page contents
লাইফস্টাইল, সংস্কৃতি ও বিশ্ব

বাবা

ছোটবেলায় আম্মু ছাড়া কেউ আদর করলেই তার গালে কামড় বসাতাম। বাবা যেহেতু তার ছোট্ট, প্রথম ও একমাত্র মেয়েকে অফিস থেকে এসেই কোলে নিত, আদর করত তাই কামড় তার প্রতিদিনের পাওনা ছিল। এখনও গালে একটা দাগ আছে, মাঝেমধ্যে দেখায়ে বলে সেসব কথা।

ছোটবেলায় যখন আমরা ফরিদপুর থাকতাম, প্রতিদিন ঘুরতে বের হতাম বাবার সাথে। একটা সকালও বাদ যেত না। দুপুরে লাঞ্চ টাইমে বাবা আসত, খেয়ে রেস্ট নিত। আমি তখন “যোনাল যোনাল” খেলতাম। বাবা গ্রামীণ ব্যাংকের যোনাল অফিসে ছিল। সবসময়ই বিভিন্ন কথায় যোনাল স্যারের কথা বলত। আমিও যোনাল স্যার হয়ে বাবাকে অর্ডার দিতাম। আম্মু বকা দিত, আম্মুর রাগ বেশি ছিল। তাই বাবা পারতপক্ষে আমাকে বকাবকি করত না। যদিও বাবা খুবই রাগী মানুষ, আমার দাদুবাড়ির সবাই বাবাকে বেশ ভয় পায়। কিন্তু আমি সে রকম কিছু দেখতাম না। দুইএকদিন আম্মু হাত দিয়ে ভাত খেতে দিলে গোপনে ভাত পাচার করতাম বাবার প্লেটে। তবে মুখে কখনোই বলতাম না বাবাকে বেশি ভালোবাসি। সবসময়ই আম্মুকে বেশি ভালোবাসি বলতাম।

আমার বয়স তখন চার অথবা পাঁচ। ফরিদপুরে ভাড়া বাসায় আমাদের পাশে এক হিন্দু আন্টি থাকে। আমাকে বেশ ভালবাসত। এক বিকেলে সে আম্মুকে বলে আমাকে তাদের বাসায় নিয়ে গিয়েছিল। আন্টি নিঃসন্তান হওয়ায় আম্মু কখনোই নিতে আসলে না করত না। সেদিন আমাকে নিয়ে গিয়েছিল তার এক সাধুবাবার কাছে। আমাকে নিয়ে তিনটে ডুব দিলে তার বাচ্চা হবে—এরকম এক রূপকথা বলা হয়েছিল তাকে। যথারীতি সব আচার সেরে আন্টি ডুব দেয়ার জন্য নামলেন। প্রথম ডুব দিয়েছেন, তার কোলে আমি। প্রথম পর্ব শেষে দ্বিতীয় ডুব দেয়ার আগেই আম্মু, বাড়িওয়ালা, আরেক আন্টি চলে এসেছিল। আমাদের বাসায় যে মহিলা কাজ করত, উনিই দেখে আম্মুকে ডেকে এনেছিল। তারপর কী হয়েছিল মনে নেই। বাড়িওয়ালি আন্টিকে সেদিন রাতেই বাড়ি ছাড়ার নোটিশ দিয়েছিলেন। পুকুরে ডুব দিয়ে আমার তখন তুখোড় জ্বর। ভয়ও পেয়েছিলাম মনে হয়। খালামণি এই প্রসঙ্গ উঠলে এখনও বলে—তোর বাবা তোর পাশে বইসা সারারাইত কান্নাকাটি করছে। পুরুষমানুষরে এত কান্নাকাটি করতে ওই প্রথম দেখছি।

ছোটবেলায় একবার এক বেলার জন্য কথা বন্ধ হয়েছিল বাবার আর আমার। আমি ওয়ানে পড়ি তখন। আলমগীর স্যারের কাছে পড়তে যেতাম দুপুর তিনটায়। আম্মু নিয়ে যেত। বাবা লাঞ্চ করতে আসত দুইটায়। বাবাও আমাদের সাথেই বের হত। এরকমই একদিন আম্মু রেডি হচ্ছে। আমি রেডি। বাবাও রেডি হচ্ছে। আমি কাঁধে ব্যাগ নিয়ে বাসার মধ্যে হাঁটছিলাম। বাবা আমাকে ডেকে সামনে রুমের জানালাগুলো লক করে দিতে বলল। আমি অনেক ক্ষণ চেষ্টা করেছিলাম। কিন্তু পারি নি। তারপর বাবা আমাকে ভর্ৎসনা করেই কিছু একটা বলেছিল। ঠিক কী বলেছিল আজ আর মনে নেই। আমার শুধু মনে পড়ে—এক নিঃশ্বাসে সিঁড়ি বেয়ে নেমে নিচে আসলাম। তারপর রিকশা করে স্যারের বাসায় চলে গেলাম। তখন আমার ব্যাগে টাকাপয়সার গন্ধও ছিল না। স্যারের ওয়াইফ, আন্টি আমাকে বেশ ভালবাসত। দশ টাকা চাইলে উনি কখনোই না করবেন না আমি জানতাম। আলমগীর স্যার বেশ অবাক হয়ে গিয়েছিলেন আমাকে একা যেতে দেখে, আরও অবাক হয়েছিলেন আন্টির কাছ থেকে টাকা নেয়া দেখে।

ঘটনা বুঝে আম্মুকে ফোন দিলেন। আম্মু বাবা তখন সব জায়গায় খোঁজাখুঁজি করেছে। পটুয়াখালীর এক পরিচিত আন্টিকে মা ডাকতাম। রাগ করে উনার কাছেও চলে যেতাম। উনার বাসায়ও না পেয়ে আম্মু-বাবা রিকশা করেছিল। তাদের ধারণা আমি হেঁটে হেঁটে যাচ্ছি—রাস্তায় দেখা হয়ে যাবে। স্যারের ফোন পেয়ে আম্মু স্যারের বাসায় চলে আসল কিছুক্ষণ পরেই। বাবা অফিসে চলে গেছে। আমাকে এসে স্যারের সামনেই থাপ্পড় দিতে পারে আম্মু—বেশ ভয় পাচ্ছিলাম। তবে আম্মু আমাকে অবাক করে দিয়েছিল। একটু বকাও দেয় নি। বাসায় আসলাম পাঁচটায়।

বাবা সেদিন সন্ধ্যায়ই বাসায় চলে আসল। মুখ থমথমে, পেপার পড়ছিল এসে। রাতে ভাত খাবে না বলে আম্মুকে জানিয়ে দিল। আম্মু তরকারি গরম করতে দিয়ে আমাকে ডেকে বলল, “বাবাকে গিয়ে বলো তুমি না খাইলে আমিও খাবো না।” আমি “আচ্ছা ঠিকাছে” বলে চলে আসলাম। বাবার মুখচোখ দেখে কথা বলতে ভয় হচ্ছিল। আম্মু যা শিখিয়ে দিয়েছিল তা কিছুই বললাম না। শুধু বলেছিলাম, “আমার সাথে ওভাবে কথা বললে আমি আবার চলে যাব। আর কক্ষনোই আসব না।” বাবা পেপার থেকে চোখ তুলে তাকাল। ভয় হচ্ছিল না তখন। বাবার চোখে পানি চলে এসেছে। তারপর আর কেউ কাউকে কিছু বলি নি। অনেক ক্ষণ সোফায় বসেছিল। আমি বাবার কোলে মাথা রেখে শুয়েছিলাম।

আমরা বরিশাল বেড়াতে আসলেও বাবা চিন্তায় থাকত আমাকে নিয়ে। যদিও আমি আম্মুর একান্ত বাধ্য মেয়ে, আম্মুকে বাঘের মত ভয় পাই। যাওয়ার আগেও আম্মুকে বার বার বলত, “ঝর্ণা, ইনিসীর সাথে বেশি রাগারাগি কইরো না।” আমাদের রেখে ফরিদপুর চলে যাবার পর শুরু হত রাতে উল্টোপাল্টা স্বপ্ন দেখা। একদিন স্বপ্ন দেখে ছয়টার বাসে চলে এসেছিল সোজা ফরিদপুর থেকে বরিশাল। স্বপ্ন দেখেছিল আমি পুকুরে পড়ে গেছি। আম্মু শুনে হাসতে হাসতে শেষ। আমি বুঝতে পারছিলাম বাবা আমাকে না দেখলে ভাল থাকতে পারে না।

বাবার কাছে কখনো পড়তে বসি নি। বাবা তেমন রাগ করে না, তাই আম্মু পড়াশোনার ভার বাবার ওপর ছাড়ল না। বাবা রাগ না করলেও বাবা কম কথা বলে, গুরুগম্ভীর—এইজন্য কিছুটা ভয় পেতাম। দূরত্বও ছিল। শুধু আম্মুর ব্যাপারে নালিশের সৎসাহসটুকু ছিল। প্রতিদিন বাসায় আসার পরেই নালিশ আর বিচারকার্য শুরু হইত। বিচারে বলা হইত আম্মুকে মামাবাড়িতে পাঠায়ে দেয়া হবে। কিন্তু এই বিচারে আমি মোটেও খুশি হতে পারতাম না। মামাবাড়িতে গেলে রাতে আহ্লাদ কইরা কেউ আমার সাথে কথা বলবে না। কেউ আমাকে ভাত খাওয়ায়ে দেবে না। বেশ চিন্তার ব্যাপার ছিল সেসব! তারপর আমিই মামলা তুলে নিতাম। আসামি বেকসুর খালাস পেয়ে উঠে গিয়ে ভাত বাড়ত আর তারপর ডাক দিতো, “বাবু, ভাত খাইতে আয়!”

বরিশাল চলে আসলাম আমি আর আম্মু, বাবা পটুয়াখালী রয়ে গেল। আমি অ্যাডমিশনের কোচিং-এর পরীক্ষায় মাঝেমধ্যে কম নাম্বার পাই। আম্মু বকা দেয়। বাবাকে বললে বাবা রাগ করে না। আম্মুকে বুঝায়ে বলে। প্রতিদিন অনেকবার ফোনে কথা হয়, যা হয় সবই বলে দিই। তখনও বাবা যাওয়ার সময় মন খারাপ করত, সকালে যাওয়ার আগে ইনিসীর “সিলসিলা” চুলে হাত বুলাত। বাবা আমার সিল্কি চুলকে আদর করে সিলসিলা বলত।

আম্মু মারা যাবার পরে বাবার সাথে যোজন যোজন দূরত্ব হয়ে গেছে। কিছু একটা চাইবার আগে কী বলব তার প্রিপারেশন নিই। তারপরও বলতে পারি না অনেক সময়ই। কিছু হতে না হতে খুব চটে গেলে আমাদের অনেক কথা হয়। বাবা আমার দোষ বলে, আমি বাবার। সব সিরিয়াস কথাবার্তা। কে কত অতীতের দোষ ঘাটাঘাটি করে বের করতে পারে তার প্রতিযোগিতা। এরপর অনেক দিনের জন্য কথা বন্ধ হয়। সবসময় ভুলের জন্য বকে, শাস্তি দেয় কিন্তু কখনো আদর করে অভিমান ভাঙাতে আসে না। এখন আর বছর গেলেও একবার মাথায় হাত বুলিয়ে দেয় না। এখন আর আমার সিলসিলা চুলের প্রশংসা করে না। মায়ের শাসন দেয়ার চেষ্টা করে বাবা, শাসন দেয়ার ক্ষেত্রে সে শতভাগ সফল। তবুও আমি বাবার বাধ্য মেয়ে নই, বাবার সাথে প্রতিটা ক্ষেত্রে মতবিরোধ হয়—তার সম্ভাব্য কারণ সম্ভবত আম্মুর মত সে আমাকে ভালোবাসার চেষ্টা করে না, বোঝার চেষ্টা করে না।

গতবারের জন্মদিনের কথা বাবাকে বলি নি। তার কিছুদিন আগ থেকে কথা বন্ধ। আমি কোচিংয়ে গিয়েছিলাম। বের হতেই বাবার এক বন্ধুর ফোন আসে।

—আম্মু, তোমার কোচিং ছুটি হইছে?

—হ্যাঁ আংকেল।

—তাহলে রিকশা করে বাবার অফিসের সামনে চলে আসো।

বুঝতে বাকি রইল না কেন যেতে বললেন। গিয়ে বসতেই পিয়ন আংকেল বলল, “তোমার আব্বুর বয়স হইছে, এখন কি মাইয়ার জন্মদিনের কথা টথা মনে থাকে! সিগনেচার কইরা তারিখ লেখবার সময় মনে পড়ছে স্যারের। ডাইকা কয়, মুকুল, আজকে আমার ইনিসীর জন্মদিন। আমার তো একটুও মনে নাই। না জানি রাগই করছে!”

আমার আর কিছুর দরকার ছিল না, গিফট, ট্রিট কিছুই না—সব অভিমান ধুয়ে গেছে তখন, একটা অভিযোগও ছিল না বাবার সমন্ধে। আমাকে যা দেয়া হবে তার চেয়েও বেশি কিছু, সবচেয়ে আকাঙ্ক্ষিত কিছু তখন গায়ে মেখে বসে ছিলাম।

About Author

সানজিদা আমীর ইনিসী
সানজিদা আমীর ইনিসী

জন্ম. বরিশাল ১৯৯৮। শিক্ষার্থী, বরিশাল সরকারি মহিলা কলেজ, উচ্চ মাধ্যমিক (দ্বিতীয় বর্ষ)।