page contents
লাইফস্টাইল, সংস্কৃতি ও বিশ্ব

বাংলাদেশীরা কি ইউরোপিয়ানদের পূর্বপুরুষ

বাংলাদেশ ভূখণ্ডে প্রথম কবে কোনো গোরা লোকের পা পড়েছিল? ষোড়শ শতাব্দীর শুরুর দিকে কোনো এক সময় হবে হয়তো। কিছু আগেও হতে পারে। লোকটা ওলন্দাজ হওয়ার সম্ভাবনা বেশি। সওদাগরি বাণিজ্যের খাতিরে বা একটা দূরগামী জাহাজ বানিয়ে নেওয়ার বায়না দিতে লোকটা চট্টগ্রাম বা বরিশালের কোথাও পা রেখে থাকতে পারে। খুব করে পুরনো নথিপত্র ঘাঁটাঘাটি করে তেমন একটা সুনির্দিষ্ট লোককে খুঁজে বের করে ফেলা হয়তো বিচিত্র নয়।

কিন্তু আমি প্রশ্নটা যদি উল্টে দেই? বলি যে, বাংলাদেশ ভূখণ্ডের প্রথম কোন লোকটি ইউরোপে পা রেখেছিল?

shibbratalogo

প্রশ্নটা এভাবে আসলে উল্টেই গেছে। অন্তত বিজ্ঞানের গবেষণাগারে। আর এ প্রশ্নের জবাব খুঁজে বের করাটা দরকারিও হয়ে উঠেছে। কেননা যে বিশেষ লোকটিকে আমরা খুঁজছি, সম্ভবত সে আজকের জমানার গৌরবর্ণ ইউরোপীয়দের পূর্বপুরুষ।

একটু কি বেশি বলা হয়ে গেল?

সাম্প্রতিক এক জিন গবেষণার ফলাফল যা জানাচ্ছে, সেটা কিন্তু এর চেয়ে খুব কম কিছুও না।

তারা বলছে, যে-জিনটির কল্যাণে আজকের যুগের ইউরোপের মানুষ ফর্সা চামড়ার অধিকারী, সেই জিনটি এসেছে ১০ হাজার বছর আগে একটি সুনির্দিষ্ট মানুষের কাছ থেকে। সেই মানুষটি বাস করতো মধ্যপ্রাচ্য থেকে শুরু করে দক্ষিণ ভারতের কোনো এক জায়গায়। দক্ষিণ ভারত মানে ভৌগোলিকভাবে সেটা আজকের জমানার বাংলাদেশ পর্যন্ত বিস্তৃত।

বিভিন্ন ভৌগোলিক বিন্যাসের মানুষের মধ্যে গাত্রবর্ণের যে তফাৎ দেখা যায়, বিজ্ঞানীরা বলছেন, সেটার জিনগত কারণ তারা শনাক্ত করে ফেলেছেন। এই কালপ্রিটের নাম SLC24A5 জিন। যুক্তরাষ্ট্রের পেন স্টেট কলেজ অব মেডিসিনের গবেষক কেইথ চেং কিছুদিন আগে এক গবেষণায় দেখিয়েছিলেন, এই SLC24A5 জিনের একটি বিশেষ মিউটেশন এক বিশেষ ধরনের অ্যামাইনো এসিডের বিন্যাস তৈরি করে। ইউরোপীয়ানদের সঙ্গে আফ্রিকার কালো মানুষদের গাত্রবর্ণের যে পার্থক্য সাদা চোখে দেখা যায়, সেটার এক-তৃতীয়াংশের জন্য দায়ি এই মিউটেশন।

কেইথ চেং বলছেন, SLC24A5 জিনের মিউটেশন প্রোটিনের গঠনকাঠামোর মধ্যে সামান্য একটু পরিবর্তন ঘটায়। আর তারই কল্যাণে ইউরোপীয়দের সঙ্গে আফ্রিকার মানুষদের গায়ের রঙের এত তফাৎ। তিনি আরও জানান, ফর্সা ত্বক উত্তরের শীতপ্রধান এলাকায় সূর্যালোকবঞ্চিত মানুষজনকে কিছু সুবিধা দিয়েছিল, বিশেষ করে শরীরে ভিটামিন ‘ডি’ তৈরির সুবিধা।

কেইথ চেং

একবার দায়ী জিন আর তার মিউটেশন শনাক্ত হয়ে যাওয়ার পর দ্বিতীয় আরেক ধাপের গবেষণায় নামেন বিজ্ঞানী কেইথ। তার সঙ্গে এবার যোগ দেন প্রফেসর ভিক্টর কেনফিল্ড। এবার তাদের মিশন, সারা দুনিয়ার মানুষের ডিএনএ বিন্যাস দেখে বেড়ানো। বিশেষ করে SLC24A5 জিন আর সেটার মিউটেশন অন্য এলাকার মানুষের মধ্যে কীভাবে কতটুকু বিরাজ করছে, সেটাই তাদের প্রধান কৌতূহল।

এটা এমন এক বইয়ের পাতা কুড়িয়ে বেড়ানোর মতো, যে বইটা ছিঁড়ে ছিঁড়ে বিশ্বময় ছড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। আপনার কাজ হচ্ছে বইয়ের পাতাগুলোই শুধু কুড়িয়ে জোগাড় করা নয়, পৃষ্ঠা নম্বর মিলিয়ে মিলিয়ে পুরো বইটা আবার পাঠ উপযোগী করে তোলা।

কাজটা কঠিন আর শ্রমসাধ্য সন্দেহ নেই, তবে এর প্রাপ্তিটা লোভনীয়। একটা গ্র্যান্ড উপন্যাস একটু একটু করে আকার পাচ্ছে, যেটা ‘জনরা’ বিচারে রহস্যকাহিনী।

এতদিন পরে সেই উপন্যাস তাদের চোখের সামনে ভেসে উঠেছে।

দুই মার্কিন বিজ্ঞানী যে মিউটেশনটি খুঁজছিলেন, সেটার নাম A111T, আর এটা ইউরোপীয় সাদা চামড়ার সব মানুষের মধ্যেই পাওয়া যায়।

কিন্তু দেখা যাচ্ছে, এই একই মিউটেশন আবার পাওয়া যাচ্ছে মধ্যপ্রাচ্য আর দক্ষিণ ভারতের মানুষজনের মধ্যেও। খুব অল্প পরিমাণে এটা উত্তর আফ্রিকার লোকজনের মধ্যেও পাওয়া যাচ্ছে।

তার মানে কী?

মানে খুব সোজা।

মধ্যপ্রাচ্য, দক্ষিণ ভারত আর উত্তর আফ্রিকার মানুষজনের মধ্যে অভিন্ন পূর্বপুরুষ কেউ ছিল। জিন বিজ্ঞানীদের কাছে এই ইঙ্গিত একেবারে গণিতের মতো সরল। আর তা হলো, দূর অতীতে এদের মধ্যে এমন সুনির্দিষ্ট একজন কেউ ছিল, যার জিনে প্রথম মিউটেশনটির আবির্ভাব ঘটেছিল। তারপর সেটা শুধু জিন থেকে জিনে প্রবাহিত হয়েছে। এ যেন পিতার নাম লেখা একটা চিরকূট বয়ে নিয়ে বেড়ানো।

এই দুই বিজ্ঞানী জিন মিউটেশনের যে ভৌগলিক প্যাটার্ন আবিষ্কার করছেন, তা জানাচ্ছে, সেই বিশেষ ব্যক্তিটি দশ হাজার বছর আগে বাস করতো মধ্যপ্রাচ্য থেকে শুরু করে দক্ষিণ ভারত পর্যন্ত এলাকার যে কোনো একটা জায়গায়।

প্রফেসর চেং বলছেন, “মধ্যপ্রাচ্য আর দক্ষিণ ভারত, যার মধ্যে আছে ভারত, পাকিস্তান আর বাংলাদেশ—এই এলাকার মানুষজনের পূর্বপুরুষ অভিন্ন।”

প্রফেসর চেংয়ের কথা হজম করতে একটু বেগই পেতে হয়। তবে আমি বলবো, জ্ঞাতিসম্পর্কের দাবি আমরা তো কখনই তুলবো না, তোলা ভালো দেখায় না, বিশেষ করে ওখানে গিয়ে। ইউরোপের বিমানবন্দরের ইমিগ্রেশনে যখন শুধু বাদামি চামড়ার বলে আমাদের জুতোমোজা খোলাখুলির যন্ত্রণায় ব্যতিব্যস্ত করে তোলা হবে, তখনও উচিৎ হবে না ইমিগ্রেশন সিকিউরিটি কর্মীর কানে ফিসফিস করে এই নতুন বার্তাটি দেওয়া। আমরা কেবল এটুকু করতে পারি যে, সাদা চামড়ার ইউরোপীয়রা এদেশে অতিথি হিসেবে এলে বিমাবন্দরে আমাদের ইমিগ্রেশন অফিসার মিষ্টি করে হেসে বলবেন, ওয়েলকাম হোম।

About Author

শিবব্রত বর্মন

কথাসাহিত্যিক, অনুবাদক ও সাংবাদিক। জন্ম : ১৯৭৩, ডোমার, নীলফামারী। প্রকাশিত গ্রন্থ : ছায়াহীন; মিগুয়েল স্ট্রিট (অনুবাদ) ভি এস নাইপল; কদর্য এশীয় (অনুবাদ) সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ; পাইয়ের জীবন (অনুবাদ) আয়ান মার্টেল