page contents
লাইফস্টাইল, সংস্কৃতি ও বিশ্ব

বানররা কি মানুষের মত কথা বলতে পারবে?—বিজ্ঞানীদের মধ্যে বিতর্ক

বানররা কি কখনো মানুষের মত কথা বলতে পারবে? এই প্রসঙ্গে বিজ্ঞানীরা গবেষণা করে যাচ্ছেন সেই ১৯৫০ সাল থেকে। কিন্তু এখন যুক্তরাষ্ট্র, অস্ট্রিয়া ও বেলজিয়ামের বিজ্ঞানীরা জানালেন যে—শারীরিক দিক থেকে বানরদের পক্ষে কথা বলা সম্ভব; কিন্তু জ্ঞানশক্তির দক্ষতার অভাবে তারা হয়ত পেরে উঠবে না।

‘সায়েন্স অ্যাডভান্সেস’ ম্যাগাজিনে প্রকাশিত গবেষণাপত্র অনুযায়ী, এক্স-রে ভিডিও’র সাহায্যে বানরদের ভোকাল ট্র‍্যাক্ট পরীক্ষা করা হয়েছে। আর মুখ দিয়ে শব্দ করার সময় তাদের চেহারা, জিহ্বা এবং শ্বাসযন্ত্রের গতিবিধি লক্ষ করা হয়েছে সতর্কতার সাথে।

টাকুমসেহ ফিচ এর নেতৃত্বে পরিচালিত গবেষণা দলটি এসব পরীক্ষার মাধ্যমে জানতে পেরেছেন, শারীরিকভাবে বানররা মানুষদের মত একই প্রক্রিয়ায় শব্দ করে থাকে। তাদের হিসাবগুলি কম্পিউটারে বসিয়ে সিমুলেশনের মাধ্যমে তারা জানার চেষ্টা করেছিলেন, বানররা কথা বলতে পারলে তাদের কণ্ঠ ঠিক কীরকম শোনা যেত। তাদের ফলাফল অনুযায়ী, বানরদের কথা বলতে না পারার মূল কারণ তাদের বোধশক্তির দক্ষতার অভাব।

গত বছরের ডিসেম্বর মাসে প্রকাশিত এই স্টাডি স্বাভাবিকভাবেই মিডিয়ায় প্রচুর আলোড়ন সৃষ্টি করে।

কিন্তু ব্রাউন ইউনিভার্সিটির কগনিটিভ সায়েন্টিস্ট ফিলিপ লিবারম্যান এখন জানাচ্ছেন যে, এসব তথ্য পুরোপুরি ভুল। ‘সায়েন্স অ্যাভান্সেস’ ম্যাগাজিনেই প্রকাশিত একটি চিঠিতে তিনি দাবি করছেন, ফিচ এবং তার দলের এই আবিষ্কার অসঙ্গত। তাদের “সংগৃহীত উপাত্ত এবং তজ্জনিত ফলাফলের উপর ভিত্তি করে” তার এই মত।

লিবারম্যান ১৯৬৯ সালে বানরদের কথা বলতে পারার সম্ভাবনার ওপর গুরুত্বপূর্ণ একটি গবেষণাপত্র প্রকাশ করেছিলেন। সেই স্টাডির বিভিন্ন অংশের উপর আলোকপাত করে—বানরদের জিহ্বা ও ভোকাল ট্র‍্যাক্ট পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে—তিনি দেখার চেষ্টা করেছেন, একটি বানর তার শরীরের সাহায্যে ঠিক কী ধরনের শব্দ উৎপন্ন করতে পারত।

সেই গবেষণার ফলাফল তাকে এই সিদ্ধান্তে এনেছে যে, প্রয়োজনীয় অবধারণ ক্ষমতা থাকলেও বানর কখনোই মানুষের আদলে কথা বলতে পারত না। মাকাক প্রজাতির বানরদের বাকপ্রত্যঙ্গের বিস্তার যতটা বলে ধারণা করা হয় তা প্রকৃতপক্ষে আরো অনেক কম। কাজেই মানুষের মত কথা বলা তাদের পক্ষে সম্ভব হবে না কোনোভাবেই—যদি তাদের বোধজ্ঞান মানুষদের পর্যায়ে চলে যায় তারপরও।

বানরদের ভোকাল ট্র‍্যাক্ট অনায়াসে তাদের নিজদের মাঝে যোগাযোগের উপযোগী শব্দের জন্ম দিতে পারে। কিন্তু মানুষের মতো পূর্ণাঙ্গ ও স্পষ্ট বক্তব্য প্রদানের বিস্তার সেখানে নাই। লিবারম্যান লিখেছেন, “বানরদের মস্তিষ্কে যদি মানুষের মতই মটর স্নায়ু নিয়ন্ত্রণ করার মত শিখন ক্ষমতা থাকতো—তা হলেও যোগাযোগের মাধ্যম হিসাবে বানররা তাদের সেই ভাষা আধুনিক মানুষদের মত এতটা প্রবলভাবে ব্যবহার করত না।”

“মানুষের ভাষাগত বিবর্তনে এমন দুই মস্তিষ্কের সমন্বয় ঘটে—যা ঐচ্ছিক ও জটিল সব শারীরিক কর্মকাণ্ড সম্পাদনে সক্ষম এবং একই সাথে এর মাঝে শিখন ক্ষমতাও বিদ্যমান। এর মাধ্যমেই পরবর্তীতে মানুষের ভাষার পূর্ণাঙ্গ সীমা বিস্তৃত হয়েছে।”

লিবারম্যানের চিঠির জবাবে ফিচ এবং তার সহকর্মীরা দ্বিমত পোষণ করে বলেন, “আমরা খুবই আনন্দিত যে লিবারম্যান আমাদের গবেষণার সকল উপাত্ত, প্রক্রিয়া এবং ফলাফল সাদরে গ্রহণ করেছেন। আমাদের সর্বশেষ সিদ্ধান্তের সাথেও তিনি একমত যে, মাকাক বানরদের প্রয়োজনীয় স্নায়বিক নিয়ন্ত্রণ থাকলে তারাও ভাষার জন্য উপযুক্ত শব্দ তৈরি করতে পারত।”

কিন্তু গবেষকদের মন্তব্য, বানরদের স্বরভঙ্গি আর মানুষদের স্বরভঙ্গি এক রকম হবে না—“কমন সেন্স খাটালেই বোঝা যায় যে তাদের একই রকম হবার সম্ভাবনা নাই। আমাদের গবেষণাও তাই বলে।” তবে বিবর্তনের ব্যাপারে তাদের গবেষণার মূল আলোচনা ছিল, বানরদের স্বরভঙ্গি আদৌ বিশাল শব্দকোষ সমর্থন করতে পারবে কিনা। “আমাদের গবেষণায় মাকাক বানরদের যে বিশদ ফোনেটিক স্পেস আমরা পেয়েছি, তাতে বিশাল শব্দকোষ ধারণে তাদের তেমন সমস্যা হবে না।”

তারা আরো লিখেছেন, “তাদের স্বরধ্বনি মানুষদের মত হবে কিনা তা মূল ব্যাপার নয়। স্প্যানিশ, ইংলিশ বা ডাচ ভাষার স্বরধ্বনি ব্যবহারের প্রক্রিয়ায়ও পার্থক্য আছে, যা ভাষাগত যোগাযোগের ক্ষেত্রে এসব ভাষার উপযোগিতার ওপর প্রভাব ফেলে। বানরদের স্বরভঙ্গিতেও সেরকম স্বাভাবিক তফাত দেখা যেতে পারে—এর বেশি কিছু না।”

“আমরা এরকম কোনো দাবি করি নাই যে, বানররা একদম মানুষের আদলে কথা বলতে পারবে। আমরা শুধু এটাই বলেছি এবং বলতে চাই—বানররাও তাদের ভোকাল ট্র‍্যাক্ট ব্যবহার করে বোধগম্য বাচনভঙ্গি তৈরি করতে সক্ষম।”

কানেকটিকাটের পীবডি জাদুঘরে বিভিন্ন প্রকার কঙ্কালের মাধ্যমে মানুষের বিবর্তনের প্রদর্শনী, ইউনাইটেড স্টেটস, ১৯৩৫

মিশিগান ইউনিভার্সিটির থোর বার্গম্যান সর্বোচ্চ স্তরের মেরুদণ্ডী প্রাণিদের সামাজিক জ্ঞানশক্তি নিয়ে গবেষণা করে থাকেন। বানর ও মানুষদের এই বিতর্কে তিনি ‘নিউজউইক’ পত্রিকার কাছে মন্তব্য করেছেন যে, মানুষকে অন্য জীবদের থেকে স্বতন্ত্র হিসাবে দেখার ক্ষেত্রে এটি একটি মৌলিক ও গুরুত্বপূর্ণ আলাপ।

তিনি বলেন, “এইটা যেহেতু এখন তাদের ব্যক্তিগত ইস্যুতে পরিণত হয়েছে, তাই তাদের বিতর্কগুলি নিয়েই কথা হয় বেশি। তারা শুধু একজন আরেকজনের সাথে তর্কই করছেন না, একই সাথে জনগণকে তাদের রিসার্চ সম্বন্ধে নিজেদের মতো করে বোঝানোর চেষ্টা করছেন। অথচ এগুলির ফলাফল সবসময় নিখুঁত হয় না।”

লিবারম্যানের আগের গবেষণার ফল হিসাবে সবাইকে জানানো হয়, বানররা শারীরিকভাবে মানুষের ঢঙে কথা বলতে অক্ষম। কিন্তু বার্গম্যানের মতে এটি একটি অতিরঞ্জিত বক্তব্য।

তিনি আরো বলেন, “দুই পক্ষই একমত যে বানররা কথা বলার জন্য একটা নির্দিষ্ট মাত্রার শব্দ তৈরি করতে সক্ষম। অথচ তারা এই কথাটারই ভিন্ন ভিন্ন অংশের ওপর জোর দিচ্ছে। লিবারম্যান সেইসব শব্দের কথা বলছেন যা বানররা উৎপন্ন করতে পারবে না—যে শব্দগুলি তার মতে কথা বলার জন্য অনেক গুরুত্বপূর্ণ। অন্যদিকে, ফিচ ও তার সহকর্মীরা বলছেন, বানররা মানুষদের চাইতে কম স্পষ্ট বাচনভঙ্গি তৈরি করতে পারবে—কিন্তু পারবে। কাজেই দুই পক্ষই সঠিক!”

“আমার কাছে গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার হল, এই বিতর্ক ভাষা ও বাচনভঙ্গির বিবর্তনের সাথে কতটা সম্পৃক্ত। ভাষার ক্ষেত্রে বানরদের মতো শারীরিক অবস্থা নিয়ে আপনি ঠিক কতদূর এগোতে পারবেন? এইটা অনেকটা ডিম আগে না মুরগি আগে টাইপ সমস্যা তৈরি করে। কেন বানররা প্রতিনিয়তই নতুন ধরনের শব্দ তৈরি করছে?”

“শারীরতাত্ত্বিক পরিবর্তন ছাড়াও জটিলতর যোগাযোগের উদ্ভব সম্ভব—এটি আসলে সেদিকেই ইঙ্গিত করে। কিন্তু মানুষের শরীরের গঠন যদি তার কথা বলার জন্য একান্তই জরুরি না হয়ে থাকে—তাহলে আমাদের এত অদ্ভুত শারীরিক গঠনের মাহাত্ম্য কী? আসলে ভাষাগত বিবর্তন পুরাদস্তুর শুরু হবার পর তা নির্দিষ্ট কিছু চাপ তৈরি করে যা পরবর্তীতে সমৃদ্ধ হয়েছে আমাদের ভোকাল ট্র‍্যাক্টের সাহায্যে। তো, এক্ষেত্রে শারীরিক গঠনের প্রয়োজনীয়তা কতটুকু? সেটা নির্ভর করেছে আপনি ভাষার বিবর্তনের কোন স্তর নিয়ে আলাপ করছেন তার উপর।”

About Author

সাম্প্রতিক ডেস্ক