুলি তারা গিটহাব-এ ওপেন করে দিয়েছে। সুতরাং এই প্রজেক্ট ফেসবুকের কোনো গোপন প্রজেক্টও না।

 

এআই নিয়ে মিডিয়া ও গণমানুষের এই উত্তেজনার রেসপেক্টে একটা কথা বলে রাখা ভাল। এআই বা আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স এখন অনেক স্মার্ট, তবে তারা এখনো একটা তেলাপোকার সমান স্মার্টও হয় নি। পজিটিভলি বললাম।     

 

কমেন্ট করুন

মন্তব্য

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here