page contents
লাইফস্টাইল, সংস্কৃতি ও বিশ্ব

বক্সিং মুভি ‘রকি টু’ (১৯৭৯) দেখার পর মোহাম্মদ আলি

বক্সিং জঁনরার ক্লাসিক মুভি ‘রকি (১৯৭৬)’ এর সিক্যুয়েল মুক্তি পায় ১৯৭৯ সালে। মোহাম্মদ আলি ব্যক্তিগতভাবে এই মুভি সিরিজ বেশ পছন্দ করতেন। সেই বছর তার জন্য ছবিটির বিশেষ প্রদর্শনীর ব্যবস্থা করা হয়। এইবার তার সঙ্গী হিসেবে ছিলেন ফিল্ম ক্রিটিক রজার ইবার্ট। মুভি দেখার সময় তাদের দুইজনের কথোপকথনে সিনেমা আর বাস্তবের বক্সিং এর তফাৎ আর সাদৃশ্য নিয়ে আলাপ করেন আলি। সেই সাথে চলচ্চিত্র ও আমেরিকা নিয়ে তার ব্যক্তিগত ধারণাগুলিও উঠে আসে।

মোহাম্মদ আলির সঙ্গে ‘রকি টু’ দেখা

রজার ইবার্ট

অনুবাদ: 

mohammad-ali-768

মোহাম্মদ আলি (১৯৪২ – ২০১৬)

মোহাম্মদ আলির বিরাট ম্যানশন, রঙিন কাচ, তুর্কি কার্পেট আর খাঁটি মেহগনি কাঠের মাঝখানে বসে কানের কাছে উড়তে থাকা একটা পোকা তাড়াবার চেষ্টা করছিলাম আমি। বেশ বড় সাইজের পোকাটা আমার কান ঘেঁষে ভন ভন করে চলে গেল। হাত দিয়ে চাপড়ে দেওয়ার চেষ্টা করলাম; কিন্তু মনে হলো কিছু নেই। মোহাম্মদ আলি ব্যাপারটা দেখে নিজের মনেই হাসতে থাকলেন।

একটু পর যেই দরজার দিকে এগিয়েছি, সাথে সাথে পোকাটা খুব কাছ দিয়ে উড়ে চলে গেল। অনেকটা আমার চুল ঘেঁষেই। আমার নড়াচড়া দেখে আলি তখনও অদ্ভুতভাবে হাসছেন।

তারপর বুঝিয়ে দিলেন ঘটনাটা কী।

“হাত কিন্তু একদম শুকনো থাকতে হবে। আর এইভাবে বুড়ো আঙুলটা নিয়ে তর্জনীর পাশে ঘষা দিলেই ভন ভন শব্দ হয়। কারো পিছন থেকে আস্তে করে কানের কাছে এইরকম করলে সবাই মনে করে বড়-সড় কোনও মাছি উড়ছে।”

একদম বাচ্চা ছেলের মত হাসতে হাসতে বললেন,”আমি সবসময় এইভাবে ভড়কে দেই। কেউ বুঝতেই পারে না।”

এনবিসি থেকে একটা কালো লিমুজিন পাঠানো হয়েছে। ‘দ্যা টুনাইট শো’ এর অতিথি হিসাবে ওইখানে যাবেন আলি। শো শেষ হওয়ার পর স্ত্রী ভেরোনিকা আর মেয়ে হ্যানা’কে নিয়ে যাবেন মুভি দেখতে। কোন মুভি? ‘রকি টু’ অবশ্যই। ‘রকি টু’ এর বিশেষ প্রদর্শনীর ব্যবস্থা করা হয়েছে, আর এইবার ফিল্ম ক্রিটিক হিসাবে থাকবেন স্বয়ং মোহাম্মদ আলি।

“রকি পার্ট টু। মোহাম্মদ আলির ভূমিকায় আছেন অ্যাপোলো ক্রিড,” বললেন আলি।

কোনওরকম ঝামেলা ছাড়াই অনুষ্ঠানের শুটিং শেষ হলো। হোস্ট হিসাবে ডায়ানা রসের প্রথম শো ছিল সেদিন। রসের বয়স নিয়ে আলি ঠাট্টা করলেন, ঝুঁকে গিয়ে তার নোটগুলি পড়লেন, তারপর নিজের রিটায়ারমেন্ট পার্টিতে গান গাওয়ার ব্যাপারে কথা নিয়ে আসলেন তার কাছ থেকে।

এর কিছুক্ষণ পরই আরেকটা লিমুজিন আসলো; বাদামি-নীল রঙের রোলস রয়েস। বিশ্ব হেভিওয়েট চ্যাম্পিয়ন সেটাতে চড়ে রওনা দিলেন বাড়ির উদ্দেশ্যে। যাওয়ার সময়টা বেশ চমৎকারভাবেই কাটলো। রাস্তার এমন কোনো লোক নেই যিনি আলিকে চিনতে পারেন নি। হাত নেড়ে, চিৎকার করে তাকে সংবর্ধনা জানালেন সবাই। আলি বলেন, তিনি নাকি পৃথিবীর সবচেয়ে বিখ্যাত ব্যক্তি। হয়ত ঠিকই বলেন।

rocky-II-poster

‘রকি টু’ ছবির পোস্টার।

খ্যাতির ব্যাপারে তিনি নিজেও সতর্ক ছিলেন অবশ্য। সামনের সিটে ড্রাইভারের একদম পাশে গিয়ে বসলেন। চলা শুরু হলে অন্য লেনের গাড়িগুলি আর পথচারীদের দিকে তাকিয়ে থাকলেন। লোকজন সবাই বিশাল লিমুজিন দেখে পেছনের সিটে তাকালো। কিন্তু বিখ্যাত কাউকে দেখতে না পেয়ে খানিকটা হতাশ হয়েই ধীরে ধীরে সামনের সিটে তাকায় তারা। আলি ততক্ষণে নিজেই তাদের দিকে হাত নাড়া শুরু করে দিয়েছেন। তাদের সরল মুখগুলিতে হাসি ছড়িয়ে পড়ে। হাত মুঠো করে তাদের দিকে ঘুষি ছুড়ে মারেন আলি, তারপর দুই আঙুলে দেখান ভিক্টরি সাইন। আমরা শুধু বারব্যাংক থেকে উইলশেয়ার বুলভার্ডেই যাচ্ছিলাম না, পুরো যাত্রাটাকে যেন কোনও নায়কের প্যারেড বলে মনে হচ্ছিল।

বাসায় এসে তার স্টাডির সাথে লাগোয়া একটা টেলিভিশনের পাশে বসেছিলেন আলি। ভেরোনিকার জন্য অপেক্ষা করছিলেন; মুভি দেখতে যেতে হবে। আলির ব্যবস্থাপক সহকারী জেরেমায়াহ শাবাজ আলির খ্যাতি আর ভক্তকুলের প্রতিক্রিয়া নিয়ে কথা বললেন, “সবচেয়ে বড় দর্শকের দল সম্ভবত দক্ষিণ কোরিয়াতে দেখেছিলাম। ম্যানিলাতে তো প্রায় মিছিলের মত অবস্থা হয়ে গেল। পারলে সবাই এয়ারপোর্ট ভেঙে ফেলে। রাশিয়াতেও সবাই চিনত ওকে, কিন্তু কোরিয়ার মত আর কোথাও হয় নাই।”

আলি আমাদের এই কথোপকথনে যোগ দিলেন না। তিনি কখন কাকে গুরুত্ব দিবেন কিংবা দিবেন না, সেই ব্যাপারে তার নিজস্ব সিদ্ধান্ত থাকে। কখনো কখনো তাকে খুব আত্মনিমগ্ন মনে হয়। রুমভর্তি মানুষের মধ্যেও মাঝে মাঝে একা আর বিচ্ছিন্ন লাগে তাকে দেখলে।

মেয়ে হ্যানা এসে কোলে বসার আবদার জানালে ধ্যান ভাঙে তার। মেয়ের সাথে নরম গলায় কথা বললেন আলি।

তারপর শিকাগো থেকে বেড়াতে আসা পুরনো বন্ধু ক্লিভ ওয়াকারকে জিজ্ঞেস করলেন, “ভেরোনিকা কী বলল?”

“এই তো, এখনি নিচে নামবে।”

“চল, যাই তাহলে।”

ম্যানশনের ড্রাইভওয়ে থেকে পাঁচটা গাড়ি একসাথে বের হলো—ঠিক কোনো রাষ্ট্রপতির শোভাযাত্রা। লাইনের দুই নম্বর গাড়িতে ছিলেন আলি। নিজের মার্সিডিজ নিজেই চালাচ্ছিলেন। গন্তব্য এম.জি.এম স্টুডিও’র ইউনাইটেড আর্টিস্টস এর হেডকোয়ার্টারস। সবগুলি গাড়িতেই ইমার্জেন্সি ফ্ল্যাশলাইট জ্বলছিল পুরোটা সময়। দ্বিতীয়বারের মত এই নায়কের প্যারেড বেশ উপভোগ করছিলাম আমি।

যারা গুজবে কান দিয়েছে, তারা আলির আসার খবর অনেকে আগেই পেয়ে গিয়েছিল। স্টুডিওর পার্কিং লটে কয়েকজন ছেলেকে দেখতে পেলাম। আলি ওদের সাথে হাত মেলালেন, কাঁধ ঝাঁকিয়ে কিছু প্রেরণা দিলেন; একেবারে সটান হয়ে দাঁড়িয়ে পড়লো সবাই। যেন কোনও রাজা ওদের আশীর্বাদ করেছেন।

রকি টু মুভির দৃশ্য।

রকি টু মুভির দৃশ্য।

কিছু সময় পর আমরা গ্রীষ্মের সবচেয়ে জনপ্রিয় মুভিটি দেখার জন্য একটা প্রাইভেট স্ক্রিনিং রুমে এসে ঢুকলাম। অস্কারজয়ী যে ছবিটি সিলভেস্টার স্ট্যালোনকে তারকা বানিয়েছিল, সেই ছবির সিক্যুয়েল আরম্ভ হলো। মুভিটি ছিল ফিলাডেলফিয়ার এক ক্লাব ফাইটারের বিশ্ব হেভিওয়েট চ্যাম্পিয়ন কৃষ্ণাঙ্গ অ্যাপোলো ক্রিডকে ধরাশায়ী করার গল্প। আলি বলেছিলেন, রকি’র প্রথম পর্বটা নাকি তার খুবই পছন্দের সিনেমা। একেবারে পেছনের সারিতে স্ত্রী-কন্যাকে পাশে নিয়ে বসলেন তিনি। হয়ত ভাবছিলেন, তিনি যদি বক্সিং এর হারানো গৌরব ফিরিয়ে না আনতেন তাহলে হয়ত রকির মত কোনো সিনেমাই আর বানানো হত না। যদিও মুখে সে রকম কিছু বললেন না।

শুরুর দিকের দৃশ্যগুলি নীরব দর্শকের মত দেখে গেলেন আলি। যখন অ্যাপোলো ক্রিড টেলিভিশনে রকিকে তার মুখোমুখি হওয়ার জন্য খোঁচা দেওয়া শুরু করলেন, শুধু তখনই প্রথম কথা বললেন তিনি।

“এই ভঙ্গিটা পুরো আমার মতই হয়েছে। ক্রিডের কথা বলার ধরনও আমার মত। প্রতিপক্ষকে উত্তেজিত করার জন্য মিডিয়ায় অপমান করা—এ তো আমারই কাজ।”

রকির নতুন বাসায় কলিং বেল বেজে উঠল। আলি বললেন, “নিশ্চয়ই তার ট্রেইনার এসেছে।”

ঠিক তাই। রকি দরজা খুলে দেখে তার পুরনো ট্রেইনার মিকি দাঁড়ানো।

“অ্যান্জেলো ডান্ডি ঠিক এভাবেই আমার কাছে আসতেন। একজন ভালো ট্রেইনার জানেন যে একজন ভালো বক্সার কখনোই তার নামে টিভিতে আজেবাজে কথা শুনতে পারে না।”

রকিকে ট্রেইনার মিকি বোঝালেন: “ডান হাত দিয়ে ফাইট করা শুরু করো। বাম পাশটাকে সামলে রাখতে হবে, যাতে চোখের আর কোনো ক্ষতি না হয়।”

আলি বললেন, “কোনও ট্রেইনার যদি তার বক্সারকে সতেরো-আঠারো বছর বয়স থেকে ট্রেইনিং দেওয়া শুরু করেন, তাহলে ধরেন বাইশ বছরের দিকে এসে চাইলে তার ফাইটিং হ্যান্ড বদলে দেওয়া যায়। কিন্তু রাতারাতি এটা সম্ভব না।”

m-ali-7

ভক্তদের সাথে আলি

এরপর রকির ট্রেইনিং শুরু হয়—সেই মুরগির পেছনে দৌঁড়ানোর বিখ্যাত দৃশ্য। “এইটা অনেক আগেকার ঘটনা, জ্যাক জনসন আর জো লুইসের আমলে তারা মুরগির পেছনে ধাওয়া করতেন,” বললেন আলি, “আর এখন কোনো ট্রেইনিং ক্যাম্পের ডাইনিং টেবিল ছাড়া আর কোথাও মুরগি পাবেন না।”

রকি পাঞ্চিং ব্যাগের উপর অনবরত ঘুষি চালিয়ে যাচ্ছে। মিকি চিৎকার করছে, “জ্যাব! জ্যাব! জ্যাব!”

“একজন ভালো ফাইটারকে কখনোই এই কথাটা বলতে হয় না। সে রোবটের মত ঘুষি মারতে থাকে। আমাকে কেউ কখনো বলে নাই। আর তাছাড়া যদি ঘুষিই না মারো তাহলে আসছ কী করতে?”

তারপর দূর থেকে নেওয়া একটা শট। রকি ফোরগ্রাউন্ডে আর তার পেছনে আরো প্রায় এক ডজন বক্সার—সবাই নিজেদের মত ব্যয়াম করছে।

“এই জায়গাটা ভালো করে দেখেন। যে কোনো বক্সার স্ট্যালোনকে দেখলেই বুঝে যাবে যে তিনি বক্সার নন। তার শারীরিক ভঙ্গি দেখলেই বোঝা যায়। হ্যাঁ, চমৎকার অ্যাক্টিং—কিন্তু বক্সিং না। তবে ওই যে পেছনে লাল প্যান্ট পরা ছেলেটাকে দেখা যাচ্ছে, ওকে দেখলেই বোঝা যায় সে একজন বক্সার।”

এরপর রকি রিং এর ভেতর প্র্যাকটিস শুরু করে। সাথে একজন বক্সিং পার্টনার। আলি বললেন, “স্ট্যালনের যে পার্টনার, সে কিন্তু সত্যিকার বক্সার। স্ট্যালোনের অভিনয় নিখুঁত; সাধারণ মানুষ তো আর আমার মত সূক্ষ্ম ব্যাপারগুলি ধরতে পারবে না। কিন্তু এইখানে ট্রেইনারকে যেভাবে দেখাচ্ছে তা পুরোটাই ভুল। তিনি সারাক্ষণ চিৎকার করে এটা করতে বলছেন, ওটা করতে বলছেন। এইভাবে কেউ বলে না। এই ব্যাপারগুলি দেখলে বক্সারদের সার্কাসের জন্তু মনে হয়, যাদের সবকিছু হাতে ধরে শেখানো লাগে।”

“আচ্ছা, এরকম কি কখনো মনে হয়েছে যে রকির চরিত্রটা আপনার জীবন থেকে অনুপ্রাণিত?” জিজ্ঞেস করলাম আমি।

“মোটেও না। রকির কোনোকিছুই আমার মত না। তবে অ্যাপোলো ক্রিড যেভাবে কথা বলে, নড়াচড়া করে, ঘুষি চালায়—তার সব কিছুই আমার মত।”

সিনেমার এক পর্যায়ে রকির জীবনে কিছু সঙ্কট আসে। ছেলের জন্মের পর কোমায় চলে যায় তার স্ত্রী। রকি হাসপাতালের চার্চে গিয়ে প্রার্থনা শুরু করে।

“এখন তার ফাইট করার কোনো ইচ্ছা নাই কারণ তার স্ত্রী অসুস্থ। এইটা কিন্তু একদম বাস্তব ঘটনা! আমার একটা ডিভোর্সের সময় আমি ট্রেইনিং ক্যাম্পে ছিলাম, তখন আমার এই অবস্থা হয়েছিল। মেয়েদের ব্যাপারে চিন্তিত থাকলে আপনি কখনোই ফাইট করতে পারবেন না। সারাক্ষণ শুধু ঘুম আসবে আপনার, মনোযোগ থাকবে না এক ফোঁটা। এখন এই জায়গায় আমি একটা প্রেডিকশন করব। মুভিটা আমি দেখি নাই, কিন্তু আমার কাছে মনে হচ্ছে যে ওর স্ত্রী ভালো হয়ে যাবে। আর তারপর অ্যাপোলো ক্রিডকে তুলাধুনা করবে রকি।”

হাসপাতাল রুমে রকির স্ত্রীর জ্ঞান ফিরে আসে। আলি বললেন, “যাক, একটা মিলে গেল।”

“আমার জন্য একটা কাজ করতে হবে তোমার। যাও, গিয়ে জিতে আসো।” রকির দিকে তাকিয়ে দৃঢ়ভাবে বলে ওঠে তার স্ত্রী।

আলি চিৎকার দেন, “ইয়াহ! বীট দ্যাট নিগার’স অ্যাস!”

rocky-987o

স্ত্রীর সঙ্গে রকি।

পরের দৃশ্যে একজন নার্স রকির ছেলেকে রুমের ভেতর নিয়ে আসলেন। আপ্লুত আলি বললেন, “পিচ্চিটাকে তো অস্কার দেওয়া উচিত! ওর চুল দেখেন, পুরো ইতালিয়ান! রকি তো বাস্তবেও কোর্টে প্রমাণ করতে পারবে না যে এটা তার ছেলে না!”

এরপর শুরু হয় রকির ট্রেনিং মন্তাজ। পূর্ণ উদ্যমে অনুশীলন চলে। “এইবার ঠিক আছে। ভালোবাসার মেয়েকে ফিরে পেয়েছে—তার মন ভালো এখন। আমি আবার একটা প্রেডিকশন করি, দেখেন মিলে কিনা। লাস্টের ফাইটে দেখা যাবে রকির অবস্থা খুব খারাপ। চোখ কেটে ফুলে যাবে, মার খাবে অনেক। প্রথমে মনে হবে সে হেরে যাচ্ছে। শেষমেশ রকিই জিতবে আর ছেলেরা সবাই মেয়েদের চেয়েও জোরে জোরে কান্নাকাটি শুরু করবে।”

ট্রেনিং এর এক পর্যায়ে রকিকে ওয়েট লিফটিং করতে দেখা যায়। “একজন বক্সারের জন্য সবচেয়ে ক্ষতিকর জিনিস এই ওয়েট লিফটিং। মাসল সব শক্ত হয়ে যায়। কিন্তু মুভিতে এসব দেখতে ভালোই লাগে।”

মুভির সবচেয়ে অনুপ্রেরণাদায়ক দৃশ্যে ফিলাডেলফিয়ার রাস্তা ধরে দৌড়ানো শুরু করে রকি। তার পেছনে মানুষের ঢল। এক পর্যায়ে ফিলাডেলফিয়া আর্ট মিউজিয়ামের সিঁড়ি বেয়ে উঠতে থাকে সে। তারপর শেষ ধাপ পার করে বিখ্যাত সেই ভঙ্গিমায় হাত দু’টো তুলে দেয় উপরে।

“এখন এই দৃশ্য দেখে অনেকেই বলবে ব্যাপারটা ভুয়া,” বললেন আলি, “কিন্তু এইটা একদম বাস্তব। আমি নিউ ইয়র্কে থাকার সময়ও মানুষ এভাবেই আমার পেছনে পেছনে দৌড়াত।”

তারপর এলো মুভির শীর্ষ মুহূর্তের বক্সিং ম্যাচের দৃশ্যটি। এইবারের ম্যাচটি প্রথম মুভির চেয়ে দৈর্ঘ্য, ভায়োলেন্স—সবদিক থেকেই বড় আর বেশি। ম্যাচের আগে কার্ল উইদার্স অভিনীত অ্যাপোলো ক্রিড চরিত্রটি ড্রেসিং রুমের আয়নার দিকে তাকিয়ে নিজের দিকেই ঘুষি ছোঁড়া শুরু করে।

আলি বললেন, “উইদার্স বলেছিলেন তিনি নাকি আমার ম্যাচের ভিডিওগুলি দেখেই অ্যাপোলো ক্রিডের সব স্টাইল তৈরি করেছেন। কিন্তু এইখানে অ্যাপোলো আয়নায় যেভাবে ঘুষি দিচ্ছে, বাস্তবে এরকম কোনো ফাইটিং মুভ নেই। তবে মুভির জন্য ঠিক আছে। তাছাড়া তার মোটিভেশনও পরিষ্কার। প্রথম ম্যাচ যদিও সে জিতেছিল, কিন্তু অনেকের মতেই ম্যাচটা রকির জেতা উচিৎ ছিল। বড় ম্যাচ হেরে গেলে আপনার মাথায় শুধুই প্রতিশোধের ইচ্ছা ঘুরতে থাকে। অ্যাপোলো একজন হেভিওয়েট চ্যাম্পিয়ন। একটা ক্লাব ফাইটারের সাথে প্রায় হেরেই গিয়েছিল সে, কাজেই তার প্রতিশোধ নেওয়াটা জরুরি।”

একজন ক্লাব ফাইটারের পক্ষে কি আসলেই কোনও হেভিওয়েট চ্যাম্পিয়নের সাথে রিং এর মাঝে এতক্ষণ টিকে থাকা সম্ভব?

“না। সে পারলে মার সহ্য করে কিছু সময় পর তাকে নক আউট করার একটা সুযোগ নিতে পারে। যদিও সেই সম্ভাবনাও অনেক কম। কিন্তু পুরো সময় তার বিপক্ষে টিকে থাকা অসম্ভব ব্যাপার।”

এরপরের দৃশ্যে রকিকে তার লকার রুমে হাঁটু গেঁড়ে বসে প্রার্থনা করতে দেখা যায়। ঘুমন্ত মেয়েকে কোলে নিয়ে খুব মনোযোগ দিয়ে দৃশ্যটা দেখছিলেন মোহাম্মদ আলি।

রকি উঠে দাঁড়ানোর সাথে সাথেই আলি তার অভিনিবেশ ভাঙলেন, “এই মুহূর্তটা একজন বক্সারের জীবনের সবচেয়ে ভয়ঙ্কর মুহূর্ত! ড্রেসিং রুম মানে আপনার ট্রেনিং সব পেছনে ফেলে এসেছেন আপনি; বিশ্বের কোনো উপদেশই তখন আর কাজে আসবে না। একটু পরেই আপনি থাকবেন রিং এর ভেতর। তখন ভয় ছাড়া আপনার সাথে আর কিছুই নাই।”

আরো পড়ুন: টুইটারে ট্রলের শিকার মোহাম্মদ আলি

অ্যাপোলো ক্রিড আর রকি বালবোয়া তাদের নিজস্ব ভঙ্গিমায় রিং এর দিকে এগোতে থাকে। পরের শটে টিভির সামনে বসে থাকা রকির চিন্তিত স্ত্রীকে দেখা গেল। অ্যাপোলোর স্ত্রী দাঁড়িয়ে আছে রিং এর কাছেই।

“এমনকি অ্যাপোলোর স্ত্রীও আমার ভেরোনিকার মত দেখতে,” বললেন আলি, “দুইজনের গায়ের রঙই হালকা, দুইজনেই অনেক সুন্দরী…”

অ্যাপোলো রকিকে কটাক্ষ করা শুরু করেছে, “ইউ আর গোয়িং ডাউন! আই অ্যাম দ্যা মাস্টার অফ ডিজাস্টার!”

“প্রথম দুইটা লাইন আমার কাছ থেকে নেওয়া। তবে পরের এই ‘মাস্টার অফ ডিজাস্টার’টা ভালোই মানিয়েছে। আরো আগেই এরকম কিছু একটা ভাবা উচিত ছিল আমার।” বলতে বলতে আফসোস করলেন আলি।

মুষ্টিযুদ্ধ শুরু হলো। অ্যাপোলো আর রকির ঘুষি দেওয়া-নেওয়া চলছে। আর রকির কাছ থেকে দূরে দূরে থেকে কটাক্ষ করেই যাচ্ছে অ্যাপোলো। সেই সাথে রাউন্ড বিরতিতে ট্রেইনাররা নিজেদের মত করে দিচ্ছে নির্দেশনা।

mohammad-ali-1

সিলভেস্টার স্ট্যালনের সঙ্গে মোহাম্মদ আলি

“আমার ট্রেইনার আমাকে রাউন্ডের মাঝখানে কিছু বলতেন না। আমিই বলতে দিতাম না। আমি শুধু জানতে চাই রাউন্ডটা আমি জিতলাম কিনা, ব্যস! উপদেশের সময় অনেক আগেই শেষ।”

আপনার কি মনে হয়—এই ছবিতে খেলা কয় রাউন্ড পর্যন্ত যেতে পারে?

“ঠিক নাই, বলাটা কঠিন। কিন্তু ওই যে দেখেন, অ্যাপোলো আমার রোপ-আ-ডোপ ডিফেন্স ইউজ করছে।”

দশম রাউন্ডে আলি মাথা নাড়লেন, “এই রাউন্ডে এসে সব শ্রেষ্ঠ ফাইটাররা নতুন করে উদ্যম ফিরে পায়।”

এই সময়টায় রকি খুব বাজেভাবে অপদস্থ হওয়া শুরু করল। ঠিক যেমন আলি অনুমান করেছিলেন—রকির চোখের পাতা ফুলে গেছে।

আলি বললেন, “আসল ফাইটে চোখ এতটা বন্ধ হয়ে গেলে কখনোই ম্যাচ কন্টিনিউ করা হত না। এতক্ষণে খেলা শেষ করে দিত।”

roger-ebert-21

‘রজার ইবার্ট (১৯৪২-২০১৩)’ বিশ্বের সবচেয়ে জনপ্রিয় চলচ্চিত্র সমালোচক। পেশাজীবনের প্রায় পুরোটা সময় আমেরিকার ‘শিকাগো সান-টাইমস’ পত্রিকার সাথে যুক্ত ছিলেন । ১৯৭৫ সালে চলচ্চিত্র সমালোচনার জন্য সর্বপ্রথম পুলিৎজার প্রাইজ দেওয়া হয় তাকে।

আলির মতে বাস্তব জীবনের বক্সিংয়ে কখনোই এতটা শারীরিক নির্যাতন সহ্য করা সম্ভব না। তবুও ‘রকি টু’ তে খেলা চলল একদম শেষ পর্যন্ত। তারপর রকির বিখ্যাত থিম মিউজিক বেজে উঠলে রুমের লাইটগুলি জ্বালিয়ে দেওয়া হলো। আলির সফরসঙ্গী সবাই করতালি দিলেন।

হ্যানা এখনো ঘুমিয়ে আছে; মেয়ের ঘুম ভেঙে যেতে পারে, তাই খুব সাবধানে উঠে দাঁড়ালেন আলি। তারপর মেয়েকে ভেরোনিকার কোলে তুলে দিলেন আস্তে করে।

“গ্রেট মুভি,” বললেন তিনি, “খুব ভালো লাগল। ভালোবাসা, আবেগ, ভায়োলেন্স—সবকিছুই আছে। এক মুহূর্তের জন্যও উত্তেজনা কমে নি।”

ফাইটটা যেভাবে শেষ হলো, সে সম্পর্কে আপনার কী মনে হয়?

“একজন কৃষ্ণাঙ্গকে অন্যদের চাইতে উন্নত দেখানো আমেরিকার নীতিবিরোধী। আমি বক্সিং এ এতটাই অপ্রতিরোধ্য যে রিং এর ভেতর আমার ইমেজকে প্রতিহত করার জন্য তাদেরকে রকির মত একটা সাদা ইমেজ তৈরি করতে হয়েছে। শ্বেতাঙ্গ আদর্শ আমেরিকার লাগবেই, তা সেটার শেষ ফল যাই হোক না কেন। যিশু, ওয়ান্ডার ওম্যান, টারজান—আর এখন রকি।”

 

About Author

আয়মান আসিব স্বাধীন
আয়মান আসিব স্বাধীন

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ডেভেলপমেন্ট স্টাডিজ বিভাগে পড়াশোনা করছেন। বই : সিনে-লয়েড (২০১৭, চৈতন্য)