page contents
লাইফস্টাইল, সংস্কৃতি ও বিশ্ব

বাংলার স্বরযন্ত্রে ইসলামি পরিভাষার গতিপ্রকৃতি

বাংলা ভাষায় ইসলাম ধর্মের গুরুত্বপূর্ণ পরিভাষাগুলি লক্ষ্য করলে দেখা যাবে আরবি আর ফার্সির মেলবন্ধন ঘটেছে, যা বাংলার ইসলামের উত্থানের ইতিহাসের সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ। কিন্তু বর্তমানে সেই পরিভাষাগুলির উৎস ও উচ্চারণকে কেন্দ্র করে, সহি আরবিকে মান ধরে একটা বাছাই প্রক্রিয়ার নজরে পড়ছে।

প্রক্রিয়াটির মধ্যে দুটি তাগিদ বিশেষ চোখে পড়ার মত—এক, ইসলামের গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলির জন্য ইতোমধ্যে যেসকল ফার্সি শব্দাবলি ব্যবহার হয়ে আসছে তার বদলে আরবি পরিভাষার ব্যবহারের তাগিদ, এবং দুই, ইতোমধ্যে ব্যবহৃত আরবি পদগুলির উচ্চারণে নেটিভ আরবদের অনুসরণের তাগিদ।

সাম্প্রতিক বিশ্ব এবং আরব যে সম্পর্কে জড়িয়েছে তারই গতিপ্রকৃতি ইসলামে নতুন নতুন তরঙ্গ তুলছে। সে সকল তরঙ্গের দোলা বিশ্বমুসলিমের ব্যবহৃত ইসলামি পরিভাষাগুলিতেও এসে লাগছে।

ahmed-shamim-logo

আমাদের আজকের আলাপের লক্ষ্য সেই তরঙ্গ বাংলাভাষী মুসলমানদের কীভাবে আন্দোলিত করছে তার তত্ত্ব-তালাশ করা। তবে আমাদের বিবেচনাটি হবে ভাষাতাত্ত্বিক। সামাজিক-রাজনৈতিক এবং ধর্মতাত্ত্বিক বিবেচনা আমরা এখানে তুলে রেখে বাংলা ভাষার ইতিহাস, ধ্বনিতত্ত্ব এবং বানানরীতির সাপেক্ষে উক্ত তাগিদগুলির অনুসরণ করার পথে জটিলতাগুলি আলোচনা করব এ লেখায়।

প্রথম তাগিদের প্রেক্ষিতে শুরুতেই বাংলায় ব্যবহৃত ফার্সি থেকে আসা ইসলামি পরিভাষাগুলি থেকে কিছু শব্দ নিয়ে, তাদের আরবি প্রতিশব্দসহ একটি সংক্ষিপ্ত তালিকা তৈরি করা যাক।

ফার্সি খোদা, পয়গম্বর, নামাজ, রোজা, গুনাহ, ফেরেশতা, বেহেশত, এবং দোজখ শব্দগুলির আরবি প্রতিশব্দ হল যথাক্রমে আল্লাহ, নবী, সালাত, সিয়াম, খাতাহ<খাতি’আহ, মালাক (যেমন, মালেকুল মউত হল মৃত্যুর ফেরেশতা), জান্নাত, এবং জাহান্নাম।

প্রসঙ্গক্রমে বলা যাক যে, তারমধ্যে আবার বাংলা শব্দগঠনের একটি বিশেষ পদ্ধতি মন্ত্রী-মিনিস্টারে আদলে গুনা-খাতাহ এবং খোদা-তাল্লাহ কিংবা আল্লা-খোদা পদগুলি তৈরি করেছে। এটা এক্ষেত্রে বাংলা ভাষার স্বাতন্ত্র্যের পরিচয় বহন করে।

যাহোক, মূল আলোচনায় ফিরি।

arabian-calli

আরবি ক্যালিগ্রাফি ডিজাইন।

ইদানীং খোদা হাফেজ থেকে খোদা শব্দটিকে বিদায় জানিয়ে আল্লাহ হাফেজ বলার তাগিদ আসছে; তেমনি তাগিদ আসছে নামাজের স্থলে সালাত, রোজার জায়গায় সিয়াম ব্যবহার করার।

সহি আরবির ব্যবহারের ফজিলতের কথা চিন্তা করে এমনসব মাছলা এসে থাকবে। পাশাপাশি অন্য কারণও থাকতে পারে, যেমন আরব, বিশেষ করে সৌদি-আরব এবং ইরানের তিক্ত রাজনৈতিক সম্পর্ক।

এ কথা বলাই বাহুল্য যে, বিশ্ব-মুসলমানদের ব্যবহৃত ফার্সি পরিভাষাগুলি আরবির পাশাপাশি চলে আসছে বহুকাল ধরে, বিশেষ করে এশিয়াতে ইসলামি সংস্কৃতির অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ হয়ে গেছে। রাজনৈতিক বিবেচনায় ফার্সি শব্দগুলি ঝেড়ে ফেলা একদিকে যেমন ইসলামি সংস্কৃতির অঙ্গহানি, অন্যদিকে তেমন স্থানীয় ভাষাগুলিরও ক্ষতি।

এবার আসি আরবি পরিভাষাগুলির বাংলা উচ্চারণের বদলে নেটিভ আরবি উচ্চারণের তাগিদ প্রসঙ্গে।

রমজান মাস শুরু হয়েছে; সামাজিক মাধ্যমে দেখা যাচ্ছে মাসটির নামের সহি আরবি উচ্চরণ রামাদান করার এবং লেখার তাগিদসম্বলিত লেখালেখি। অনেকে আবার রামযান বলার এবং লেখার পক্ষপাতী। লক্ষ্য করবেন, এখানে অ-কার আ-কার এবং জ, য, দ নিয়ে বাহাসটি তৈরি হয়েছে।

মজার বিষয় হল, বাংলায় মাসটির নাম হুবহু অর্থাৎ যেভাবে নেটিভ আরবগণ উচ্চারণ করেন সেভাবে লেখা সম্ভব না। কেননা, শব্দটি হল رمضان এবং এখানে যেসব স্বর ব্যাঞ্জনের ব্যাপার আছে তার মধ্যে বাংলা হরফে আনা যায় না এমন অন্তত দুটি ধ্বনি আছে। একটি হ্রস্ব আ এবং অন্যটি দোয়াদের কণ্ঠমূলীয় (guttural) দ।

বিষয়টি বোঝার জন্য আমরা সংশ্লিষ্ট আরবি ধ্বনি- ও হরফসমূহ সম্পর্কে সংক্ষিপ্ত আলোচনা করব।

আরবিতে স্বরধ্বনি আছে ৬ টা: হ্রস্ব এবং দীর্ঘ আ, উ, ই। দীর্ঘ আ লেখে আলিফ দিয়ে, দীর্ঘ উ ওয়াও দিয়ে এবং দীর্ঘ ই লেখে ইয়া দিয়ে। হ্রস্ব স্বরগুলির জন্য প্রচলিত আরবিতে কোনো বর্ণ ব্যবহার করা হয় না, তবে যদি হয়, যেমন কুর’আনে হয়েছে, সেক্ষেত্রে যবর হল হ্রস্ব আ, পেশ হল হ্রস্ব উ এবং যের হল হ্রস্ব ই। বিষয়টি যেমন, বাংলার ব্যাঞ্জন বর্ণে একটি করে অ থাকে ঠিক তেমনি আরবি ব্যাঞ্জন বর্ণে একটি করে হ্রস্ব স্বর থাকে। আরবি ভাষায় শিক্ষিতজন সেটা শব্দের ব্যবহার থেকে বুঝে নিতে পারেন প্রতিবেশের সাপেক্ষে।

তাহলে দেখা যাক মাসটির নামে ব্যবহৃত ব্যাঞ্জনগুলি কী কী। রে, মীম, দোয়াদ, আলিফ, নুন। এখানে দোয়াদ ঠিক বাংলা দ-এর মত দন্ত্য দ নয়, এটা গলার আরও গভীর থেকে এর উচ্চারণ হয় (দ-এর নিচে একটা ফুটকি দিয়ে সেটা চিহ্নিত করা যেতে পারে)। ফলে যাদের ভাষায় সেই কণ্ঠমূলীয় দ ধ্বনি নেই তারা অনেকে ওটার কাছাকাছি থাকা কোনো ধ্বনি দিয়ে কাজ সারে।

কিছু কিছু ভাষায় তাই জ অথবা য দিয়ে উচ্চারণ করা হয়। বাংলায়ও তাই হয়েছে ramadaan কে আমরা রমজান বলি। এও লক্ষণীয় যে, স্বরধ্বনিগুলির ক্ষেত্রে এক, বাংলায় আছে দীর্ঘ আ, কিন্তু হ্রস্ব আ নাই, ফলে ramadaan এর দীর্ঘ আ কে আ রেখে হ্রস্ব আ-গুলিকে অ করে ফেলি।

পারসিয়ান ক্যালিগ্রাফি

পারসিয়ান ক্যালিগ্রাফি। শিল্পী. A1one A.k.a Tanha

আবার ম-এর ঠিক পরের অ বাদ দেই কারণ বাংলা শব্দ সুযোগ পেলে দুই সিলেবলে থিতু হয় (যেমন, জানালা, দরজা হয় জানলা, দর্‌জা)। কেউ বলেন রামযান, তারা হ্রস্ব আ এবং দীর্ঘ আ-এর পার্থক্য ঘুচিয়ে দেন, এবং ম-এর পরের সেই অ-টা ফেলে দেন।

দুটাই সঠিক স্বর না থাকার ফল দুই রকম বিকল্প তৈরি হল যা বাংলার ধ্বনিতত্ত্ব নির্দেশিত। যা হোক, ramadaan কে রামাদান বলাও বাংলার ধ্বনিতত্ত্ব অনুমোদিত, যেখানে সব আ-কে দীর্ঘ আ হিসাবে উচ্চারণ করা হচ্ছে, আর কণ্ঠমূলীয় দ-কে দন্ত্য দ হিসাবে বলা ও লেখা হচ্ছে (খুব প্রশিক্ষিত হলে কণ্ঠমূলীয় দ উচ্চারণ সম্ভব, অনেকে তা করেও থাকেন)। ফলে দেখা যাচ্ছে, বাংলার ধ্বনিতত্ত্ব এবং বানানরীতি থেকে মাসটির নামের শতভাগ নিস্তার নাই।

আবার রমজান বাদ দিয়ে রামাদান বলাতেই শেষ হয় না বিষয়টা। কেননা একই কারণে তখন ফরযকে ফার্দ বলার ক্ষেত্র তৈরি হয়। খেয়াল করেন ফরযের আরবি বানান فرض — এখানে ফা, রা আর সেই কণ্ঠমূলীয় দ। ফলে ফা (হ্রস্ব আ) র্‌ এবং দ্‌ মিলে ফার্দ (আরবরা রোমান হরফে বানান করে fard)।

এখন প্রশ্ন উঠতেই পারে, কণ্ঠমূলীয় দ-কে বাঙালিরা শুরুতেই কেন দন্ত্য দ দিয়ে প্রতিস্থাপন করল না?

এটা হতে পারে বাংলাভাষীরা আরবির চেয়ে ফার্সি তুর্কি পশ্তুন, উর্দু ইত্যাদি ভাষার সংস্পর্শে এসেছে বেশি, ফলে ওইসব ভাষায় যেহেতু বিকল্পটা জ বা য, তাই বাংলাও সে পথ ধরেছে। আরও কিছু আরবি ধ্বনি আমরা ইরানিদের (আরও অনেক দেশ আছে) মত উচ্চারণ করি। যেমন আজান বা আযান—এখানে জ বা য -এর স্থলে আরবিতে আছে একটি ঘোষ ঘৃষ্ট দন্ত্য ধ্বনি দ; বানানটি দ্রষ্টব্য- أَذَان ; এখন সেটাকে যদি আমরা আমাদের ঘোষ স্পৃষ্ট দন্ত্য ধ্বনি দ দিয়ে বলি তাহলে লিখতে হয় আদান (আরবরা রোমান হরফে লেখে Adhan)।

আরেকটা গুরুত্বপূর্ণ পদ হল হাদিস যা সহি আরবিতে উচ্চারণ করলে শব্দটির শেষ ধ্বনিটা দন্ত্য স নয়, বরং অনেকটা দন্ত্য থ-এর মত হয়। কেননা বানানটি হল, حديث‎‎ — এখানে শেষ হরফটি বাংলাদেশ ছা (সা) বলা হলেও, আরবিতে বলা হয় থা (অবশ্য বাংলা থ স্পৃষ্ট ধ্বনি, অন্যদিকে আরবি থ ঘৃষ্ট)। আমরা যেসব ভাষাভাষীর মাধ্যমে হাদিথ প্রত্যয়টি পেয়েছি তারা হাদিস বলত বলেই আমরাও হাদিসই বলি।

এমন আরও আরবি ধ্বনি আছে যা আমরা বাঙালিরা ভিন্নভাবে উচ্চারণ করি, ইরানি কিংবা পশতু কিংবা তুর্কি ভাষায় যেমনটা আছে তেমনটা উচ্চারণ করি। এছাড়াও দ্বিতীয় ভাষায় শেখার এমন সব ক্ষেত্র আছে যেখানে অনেক ধ্বনির নেটিভ উচ্চারণ সম্ভব হয়ে ওঠে না।

যাহোক, এখন আমাদের ভেবে দেখতে হবে আমরা ইসলামের যে সকল পরিভাষা ব্যবহার করি সেগুলির আরবি উচ্চারণ নিয়ে কতটা উচ্চকিত হব। অনেক কিছু বিচারেই সে কথা ভেবে দেখতে হবে। আমি কেবল এখানে ধ্বনিতত্ত্বগত বিবেচনাটি হাজির করলাম।

About Author

আহমেদ শামীম
আহমেদ শামীম

টেক্সাস ইউনিভার্সিটির (অস্টিন) এশিয়ান স্টাডিজ বিভাগে বাংলা পড়াচ্ছেন। পাশাপাশি সিটি ইউনিভার্সিটি অব নিউইয়র্কের ভাষাবিজ্ঞান বিভাগে পিএইচডির অংশ হিসেবে রাজশাহীর কডা ভাষার ব্যাকরণ বর্ণনার কাজ করছেন। তার আগে, ভাষাতত্ত্ব পড়িয়েছেন নিউইয়র্কের লাগুয়ারডিয়া কমিউনিটি কলেজে, ঢাকায় ব্র্যাক এবং ড্যাফোডিল বিশ্ববিদ্যালয়ে। ভাষাবিদ্যায় আসার আগে তিনি ইংরেজি সাহিত্য নিয়ে পড়েছেন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে, এবং পড়িয়েছেন স্ট্যামফোর্ড, ইন্ডিপেন্ডেন্ট এবং নর্থসাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ে। বাংলা ভাষা ও ভাষাতত্ত্ব নিয়ে বেশ কিছু পত্র পত্রিকায় এবং জার্নালে তার লেখা প্রকাশিত হয়েছে। ২০১৩ সনে প্রকাশিত প্রবন্ধ সংকলন 'বাঙলা কথা' একমাত্র গ্রন্থ ।