page contents
লাইফস্টাইল, সংস্কৃতি ও বিশ্ব

ভুলোমন

আমার বাবা ছিল খুবই ভোলাভালা মানুষ। তার ভুলে যাওয়া স্বভাব নিয়ে আমাদের হাসাহাসির অন্ত ছিল না।

বাসার কোনো সিরিয়াস কাজের ভার কখনোই আমার বাবাকে দেওয়া হত না। বাজার টাজার তো কখনোই না!

আমার বাবা এতটাই ভুলোমনা ছিল যে আমরা কোন বোন কোন ক্লাসে পড়ি, জিজ্ঞাসা করলে সেটাও অনেক কষ্টে মনে করার চেষ্টা করত। প্রায় সময়ই মনে করতে পারত না।

বছরের প্রথমে নতুন ক্লাসের বই কিনতে গিয়ে ক্লাস নিয়ে প্রায়ই গড়বড় করে ফেলত। বেশিরভাগ সময়ই যে ক্লাস পাস করলাম, সে ক্লাসের বইই বাবা আবার কিনে আনত। নতুন ক্লাসে যে উঠেছি, সেটা ভুলেই যেত।

প্রতি বছর এটা নিয়ে নতুন নতুন হাস্যকর গল্প তৈরি হত, এসব ভুলোপনা নিয়ে আমরা বাবাকে টিটকারি করতাম। তবু বাবা ভুলে যেত।

একবার, এক বছর বাবা আমাদের চার বোনের বইই ঠিকমত নিয়ে আসল। সবাই অবাক হল আর আমার হল সন্দেহ। আমি খুব ভালমত চেক করে দেখলাম, আমাদের সব বোনের বইয়ের সেটেই ধর্ম বইটা হল ‘ইসলাম ধর্ম শিক্ষা’ আর গার্হস্থ্য বইয়ের জায়গায় কৃষি শিক্ষা বই!

logo paromita

শুরু হল আমাদের হাসাহাসি। একটা কাজও আমার বাবাকে দিয়ে হয় না—এ নিয়ে মায়ের তিরস্কার। বাবার খুবই মেজাজ খারাপ হল।

বলল, “তোমাদেরকে দেখে তো মনে হয় না তোমরা গার্হস্থ্য পড়বা, আমাকে দোকানদার জিজ্ঞাসা করল, কৃষি না গার্হস্থ্য? আমি কৃষি দিতে বললাম। আর ধর্ম তো জিজ্ঞাসাই করে নাই!”

আমি বললাম, তোমার কি আমাদের দেখে মনে হয় আমরা সবজি চাষ পড়ব?

বাবার অপদস্থ মুখ দেখেও আমাদের হাসাহাসি থামল না।

এখন খুব লঘুভাবে বললেও, তখন আমি তার এসব কাজকারবারে খুবই বিরক্ত হতাম।

untitled-17-copy-jpg12

আমার বাবা (বাবুল পাল, ১৯৫৩-২০১২)

একবার আমার নতুন স্কুলের ড্রেস এনেছিল জুন মাসে। জানুয়ারি থেকে মার্চ—তিনটা মাস আমি স্কুলে যাওয়া নিয়ে খুব অস্বস্তিকর অবস্থায় ছিলাম। পরে বাবার দোকানের জামার চিন্তা বাদ দিয়ে পাড়ার দোকান থেকেই নতুন ড্রেস বানিয়ে ফেলি। আমার বাবার নিজেরই কাপড়ের দোকান আর টেইলার্স ছিল। এবং আমার চৌদ্দগুষ্টির বিয়ের ড্রেস, উৎসবের ড্রেস, স্কুলের ড্রেস সবই ওখানে বানানো হত।

আমি যখন ক্লাস টেনে পড়ি, আমার বড় বোনের শ্বশুরবাড়িতে আমার বাবাকে জিজ্ঞাসা করা হল, আমি সায়েন্সে পড়ি নাকি কমার্সে!

আমার বাবা আমতা আমতা করে বলে এসেছিল, কী জানি, মনে হয় আর্টসে পড়ে!

বাসায় এসে আমাকে খুব ভনিতা করে বাবা জিজ্ঞাসা করল, আচ্ছা তুমি আর্টসে না কমার্সে!

আমি মুখ ঝামটা দিয়ে বললাম, আর্টসে কমার্সে হব কেন? অবশ্যই আমি সায়েন্সে।

তারপর আমি আমার বড়বোন মারফত যখন নেপথ্যের কাহিনী জানতে পারলাম, আমার মাথায় আগুন লেগে গেল!

এমনিতেই নানা কারণে আমি বাবার এসব আচরণ নিয়ে খুবই ক্ষিপ্ত ছিলাম। একটা মানুষ কী করে সবই ভুলে যায়! আরো কিছু কারণ ছিল ক্ষেপে থাকার। একটা একটা করে বলি।

আরো পড়ুন: স্যার / পারমিতা হিম

বাবার অভ্যাস ছিল রাতে বাসায় ঢুকে রাতের খাবারের সবগুলো মেন্যুর ইংরেজি নাম জিজ্ঞাসা করা। কিছু কমন জিনিসের নাম ছাড়া বাকিগুলো পারা একটু কঠিনই ছিল বটে। তখন তো গুগল ছিল না। সংসদ এর মোটা ডিকশনারি ঘেটে ঘেটে আমরা পাগল হয়ে যেতাম। সব শব্দ পাওয়া যেত না।

ধরেন ডাল—খাদ্যশস্য ডালের ইংরেজি লেন্টিল। কিন্তু রান্না করা ডাল আর ভুনা করা ডালকে ইংরেজিতে কী বলে—এটা তখন বলতে পারা খুব মুশকিল।

প্রতি রাতে এইরকম ইংরেজি অত্যাচারের কারণে আমরা মাকে বলতাম, আমরা জানি না, এমন কোনো তরকারি রান্না করা যাবে না! তারপরেও কিছু না কিছু উল্টাপাল্টা খাবারের ইংরেজি নামের গ্যাঁড়াকলে আমরা পড়েই যেতাম।

অন্ধকার জায়গায় হঠাৎ করে লাইট জ্বালালে তেলাপোকারা যেমন আলমারির পেছনে, আনাচে কানাচে ঘুপচি অন্ধকার সরে যায়, আমার বোনরাও তেমন আমার বাবাকে ঘরে ফিরতে দেখলেই—লাইট নিভিয়ে, সটান হয়ে বিছানায় শুয়ে পড়ে গভীর ঘুমের ভান করত। আমার এইসব নাটক করতে আত্মসম্মানে লাগত খুব। তাই আমি ঘুমাতামও না, ভানও করতাম না।

বাসা ছাড়াও, নানা জায়গায় আমাকে নানান ইংরেজি ট্রান্সলেশন জিজ্ঞাসা করে করে আমার জীবনটার ফালুদা বানানো ছিল আমার বাবার প্রধান কাজ।

মনে আছে, একবার দুর্গাপূজার সময়, আমি আমার দাদুর বাড়িতে ছিলাম। আমার দাদু তার কাজকারবারের পাশাপাশি হোমিওপ্যাথিক ডাক্তারি প্র্যাকটিস করত। সবাই তাকে এই হোমিওপ্যাথি নিয়ে নানা রকমের কথা বলে খুব ক্ষেপাত। আমিও নানা কিছু বলে ক্ষেপাতাম। সেবারের সেরা ক্ষেপানো ছিল—“ডাক্তার আসিবার পূর্বে রোগীটি মরিয়া গেল”, এ কথা বলে স্লোগানের সুরে বলে ওঠা—‘কোন সে ডাক্তর’? অন্যরা স্লোগান ধরবে—‘নির্মল ডাক্তর!’

বাবার সামনে এরকম ফাজলামো কেউ করতাম না বটে, কিন্তু পূজাবাড়িতে গণ্ডগোলের মধ্যে তার কানে বাচ্চাদের স্লোগান যেতেই পারে! আমাদের মণ্ডপে সন্ধ্যাবেলা তখন আমি নাচানাচি নিয়ে খুব ব্যস্ত। সেখানে দুই হাতে দুই ধূপদানি নিয়ে নাচার একটা স্টাইল ছিল। বড়রা সেটা করলেও আমি ছোট বলে আমাকে কখনো ধূপদানি নিতেই দিত না। আমি খুব চেষ্টা করছিলাম মামাদেরকে পটিয়ে নাচানাচির মধ্যেই একটা ধূপদানি বাগানোর। এর মধ্যেই আমার বেরসিক বাপ এসে আমার শার্টের কলার ধরে এক সাইডে নিয়ে বলল, বল তো “ডাক্তার আসিবার পূর্বে রোগীটি মরিয়া গেল” এর ইংরেজি কী?

আমি এক ঝটকায় কলার ছাড়িয়ে নিয়ে বললাম, ধুর!

বলে আমি আমার কাজ, মানে ধুপদানি সংগ্রহের কাজে চলে গেলাম।

পরের দিন ‘বিশ্ব বেয়াদব’ হিসেবে আমার বিচার করা হল। দাদুর পিছে পিছে ডাক্তারি স্লোগানও বন্ধ হয়ে গেল। পুরো পূজার আনন্দ মাটি হল। এ রাগ আমি ভুলতেই পারি নাই।

আরো পড়ুন: দুর্গাপূজার ছুটিতে / পারমিতা হিম

রাগার কারণ আরো আছে। কোনো পরিবারে নতুন সন্তান হলে আমার বাবা নাকি নাম রাখত—সীতা, গীতা, রিতা, মিলি, ঝিলি, মৌসুমি। এছাড়া কোনো নাম আমার বাবার স্টকে নাই।

আমার বড় বোনের যখন জন্ম হল তখন যথারীতি আমার বাবা নাম রাখল—সীতা, গীতা, রিতা, মিলি, ঝিলি, মৌসুমি। সবার তীব্র প্রতিবাদে এসব নাম বাতিল হয়ে গেল। ওর নাম রাখা হল—নন্দিতা। আর ডাক নাম—রিমি।

এদিকে, আমার জন্মের সময় আমার বাবা ছিল দেশের বাইরে। তাই সে চিঠিতে যখন আমার সম্ভাব্য নাম পাঠালো—ওগুলাই—সীতা, গীতা, রিতা, মিলি, ঝিলি, মৌসুমি—সবাই তার অনুপস্থিতির মর্যাদা রক্ষার্থে আমার বড় বোনের নামের সাথে মিলিয়ে আমার ডাক নাম রেখে দিল—মিলি। আর ভাল নাম—পারমিতা।

যাই হোক, খুব বেশি চালু হয় নাই ‘মিলি’ নাম। আর আমারও এই নাম জীবনে পছন্দ হয় নাই। আমার সব বোনের সুন্দর সুন্দর নাম। ওরা আমাকে এটা নিয়ে খুব ক্ষেপাত তখন। আর আমার সব রাগ গিয়ে পড়ত আমার বাপের ওপর।

তাই, আমার বড়বোনের শ্বশুড়বাড়িতে গিয়ে আমার সম্পর্কে ভুল তথ্য দেয়ার অপরাধ আমি কিছুতেই মেনে নিতে পারলাম না। আমি সোজা গিয়ে আমার বাবাকে বললাম, তোমার যখন এতই ভুলোমন, কিছুই মনে রাখতে পারো না, তাহলে বিয়ে করতে গেছিলা কেন? তোমাকে বিয়ে করতে বলছিল কে? সেটাও ভুলে যেতে পারলা না! নজরুলের মত লেটো গানের দলে যোগ দিয়ে পাড়ায় পাড়ায় গান করে বেড়াতা!

আমার বাবার নানা রকমের বন্ধু ছিল। তারা সকলেই বিশ্ববিখ্যাত বাউন্ডুলে আর পেশায় গীতিকার, সুরকার কিংবা গায়ক। এজন্য কিছু ঘটলেই আমি তাকে নজরুলের মত লেটো গানের দলে যোগ দিতে বলতাম।

তাছাড়া, পড়ালেখা নিয়ে এত বাড়াবাড়ি করত আমার যে বাপ, সে নিজে কিন্তু মোটেও কোনো ভাল স্টুডেন্ট ছিল না। আমার ফুপুর কাছে শোনা, এসএসসি পরীক্ষার সময় আমার বাপ বাড়ির সামনের রেললাইনের ওপরে শুয়েছিল। পরীক্ষা দেয়ার চাইতে প্রাণ যাওয়া তার কাছে উত্তম মনে হয়েছিল। পরে আমার বাপের বাপ তাকে বুঝিয়ে সুঝিয়ে বাসায় নিয়ে আসে।

আরো পড়ুন: শার্লক হোমস / পারমিতা হিম

সময় গড়াতে গড়াতে দেখি, বাপের এ ভুলে যাওয়া স্বভাব বিলকুল আমার মধ্যে কপি পেস্ট হয়ে গেছে। আমার ছোট বোন প্রায় বিশ দিন ধরে তার পরীক্ষার অ্যাডমিট কার্ড প্রিন্ট করে আনার জন্য আমার কানের কাছে ঘ্যান ঘ্যান করছে। আমি বাসা থেকে বেরুলেই আমাকে ফোন করে মনে করিয়ে দেয়। মেসেজ পাঠায়—আজকে কিন্তু আনতেই হবে!
আমি যথারীতি ভুলে যাই।

আজকে অফিসে ইউটিউবে গান শুনতে শুনতে দেখি পাশের সহকর্মী একটা পিডিএফ ফরমেটের অ্যাডমিট কার্ড খুলেছে ওর কম্পিউটারে। ওটা দেখে আমিও আমার মেইল খুলে তিথিরটা ডাউনলোড করে একটা কপি নিলাম। বাসায় ফিরে সেটা তিথির হাতে দিতেই ও বলল, ওরে বাপরে! কীভাবে আনলা! আমি তো ভাবছি, আমি ভার্সিটিতে ভর্তি হয়ে যাবার পরে কোনোদিন হয়ত ভর্তি পরীক্ষার কাগজটা হাতে পাব!

মন খারাপ করে ভাবছি, বাপকে দেওয়া খোটাগুলো এখন আমাকেই আবার শুনতে হচ্ছে! এর মধ্যেই মনে পড়ে গেল, আজ মধু পুর্ণিমার রাত। আজকে রাতে বাসায় থাকব, ঢাকায় থাকব, গ্রামের রাস্তায় রাস্তায় নদীর পাড়ে পাড়ে হাঁটব না—ভাবা যায়!

কিন্তু, ঐ যে, আমি তো আজকের প্ল্যানপ্রোগ্রামের কথা ভুলেইই গেছি। আমার বন্ধুরাও আমাকে রাগ করে আর ফোন করে নি। কারণ আমি প্রায় সময়ই ওদের সাথে প্রোগ্রাম সেট করে, যাওয়ার দিন বিলকুল ভুলে যাই!

About Author

পারমিতা হিম

লেখক ও সাংবাদিক; এখন সময় টেলিভিশন, ঢাকা, বাংলাদেশে কর্মরত।