বিমানগুলি মধ্য আকাশে পয়ঃনিষ্কাষণ ট্যাংক খালি করছে না তো!

দিল্লীর ইন্দিরা গান্ধী ইন্টারন্যাশনাল এয়ারপোর্টের খুব কাছে একজন অবসরপ্রাপ্ত ভারতীয় সেনাপতির বাসভবন। তিনি একদিন আবিষ্কার করলেন, আকাশ থেকে তার বাসভবনের উপর মলমূত্র নিক্ষিপ্ত হচ্ছে। পরীক্ষা করে তিনি নিশ্চিত হলেন এসব মলমূত্র অন্য কোনো দৈব প্রাণীর নয়, বরং তারই জাতি ভাই মানুষেরই মলমূত্র।

আজব ব্যাপার! কোত্থেকে আসে এসব? গবেষণা করে তিনি সিদ্ধান্তে আসলেন, এসব নিশ্চয়ই তার বাড়ির উপর দিয়ে উড়ে যাওয়া বিমান থেকে ফেলা হচ্ছে।

ব্যাস, আর কোনো কথা নয়। তিনি উড়োজাহাজ মন্ত্রণালয়ের বিরুদ্ধে মামলা ঠুঁকে দিলেন। ভারতের পরিবেশ আদালত নতুন আইন প্রণয়ন করল—যদি প্রমাণিত হয় যে সত্যি কোনো বিমান থেকে এসব নিক্ষিপ্ত হয় তাহলে সেই বিমান কোম্পানিকে ক্ষতিগ্রস্তদেরকে ছয় শ’ পাউন্ড জরিমানা দিতে হবে।

“কী পরিমাণ চাপ পড়ে টয়লেটগুলির উপর, ভাবা যায়?”

বিমান মন্ত্রণালয় আদালতের আদেশ শিরোধার্য করে তদন্ত চালিয়ে স্বীকার করে যে, নিক্ষিপ্ত মলমূত্র অবশ্যই মানবকুলের, কিন্তু তাই বলে সে সব কোনো প্লেন থেকে নিক্ষিপ্ত হবার কোনো সুযোগ নাই।

কিন্তু তবুও আদালতের আদেশ জারি থাকল যেন মন্ত্রণালয় সূক্ষ্ম পরীক্ষা চালিয়ে দেখে যে বিমানগুলি তাদের পয়ঃনিষ্কাষণ ট্যাংক কোনোভাবে মধ্য আকাশে খালি করছে কিনা!

মিলিয়ন ডলারের প্রশ্ন হল, এমন কাজ করা কি চলমান কোনো বিমানের পক্ষে আদৌ সম্ভব?

তার আগে বিমানের টয়লেট সম্পর্কে কিছু জানার চেষ্টা করি।

কেউ যদি না বিমানের প্রথম শ্রেণী কিংবা ব্যক্তিগত বিমানে ভ্রমণ করেন, তাহলে মনে রাখতে হবে, সাধারণ যাত্রীবাহী জাহাজগুলি দেখতে অনেক আধুনিক হলেও টয়লেটগুলি খুব অবহেলিত রয়ে যায়। টয়লেটে কোনো জানালা নাই। খুব অল্প পরিসর জায়গা থাকে। সামান্য কিছু পরিচ্ছন্ন সরঞ্জাম দেয়া হয় সেখানে। অথচ পুরো জাহাজের ছয় সাতশ যাত্রী অনেক লম্বা সময়ের জন্য একাধিকবার মাত্র চার-পাঁচটা টয়লেটের উপর নির্ভর করেন।

কী পরিমাণ চাপ পড়ে টয়লেটগুলির উপর, ভাবা যায়?

কেউ কি কখনো এই পরিমান চাপ সহ্য করার ক্ষমতার জন্য এসব টয়লেটকে কোনো ক্রেডিট দেয়ার কথা ভেবেছে?

মনে হয় না।

একবার ভাবুন, যদি বিমানে টয়লেটের ব্যবস্থা না থাকত তাহলে কেমন হতো! ধরুন পাইলট কিংবা কোপাইলট যদি তার এক নম্বর কিংবা দুই নম্বর প্রয়োজন চেপে ধরে ছয় সাত ঘণ্টা জাহাজ চালাতে বাধ্য হতেন তাহলে তার মানসিক অবস্থা কেমন হতো? তিনি তো যে কোনো ধরনের ভুল করে পুরো জাহাজকে বিপদে ফেলে দিতে পারতেন কিংবা চাপ সহ্য করতে না পেরে নিজের কাপড় নষ্ট করে ফেলতেন। একই রকম দুর্ঘটনার সম্মুখীন হতে পারত যে কোনো যাত্রী। যাত্রীদেরকে তো বলা যেত না যে আগামী কয়েক ঘণ্টার জন্যে মলমূত্র ত্যাগ করা যাবে না! বলে কয়ে তো কারো প্রাকৃতিক চাপ থামানো সম্ভব নয়।

উড়োজাহাজের ভিতর টয়লেট—এত জরুরি একটা বিষয় অথচ এ নিয়ে কোনো সাংবাদিক সম্মেলন হয় নাই। কোন হলিউড মুভি তৈরি হয় নাই। যেন এটি আলোচনায় আনার মত কোনো বিষয় ছিল না।

“আকাশে উড়ন্ত অবস্থায় জাহাজের ভিতরের জানালাবিহীন অনেক ছোট্ট টয়লেট আসলে সকল মানুষের জরুরি প্রয়োজন মিটিয়ে তাদেরকে মানসিক চাপ থেকে মুক্ত করে ‘হিরো’র ভূমিকা পালন করে।”

কেউ স্বীকার করুক আর নাই করুক, আকাশে উড়ন্ত অবস্থায় জাহাজের ভিতরের জানালাবিহীন অনেক ছোট্ট টয়লেট আসলে সকল মানুষের জরুরি প্রয়োজন মিটিয়ে তাদেরকে মানসিক চাপ থেকে মুক্ত করে ‘হিরো’র ভূমিকা পালন করে।

উড়োজাহাজ আবিষ্কারক রাইট ব্রাদার্সের প্রথম ফ্লাইট এত সংক্ষিপ্ত ছিল যে সেখানে টয়লেটের প্রয়োজনীয়তার কথা ভাবাই হয় নাই।

দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের সময় বোমারু বিমানের পাইলটেরা মুখবন্ধ বালতির ভিতর মলমূত্র ত্যাগ করতেন। প্রবাদ আছে যে তারা শত্রু এলাকায় গিয়ে মলমূত্রভর্তি বালতি বিমান থেকে নিচে ফেলে দিতেন। শুধু তাই নয়, জার্মানির উপর বোমা বর্ষণের সময় বোমার সাথে মলমূত্রের বালতি বেঁধে দেয়ার ইতিহাসও আছে।

প্রয়োজন মিটানোর জন্য বালতি স্থাপন করা হলেও বিমানের টারবুলেন্সের কারণে বালতি উলটে ত্যাগ করা মলমূত্র প্লেনের সর্বত্র ছড়িয়ে পড়ে মহা ঝামেলার সৃষ্টি করত। তাই যুদ্ধের সময় বোমা ফেলার স্থান নির্ধারণ নিয়ে মাথা ঘামানোর পাশাপাশি নোংরা বালতিতে প্রাকৃতিক প্রয়োজন মেটানোর চিন্তাও পাইলটদের আরেক মাথাব্যথা ছিল।

তারপর বিমান যখন সংক্ষিপ্ত থেকে দীর্ঘ পথে যাত্রা শুরু করল, তখন পাইলট এবং যাত্রীদের আরামের কথা ভেবে নিরাপদ টয়লেটের ভাবনা যোগ হল।

তখন প্লেনে টয়লেট যোগ হল আলাদা করে। আলাদা সেফটি ট্যাংক লাগিয়ে নীল রঙের ক্যামিকেলযুক্ত জলীয় উপাদান যোগ করা হল টয়লেট ফ্লাশের সাথে। মানুষের আরাম হলেও আকাশের উচ্চতায় বাতাসের চাপে এই টয়লেট ট্যাংক লিক করার বহু আলামত দেখা গেছে। মানুষের মলমূত্র নীল জলীয় উপাদানের সাথে লিক করে মাইনাস তাপমাত্রায় জমে গিয়ে নীল রঙের বরফের চাঁই হয়ে প্লেন থেকে খসে পড়ার অনেক ঘটনা আছে।

এই কেলেংকারি থেকে মুক্তি পেতে ১৯৮২ সালে বোয়িং কোম্পানি প্রথম এর ভ্যাকুম টয়লেট স্থাপন করতে শুরু করল তাদের বিমানগুলিতে। এই টয়লেটগুলি খুব আধুনিক ব্যবস্থার। নন স্টিক কড়াইয়ের মত, টয়লেটের প্যানও ননস্টিক। আর টয়লেট ফ্লাশ করলে যে আওয়াজ হয় সেটা আসলে ভ্যাপোরাইজারের শব্দ। মানে সামান্য নীল পানি প্রচণ্ড বাতাস দিয়ে দূষিত মলমূত্র টেনে নিয়ে সংকুচিত (কনসেনট্রেট) করে ফেলে। একই সাথে এই ভেপোরাইজার টয়লেটের সব দুর্গন্ধ টেনে নেয়।

নইলে ভাবুন, জানালাবিহীন টয়লেটে এত মানুষের ঘন ঘন ব্যবহার করার পর বিমানের  ভিতর কি কারো পক্ষে স্বস্তিতে বসে থাকা সম্ভব হতো?

তারপর কী হয়?

প্লেন যখন এয়ারপোর্টে অবতরণ করে, টয়লেট ট্যাংকে জমানো কনসেনট্টেটেড মলমূত্র ও নীল জলীয় সেনিটারি ট্রাকের ভিতর ভ্যাকুম করে প্লেন থেকে নিয়ে নেওয়া হয়। সব কিছুই হয় উচ্চ বাতাসের প্রেসারে।

টয়লেট ট্যাংকে জমানো কনসেনট্টেটেড মলমূত্র অপসারণ চলছে।

একজন পাইলটকে প্রশ্ন করা হয়েছিল ভারতীয় জেনারেলের মামলা সম্পর্কে। তিনি হেসে জবাব দিয়েছেন, এটা কোনোভাবে সম্ভব নয়। আজকের আধুনিক প্রযুক্তিতে যদি না কেউ ইচ্ছা করে ভ্যাকুম ট্যাংক ফুটা করে দেয়। যদি করেও দেয়, তাহলে ককপিটের মনিটরে থাকা পাইলটের তা টের পেয়ে যাওয়ার কথা। তাই ধরে নেয়া যায়, ভারতীয় সেনাপতির অমন উদ্ভট দাবি একেবারে কাল্পনিক।

সূত্র. দ্য টেলিগ্রাফ

কমেন্ট করুন

মন্তব্য

About Author

মুরাদ হাই
মুরাদ হাই

জন্ম হাতিয়ায়। ১৯৬০ সালের ৯ অক্টোবর। ১৯৭৯ থেকে ১৯৮৫ সাল পর্যন্ত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র ছিলেন। পড়তেন মার্কেটিং বিভাগে। থাকতেন সূর্যসেন হলে। ১৯৮৯ সালে পাড়ি জমান নিউইয়র্কে। সে অবধি সেখানেই আছেন। দুই ছেলে রেশাদ ও রায়ান ছাত্র, স্ত্রী রাজিয়া সুলতানা স্কুলের শিক্ষিকা।

Leave a Reply