বেশি বয়সী ছেলেটা

শেয়ার করুন!

আমি তখন একটা গভীর প্রেমের মধ্যে ছিলাম। মা সেটা জানতেন। ধরা পরেছিলাম কয়েক দফায়। কিন্তু অনেক ফাঁক-ফোকর বের করে প্রেমটা চালিয়ে যাচ্ছিলাম। মারধরের বেশ কয়েক স্টেপ পার করেও আমার গভীর প্রেমে ভরাডুবি ঘটাতে পারে নি মা। প্রতিদিন শাসনে কাজও হত না এক সময়। মা গালিও দিতেন। মুখে যা আসত তাই বলতেন।  আমি কানে দিতাম না।

মাকে চেতানোটা বিপজ্জনক তাই কিছুই উত্তর দিতাম না। শুধু বলতাম, “মা মন ভাঙা তো মসজিদ ভাঙার সমান, তুমিই বলতা। এখন এতদিন পর আমি কীভাবে বলব যে, সম্পর্ক রাখা আর সম্ভব না? আর তাফসির তো ৫ ওয়াক্ত নামাজ পড়ে, ও যদি এইজন্য আমাকে অভিশাপ দেয় তাহলে তো আমি আর লাইফে কিচ্ছু করতেই পারব না!”

আমার এসব কথায় মা খুব বিরক্ত হতেন। আল্লাহখোদার দোহাই দিলে মাকে একটু শান্ত করা যেত। একটু নরমও হতেন। কিন্তু কোনো না কোনো ভাবে আমাকে দিয়েই সম্পর্কটার দফারফা করার আপ্রাণ চেষ্টা করতেন। তাই সহজ উপায়ে আমাদের প্রেমটা  ভাঙার উদ্দেশ্যেই হয়তো আমাকে দেশ থেকে তাড়ানোর ব্যবস্থা করলেন।

বড় ভাই আদিত্য ছোটবেলা থেকেই ইন্ডিয়াতে পড়ালেখা করে। ইন্টার পরীক্ষা দেওয়ার পর মা আমাকেও হুকুম দিলেন তুমি ইন্ডিয়া গিয়ে শান্তিনিকেতনে গ্রাজুয়েশন করে আসো। অনেক বোঝানোর পরও কোনো কাজ হল না।

সেই সময় আমার প্রেমের অবস্থাও তেমন সুবিধার চলছিল না। তখন চলছিল সম্পর্কের ৪ বছর। দুনিয়ার আজাইরা সমস্যার ঘূর্ণিঝড় বইছিল। আমাদের প্রেমের সম্পর্ক প্রেমিক-প্রেমিকা থেকে ছিটকে কেমন শত্রু-শত্রু টাইপের হয়ে গিয়েছিল। কে কার দোষ ধরব। সেটা নিয়ে অন্যকে পরাজিত করাটাই ভাবতাম জীবনের একমাত্র সার্থকতা। প্রধান ঝামেলা ছিল প্রতিযোগিতামূলক মনোভাব। আর মারামারি তো লেগেই থাকত।

প্রথম থাপ্পড়টা আমিই দিয়েছিলাম। সেই থেকে শুরু। চরথাপ্পড় লাথি ছোড়াছুড়ি সবই চলছিল। যেই যেই রাস্তায় এসব ঘটত সেখানে আর আমরা সেকেন্ড বার যেতাম না। আবার নতুন কোনো রেস্টুরেন্টে যেতাম।

বেশির ভাগ সময় বাস স্ট্যান্ড আর রেস্টুরেন্ট, খাবার দোকানেই মারামারিটা হতো। তারপর আবার নতুন জায়গা খোঁজার মধ্য দিয়ে আমাদের সম্পর্কের টুইস্ট বাড়ত। নিজেরাই হাসতাম। আবার ভাব হয়ে যেত। কেউ কাউকে ছেড়ে থাকতে পরতাম না বলেই সম্পর্কটা এতদিন লাস্টিং করেছে। ঝগড়াঝাটির মেয়াদ আমি আর তাফসির কেউই বেশি ঘণ্টা বারতে দিতাম না। রাগারাগি কাটাকাটি করে যে যার মত আলাদা আলাদা বাসায় গিয়ে একটু কান্নাকাটির পর্ব  শেষ করে ফোনে কথা বলতাম। কখনো আমি, কখনো সরি বলত তাফসির। কখনো বলত ঠিক ভাবে গেছ? তাতেই আমি পটে যেতাম। আর আমি বলতাম, “মা ঠিকই বলেন, তুমি আমাকে মোটেই ভাল রাখবা না। আমি তো ভাল মেয়ে নয় তো এত কিছুর মধ্যেও সম্পর্কটা ধরে রাখি?” আমার অভিমান অভিযোগেই পটে যেত তাফসির। সাথে সাথেই সরি বলে দিত। আমি সরি কমই বলতাম। ওকে দিয়েই বলাতাম। অনেকবার রাস্তাঘাটে আমাদের মারামারিতে লোক জড়ও হয়ে যেত। তখন অবস্থা খারাপ দেখলে ঝগড়ার মধ্যেই হঠাৎ কোনো বাসে দৌড়ে উঠে যেত তাফসির। আর আমি বোকার মত দাঁড়িয়ে মানুষজনের কটূক্তি আর ফালতু ফালতু কমেন্ট কিছুক্ষণ হজম করে কোনো একটা রিকশায় চেপে বাসায় ফিরতাম। সারা রাস্তা কাঁদতাম। সম্পর্কের এই টানাপড়েনের মধ্যে দূরত্ব বাড়লে সম্পর্ক যায় যায় ফাইনাল তাতে আমার কোনো সন্দেহ হচ্ছিল না।

কিন্তু শেষ রক্ষাটা আর হল না। মা আমার রেজাল্ট বের হওয়ার জন্য অপেক্ষা না করে আমাকে পাঠিয়ে দিলেন নানাবাড়ি। সেই বারই প্রথম একা ভারত যাওয়ার অভিজ্ঞতা আমার।

যাওয়ার সময় মা আহাজারি কান্নাকাটির সুযোগও দিল না আমাকে। প্রায় জোর করে বাসে ঠেলে দিলেন।

যাওয়ার সময় আমার প্রেমিকটা ভেউ ভেউ করে কাঁদছে। কান্না দেখে মনে হচ্ছিল এই কান্নাই শেষ কান্না। যাওয়ার কথা শুনে তো বেশ ভালোই ছিল এখন এত কাঁদছে কেন! চিরবিদায় হয়ে যাচ্ছি কিনা বুঝে উঠতে পারি নি। তবে আমার কষ্টটা কোনো বিশেষ কারণ ছাড়াই তীব্র ছিল না। কান্না পেল না। বাসে উঠে খুব মিস করছিলাম বাবা মা আর তাফসিরকে। আর কবে আসব তাও জানি না। কত স্মৃতি! সব ফেলে রেখে যাচ্ছি।

premer galpa 234
পার হওয়ার আগে ইন্ডিয়ার বর্ডারে

২.
বাস স্ট্যান্ডে বাবা-মা আসলেন না। উনারা আমার উপর ভীষণ রেগে আছেন। একটা ছেলের জন্যে যেতে না চাওয়াটা চূড়ান্ত পর্যায়ের বেয়াদবি তাদের কাছে। বাস স্ট্যান্ড থেকে বাসা ১০ মিনিটের পথ। তাই বাবার অফিসের স্টাফ মালপত্রসহ আমাকে বাসে উঠিয়ে দিয়ে চলে গেলেন।

একা যেতে মোটেও ভয় লাগছিল না। বাস ছাড়তেই মা আর নানাবাড়িতে খালা-মামাদের ফোন করে জানিয়ে দিলাম। সবাই বেশ উৎসাহ নিয়ে বসে আছেন, আমি যাব।

আমার নানাবাড়িতে নানা বেঁচে নেই কিন্তু চার মামা-মামিরা খালাসহ বেশ ভরা সংসার। সারাদিন বাচ্চাকাচ্চাদের চরম কেউ-চেউ মামিদের রান্নার আয়োজন নানির আদর সব দিক থেকে তুলনামূলক ভালই লাগবে ভেবে স্বস্তি লাগছে কিছুটা। একদম একা হয়ে যাব না। খালাত ভাই-বোন দুইটা বড়। ওদের সাথে সম্পর্কও ভালে। খাওয়া-দাওয়ার ব্যাপারটাও আরামের ভারতে।

রাতের বাসে উঠেছিলাম। বর্ডারে ছোট মামা থাকবেন। ফোনে বেশি কথা বলা যাবে না কারো সাথে। এই দিকে বন্ধুরা সমানে ফোন দিচ্ছে। আমি সবাইকে শুধু বলছি, “রাগ করিস না ফোনে চার্জ কম। আমি একা যাচ্ছি সারা রাস্তা মা-মামা-খালাদের আপডেট দিতে হবে। সব কথা ফেসবুকে শুনব।” কেউ বুঝল কেউ ভাবল ভারতে পড়তে যাচ্ছি বলে ভাব দেখাচ্ছি। কেউ বুঝল না আমার কষ্ট। মা বড় না প্রেম বড় ভাবতে ভাবতে ঘুমিয়ে পড়লাম। ঘুম ভেঙে ভেঙে ভোর হয়ে গেল। আরিচার আগে বিশাল জ্যাম। কুয়াশায় রাতে কোনো ফেরি পারাপার হতে পারে নি।

৩.
জ্যাম কাটলো দুপুরে। বর্ডারে পৌঁছালাম সন্ধ্যা সাড়ে পাঁচটায়। ইমিগ্রেশন বন্ধ হয়ে যাবে ৬টায়। যদি ৬টার আগে সব ফরমালিটিজ শেষ করে ইমিগ্রেশন কাজ শেষ না হয় তবে পরের দিন ভোর ৬টার আগে সম্ভব না বর্ডার পার হওয়া।

আমার তো মাথায় হাত। মা হাতে ধরিয়ে দিয়েছেন বিশাল বিশাল দুটা ব্যাগ। আচার আর কাপড়চোপরের। সাথে রান্না করা চিংড়ি মাছ আর খাসির আস্ত দুটা রান। আমাকে এগুলো খুবই ভোগাচ্ছিল। মামাকে ফোন করে বললাম। মামা ইন্ডিয়া বর্ডারের গেটে দাঁড়িয়ে আমাকে হাত ইশারা করছেন।

নানা ইন্ডিয়ায় কাস্টমস অফিসার ছিলেন তাই মামারা গেট পর্যন্ত আসার অনুমতি নিতে পারেন। মামা চিন্তা করতে মানা করলেন। ইমিগ্রেশনের একটা একটা করে ধাপ যাচ্ছে আর আমি ঘড়ি দেখছি। একদম শেষ সময়ে আটকে গেলাম।

একজন অফিসার বললেন আমি যেতে পারব না। একা ১৮ বছরের নিচে কোনো মেয়েকে এভাবে যেতে দেওয়াটা সমস্যার। তখনও সার্টিফিকেটে ১৮ হয় নি আমার।

আমার তো মাথায় হাত। সমানে বলতে থাকলাম, আমার মামা গেটে দাঁড়িয়ে আছেন, নানাবাড়ি ভারতে, আমার বাবা সাংবাদিক, সরকারি চাকরি করেন আরো অনেক কিছু। বললাম, “কেন আপনারা আমাকে যেতে দিবেন না? আর বেশি দেরি করলে তো আমি ওই পারে যেতেও পারব না। গেট বন্ধ হয়ে যাবে। তখন একা আমি একটা মেয়ে কীভাবে বাসায় ফিরব! আর এত দূর এসে মাত্র কয়েক মাস বয়স কম বলে আপনারা যেতে দেবেন না!”

কাস্টমস অফিসার তাদের স্যার বড় অফিসারকে ডাকতে গেলেন দোতলায়। সবাই মাঝবয়সী। আমি সেই শীতের মধ্যে ঘামছি। ওই বড় অফিসার কি আমাকে বাক্সপেটরা সহ ঢাকা পাঠিয়ে দিবে! আমার সামনে থাকা আরেকজন অফিসার একদম রিলাক্সড দৃষ্টিতে আমাকে দেখছেন তো দেখছেনই। কোনো কথা বলছেন না। আমার বিপদে তিনি যেন খুবই খুশি মনে হচ্ছে।

তাকে বললাম, আচ্ছা এই রকম কেস কি আগেও ঘটেছে?

অফিসারটা বললেন, “কেস আবার কী জিনিস? না জেনেশুনে চইলা আসো কেন? বাবা মা পাঠায় দিল কেন একা একা একটা মেয়েকে?”

খুব রাগ হল লোকটার উপর। এবার একটু উচ্চস্বরেই বলে উঠলাম, “আশ্চর্য, কতবার বলব আমার আপন ছোটমামা দাঁড়িয়ে আছেন। আপনি দেখতে চাইলে পারবেন, আসেন দেখেন ওই যে বর্ডারের গেটের ওই পাশে।”

premer galpa 234dsf
ইন্ডিয়া ও বাংলাদেশের পতাকা

আমি পায়চারি করছি। অফিসারের কোনো পাত্তা নাই। অনেকক্ষণ ধরে একটা কমবয়সী অফিসার টেবিলের উপর ভর দিয়ে গালে হাত রেখে আমাকে উদাস ভঙ্গিতে দেখছে। আমার সেই দিকে কয়েকবার চোখ পড়েছে কিন্তু চোখ সরিয়ে নিজের পায়চারিতে মন দিচ্ছি। ছেলেই বলা যায়। একটু বেশি বয়সী ছেলে।

আড়চোখে ছেলেটার দিকে তাকানোয় বিরক্তি একটু কমছে। টেনশনও কমছে। একবার ছেলেটার ভাবলেশহীন তাকাতাকি আরেকবার দোতলার সিঁড়িতে অফিসারের আগমন হচ্ছে কি না দেখছি।

পাশে থাকা ট্রলি ব্যাগটার ওপর একটু হেলান দিলাম। ছেলেটা গাল থেকে হাতটা নামিয়ে আমার দিকেই আসছে। আমার পাশে এসে দাঁড়ালো কিন্তু আমার সাথে কথা বলল না। আরেকজন অফিসার যার হাতে আমার পাসপোর্ট তাকে বলল, “দেখি পাসপোর্টটা? কী সমস্যা এটার?”

আমি পিছন ফিরে তাকালাম না। কান খাড়া করে শুনছিলাম কী বলছে লোকটা। কাস্টমসে সব খাইষ্টা লোকজন। ঘুষ চাইবে মাস্ট। এরা কোনো না কোনো ভাবে কিছু একটা কারণ সৃষ্টি করে ঘুষের আমদানি বাড়ানোর ধান্দা ছাড়া কিচ্ছু বোঝে না। আবার আমাকে একা দেখে টাকা বাগিয়ে নিতে চাচ্ছে। হাতে সময়ও নেই।

বেশি বয়সী ছেলেটা আমাকে বলল, “আপনি ভারতে কোথায় যাবেন? কার কাছে?”

আমি পিছনের দিকে ঘুরে বললাম, “আমার নানাবাড়ি যাব। এবারেই প্রথম একা একা যাচ্ছি। ওই পারে। ওই যে বর্ডারের গেটে দাঁড়িয়ে আছে ছোটমামা।”

ছেলেটা একটু উঁকিটুকি দিয়ে আমার দিকে ঘুরে তাকিয়ে বলল, “ওহ। আপনার মামাকে গেটে আসতে দিয়েছে?”

আমি বললাম, “নানা ইন্ডিয়ান কাস্টমস অফিসার ছিলেন। বড় মামা এখন কাস্টমসে চাকরি করেন। কাস্টমস পোর্ট। তাই পরিচয় দেখালে আসতে দেয়।”

ছেলেটা আবার বলল, “আপনার তো ১৮ বছর হতে আরো দুই মাস বাকি!”

আমি বললাম, “দেখেন আসলে আমার ১৮ বছর হয়ে গেছে। কিন্তু সার্টিফিকেটে কম।”

ছেলেটা ঠোঁটটা বাম দিকে বাকিয়ে মিষ্টি একটা চিকন হাসি দিয়ে বলল, “কী দরকার ছিল একটা বছর কমিয়ে? দেখলেন তো কী ঝামেলা?”

অামি করুণ করুণ চোখে ছেলেটার চোখ বরাবর তাকিয়ে বললাম, “এখন কি সমাধান হবে না? আমি কি ওই পারে যেতে পারব? দেখেন সকাল থেকে নানি, মামা, মামি, ভাই, বোন সবাই অপেক্ষা করছে। আমার তো কান্নাই পাচ্ছে। ওই দিকে মামা টেনশন করছেন। সেই সকালে এসেছেন আমাকে নিতে।”

ছেলেটা আমার দিকে তাকাল না। পাসপোর্টটা উল্টেপাল্টে দেখছে। একটা পাতা করে উল্টিয়ে বলল, “মাগুরা কোথায় বাসা?”

আমি বললাম, “শ্রীপুর।”

আবার বলল, “ওখানে কে কে থাকেন?”

আমি বললাম, “কেউই না। জানিও না। আসলে একটা বাড়ি আছে। কেউ যায় না।”

ছেলেটা মাথা ঝোঁকাতে ঝোঁকাতে বলল, “ওহ। ভালো ভালো। আমার বাড়ি মাগুরাতেই। শ্রীপুরেই।”

আমি বললাম, “ওহ তাই? আচ্ছা আপনি একটু বলেন না আমাকে কি ছাড়বে মনে হচ্ছে?”

ছেলেটা আবার সেই ঠোঁটের কোণায় চিকন হাসি দিয়ে বলল, “স্যার কি বললেন…?”

কথা বলতে বলতে ওই খারুজ অফিসারটা তার ডাবল খারুজ স্যারকে নিয়ে এল।

স্যারটা আসতেই ওই চিকন হাসির ভদ্র ছেলেটা অফিসারটাকে বলল, “স্যার মেয়েটা আমার এলাকারই। ওর দাদা কবি। ওই যে কাদের নওয়াজ—উনার নাতনি। ওর বাবা-মা আমাকে বলে দিয়েছিলেন ও একা আসবে। ওর নানি অসুস্থ। আর মামা বর্ডারের গেটে দাঁড়িয়ে আছে।”

আমি তো ছেলেটার কথা শুনে আহ্লাদে গদ গদ হয়ে তার দিকে ইম্প্রেস দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছি। ওমা ছেলে কী বলে…!

বড় পেটমোটা স্যারটা জুনিয়রটার কথা তেমন শুনলেন না মনে হল। আমাকে বললেন, “তোমার মা-বাবাকে কল দাও, কথা বলি।”

আমি তো সেই ভয় পেলাম। এখন যদি মাকে জিজ্ঞেস করে এই লোক যে ওই জুনিয়র অফিসারকে চেনে কিনা তাহলে তো আমার যাওয়া হবেই না। এই ছেলেরও বারোটা বাজবে।

আমি মাকে কল দিয়ে বললাম, “মা, এই আমি বর্ডারে আছি তুমি একজন অফিসারের সাথে কথা বলো।” লোকটাকে ফোন ধরিয়ে দিয়ে ভদ্র জুনিয়র অফিসার ছেলেটার দিকে তাকিয়ে আছি। অফিসারটা মাকে বললেন, “জ্বি আপনার মেয়ে তো নওয়াজ পারভিন, জ্বি জ্বি ছেড়ে দিচ্ছি তাহলে আমরা।”

আমার মা মনে হয় পিছন থেকে নামটা সংশোধন করে বলে দিলেন, “না না, নওয়াজ ফারহিন অন্তরা।”

অফিসারটা বললেন, “জ্বি জ্বি, নওয়ার ফারভিন। আপনার বাবার বাড়ি তাহলে ভারতে আছে? ওহ আচ্ছা ম্যাডাম।”

লোকটা আবারও আমার নামটা ভুল করে ফোনটা রাখলেন। তাতে কী, যেতে তো দিচ্ছেন।

জুনিয়র ভাল অফিসারটার দিকে তাকিয়ে এই প্রথম আমি জয়ীর হাসি দিলাম। আর চোখের দিকে চোখ দিয়ে কয়েক সেকেন্ড তাকিয়ে আবারও একটা মিষ্টি হাসি দিলাম। ছেলেটা মাথা নিচু করে ফেলল।

মনে হয় লজ্জা পাচ্ছে। আমি তাড়াহুরা করে ব্যাগ টেনে টেনে পাসপোর্টটা নিয়ে গেটের দিকে ছুটছি। ছেলেটা হালকা হালকা পায়ে আমার পিছন পিছন কয়েক পা আসল, তারপর থেমে গেল। বেশ অনেকটা পিছনে পড়ে গেছে। আমি তাড়াহুরার মধ্যেও পিছনে তাকালাম।

premer galpa 32
কলকাতার হাওড়ায় আমার নানাবাড়ি

সেই জুনিয়র অফিসারটা তাকিয়েই আছে। আমি কিছু দূর হেঁটে আবার তাকালাম। ছেলেটা একই জাগায় দাঁড়িয়ে একই ভাবে তাকিয়ে আছে। কিন্তু ঠোঁটের কোণে হাসিটা নেই। আমি যতদূর পর্যন্ত দেখা যায় দেখতে দেখতে বর্ডার গেটে চলে এলাম।

মামা দাঁড়িয়ে আছেন। মামার সাথে ভারত কাস্টমসের সব ইমিগ্রেশন ঝামেলা শেষ করে গাড়িতে উঠলাম। বাসে করে যেতে হল না। বড় মামা গাড়ি পাঠিয়েছেন। গাড়িতে বসে হাফ ছেড়ে বাঁচলাম। তারপর ছোট মামাকে সব ঘটনা বললাম। ওই ভদ্র ছেলেটার উপকারের কথাও বললাম। কিন্তু আমি যে বার বার তাকিয়েছি, মিষ্টি মিষ্টি হেসেছি তা বলি নি। কিন্তু আমি যে কৃতজ্ঞ সেটা বোঝালাম মামাকে।

গাড়ি চলছে। একটু একটু খারাপ লাগছে। ছেলেটার সাথে কি আর দেখা হবে কখনও! এই যা, আমি তো একটা বার নামটাও দেখলাম না। ওর পোশাকে নেমপ্লেটেই তো লেখা ছিল নামটা। হড়বড়িতে নামটাই দেখলাম না। খুব আপসোস লাগছে। খারাপ লাগা আরও বেড়ে গেল। সারা রাস্তা শুধু হাসিটা খেয়াল পড়ছিল।

৪.
নানাবাড়িতে যাওয়ার পর কিছুদিন খুব মনে পড়ল ছেলেটাকে। নামটা জানলেও তো একবার ফেসবুকে সার্চ করে খুঁজতে পারতাম। তাও দেখলাম না। নিজের ফেসবুকও অনেক বার চেক করে দেখতাম ওই ছেলেটা রিকোয়েস্ট পাঠিয়েছে কিনা। না তাও নেই।

আবার বাংলাদেশে ফেরার পথে আশা করছিলাম দেখা হয়ে যাবেই। কিন্তু অনেক খুঁজেও বাংলাদেশ কাস্টমস অফিসের আনাচে-কানাচে যতদূর চোখ যায় দেখা পেলাম না ছেলেটার।

এরপর যতবার বর্ডার পার হয়েছি এদিক-ওদিক তাকিয়ে তাকিয়ে ঘাড় ব্যথা করে ফেলেছি তাও দেখি নি ছেলেটাকে। ওই খারুজ অফিসারের দুটোকেই পেয়েছিলাম একবার দু’বার। কিন্তু ওর আর হদিসই পাই নি।

কিন্তু চোখ বন্ধ করলে ওই হাসিটা ঠিক মনে পড়ে যায়।

কমেন্ট করুন

মন্তব্য

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here