page contents
লাইফস্টাইল, সংস্কৃতি ও বিশ্ব

ব্রুকলিন (২০১৫)

অভিনেত্রী সিওর্শা রোনান এর নামের মত তার মুখাবয়বও যেন অদ্বিতীয়। ভেসে থাকা চোখ, এক চিলতে ঠোঁট আর চোখ ধাঁধানো শুভ্রতায় মোড়া দেহ নিয়ে তার একমাত্র তুলনা হয়তো চিনামাটির কোনো পুতুল।

এরকম গড়ন সব অভিনেতার জন্যই আপাত আশীর্বাদ থেকে অভিশাপে রূপ নেয়। কারণ চাইলেও তখন বহুধর্মী ও বিচিত্র চরিত্রে নিজেকে মিশিয়ে ফেলা সম্ভব হয় না। তবে রোনান তার এই বাঁধা পেরিয়ে গেছেন আলগোছেই।

brooklyn-2

পরিচালক জন ক্রাউলি।

২০১৫ সালের ‘ব্রুকলিন’ ছবিতে তার চরিত্র ‘এলিশ’ সূক্ষ্ম ভাবে জীবনের তিনটি পর্যায় পার করে। প্রক্রিয়াটা তেমন স্বচ্ছ না হলেও গল্পের পরিক্রমায় তা স্পষ্ট। আর সিওর্শা রোনানের শরীরী ভাষা, বিশেষ করে নাক ও চিবুকের মাঝখানে কিছু ঐচ্ছিক দৃঢ়তার দক্ষ ব্যবহার তার পরিবর্তনগুলোকে করেছে প্রভাবশালী।

গত শতাব্দীর অর্ধেকটা পেরিয়ে গেছে তখন। এলিশ তার বড় বোন আর মাকে নিয়ে আয়ারল্যান্ডের ছোট একটি শহরে থাকে। কর্মচারী হিসেবে এক দোকানিকে সাহায্য করে আর উপরি কামাই হিসেবে রোজ দেখতে হয় দোকানির রুক্ষ আচরণ।

movie-review-logo

পরিচিত একজন যাজকের সহযোগিতায় বড় বোন তাকে যুক্তরাষ্ট্রে যাওয়ার ব্যবস্থা করে দেয়। এরপরই মা-বোন আর বন্ধুদের ফেলে রেখে যায় তরুণী এলিশ, এসে পৌঁছে নিউ ইয়র্কের ব্রুকলিনে।

একটি আইরিশ বোর্ডিং হাউজে তার আশ্রয় হয়, আর চাকরি হয় এক ডিপার্টমেন্ট স্টোরে। উচ্ছল কিন্তু অতিমাত্রায় চঞ্চল মেয়েদের সাথে নিজেকে মানিয়ে নিতে ঠিক পারে না এলিশ, আর বাড়ির জন্য কাতর চেতনাকে পোষ মানাতে হয়ে যায় অন্যমনস্ক।

একদিন দেখা হয় এক যুবকের সাথে, ইতালিয়ান-আমেরিকান, নাম ‘টনি’। ধীরে ধীরে তার সাথে পরিচয় গাঢ় হয়, আর তার হাসিমুখের সারল্যের সাথে ভেতরের সত্তাটিরও যে খুব একটা অমিল নেই—তাও খোলাসা হয়ে মসৃণভাবে। সুযোগ বুঝে প্রেম আসে, দ্বিধা আর শঙ্কাও এসে যায় সময়মত।

‘ব্রুকলিন’ দেখে পরিচালক জন ক্রাউলির আগের কাজগুলি দেখার জন্য মুখিয়ে আছি। তার কাজ সহজ করেছে ‘নিক হর্নবি’র চিত্রনাট্য, যা কম টইবিন এর উপন্যাস চেঁছে সাহিত্যকে চলচ্চিত্রে রূপান্তরের আদর্শ মূর্তি গড়েছে। নিক হর্নবি আগেও নিজের লেখা বই আর চিত্রনাট্য দিয়ে কিছু পরিচালকের কাজ এগিয়ে দিয়েছিলেন, এবার যেন অন্যের সৃষ্টি উপলব্ধিতে নিজের দক্ষতা দেখাতে চাইলেন।

brooklyn-4

চিত্রগ্রহণ আর আবহ সংগীত, দু’টো অনুষঙ্গই ছবিটির স্মৃতিচারণাময় পরিবেশে জোর দিয়েছে। ছবির ব্রুকলিন ১৯৫০ এর প্রকৃত রূপে নয়, বরং গল্পে শোনা ও কল্পনায় দেখা দৃশ্যগুলির আদলে তৈরি। পুরো ছবিটিই যেন বাবার মুখে তার যুবা বয়সের কোনো কাহিনি, যা আমাদের মনের আয়নায় প্রতিফলিত হয়ে পর্দায় ধরা দিয়েছে।

জুলি ওয়াল্টার্স বোর্ডিং হাউজের কর্ত্রী হিসেবে প্রতি সংলাপে তীক্ষ্ম রসযোগ করেছেন, এমনকি যখন তার বক্তব্য গম্ভীর তখনও।

জিম ব্রডবেন্ট অল্প সময়ে বলার ও ছাপ রাখার মত কিছু সংলাপ পেয়েছিলেন, যা প্রকাশ করেছেন স্বাভাবিক ভঙ্গিমায়। এমোরি কোহেন তার ইতালিয়ান-আমেরিকান বাচনভঙ্গি আর মুখময় সাদা দাঁতের সাথে নিষ্কলুষ এক আভা ছড়িয়ে দেন, যা তাকে একবার দেখেই ভালো লাগিয়ে দেয়। ডমন্যাল গ্লিসন এর স্বভাবসিদ্ধ চরিত্রগুলির সাথে এই ছবিতে এনেছেন বিস্তর তফাত—গড়নে ও অভিব্যক্তিতে।

সিওর্শা রোনান শিশুকাল থেকেই চলচ্চিত্রে আছেন, ‘অ্যাটোনমেন্ট’ (২০০৭) এর জন্য অস্কার মনোনয়ন তাকে আলোচিত করেছিল একেবারে শুরুতেই। পরে ভালো-খারাপ মিলিয়ে করা তার কাজের তালিকা এবার সঠিক রাস্তায় আছে বলেই মনে হচ্ছে।brooklyn-3

এলিশ চরিত্রে আরেকটি অস্কার মনোনয়ন প্রত্যাশিতই ছিল, কিন্তু তার কাজের ওজন প্রকাশ করতে শুধু এটুকুই যথেষ্ট নয়। এলিশের দোদুল্যমান প্রতিটি অবস্থানে নিজের দাবি ধরে রাখা আর প্রতি মুহূর্ত আগেরটির চেয়ে সুখের বোধ হবার পরও সৎ অংশটুকু জাপটে ধরা—এর সবই চিত্রনাট্যের দেখানো রাস্তা হলেও তা কার্যকর করতে দরকারি সব দৃঢ়তা ও তারতম্যের প্রকাশে সিওর্শা ছিলেন নিপুণ।

অনেকের কাছেই ছবিটি দাগ কাটবে একেবারে ব্যক্তিগত অঞ্চলে। তবে সবাই দেখেছে এলিশের ক্রমশ পরিবর্তন, যার শেষ ধাপের সাথে প্রথম ধাপের কোনও মিল নেই। তবুও আমরা বুঝতে পারি সবগুলি এলিশকেই।

brooklyn-8

সমালোচক পিটার ট্রেভার্স মনে করেন, এ ছবি নাড়ির টানের উৎস খুঁজেছে; বুঝতে চেয়েছে নিজ বাড়িতেই আমাদের মন নাকি মনের মাঝেই বাড়ি থাকে?

তবে “ব্রুকলিন” দেখে সবচেয়ে সত্য ধারণার জন্ম দিয়েছেন সম্ভবত সমালোচক গ্লেন কেনি। যার কথায়—”এই পৃথিবীতে আমাদের জন্য আশীর্বাদের শেষ নেই ঠিকই, কিন্তু দিনশেষে এ জগৎ অনেক করুণ এক জায়গা—আর সুখ যদি থাকে, তবে তা এই কথাটি মেনে নেওয়ার মাঝেই।”

About Author

আয়মান আসিব স্বাধীন
আয়মান আসিব স্বাধীন

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ডেভেলপমেন্ট স্টাডিজ বিভাগে পড়াশোনা করছেন। বই : সিনে-লয়েড (২০১৭, চৈতন্য)