page contents
সমকালীন বিশ্ব, শিল্প-সংস্কৃতি ও লাইফস্টাইল

বিমান বাংলাদেশে একদিন…

এয়ারপোর্ট থেকেই শুরু করি। আমি কোলকাতা থেকে ঢাকা ফিরব। এবং সেইদিন আমাকে ঢাকায় ফিরতেই হবে।

এর আগের তিনদিন ধরে আমি ইন্ডিয়ার এক প্রান্ত থেকে আরেক প্রান্তে ফ্লাই করে বেড়াচ্ছি। আমার পরনে একটা সাদা টি-শার্ট আর একটা নীল জিন্স, আর গলায় ঝুলানো একটা ছোট্ট ব্যাগ যেখানে পাসপোর্ট, টিকেট আর মোবাইল রাখা। ব্যাগেজ বলতে একটা এম সাইজ লাগেজ আর একটা একদম খালি শোল্ডার ব্যাগ যেটা আমি এয়ারপোর্ট থেকে শপিং করা জিনিস রাখার জন্যই খালি করে আনছিলাম। এয়ারপোর্ট থেকে নানা রকম জিনিস কিনে কিনে ওই শোল্ডার ব্যাগ আমার কাঁধের চেয়েও ভারি হয়ে গেল, কিন্তু প্লেনের কোনো খোঁজ তখনও পাওয়া গেল না।

বিমান বাংলাদেশের পৌনে এগারোটার প্লেনে উঠলাম দুই ঘণ্টা পরে পৌনে একটায়। এই দুই ঘণ্টায় এয়ারপোর্টের স্ক্রিনে যতগুলি প্লেনের ফ্লাইট ছিল তার মধ্যে শুধু দুইটা প্লেনের ফ্লাইট ডিলে। দুইটাই বাংলাদেশে যাবে, দুইটাই বাংলাদেশের প্লেন। একটা রিজেন্ট এয়ারওয়েজ, আরেকটা বাংলাদেশ বিমান।

যাই হোক, আমার সিট সামনের দিকেই, জানালার পাশে। গত তিনদিনের বিশ্বব্যাপী ফ্লাইটে ‘দুইজনের সিট’ এর দেখা পাই নাই। সেই বিমানগুলিতে ছিল তিন সিট একসাথে। সে ফ্লাইটগুলি ছিল সুন্দর সুন্দর সব ছেলে যাত্রীতে পরিপূর্ণ এবং তখন আমার মা আমার সাথে ছিল। ওইসব যাত্রায় সবসময়ই কোনো না কোনো সুন্দর ছেলের সিট ছিল আমাদের দুজনের সিটের সাথে। আর এখানে বলে রাখা ভালো, আমার মা সবসময়ই মাঝখানের সিটে বসে, জানালার পাশের সিট তার পছন্দের না।

আর যখন আমি রিটার্ন ফ্লাইটে ফেরা শুরু করলাম, তখন প্রথম ফ্লাইটে আমার পাশে বসলেন একজন সত্তরের কাছাকাছি বুড়ো, যার বাড়ি কেরালা বলে ধারণা করি (তার কথা বলার টোন থেকে), পরের ফ্লাইটে একজন সর্বদা পান-জর্দা চিবানো সত্তরোর্ধ্ব বুড়ি, যিনি ফ্লাইটে পুরা পানের বাটা নিয়ে হাজির ছিলেন এবং তারও পরের ফ্লাইটে পাশে ছিল একজন ‘বাংলাদেশি মেয়ে ঘৃণাকারি’ কোলকাতার বাঙালি মহিলা, যিনি একাই ফ্লাই করতেছিলেন তবু উনার গয়নাগাটির পরিমাণ দেখে আমি ধারণা করছিলাম যে উনি হানিমুনে যাচ্ছেন। আলাপে আলাপে উনি বলেই ফেললেন—উনি বাংলাদেশের মেয়েদের ঘৃণা করেন, কারণ তার ভাইকে বাংলাদেশের এক মেয়ে ‘পটিয়ে’ বিয়ে করে ঢাকায় নিয়ে গেছে। সে মেয়ে কিছুতেই জামাইয়ের বাড়ি কোলকাতায় থাকবে না। তাই তার বড় ভাই, পরিবার পরিজন ছেড়ে এখন থাকে ঢাকা। আর তাই বাংলাদেশের মেয়েদের তিনি এক কথায় ‘ঘৃণা করেন’।

যাই হোক, বাংলাদেশ বিমানে বেশিরভাগ যাত্রীই বয়স্ক, তার ওপর রোগী। মহিলারা আছেন বাচ্চাকাচ্চা সমেত। আমার বয়সী কোনো মেয়ে যাত্রী দেখা গেল না। আর আমার পাশের সিটের যাত্রীকে তখনো দেখা গেল না। বিমানের শেষ বাসে তিনজন যাত্রী আসলেন। তিনজনই লম্বা জোব্বা পরা, মুখে লম্বা দাঁড়ি, বয়সে বেশ প্রবীণ। তার মধ্যে একজন আবার হাতে ছয়টা নানান সাইজের পোটলা (পোটলা বললাম কারণ ওগুলাকে ব্যাগ বললে ভুল হবে আর প্যাকেটও ঠিক মানানসই শব্দ না ওগুলার জন্য) নিয়ে আমার সিটের দিকে আগায়ে আসতেছেন। আমি তার হাতের ছয় ছয়খান প্যাকেট দেখে, জীবনে যত বাস-ট্রেন-প্লেন ভ্রমণ করছি সেই অভিজ্ঞতার নিরিখে বুঝে নিলাম—উনিই আমার সহযাত্রী।

উনি আমার পাশে এসে বসলেন। উনার পায়ের মাঝখানের জায়গায় কষ্টেসষ্টে দুইটা পোটলা রাখলেন। আমার সাথে এক ছোট্ট হ্যান্ডব্যাগ থাকায় তার বাকি চারব্যাগের একখান আমার সিটের নিচে রাখার অনুরোধ করলেন। আমি ভাবলাম, বড়জোর পঁয়তাল্লিশ মিনিটেরই তো ফ্লাইট, থাক, রাখুক। এরপর পিছনের দুই সিটের যাত্রীকে অনুরোধ করে তার বাকি গাট্টিবোঁচকার একটা ব্যবস্থা করা হল।

দোয়া মোনাজাত পাঠ শুরু হল। এয়ারহোস্টেজ তার অদ্ভুত রঙের লিপস্টিক সমেত আমাদের স্বাগত জানালেন। দুইজন কেবিন ক্রু এই ফ্লাইটে। একজন মহিলা, একজন পুরুষ। তাদের চেহারা মনে পড়লেই আমি জীবন সম্পর্কে হতাশ হয়ে পড়ি। এতই হতাশ হয়ে পড়ি যে এইটুকু লাইন লেখার পরে আবার এই লেখা শুরু করতে আমার তিনদিন সময় নষ্ট হয়ে গেছে। তাই তাদের সম্পর্কে, তাদের ইংরেজি উচ্চারণ ও কর্মদক্ষতা সম্পর্কে; এমনকি বডি ল্যাঙ্গুয়েজ নিয়ে আর একটাও লাইন না লিখব না বলে সিদ্ধান্ত নিলাম। 

প্লেন তখনও রানওয়েতে। কিছুক্ষণ হাঁটে, কিছুক্ষণ থামে, কিছুক্ষণ আবার ইঞ্জিন স্টার্ট দেয়। আমার ইন্ডিয়ান সিমে তখনো অনেক জিবি ইন্টারনেট আছে। একটু পরেই তো এই ইন্টারনেট আর কোনো কাজে লাগবে না, তাই আমি ইউটিউব থেকে ‘বাহুবলী ২’ এর গান ডাউনলোড করতে করতে, হেডফোনে ফুল ভলিউম দিয়ে, চোখে সানগ্লাস পরে, ঘাড় কাত করে একটু ঘুমাবার চেষ্টা করলাম। ঠিক তখনই ওই মহিলা এয়ারহোস্টেজ (উফফ তার বর্ণণা দিব না, দিব না, দিব না), একটা কিম্ভুতকিমাকার জিনিস হাতে নিয়ে আমার সামনের দুই সিটের যাত্রীদের দিলেন। জিনিসটা মাটির বা ইটের রঙের, গোল ধরনের সাইজ, ওটা কোন খাবারের প্যাকেট হতে পারে না, আস্ত খাবারই হবে কিন্তু কোন পরিচিত খাবার বলেও মনে হচ্ছে না। এত বড় খাবার দেয় বিমান বাংলাদেশ—ভাবতে ভাবতে আমি মনে মনে নিজেকে একটু শাসন করলাম কথায় কথায় নিজের দেশের বিমানকে তুচ্ছ করার জন্য।

কিন্তু সেই এয়ারহোস্টেজ আমার আশেপাশের সবাইকে মাটি রঙের বড় জিনিসটা দিলেও আমাকে দিল না। সাধলও না। আমার খুবই মন খারাপ হল। একই পরিমাণ টাকা দিয়ে আমিও টিকিট কাটছি। ওরা প্লেনে ওঠার সাথে সাথে এত খাতির, আর আমাকে কিনা পাত্তাই দিল না! আমি আমার খাবার বুঝে নেয়ার আশায় সিটের সামনের ট্রে খুলতে যাব, এমন সময় খেয়াল করলাম আমার পাশের জন ওই মাটি রঙ জিনিসটা ট্রের ওপরে রেখে তাতে হাত রেখে এমন অঙ্গভঙ্গি করতেছেন যেটাকে কোনো ধর্মীয় আচার-আচরণ বলেই মনে হইল। ঠিক ঠিকই, একটু পরে উনি নামাজ পড়া শুরু করলেন। আমি মনে মনে যারপরনাই লজ্জিত হইলাম। ওই ইট বা মাটি বা যাই দিয়ে তৈরি হোক জিনিসটা আসলে বিশেষ সময়ে অজু করার জন্য। আমি গাধা, অভিজ্ঞতার অভাবে বুঝতে পারি নাই।

প্লেন অনেকক্ষণ হাঁটাহাঁটি করার পরে এইবার উড়তে শুরু করল। সঙ্গে সঙ্গে যাত্রীরা বলাবলি শুরু করল—প্লেনে নাকি কী প্রবলেম হইছে, এইজন্য এতক্ষণ উড়তে পারে নাই।

আমি এয়ারহোস্টেজকে জিজ্ঞাসা করলাম, প্রবলেম কী?

উনি আরেকদিকে তাকায়ে বলল, দরজা বন্ধ হচ্ছিল না। এখন হইছে।

আমি আঁতকে উঠলাম। এ কেমন প্লেন দরজা বন্ধ হয় না! যাত্রীদের কারো এ কথায় কোনো ভ্রূক্ষেপ হইল বলে মনে হইল না। ওদের কথায় মনে হইল, ওরা নিয়মিত যাওয়া আসা করে বিমান বাংলাদেশে। আর প্রায়ই নাকি বিমানের দরজা বন্ধ হয় না! ওদের নিশ্চিন্ত ভাব দেখে আমিও আর টেনশন নিলাম না।

ছোটবোন তিথিকে মেসেজ পাঠালাম—স্টার্টেড ফ্লাইং!

তিথি রিপ্লাই দিল—ওয়ালকাম ব্যাক। ওয়েটিং।

আগামীকাল তিথির পরীক্ষা শুরু। মাকে রেখে আসলাম মামাবাড়িতে। বাসায় বেচারি একা।

তখন দুইটা বাজে। এরপর আমি আউট অব নেটওয়ার্ক। প্লেন চট্টগ্রাম এয়ারপোর্টে ল্যান্ড করতে চাইল। হ্যাঁ, চট্টগ্রামে, যদিও আমি ঢাকা যাব। কিন্তু আর কোনো প্লেন ওই সময় না থাকায় এই ‘কোলকাতা—চট্টগ্রাম—ঢাকা’ ফ্লাইটেই বাধ্য হয়ে আমি চড়ে বসি। প্লেন চট্টগ্রাম এয়ারপোর্টের রানওয়ে স্পর্শ করার সাথে সাথে বিকটভাবে ঘড়ঘড় শব্দ শুরু করল। এবং রানওয়েতে মূল এয়ারপোর্ট গেইটের অনেক আগেই থেমে গেল। এয়ারহোস্টেজ চট্টগ্রামের যাত্রীদের নেমে যেতে বলল। আর ঢাকার যাত্রীদের উদ্দেশ্যে বলল, প্লেনে একটু যান্ত্রিক সমস্যা দেখা গেছে। তবে, চিন্তার কারণ নাই, যার যার জায়গায় বসে থাকতে, এক ঘণ্টা পর ঢাকার যাত্রীদের নিয়ে রওনা হবে তারা।

পাঁচ কি ছয়জন যাত্রী নেমে গেল। ঢাকার রাস্তায় লোকাল বাসের নামে জঘন্য রকম দেখতে যেসব বাস চলে তার চেয়েও জঘন্য দেখতে একটা বাস এসে যাত্রীদের নিয়ে গেল। বাকিরা সবাই ঢাকা যাবে। রইল তারা যার যার জায়গায় বসে।

আমি ‘বাহুবলী ২’ সিনেমার গানে কোনো আগ্রহ না পেয়ে তালাত মাহমুদের গানে ফিরে গেলাম। সময় যেন কাটে না।  চট্টগ্রাম থেকে ঢাকার যাত্রীরা প্লেনে উঠতে শুরু করল আধাঘণ্টা পরে। মনে মনে শান্তি পেলাম, যাক বাবা, বাসায় যাব অবশেষে। আরো মিনিট দশেক পর পাইলট তার রুম থেকে বের হয়ে প্লেন থেকেই নেমে গেল।

আমি তো অবাক! যাত্রীদের কারো কোনো মাথাব্যথা দেখা গেল না। একটু পর এয়ারহোস্টেজ তার মাইক ছাড়াই এসে  বলল, প্লেনে একটু সমস্যা দেখা দিয়েছে। আপনারা সবাই প্লেন থেকে নামেন।  সবাই প্লেন থেকে নামার জন্য তাড়াহুড়া শুরু করে দিল। আমার পাশের যাত্রী তার ছয় পোটলার কোনটা কোথায় সেটা খুঁজতে ব্যস্ত হয়ে গেল।

আমি চিৎকার করে উঠলাম, এটা কোনো কথা হল? প্লেনের কী সমস্যা সেটা বলবেন না? কতক্ষণ পরে ঢাকা রওনা দেবেন সেটা তো বলবেন? নামেন আর উঠেন বললেই হল?

আমার কথায় এয়ারহোস্টেজের চেয়েও বেশি বিরক্ত হল আমার সহযাত্রীরা। আরে বাবা, ভাঙা ভাঙা ভুল ইংরেজিতে কথা বলে বোলে কথা! তার সঙ্গে এমন চিৎকার করে কথা বলা যায়! এয়ারহোস্টেজ তাদের কাছে পীর মুরশিদের মত, সে বলছে নামো—তো চুপচাপ নামো!

এয়ারহোস্টেজ মহিলা আমাকে মুখ ঝামটা দিয়ে বলল, কী সমস্যা আমি কী জানি! সেটা স্যারকে জিজ্ঞাসা করেন! আমাকে জিজ্ঞাসা করেন কেন?

নামতে গিয়ে খেয়াল করলাম আমাদের মধ্যে নীল পাসপোর্টধারী সাদা চামড়ার একজন যাত্রীও আছেন। প্লেনের সিঁড়ির পাশেই ওয়ারল্যাস হাতে দাঁড়ানো এক অফিসার। সেই সাদা চামড়া তাকে জিজ্ঞাসা করছে, কতক্ষণ ডিলে হতে পারে! আমিও গিয়ে জিজ্ঞাসা করলাম, অফিসার জানালো, ইঞ্জিনে ‘একটু’ সমস্যা, ঠিক করেই ফ্লাই করবে প্লেন। এই এক ঘণ্টা লাগবে।

সেই জঘন্য বমি আসা বাসটাতে চড়ে বসলাম। বাসটার লাল সস্তা ফোম থেকে সত্যি সত্যি বমির গন্ধ আসতেছিল। আমার অবশ্য বাস ফোবিয়া আছে, বাসের কাউন্টার দেখলেও বমি বমি লাগে। আমি বহুত কষ্টে ওই বাসে চড়ে আমার কাঁধের ভারি ব্যাগটা নিয়ে দুইতলা সিঁড়ি বেয়ে উঠলাম। আমাদের সবাইকে দোতলার একটা রুমে বসায়ে রুমের ওই দরজাটা লক করে চলে গেল বিমান বাংলাদেশের লোকেরা। রুমের আরেক দরজা থেকে দুইটা ডিউটি ফ্রি মদের দোকান, টয়লেট, আর একটা বন পাউরুটির দোকানে যাওয়া যায়। তবে ওই রুম থেকে আমাদের নষ্ট বিমান দেখা যায়। তার সামনে ইউনিফর্ম পরা লোকদের জটলা। বিমান হয়ত ঠিক হবে, এই ভেবে আশ্বস্ত হলাম।

আমার এক ফোনে তখনও ইন্ডিয়ান সিম। সেটাতেই গান শুনতেছিলাম। ওইটার সিম বদল করার জন্য বিশেষ পিন দরকার। আরেক ফোনে দুইটা বাংলাদেশী সিম। কিন্তু এক ফোটাও চার্জ নাই। আমি ভাবলাম, ওই মোবাইলে আগে চার্জ দিয়ে নেই। তারপর তিথিকে ফোন করে বলে দেই, দেরি হবে। কিন্তু কোথাও কোনো প্লাগ পয়েন্ট খুঁজে পাইলাম না। বিরক্তিতে অস্থির হয়ে পায়চারি করতেছি আর রানওয়েতে বিমানের দিকে তাকাচ্ছি।  আমি ছাড়াও আরেকজন আমার মতই পায়চারি করে করে রানওয়ের দিকে তাকাচ্ছে—সেই সাদা চামড়ার লোকটা।

এদিকে আমার প্রিয় সহযাত্রীরা তাদের গাট্টি বোঁচকাসহ চেয়ারের ওপর পা তুলে বসে গেল। এ যেন তাদের সংসার! কেউ কান চুলকাতে লেগে গেল, কেউ ব্যাগ থেকে নেইল কাটার বের করে নখ কাটতে শুরু করল, কেউ আবার চোখে সানগ্লাস পরে ভিডিও কল করা শুরু করল। আমার ব্যাগের পাশে বসল কোলকাতার তিনজন লোক। তারা একজন আরেকজনকে বলল, এই চট্টগ্রামে না দাদা সবসময়ই এরকম হয়, আগেও দেখেছি। বলেই তারা এইমাত্র এয়ারপোর্ট থেকে কেনা ভ্যাটবিহীন পাঁচটা রামের বোতলের একটা খুলে পান করতে শুরু করল। আরেক বন্ধু ব্যাগ থেকে বের করল তাস। তারা আরামসে রাম খাচ্ছে আর তাস খেলতেছে।

আমার মনে হইল, এরা যেহেতু নিয়মিত যাত্রী আর এত নিশ্চিন্ত সেহেতু আমারও দুশ্চিন্তার কিছু নাই। আগের রাতে ঘুমাই নাই। সকাল থেকে কিছু খাই নাই। বন পাউরুটির দোকানটাতে নাকি পটেটো ক্র্যাকার্স ছাড়া কিছু নাই—যাত্রীদের বলাবলি করতে শুনলাম।

আমি চিপস খাই না। অপেক্ষা করতে করতে আমি আমার ব্যাগের উপর মাথা রেখে ঘুমায়ে গেলাম। আমার যখন ঘুম ভাঙলো তখন দুই ঘণ্টা পার হয়ে গেছে। তখনও কোলকাতার দাদাগুলি তাস খেলে যাচ্ছে। সানগ্লাস পরুয়া চ্যাংড়া দুইটা ভিডিও কল না করলেও, সানগ্লাস খোলে নাই, সেলফি তুলতেছে। কেউ কেউ চেয়ারের ওপর সটান হয়ে শোয়া। আমি আবার চারিদিকে পায়চারি করলাম। বাইরে সূর্য প্রায় ঢুলু ঢুলু। রানওয়েতে সেই নষ্ট বিমানটা নাই। আর নাই সেই সাদা চামড়ার লোক। আমি অনেকক্ষণ অপেক্ষা করলাম। সেই লোক কোথাও নাই! আমার যেন মাথা খারাপ হয়ে গেল। আমি চিৎকার করে উঠলাম, আপনাদের কি কারো খেয়েদেয়ে কোনো কাজ নাই? ঢাকায় যাবার তাড়া নাই? কীভাবে এখানে ঘণ্টার পর ঘণ্টা বসে আছেন?

দুজন হিজাব পরা মেয়ে, আমার চেয়ে বয়সে কিছুটা বড় উঠে দাঁড়াল। বলল, দেখেন আমরা অসুস্থ। ওষুধ খাবো, এখানে একটু পানিও খাবার সুযোগ নেই। তাদের একজনের হাসবেন্ড বলে উঠল, আরে বাবা, প্লেন নষ্ট হইছে তো ওদের কী দোষ? প্লেন আজকে ঠিক হবে না। সবাইকে এখানেই থাকতে হবে।

যেন এটা বিধির লিখন। না যায় খণ্ডন।

আমি বললাম, আমার আজকে ঢাকায় ফিরতেই হবে। আমার জরুরি কাজ। আর এক ঘণ্টার কথা বলে তিন ঘণ্টা কাটানো এটা তো কোনো কথা হতে পারে না। তারা কেউ তো আমাদের জানাবে কী হতে যাচ্ছে—নাকি? আমি ভাঙচুর করতে গেলাম। কারো যাওয়ার তাড়া থাকলে আসেন। নাহলে ঘুমান এখানে।

সঙ্গে সঙ্গে অনেকেই আমার প্রতিবাদে শামিল হইল। তাদের কথার সুর শোনেন—‘অন্তত দুপুরের খাবারটা তো দিতে পারত!’

লজ্জায় ঘৃণায় আমার চোখে পানি চলে আসল। খাওয়া ছাড়া এদের আর কোনো চিন্তা নাই! আমি সঙ্গে সঙ্গে অন্য গেইট দিয়ে বের হয়ে সিকিউরিটির নিয়ম ভঙ্গ করে ইমিগ্রেশনের লাইনে চলে গেলাম। আমাকে সিকিউরিটি গ্রেফতার করল তার আগেই। এর মধ্যেই দুইজন অসুস্থ মহিলা, তাদের একজনের সেই হাসবেন্ড, একজন বাচ্চাসহ মহিলা আর আমার সেই ছয় পোটলা নিয়ে ভ্রমণ করা সহযাত্রী আমার পিছে পিছে এসে পড়ল। সিকিউরিটি এবার আমাদের কথা শুনে গেইট পার হইতে দিল। গেইট পার হলে যে জায়গা, সেটা হইল ইমিগ্রেশন অফিসারদের বসার পেছনের জায়গা। সেখানে কারো দাঁড়ায়ে থাকা নিষেধ। আমি সেইখানে গিয়ে এমন চিল্লাফাল্লা করলাম যে ইমিগ্রেশন অফিসারদের কাজের খুব ডিস্টার্ব হইল। যখন জানতে চাইল ঘটনা কী, তখন আমরা সব বলার পরে গিয়ে বলল, আপনারা ওই রুমে গিয়ে বসেন, আমরা বিমান বাংলাদেশের কাউকে পাই কি না দেখি। সঙ্গে সঙ্গে আমার বিপ্লবী কমরেডরা ওই ওয়েটিং রুমে যেতে প্রস্তুত হয়ে গেল।

আমি বললাম, না, আমি যাব না। বিমান বাংলাদেশের কেউ এখানে না আসা পর্যন্ত আমি এখান থেকে যাব না। ওরা আমাদেরকে তিন ঘণ্টা অপেক্ষা করাইছে। এখন আবার কয় ঘণ্টা বসায়ে রাখবে কোনো ঠিক নাই। কোনো সুনির্দিষ্ট সময়সূচি না জানা পর্যন্ত আমি যাব না।

আমার কমরেডরা এখন আবার আমার সাথে একমত হইল যে, এরকম কঠোর অবস্থানে না গেলে হবে না। বার বার বলল, আমাদের দুপুরের খাওয়া পর্যন্ত দেয় নাই!

এদিকে ওই রুমের দোতলার জানালা খুলে একটু পর পর বিমান বাংলাদেশের লোকজন আমাদের দিকে উঁকি দিতে শুরু করল। আমাদের সাথে চোখাচোখি হলেই আমার কমরেডরা ‘ধর ধর’ বলে চিৎকার করে ওঠে, আর ওরা সঙ্গে সঙ্গে জানালা বন্ধ করে চলে যায়। এভাবে ‘টম অ্যান্ড জেরি’ খেলা চলল কিছুক্ষণ।

তারপর এল সেই আকাঙ্ক্ষিত ঘোষণা। আপনাদের প্লেন ছাড়বে, আপনারা রানওয়েতে চলে যান। আমরা ফিরে এসে দেখলাম আমার নন-বিপ্লবী সহযাত্রীরা তাদের গাট্টি বোঁচকা নিয়ে আমাদের দিকে দাঁত কেলিয়ে কেলিয়ে সিঁড়ির দিকে হেঁটে যাচ্ছে! তাদের ভাবটা এমন যে, আমরা বিপ্লব করতে যাওয়ায় আমাদেরকে প্লেনের পিছনের সিটে বসতে দিবে, আর ওদেরকে দিবে সামনে!

যাই হোক, আবার সেই লক্করঝক্কর বাসে চড়ে, প্লেনে গিয়ে উঠলাম। আমাদেরকে যার যার আগের সিটেই বসতে দিল। ইঞ্জিন স্টার্ট দিল। মাইকে যাত্রাপথের দোয়া বেজে উঠল। এয়ারহোস্টেজ ঘোষণা দিল—এক ঘণ্টার মধ্যে ঢাকা গিয়ে পৌঁছবে প্লেন।

সত্যি বলতে আমি তখনো বিশ্বাস করি নাই আজকে ঢাকা পৌঁছতে পারব। আমি সেফটিপিন বের করে আমার মোবাইলের কাভার খোলার চেষ্টা করলাম। আমার দশ মিনিটব্যাপী প্রাণান্ত চেষ্টা দেখে আমার পাশের ছয় গাট্টি-বোঁচকা বিশিষ্ট যাত্রী নিজে থেকেই আমার মোবাইল এর কাভার খুলে সিমটাও বদলে দিলেন। এ এক দারুণ উপকার। কিন্তু কাকে ফোন করে এই দুর্ভোগের কথা বলব সেটা ভাবতে গিয়ে নিজেরই চরম দুর্ভোগ শুরু হইল। তিথির নিশ্চয়ই এতক্ষণে টেনশনে বারোটা বেজে গেছে। তবে, ও হয়ত ভাববে—হাতে সময় না থাকায় আমি সরাসরি অফিসে চলে গেছি, অফিস করে একেবারে রাতে বাসায় ফিরব।

আমার তো ঢাকা পৌঁছে উবার ডাকতে হবে! সব দিক ভেবে ফোন বন্ধ করে রাখলাম চার্জ রক্ষার আশায়।

এদিকে আমার সহযাত্রীরা সবাই খুশি খুশি মনে সিটে বসে আমাদের আজকের এই যাত্রা নিয়ে নানান রকম রসিকতা করতে শুরু করল। আমার বিপ্লবী কমরেডদের কেউ বলল, মাঝ রাস্তায় আকাশের উপরে যদি বিমানের দরজা খুলে যায়! কেউ বলল, হতেও পারে এটা শোডাউন, আমরা চিল্লাচিল্লি করে ওদেরকে অসুবিধায় ফেলায় আমাদেরকে আরেকবার নষ্ট প্লেনে এনে বসায়ে রাখল! কিছুক্ষণ পর আবার নামায়ে দিবে—এ কথা শুনে মোটামুটি সবাই হেসে ফেলল।

এয়ারহোস্টেজ তার গম্ভীর চেহারাটা নিয়ে আমাদের সামনে হাজির হল, আবার। দেখাল কীভাবে সিট বেল্ট বাঁধতে হবে, আরো হাবিজাবি। প্লেন কিছুক্ষণ রানওয়েতে আবার হাঁটল। চট্টগ্রাম খুব সুন্দর শহর। এয়ারপোর্ট সমুদ্রের কাছে হওয়ায় আরো সুন্দর। তখন দিনের সূর্য ডুবে যাচ্ছে। চারিদিকে কমলা আভা। বাইরে হাওয়ারা রানওয়ের কাশবনের ওপর দোল খাচ্ছে। জানালা দিয়ে তাকিয়ে সেটা দেখতে দেখতে উদাস হয়ে গেলাম। হোমল্যান্ড বলে কথা! প্লেন জোরে দৌড়াতে শুরু করল। যে কোনো মুহূর্তে উড়বে উড়বে অবস্থা। আর উড়তে যাবার আগেই একটা ধাক্কা খেয়ে থেমে গেল প্লেন। সবাই হইহই করে উঠল—কী হল? কী হল?

কী আর হবে! কপালে যা ছিল তাই হল। প্লেন উড়ল না। পাইলট তার রুম থেকে বের হয়ে সোজা বাইরে চলে গেল, রানওয়েতে দাঁড়ায়ে ওয়ারল্যাসে কথা বলা শুরু করল। রানওয়েতে অফিসারদের ভিড় জমতে শুরু করল। দুই চার মিনিট পর, কে যেন এয়ারহোস্টেজকে জিজ্ঞাসা করল, প্রবলেমটা কী, ম্যাডাম?

এয়ারহোস্টেজ নির্বিকার গলায় উত্তর দিল, প্লেনের ইঞ্জিন অফ হয়ে গেছিল।

আমার বিপ্লবী কমরেডরা চিৎকার করে উঠল, অফ হয়ে গেছিল মানে? এ ঘটনা যদি প্লেন আকাশে ওড়ার পরে হত? আপনারা ঠিকমত সারাই না করে আমাদেরকে কেন ওঠালেন এ প্লেনে?

মুখ ঝামটা দিল এয়ারহোস্টেজ! চিৎকার করে বলল, আমি কী জানি? এসব জানা কি আমার কাজ? আমার কাছে জানতে চান কেন?

সবচেয়ে সামনের সিটে বসা দুই বৃদ্ধ লোকের একজন বললেন, এটা কী ধরনের ব্যবহার? আমরা কখন ঢাকা পৌঁছাব, কিছু একটা তো বলবেন!

আবার চিৎকার করে উঠল এয়ারহোস্টেজ মহিলা, আমাকে জিজ্ঞাসা করেন কেন? আমি যেটা জানি সেটা বললাম। প্লেন কখন যাবে, সেটা কি আমি জানব?

যাত্রীরা সব হইহই করে উঠল। ইংরেজি বলা এয়ারহোস্টেজ যখন ঠিক তাদের ঘরের মা-বউদের মত কপাল কুঁচকায়ে,যা-তা স্বরে বাংলা ভাষায় ঝগড়া করে, তখন কি তারা আর এই এয়ারহোস্টেজের দাবড়ানি সহ্য করে? যাত্রীদের চিৎকার আর এয়ারহোস্টেজের আরো জোরে চিৎকারে পুরা প্লেন একটা নিয়ন্ত্রণহীন টক শো-তে পরিণত হইল।

আমার পাশের ছয় পোঁটলাবিশিষ্ট যাত্রী প্লেন থেকে নেমে গেল। একটু পরে ফিরে এসে বলল, এই প্লেন আজকে আর যাবে না। আমাদের আজকে চট্টগ্রামেই থাকা লাগবে। পাইলট নেমে বলে দিছে—ইঞ্জিন যখন তখন অফ হয়ে যায়, এই বিমান নিয়া আমি আকাশে উড়তে পারব না। যাত্রীরা হায় হায় করে উঠল। আর সত্যি বলতে আমার চোখে পানি চলে আসল। কী এক বিপদ!

চট্টগ্রাম আমার হোমল্যান্ড। সেখানে এক রাত থাকা কোনো ব্যাপার না। কিন্তু ঢাকায় তিথি একা। আগামীকাল সকালেই তার পরীক্ষা। আর আমারও এখন বাসায় যাওয়ার মুড ছাড়া আর কোনো কিছুতে মন বসতেছে না। আমি আমার ফোন অন করে আমার ট্রাভেল এজেন্সিতে ফোন করলাম। দশ মিনিট বকলাম কেন ওই পোড়ার মুখো বিমান বাংলায় টিকিট করতে গেল—এই জন্য। তারপর বললাম সন্ধ্যায় ‘চট্টগ্রাম টু ঢাকা’ কোন কোন ফ্লাইট আছে জেনে আমাকে একটা টিকিট করে দিতে।

প্লেনের ভেতর তখন যাত্রীদের বিলাপ। অসুস্থ রোগীদের কথা আর নাইবা বললাম। অনেকে আছেন যাদের ট্রানজিট ঢাকায়, এরপর কুয়েত, আরব আমিরাতে বা থাইল্যান্ডে যাবেন। একেবারেই শ্রমিক শ্রেণীর লোক এরা। ওয়ার্ক পারমিট নিয়ে ওসব দেশে যাচ্ছে। এরা বোঝেও না যে, বিমান বাংলাদেশের ফ্লাইট এর সাথে ‘এমিরেটস’ এর ফ্লাইটের কোনো সম্পর্ক নাই। এমিরেটস তার নিজের টাইমেই চলে গেছে। আমি সিট থেকে উঠে যাত্রীদের সবার দুর্ভোগের কথা আমার মোবাইলে ভিডিও রেকর্ড করতে শুরু করলাম। তখন কথায় কথায় এই শ্রমিক যাত্রীদের কাছ থেকে জানতে পারলাম, তাদের পরের ফ্লাইটের টাইম অনেক আগেই পার হয়ে গেছে।

আমি প্রশ্ন করলাম, আপনাদের যে ফ্লাইট মিস হয়ে গেল, আপনারা এখন কী করবেন? বিমানের কারো সাথে কথা বলেছেন?

একজন আরেকজনের দিকে মুখ চাওয়াচাওয়ি করলা তারা। তারপর যা বলল তার মানে এই যে, ওদের ধারণা বিমানের ফ্লাইট যেহেতু ডিলে, সেহেতু বাকি সব ফ্লাইটও ডিলে হবে। আর বিমান বাংলাদেশ ঢাকায় গিয়ে ইমিরেটস এর সাথে কথা বলে ওদেরকে কোনো একটা ব্যবস্থা করে দিবে।

প্রকাশ না করলেও আমি খুব সেনসিটিভ মানুষ। ওদেরকে কি আমি বলদ ডাকব, গালাগালি করব, রাগ হব নাকি ওদের দুঃখে কানব—কিছুই বুঝতে পারলাম না। ঢাকা এয়ারপোর্টে যাবার পরে ওদের কী হবে এটা ভেবে সত্যি দুঃখে কলিজা ফেটে গেল আমার। কোন ধরনের প্রশিক্ষণ ছাড়াই, শিক্ষা ছাড়াই, ন্যূনতম ধারণা ছাড়াই এ মানুষগুলিকে বিদেশে পাঠায়ে অবর্ণনীয় কষ্টের মধ্যে ফেলে দেয় আমাদের সরকার, কারো কখনো কিছুতেই কিছু যায় আসে না। এদিকে ইউএস বাংলায় সন্ধ্যা সাড়ে আটটার ফ্লাইটে আমার জন্য একটা টিকিট কাটা হয়ে গেছে। তবু এ মানুষগুলার জন্য আমি আবার চিল্লাফাল্লা করার সিদ্ধান্ত নিলাম।

এয়ারহোস্টেজ আমাকে বাধা দিল, ভিডিও করবেন না, এখানে ভিডিও করা যাবে না।

আমি তাকে এমন রামধমক দিলাম যে সে কানে দুই হাত দিয়ে প্লেন থেকেই নেমে গেল। ইউনিফর্ম পরা এক লোক উঠে বলল, এই প্লেন যাবে না, আপনারা সবাই নেমে পড়ুন।

বাইরে ওই লাল বাসটা দাঁড়ানো। আমরা কখন যাব, কোন প্লেনে যাব আর এখনই বা আবার কোথায় নিয়ে যাচ্ছে আমাদেরকে কিছুই না বলে—শুধুমাত্র ‘নামুন’ বললেই হল নাকি!

আমার কিন্তু তখন ধৈর্যের সব বাঁধ ভেঙে গেছে। চাচা চৌধুরী ও সাবু’র কমিকসে এরকম ছিল যে—সাবু যখন রেগে যায়, আগ্নেয়গিরিতে অগ্ন্যুৎপাত শুরু হয়।

আমার অবস্থা তখন সাবুর মত। আমি ধুমধাম প্লেন থেকে নেমে আরো জোরে আমার কাঁধের ব্যাগটা ছুঁড়ে ফেললাম রানওয়েতে। (ফলস্বরুপ এয়ারপোর্ট থেকে কেনা জিনিসের কোনো-কোনোটা ভেঙে চুরমার হয়ে গেল) তারপর প্লেনের সামনে বসে পড়লাম।

বললাম, আমি আজকে কখন কীভাবে ঢাকায় যাব সেটা কনফার্ম না হওয়া পর্যন্ত এইখান থেকে উঠবো না। আপনারা বললেই বাসে উঠে সুড় সুড় করে ওই রুমে চলে যাব, আপনারা কোনোরকম ফ্যাসিলিটিস না রেখেই ওই রুমে ঘণ্টার পর ঘণ্টা বসায়ে রেখে সবাই পালায়ে যাবেন—সেইটা আর হচ্ছে না। যে বাসে উঠবে উঠুক, আমি উঠছি না। এইটা কোন সার্ভিস? এইটা কোন আচরণ?

আমার চিৎকারে আমার সহযাত্রীরা খুবই দ্বিধাগ্রস্ত হল। অনেকে বাসে উঠে গেছিল, তারা নেমে গেল। বাচ্চাসহ একজন মহিলা ছিল যিনি কোলকাতার, তিনি আমার সাথে বসে পড়লেন, কেঁদেও ফেললেন। বললেন, আমার বাচ্চাটা সকাল থেকে এই একটা কেক খেয়ে আছে। না পানি, না খাবার, না কিছু এরা দিয়েছে! আমাদের কালকে লন্ডনের ফ্লাইট। ঢাকা এয়ারপোর্টে গাড়ি এসে দুপুর থেকে অপেক্ষা করছে। এ কেমন দেশ! কোনো নিয়ম কানুন, আচার-বিচার নেই এদের!

সঙ্গে সঙ্গে আমার দুই হিজাবী কমরেডও চিৎকার করে উঠল। ওরা অসুস্থ। ডাক্তার দেখায়ে ফিরতেছে। এর মধ্যে একজনের গায়ে তখন ১০৩ জ্বর। কিন্তু উনাকে একটা প্যারাসিটামল খাওয়ানোর ব্যবস্থাও করা যায় নাই।

পুরা ফ্লাইটে যত মেয়ে ছিল, সব মেয়ে আমার সাথেই প্লেনের সামনে বসে গেল। সিকিউরিটি এসে আমাদেরকে বলল, রানওয়েতে কোনো জটলা করা যাবে না। এখানে বসা যাবে না। অন্য প্লেন যাবে, আমরা এরকম ডিস্টার্বেন্স তৈরি করতে পারি না।

আমি চিৎকার করে বললাম, বিমান বাংলার ম্যানেজার এখানে না আসা পর্যন্ত আমি এখান থেকে উঠব না। আমার গায়ের উপর দিয়ে প্লেন যাক।

বিমান বাংলাদেশের লোকজন ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে গেল। রানওয়ে সিকিউরিটি ওদেরকে ধমকাতে ধমকাতে বলল, যাও তাড়াতাড়ি ম্যানেজারকে আসতে বলো।

সাথে থাকা যাত্রীরা আমাকে বাহবা দিয়ে বলল, ঠিক, ঠিক, ঠিক করেছেন একদম। আমাদের রুমে আটকে দিয়ে কোনো খবরই নিল না, দুপুরে খেতেও দিল না!

আমার সামনে প্রশস্ত রানওয়ে, পেছনে বিশাল বিমান। সামনে ওয়াকিটকি আর হাবিজাবি নিয়ে একগাদা ইউনিফর্ম পরা লোক, উপরের নীল আকাশে একটু একটু করে তারাদের আভাস পাওয়া যাচ্ছে। সন্ধ্যা হচ্ছে। আমার শহরের বাতাস আমাকে একটু পরপর ছুঁয়ে ছুঁয়ে যাচ্ছে। চোখমুখ শক্ত করে বসে আছি বটে, কিন্তু কেউ যদি সেই মুহূর্তে আমার ভেতরের আমিকে দেখতে পেত, তাহলে দেখত—একটা মেয়ে রানওয়েতে নিজের ব্যাগের ওপর বসে হাত পা ছুঁড়ে কেঁদে যাচ্ছে আর বলতেছে, আমারে বাসায় যাইতে দে রে মনা, যে কোনো ভাবে বাসায় যাইতে দে…

এমন সময় আজান দিল। আমার পাশের সিটের যাত্রী আরো যারা নামাজ পড়বে তাদেরকে নিয়ে রানওয়ের উপরেই নামাজ পড়া শুরু করে দিল। অফিসাররা বুঝল, আমাদেরকে ম্যানেজ করতে পারবে না। ম্যানেজার ডাকা ছাড়া উপায় নেই। একটু পরেই একটা সাদা মাইক্রোবাস আসতে দেখা গেল। ধরণীতে পা রেখে আমাদের ধন্য করলেন বিমান বাংলার ম্যানেজার সাহেব।

ততক্ষণে আমি আরেকবার আমার ট্রাভেল এজেন্সির ছেলেটার সাথে কথা বললাম। আমার ইউএস বাংলার টিকিট কনফার্মড। পকেট থেকে আরো সাত হাজার টাকা গচ্চা। এরপর বিমান বাংলাদেশ এর হেডঅফিসে ফোন দিয়ে জিএম’কে চাইলাম। ফোন যে ওঠালো সে আরো তিন চারজনকে ফোনটা ধরিয়ে দিল, একই ঘটনা এই তিন-চারজনকে বলতে বলতে হয়রান হয়ে আমি বললাম, আমি জিএম এর সাথে কথা বলব। উনাকে ফরওয়ার্ড করুন। ফোনে কথা বলতেই বলতেই আমি আন্তজার্তিক রুটে বিমানযাত্রীদের ‘রাইটস’ বা অধিকারগুলা কী কী সেগুলা পড়ে ফেললাম। বিমান বাংলাদেশের আর কোনো ফ্লাইট সেদিন চট্টগ্রাম থেকে ঢাকা আসবে কিনা সেটাও দেখে ফেললাম। এদিকে, ফোনের সেই ব্যক্তি এক পর্যায়ে বলেই ফেলল যে—এই ফ্লাইটটা ডিলে তারা জানেন। কিন্তু যাত্রীদের কী ব্যবস্থা করা হবে, তা তারা বলতে পারছেন না। কিন্তু জিএম এখন অফিসে নাই। তাই ওইদিকে লাইন ফরওয়ার্ড করতে পারবে না।

সবশেষে এক বন্ধুকে ফোন দিয়ে সংক্ষেপে ঘটনা জানায়ে রাখলাম, কারণ ফোনের চার্জ প্রায় শেষ পর্যায়ে। এরপর কী আছে কপালে—জানি তো না।

ম্যানেজার তার নিরাপত্তা বেষ্টনী ছেড়ে আগায়ে আসার সঙ্গে সঙ্গে যাত্রীরা যেন কথা নিয়ে ঝাঁপায়ে পড়ল তার উপর। সবাই যার যার অভিযোগ ক্ষোভের সঙ্গে ঝাড়তেছে…

‘আমাদের দুপুরের খাবার দেন নাই…’

‘ওষুধ খাবার পানি পর্যন্ত পাই নাই…’

‘আমাদের সাথে যে সাদা চামড়ার লোক ছিল, সে কোথায় গেল? বিদেশী মানুষের খুব কদর, আর দেশীদের কোনো খবরই নাই!’

‘এইটা কোনো সার্ভিস, নাকি কোনো মানুষের কাজ…’

‘ফাজলামোর একটা সীমা থাকা উচিত…’

‘আপনাদের এয়ারহোস্টেজ বেয়াদবের মত কেন কথা বলে?’

‘এইটা কি এয়ারহোস্টেজ নাকি ডাইনি?’

‘আমাদের দুপুরের খাবার…’

কুয়েত, আরব আমিরাত, থাইল্যান্ডগামী শ্রমিকরা একপাশে দাঁড়ায়ে পুরা ঘটনা দেখতাছে। বিমানের অফিসারকে কিছু বলার সাহস তাদের নাই! যদি মাইন্ড করে ওদেরকে আর প্লেনেই উঠতে না দেয়!

কথা বলার সুযোগ পেয়ে আমি ঢুকে পড়লাম ভিড়ে। প্রথমে আমার অফিসের একটা কার্ড দিলাম ম্যানেজারের হাতে। তারপর চিৎকার করে বললাম, আজকে আপনারা যা করলেন, সেটার খেসারত যদি না দেওয়াইছি আপনাদেরকে দিয়ে—কোন সাহসে আপনারা একটা লকড রুমে আমাদেরকে এত ঘণ্টা বসায়ে রাখলেন, একটা মানুষ এসে একটা কথা বলল না, জানাল না যে কী হতে যাচ্ছে, আমাদের কোনো ইমার্জেন্সি আছে কিনা, এই মানুষগুলা তাদের ফ্লাইট মিস করে ফেলছে, আপনাদের উচিত ছিল না তাদেরকে আগে একটা ব্যবস্থা করে দেওয়া? আমি যদি দেখে না নিছি আপনাদেরকে, বহুত ফাইজলামো করছেন জীবনে, উচিত একটা শিক্ষা দিয়াই ছাড়ব এবার… (আমার তখন মাথা পুরাই খারাপ)।

গোলগাল ম্যানেজার বাবু গেলেন ভড়কে। বললেন, আমি খুব দুঃখিত আপনাদের সাথে এরকম আচরণ করা হল। এমন করা তো ঠিক হয় নি। (যেন উনি জানেনই না যে এমন হচ্ছিল!) আমি কী করতে পারি বলেন। প্লেন এটা তো ঠিক হচ্ছে না। এখন ঢাকা থেকে যদি আরেকটা পাঠায়, সেটাতে আপনাদেরকে পাঠাব। সেটা কখন আসবে তা তো বলতে পারছি না। এখন আমি কী করতে পারি বলেন? আপনারা কী চান বলেন?

সবাই চিৎকার করে বলল, খাবার!

আমি বললাম, এখানে রোগী আছে, বাচ্চা আছে, বুড়া আছে। প্রায়োরিটি লিস্ট করে তাদেরকে অন্য প্লেনের যে সিট খালি আছে সেগুলাতে পাঠানোর ব্যবস্থা করেন। আজকে রাতের মধ্যে সবাইকে পাঠানোর ব্যবস্থা করবেন। আমি সবার ফোন নম্বর রেখেছি। প্রত্যেকে না পৌঁছানো পর্যন্ত আমি খবর রাখব।

ওয়ার্ক পারমিট নিয়ে যারা দেশের বাইরে যাবে, তাদেরকে দেখায়ে বললাম—এই ভাইদের ঢাকা থেকে ফ্লাইট ছিল, তারা কীভাবে যাবে সেটার সমস্ত দায়িত্ব আপনাদের। আমি খোঁজ রাখব। না হয় সবার আগে ফোন যাবে রাশেদ খান মেননের কাছে।

তবে, সবকিছুর আগে, আমার লাগেজটা দিন। এই আমার টিকিট। এই আমার ট্যাগ নম্বর। লাগেজ নামান। সব জরুরী জিনিস ওইখানে। (আমি বললাম না যে আমার অন্য ফ্লাইটে টিকিট বুকড আছে)।

ম্যানেজার আমাদের লাগেজের ট্যাগটা নিয়ে অন্য অফিসারের হাতে দিয়ে বললেন, উনার লাগেজটা নামান।

তারপর আমাকে উনার সাদা গাড়ি দেখিয়ে বললেন, আপনি গাড়িতে গিয়ে বসুন। এয়ারপোর্টে চলে যান। আপনার লাগেজ দিচ্ছি। আপনাদের পাঠানোর ব্যবস্থা করছি।

এটা একটা টোপ। সবচেয়ে যে শক্তিশালী লোক তাকে আলাদা করে দিয়ে দুর্বলগুলার সাথে যা খুশি তাই করবে। আমি এই টোপ গিললাম না। বললাম, না, আমাকে একা না, সবাইকে এয়ারপোর্টের লাউঞ্জে নিয়ে যান। কোনো রুমে আটকানো চলবে না।

আমি, আমার দুই হিজাবী কমরেড, বাচ্চাসহ কোলকাতার মহিলা কমরেড ওই সাদা গাড়িতে উঠে এয়ারপোর্টের ওয়েটিং লাউঞ্জে গিয়ে বসলাম। বাকিরাও ধীরে ধীরে সেখানে এসে পৌঁছালো। একটু পরে সেখানে নিম্নমানের কেক, জুস আর পানি নিয়ে আসল বিমান বাংলাদেশের লোকেরা। কিছু যাত্রীরা চুপচাপ সেগুলাই খেল। আমার মত  অসম্ভব ফেড-আপ কয়েকজনও ছিল—যাদেরকে খাবার সাধতেই চেঁচায়ে বলল—আরে মিয়া রাখেন আপনার কেক, ভাত আনেন ভাত, ফাজিলের দল! বেয়াদ্দব!

ক্যাওস যখন শুরু হয়, তখন সেটা বাড়তেই থাকে, কমে না। যাত্রীরা অসম্ভব বিরক্ত, ক্ষুধার্ত আর ক্লান্ত—সব মিলিয়ে তাদের মেজাজ তিরিক্ষি হয়ে গেছে। ছোটখাট বিষয় নিয়েও তারা অনেক চিৎকার করতেছে। অথচ এই আধঘণ্টা আগেও কারো মুখে রা ছিল না। আমি আমার পোঁটলা সহযাত্রীকে ডেকে নিয়ে সাইডে গেলাম।

বললাম, আমার ঢাকায় যাওয়া খুব জরুরী। এখন ইউএস বাংলা প্লেনে টিকিট করা হইছে। আটটার ফ্লাইট। আমি চলে যাব। কিন্তু সব যাত্রী না পৌঁছানো পর্যন্ত আমার সাথে যোগাযোগ রাখবেন। শেষ পর্যন্ত কী হইল সেই আপডেট উনার কাছ থেকে আমি জেনে নিব।

উনি ক্ষোভে ফেটে পড়লেন। বললেন, এইটা কোনো কথা হইল? এত চিল্লাফাল্লা করে এখন আপনি পালায়ে যাবেন?

আমি ‘পালায়ে যাব’ শব্দের ব্যবহার নিয়ে উনার সাথে অনেকক্ষণ ঝগড়া করতে পারতাম, কিন্তু আশেপাশের সবার ঝগড়া দেখে বুঝে গেছি যে এখন সবার মুডই এরকম। একটু টোকা দিলেই হেইহেই করে উঠতেছে।

উনি আমাকে আরো পরামর্শ দিলেন, আপনি রিপোর্টার মানুষ, রিপোর্ট করেন। এই যে অসুস্থ আপা আছে না, উনি ভাইয়ার কোলে এমনে (কাত হয়ে দেখালেন) পড়ে যাক আর আপনি ভিডিও করেন। তারপর রিপোর্ট করেন। এই যে বাচ্চা মেয়েটা ওকে কাঁদতে বলেন আর ভিডিও করেন। দুর্দান্ত রিপোর্ট হবে। আপনি পালায়ে গেলে তো হবে না।

আমার ফোনে তখন যতটুকু চার্জ আছে সেটা আমি উবার ব্যবহারের জন্য রেখে দিছি। আর মানুষের এইরকম কথায় রাগ করা তারও আগে ছেড়ে দিছি। কারণ আমাদের দেশে যার যেইটা কাজ বা পেশা সেইটা ছাড়া বাকি সব কাজে সব মানুষ ওস্তাদ। রিকশাওয়ালা বড় পলিটিশিয়ান, ডাক্তার বড় সাংবাদিক, সাংবাদিক বড় চিকিৎসক।

আমি বললাম, আমার যেতেই হবে।

বলে আমার লাগেজ এখনো কেন আসল না এই নিয়ে আবারো চিল্লাফাল্লা শুরু করে দিলাম। এইবার কাজ হল। আমাকে নিয়ে গেল ইমিগ্রেশনে। ইমিগ্রেশন অফিসার খুব ভয়ে ভয়ে আমার দিকে তাকালেন। আমার সঙ্গে যাওয়া বিমান বাংলা’র অফিসার তাকে প্রশ্ন করলো আমাকে বেশি না ঘাঁটাতে, আমি ঝামেলা করি।

এই ইশারা পেয়ে উনি আমাকে মৃদুস্বরে জিজ্ঞাসা করলেন, কোনো ঝামেলা হইছে নাকি ম্যাডাম?

আমি বললাম, কেন, জানেন না আপনারা? অবশ্য জানবেন কেন, এইসব ফাইজলামো তো উনাদের প্রতিদিনের অভ্যাস। আজকে প্রথম আমরা চিল্লাফাল্লা করলাম, তাই টেনশনে পড়ে গেছে, নাহলে কে কোথায় মরে পড়ে আছে তার খবর কী উনারা রাখতো?

বলে আগুন গরম দৃষ্টিতে তাকালাম ওই অফিসারের দিকে।

ইমিগ্রেশন অফিসার বলল, কী ঘটনা বলেন তো?

আমি সংক্ষেপে তাকে পুরা কাহিনী বললাম। সে বিমানের অফিসারকে বলল, এটা কেমন কথা উনাদেরকে একটা রুমে আটকায়ে রাখছেন? এটা তো কোনো আচরণ হতে পারে না!

আমি চিৎকার করে বললাম, কারণ এইসব করে উনারা পার পেয়ে যান। কোনো জবাবদিহিতা নাই, কোনো মাথাব্যথাও নাই। উনারা ভাববেন গরীব মানুষদের সাথে এগুলা করে উনারা অনেক ভালো থাকবেন। উনাদের ছেলেমেয়েরা ভুগবে এইসব কাজের ফল। কোনোটাই কাজ আনপেইড থাকবে না।

ইউএস বাংলা’র ফ্লাইটে বিজনেস ক্লাসে আমি একজনই যাত্রী। একটু পর পর কেবিন ক্রু’রা এসে খাবার, জুস এইসব সেধে যায়। আমি একজনের কাছে মাফই চেয়ে ফেললাম, বললাম, আমি এখন ঘুমাব। প্লিজ আমাকে কেউ ডাকবেন না। ঢাকা পৌঁছানোর আগে আমাকে ডিস্টার্ব করবেন না দোহাই লাগে। আমি কিছু খাব না।

ওই ফ্লাইট ছাড়ার আগে আমার অসুস্থ কমরেডদের ফোন করলাম। উনারা তিনজন আর সেই পিচ্চি মেয়ে আর তার মা—এই ছয়জনকে রিজেন্ট এর পরের ফ্লাইটে ঢাকা পাঠাবে। ওরা ইমিগ্রেশন পার হয়ে এখন ডোমেস্টিকে ওয়েট করতেছে।

আমি ঘুমালাম।

ঢাকা এসে যখন লাগেজ এর জন্য অপেক্ষা করছি, তখন আমার পোঁটলা সহযাত্রীকে ফোন করলাম। উনি জানালেন, বিমান বাংলাদেশের একটা প্লেন রাতে ঢাকা থেকে যাবে। সেটা চট্টগ্রামে পৌঁছাতে রাত বারোটা বাজবে। তারপর তারা ঢাকার উদ্দেশ্যে রওয়ানা হবেন। আর উনারা রাতের খাবার খেয়েছেন! (আমি জিজ্ঞাসা করি নাই, উনিই বললেন।)

ফোনের অবশিষ্ট চার্জ দিয়ে এবার একটা উবার ডাকার চেষ্টা করলাম। এবং আমার মাথা আরো খারাপ করতে এই প্রথম সম্পূর্ণ নতুন একটা জিনিস দেখলাম। ড্রাইভার এর নামের পরে নাম্বার এর জায়গায় লেখা—‘হি ইজ ডেফ, ইউ কেন টেক্সট হিম।’ মানে আমার উবার ড্রাইভার কানে শোনে না! তাহলে তাকে বলব কেমনে যে কোথায় আসতে হবে! আমি প্রথমে ভাবলাম আমার চোখের দেখার ভুল। পরে দেখি সত্যি সত্যি এমন লেখা। কল করার কোনো সিস্টেম নাই। তাকে এসএমএস দিলাম। কোনো রিপ্লাই আসল না। আমার ফ্লাইটে যারা আসছিল, তারা সবাই চলে গেছে। আমি আরো কিছুক্ষণ অপেক্ষা করলাম, ম্যাপে দেখার চেষ্টা করলাম সে আমার লোকেশনের দিকে আগাচ্ছে কিনা। বিশ মিনিট অপেক্ষার পরেও তার কোনো নড়াচড়া না দেখে, একটা সিএনজি ডেকে পাঁচশো টাকা ভাড়ায় বাসার পথে রওনা দিলাম। সিএনজিওয়ালার সাথে দরকষাকষি করার এনার্জিও আমার আর নাই।

ঢাকায় সেদিন ঠাডা পড়া জ্যাম। এয়ারপোর্ট মোড় এর সিগন্যালটাই পার হতে পারলাম না, পঁয়তাল্লিশ মিনিটেও! গরমে, ঘামে, সিএনজির আওয়াজে, গাড়ির প্যাঁপু-প্যাঁপুতে অসহ্য হইতে হইতে কখন যে ব্যাগের উপর মাথা দিয়ে ঘুমায়ে পড়লাম কে জানে!

হঠাৎ ঘুম ভেঙে গেল। দেখি আমার চারপাশের পরিবেশ একদম বদলায়ে গেছে। রাস্তার পাশে লম্বা লম্বা কিম্ভুত দর্শন কী যেন দাঁড়ায়ে আছে! মনে হচ্ছে কাঁটাওয়ালা কোনো দৈত্য!

এয়ারপোর্ট রোডে বনসাই। ছবি. প্রথম আলো

কোন দেশে চলে আসলাম আমি! রাস্তা ভালো করে দেখার চেষ্টা করলাম। কোনো সাইনবোর্ড চোখে পড়ল না। চোখ কচলে ভালো করে দেখলাম। আরে আমি তো সিএনজি’তেই। এই যে আমার লাগেজ, এই যে ব্যাগ। তাহলে এইরকম অদ্ভুত গাছ কোত্থেকে আসল!

আমাদের দেশে তো এইরকম গাছ নাই! আমি কি ভুল প্লেনে উঠে অন্য কোনো দেশে চলে আসলাম? হাউমাউ করে কাঁদতে ইচ্ছা করল। কিন্তু অন্য দেশের ভিসা ছাড়া ইমিগ্রেশন কীভাবে পার হলাম—এই ভাবনা আমার মাথায় আসতে আরো পাঁচ-দশ মিনিট সময় লাগল।

তখন বুঝলাম, খারাপ সিএনজি’ওয়ালার পাল্লায় পড়ছি। সে নিশ্চয়ই আমাকে অপহরণ করছে, এখন আশুলিয়ার দিকে কোনো রাস্তায়, আমাকে নির্জন কোথাও নিয়ে যাচ্ছে। আমি সিএনজিওয়ালাকে ভাল করে লক্ষ্য করলাম। সে একটু পরপর লুকিং গ্লাসে দেখতেছে—আমি ঘুম নাকি জেগে। তার চেহারা দেখে আমার আর কোনো সন্দেহ থাকল না যে আমি এখন আরেক বিপদে পড়ে গেছি। আমি কিডন্যাপারদের জন্য প্রস্তুতি নিলাম।

সিএনজিওয়ালার চোখ ফাঁকি দিয়ে ফোন বের করে একটা এসএমএস দিতে গেলাম বন্ধুদের কাছে, ফোন গেল বন্ধ হয়ে। চার্জ নাই তাতে কী, ব্যাগ থেকে চার্জার বের করে দুই মোবাইল সেট আর চার্জার শরীরের বিভিন্ন জায়গায় লুকায়ে রাখলাম। আর কি কি করা যায় ভাবতে ভাবতে এমন একটা জায়গায় এসে পড়লাম যেটা একটু পরিচিতই মনে হল। কাকলীর মোড়। তারপর চেনা রাস্তাতেই আমাকে বাসায় নামায়ে দিল সিএনজিওয়ালা।

পরদিন সকালে ঘুম থেকে উঠে ফেইসবুকে দেখি, সৌন্দর্যবর্ধনের জন্য কীসব ছাতামাথা বনসাই গাছ এনে নাকি এয়ারপোর্ট রোডে লাগাইছে সিটি করপোরেশন—সেইগুলা নিয়ে পাবলিক খুব হাসাহাসি করতেছে!

(কভার ফটো. এয়ারপোর্টে লেখকের প্রামাণ্য ছবি, সংশ্লিষ্ট ভ্রমণের ছবি নয় এটি।)

কমেন্ট করুন

মন্তব্য

About Author

পারমিতা হিম
পারমিতা হিম

লেখক ও সাংবাদিক; এখন সময় টেলিভিশন, ঢাকা, বাংলাদেশে কর্মরত।

4 Comments

  1. Sadia Tabassum Reply

    পাক্কা ৪৫ মিনিট লেগেছে পড়তে কিন্তু অনেক মজা পেয়েছি পড়ে।আসলে আপনি হচ্ছেন এন্টিক পিস আপনার মত কেউ এতো সিরিয়াস ব্যাপার হাস্য রসাত্নকভাবে উপস্থাপন করতে পারবে না।

  2. Anonymous Reply

    এইটা কি রম্য রচনা ছিল,আপু।আমিতো বিশ্বাস করতে পারছিনা।আমি কখনো প্লেনে উঠিনি।এখনতো উঠতেই ভয় লাগছে!!!

  3. Anonymous Reply

    “দুইজন কেবিন ক্রু এই ফ্লাইটে। একজন মহিলা, একজন পুরুষ। তাদের চেহারা মনে পড়লেই আমি জীবন সম্পর্কে হতাশ হয়ে পড়ি। এতই হতাশ হয়ে পড়ি যে এইটুকু লাইন লেখার পরে আবার এই লেখা শুরু করতে আমার তিনদিন সময় নষ্ট হয়ে গেছে।”
    এই কথাগুলো কি আপনার পেশাদারিত্ব পরিচয় দেয়? একজন মানুষ আরেকজন মানুশ সম্পরকে এইগুলা কিভাবে বলে? এছারাও অন্নান্ন মানুস সম্পরকে আপনি জা বর্ণনা দিয়েছেন তা কিছুতেই মেনে নেওয়া যাচ্ছে না। আল্লাহ আপনাকে হেদায়েত দান করুক। ভালো থাকুন এবং দয়া করে কলম এর অপবেবহার করবেন না।

  4. Anonymous Reply

    অফিস টাইমে ফেসবুকে এতো দীর্ঘ লিখা পড়ার নিয়ম না থাকলেও পড়লাম। নিজেদের বিমানের দূর্দশা পড়ে যারপরণাই ব্যাথিত, আর আপনার যাত্রা অভিজ্ঞতাতেও।

Leave a Reply