page contents
লাইফস্টাইল, সংস্কৃতি ও বিশ্ব

বিটপীলতা

বিজ্ঞাপনে আমার প্রথম ইন্টারভিউ অরূপ সান্ন্যালের সাথে। বিটপী অ্যাডভারটাইজিং-এর চিফ ক্রিয়েটিভ অফিসার। কলকাতার। বাংলাদেশে বহুদিন। ঘাটাঘাটি কইরা দেখি কবীর সুমনের বন্ধু তিনি। (ব্রাত্য রাইসু একসময় বিটপীর কপিরাইটার ছিলেন তা আগেই জানতাম।) ফলে আমার আগ্রহ বাইড়া যায়।

ইন্টারভিউ এর দিন আমি সিলেট থেকে ঢাকা পৌঁছে সরাসরি বসুন্ধরায় বিটপীর অফিসে চলে যাই। দিন তারিখ মনে নাই। সম্ভবত জানুয়ারি দুই হাজার তেরো। তার আগে ফেইসবুক ঘাইটা বিটপীর অফিস ইন্টেরিয়র দেখছিলাম। ভালো লাগছিল। ছোটখাটো, কিন্তু কেমন একটা আর্টিস্টিক আর্টিস্টিক ফিল। গ্লাসপেইন্টিং; গ্রাফিতি; স্টিকি নোট। অগোছালো আবার গোছালো, এইরকম একটা বাইপোলার অবস্থা।

chingkhei-png

তো ইন্টারভিউ এর দিন আমি আমার এই সকল কারণে আরো বেড়ে যাওয়া আগ্রহসহ বিটপীর অফিসে ঢুকি এবং ঢুকে শুনি আমাকে একটু ওয়েইট করতে হবে। ছাদ লাগোয়া একটা বিল্টইন ক্যাফে তাদের। আমি চাইলে সেখানে বসতে পারি।

ছাদক্যাফেতে কিছুক্ষণ বসার পর আমার ডাক আসলে আমি ইন্টারভিউ রুমে ঢুকি।

অরূপ স্যান্নালকে আমার সরাসরি দেখেও ভালো লাগে। চোখে চশমা। ছোট করে ছাঁটা চুল। ছবিতে যেমন দেখছি ফেইসবুকে। গোছানো মনে হইল। (মানে ছোটছাঁটা চুলের কারণে না। কেন মনে হইল তার ব্যাখ্যা নাই।) আর মনে হইল, সিভি দেখে আর সরাসরি দেখে উনারও যে আমাকে ভালো লাগছে সেইটা তিনি বুঝতে দিতে চাইতেছেন না।

ছবি. অরূপ স্যান্নাল

ছবি. অরূপ সান্ন্যাল। ইলাস্ট্রেশন. লেখক।

আমাদের আলাপ শুরু হয় ধীর লয়ে। আমি একাডেমিক্যালি কী পড়ি, কোথায় পড়ি ইত্যাদি। (এই নাতিদীর্ঘ আলাপে উনার কনফিডেন্স আর দৃঢ় ব্যক্তিত্বের সামনে আমি যে ভিতরে ভিতরে গ্রেজুয়ালি নুয়ে পড়তেছি আমিও সেইটা আড়াল করার চেষ্টা করতে থাকি।)

কিন্তু বিস্তারে লয় বাড়তে থাকে দ্রুত। এতই দ্রুত যে আমি হিম শিম খাইতে শুরু করি। মনে হইতেছিল আমাকে ব্রাশফায়ার করা হইতেছে প্রশ্নের।

অরূপ আমাকে জিজ্ঞেস করেন, আমি বিজ্ঞাপন দেখি কি না। আমি ভদ্রতা করে বলি যে দেখি। (না চাইলেও যে আমাদের আসলে বিজ্ঞাপন দেখতে হয়, ফলে বিজ্ঞাপন দেখা যে একটা প্যাসিভ কিংবা বাই ডিফল্ট একটা ঘটনা, বা বিজ্ঞাপন না দেখাটাই যে আসলে একটিভ একটা কাজ, সেইটা বলি নাই তখন।) শুনে, আমার ভালো লাগা সাম্প্রতিক কোনো বিজ্ঞাপনের কথা জানতে চান তিনি।

আমার মাথা পুরাই ব্ল্যাংক। কিছুই মনে আসতেছে না।

অনেকক্ষণ ভাইবা আমি জিপির সবশেষ অ্যাডটার কথা বলি।

—কোনটা?
—ঐ যে স্টপমোশনেরটা।
—আচ্ছা। অ্যাডটা কীসের ছিল?

আমি থতমত। আমার কেবল নীল রঙ মনে আসে। মানে টেলিনর নীল। আর স্টপ মোশন। আর কিউট একটা জিংগেল। মেবি একটা মেয়ে, বিছানা, ঘুম, স্বপ্ন, এই। আর কিছুই মনে আসে না। এমনকি এডটা জিপির নাকি সিম্ফনির, সেই তালটাও পেকে গোল হয়ে যায়।

প্রশ্ন কমন না পড়ায় আমি বলি আমার মনে পড়তেছে না। অরূপ বলেন তাইলে তো এটা সাকসেসফুল কমিউনিকেশনই হইল না। আমি মাথা নাড়ি। বোঝা জিনিস আবার নতুন কইরা বুঝি আমি। শুধু ভালো লাগলেই বা লাগাইলেই যে হয় না, একটা যোগাযোগ যে লাগে, সেইটা। আমার মনে হইল আমার সব শেষ।


ভিডিও: Grameenphone INTERNET – STOPMOTION

এরপরেও আরো টুকটাক কথাবার্তা হয় আমাদের। (মানে অরূপ জানতে চান, আর আমি জানাই।) চাকরিটা যদি পাই, ঢাকায় আমি কই থাকব না থাকব। বেতন নিয়ে নেগোসিয়েশনের সুযোগ নাই, যা অফার করা হবে সেইটায় যদি হয় তো হবে, নাইলে নাই। এইসব। অর্থাৎ বিস্তারের দ্রুতলয়ের প্রশ্নবাণের ব্রাশফায়ার কমে আসে ধীরে ধীরে। বাতাসে তেহাই-এর গন্ধ। আমি বিষণ্ন।

তখন আমি হঠাৎ কইরা বলি, আমার রিসেন্ট একটা অ্যাড ভালো লাগে নি।

অরূপ আগ্রহী হইলেন। সেটা তার আগ্রহ প্রকাশ না করার চেষ্টায় বুঝলাম।

sumon

নির্মাতা মেজবাউর রহমান সুমন

অরূপ নির্বিকার ভাবে “কোনটা?” জানতে চাইলে আমি বলতে থাকি বিস্তারিত। (অ্যাডটা ছিল জিপি আমন্ত্রণ। মেজবাউর রহমান সুমনের বানানো। কিছু বাঙালি বন্ধু জঙ্গলে হারিয়ে যায়। জংলিরা তাদের ধরে নিয়ে যায়। ক্যাম্প ফায়ার; উদ্দাম নৃত্য; ক্যানিবালিজমের ইঙ্গিত। পরে দেখা যায় জংলিদের মধ্যে একজন তাদের মধ্যের একজনের পুরনো বন্ধু। ফলে তারা বাঁইচা যায়। ইত্যাদি।)

আমি রিপ্রেজেন্টেশনের কথা বলি। পলিটিকাল কারেক্টনেস, রেইসিজম, আদারিং প্রজেক্ট ইত্যাদিরও। ভেরি ভারি জার্গনে ভরা এইসকল কথায়ও অরূপ তার চশমার ওপাশের দুই চোখে অভিব্যক্তির পরিবর্তন আনেন না। নির্বিকার থাকার চেষ্টা করেন, ফলে পারেন। বহু বছরের চর্চায় শক্ত করে তোলা খোসা। আমি ইম্প্রেসড হই। এই লোকটার সাথে কাজ করার ব্যাপারে আমি আগ্রহী হই।


ভিডিও: Grameen phone TVC – Amontron

এই অ্যাডটার জন্য ইনস্ট্যান্টলি একটা জিংগেল লিখতে বলছিলেন মনে হয় অরূপ আমাকে এরপর। মানে জংলিরা যে বাঙালিদেরকে আগুনের উপরে বেঁধে নাচতে থাকে, ঐ দৃশ্যের জন্য। কারণ আমি বলছিলাম আমি সংরাইটিং আর ওয়ার্ডপ্লেতে ভালো।

gp1

জিপি আমন্ত্রণ – বিহাইন্ড দ্য সিন

যাই হোক। চাকরিটা আমি পেয়ে যাই। ইন্টারভিউ এর কিছুদিন পর কনফার্মেশন আসে ফোনে। কিন্তু আমি ফাইনালি বিটপীতে জয়েন করি নাই।

বিটপীর পর (অর্থাৎ বিটপীতে জয়েন না করার পর) আমি ওগিলভিতে জয়েন করি অক্টোবর দুই হাজার তেরোতে। তারপর সান কমিউনিকেশন্সে অক্টোবর দুই হাজার চৌদ্দতে। এই দুই এজেন্সির দিনগুলির গল্প, মানে সিনেমা মিউজিক আর সাহিত্যের ফাঁকে আমার এক বছরের এই বিজ্ঞাপন বিরতি কিংবা বিজ্ঞাপনে ঢাকা দিনলিপি, আরেকদিন বলি।

About Author

চিংখৈ অঙোম
চিংখৈ অঙোম

সিলেটবাসী। মনিপুরিভাষী। কবিতাকাহিনি-গান-ছবি-মুভি লিখি, গাই, আঁকি ও বানাই।