page contents
লাইফস্টাইল, সংস্কৃতি ও বিশ্ব

‘ভয়েড স্টার’—ভবিষ্যতের পৃথিবী চালাচ্ছে কম্পিউটার ব্রেইন ও এআই

পৃথিবী একটা সাইবারনেটিক ভবিষ্যতের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। পৃথিবী আসলে অনেকগুলি ভবিষ্যতের দিকেই এগিয়ে যাচ্ছে; পরিবেশ বিপর্যয়, পলিটিক্যাল অস্থিরতা, আরো অনেক কিছু। তার মধ্যে একটার কথা বলছি, সাইবারনেটিক ভবিষ্যৎ।

সেই ভবিষ্যতে মানুষ এবং আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স মিলে পৃথিবী চালাবে। মানে, মানুষের সাথে রোবট ও কম্পিউটারের ইন্টার‍্যাকশনের মাধ্যমে ওয়ার্ল্ড সিস্টেম ফাংশন করবে। এটা কোনো ফিকশন বা গল্পের ভিতরের ভবিষ্যৎ না। এটা বাস্তবতার ভবিষ্যত।

জাকারি ম্যাসন (জন্ম. ইউএস, ১৯৭৪)

২০-২২ বছর আগের কথা চিন্তা করেন। কম্পিউটার, ইন্টারনেট, স্মার্টফোন–শুধু এই তিনটা জিনিসের ব্যাপারে চিন্তা করলেই চলবে। এই ২০-২২ বছরের মধ্যে পাওয়ারফুল কম্পিউটার প্রায় সব জায়গায়ই একটা ডোমেস্টিক এবং ইন্ডিভিজুয়াল ডিভাইস হয়ে গেছে, সব সিস্টেম কম্পিউটারাইজড হয়েছে, সেলফোন এসে কয়েক ধাপ পার হয়ে স্মার্টফোন হয়ে গেছে এবং ইন্টারনেট জিনিসটা এখন ইলেকট্রিসিটির মতই এসেনশিয়াল।

কম্পিউটার বা স্মার্টফোন বা ইন্টারনেট আপনার সাথে যেভাবে ইন্টার‍্যাক্ট করতে পারে, আপনার অন্যান্য ইলেক্ট্রিক্যাল ডিভাইসের মত এটাকে নিছক টেকনোলজি হিসেবে দেখার সুযোগ নাই। এখন আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্সের যে অবস্থা, সেই অনুযায়ী পৃথিবীর ভবিষ্যৎ সাইবারনেটিক হবে না, এই কথার পক্ষে একটা যুক্তিও কাজ করে না।

‘ভয়েড স্টার’ বইয়ের গল্প সাইবারনেটিক ফিউচারের মানুষ ও আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্সদের নিয়ে।

একবিংশ শতকের শেষের দিকে, সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বেড়ে গেছে। নিউ ইয়র্ক সিটি পানির নিচে। বিপরীতভাবে জাপান ঠাণ্ডায় জমে যাচ্ছে। পৃথিবীর প্রাকৃতিক অবস্থা বেশ খারাপ। তবে স্যান ফ্রান্সিসকোর ধনী ব্যক্তিরা বেশ ভালো আছে। গরীবরা যাতে স্যান ফ্রান্সিসকোতে ঢুকতে না পারে সেজন্য আকাশে অস্ত্রবাহী ড্রোন পাহারা দিচ্ছে। ধনী ব্যক্তিদের প্রাইভেট আর্মি আছে। বয়স যাতে না বাড়ে সেজন্য তারা প্রতি বছর বিশেষ চিকিৎসা নেয়।

আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্সগুলিকে হাজার হাজার বছর ধরে আগের জেনারেশনের আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্সগুলি এমনভাবে ডিজাইন করেছে যে তারা কীভাবে কাজ করে সেটা মানুষ বুঝতে পারে না। আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্সগুলি সব দিক থেকে মানুষকে অতিক্রম করে ফেলেছে, তাই তারা মানুষের অস্তিত্বের ব্যাপারে অনেকটা উদাসীন। আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্সের বুদ্ধিবৃত্তিক ফাংশন স্বাভাবিকভাবেই মানুষের মত না। ইন্টারেস্টিং ব্যাপার হল, এই আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্সরা মানবপ্রজাতিকে রক্ষা করতে চায়, টেকনোলজির কেয়ারটেকার হিসেবে।

স্যান ফ্রান্সিসকোর একজন বিলিওনিয়ার জেমস ক্রমওয়েলের বয়স প্রায় দেড়শ বছর। সে আরো অনেক অনেক বছর বাঁচতে চায়।

এই বইয়ের প্রধান চরিত্র ইরিনা। ইরিনা আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্সদের সাথে ইন্টার‍্যাক্ট করতে পারে, কম্পিউটার মাইন্ডের সাথে যোগাযোগ করতে পারে। আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্সদের এনক্রিপ্টেড চিন্তা সে মানুষের জন্য ট্রান্সলেট করে।

আরেকজন হল স্ট্রিটফাইটার কার্ন। সে অসংখ্য রিফিউজিদের একজন। বস্তির মত একটা জায়গায় থাকে। কার্ন অনেকটা বৌদ্ধ সন্ন্যাসীদের মত। সে মার্শাল আর্ট প্র্যাকটিস করে।

আরেকজনের নাম থেলস। সে ব্রাজিলিয়ান এক পলিটিশিয়ানের ছেলে। তার বাবা নিহত হওয়ার পরে সে লস অ্যাঞ্জেলসে পালিয়ে এসেছে।

আকেমি নামের একজন উচ্চাভিলাষী অভিনেত্রী আছে।

এই সব চরিত্রদের প্রত্যেকেরই নিজস্ব এজেন্ডা আছে। আলাদা আলাদা মিশন আছে। ইরিনার উদ্দেশ্য প্রতিশোধ, কার্ন কিছু একটা খোঁজে, থেলস কিছু জিনিসের উত্তর চায়। ঘটনাক্রমে একজন আরেকজনের মুখোমুখি হয়। ক্লাইম্যাক্স তৈরি হয়।

তবে সবচেয়ে সিগনিফিক্যান্ট হল, এসব কিছুর ব্যাকগ্রাউন্ডে থাকে একটা সুপার-পাওয়ারফুল রহস্যময় আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স বা এআই। ইরিনা, থেলস ও আকেমিকে এই রহস্যময় আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্সের প্রয়োজন।

জেমস ক্রমওয়েলের সাথে এই রহস্যময় আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্সের একটা বিজনেস চলতে থাকে। এই সুপার-পাওয়ারফুল আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্সের উদ্দেশ্য সম্পূর্ণ বোঝা যায় না। এরও নিজস্ব একটা এজেন্ডা থাকে।

সবকিছুর পিছনে একটা অদৃশ্য শক্তি এইসব এজেন্ডাগুলিকে বিভিন্ন ঘটনার মধ্য দিয়ে গল্পের শেষে নিয়ে যায়।

আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স ভালোভাবে এবং ডিটেইলে বুঝতে পারে–এরকম খুব একটা দেখা যায় না। এই কারণে ফিজিক্সের পপ আইডিয়া নিয়ে প্রচুর সায়েন্স ফিকশন পাওয়া যায়, সে তুলনায় আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স বা কম্পিউটার নিয়ে ভাল সায়েন্স ফিকশন নাই। আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স এবং কম্পিউটারের কাজ নিয়ে সে ধরনের প্রবলেম এই বইয়ে নাই।

পরে দেখলাম, এই বইয়ের লেখক জাকারি ম্যাসন ২০ বছর ধরে সিলিকন ভ্যালি-তে কম্পিউটেশনাল লিঙ্গুইস্টিকস নিয়ে কাজ করেছেন। পরের দিকে ফিকশন লেখতে শুরু করছেন। সুতরাং এই ব্যাপারে তার আইডিয়া অসম্পূর্ণ না। কম্পিউটার সায়েন্স বেজড বা ভার্চুয়াল রিয়ালিটি নিয়ে উইলিয়াম গিবসনের কয়েকটা ভাল সায়েন্স ফিকশন আছে। জাকারি ম্যাসনের লেখা এই ফার্স্ট পড়লাম। তার লেখায় উইলিয়াম গিবসনের অনেক ইনফ্লুয়েন্স আছে।

পড়ুন, ‘ওয়েস্টওয়ার্ল্ড’ মুভি সিরিজ নিয়ে আশরাফুল আলম শাওনের ১০ পর্বের লেখা >> ওয়েস্টওয়ার্ল্ড

কম্পিউটার ব্রেইন বা আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স আরো আরো স্মার্ট হলে সাধারণ মানুষ তার সাথে কীভাবে ইন্টার‍্যাক্ট করবে—সেটা এই বইয়ের কাহিনীর একটা সেন্টার। আমাদের চারপাশে টেকনোলজির একটা ইকোসিস্টেম তৈরি হয়েছে, এবং এই ইকোসিস্টেম আস্তে আস্তে বাড়ছে। টেকনোলজির এই ইকোসিস্টেমের সাথে মানুষের সম্পর্ক খুবই ভাসা ভাসা। একজন এভারেজ ইউজার কতটা বুঝতে পারে যে তার স্মার্টফোন কীভাবে কাজ করছে? বা তার আইফোন বা মাইক্রোসফট ফোনের এআই সফটওয়্যার সিরি বা কর্টানা কীভাবে কাজ করছে? ইন্টারনেটের এআই সফটওয়্যারগুলি বুদ্ধিবৃত্তিকভাবে কতটা একটিভ?—এভারেজ ইউজার এগুলির কিছুই বুঝতে পারে না।

৪০-৫০ বছর আগে সাইবর্গ হিসাবে যে জিনিস কল্পনা করা হত, এখনকার মানুষ সেই সাইবর্গের চেয়েও মোটামুটি ডেভেলপড হয়ে গেছে। মানুষ এখন স্মার্টফোনকে অলমোস্ট একটা অর্গানের মত ব্যবহার করছে—পার্সোনাল ডাটা রাখছে এই ডিভাইসে, ভার্বাল বা টেকচুয়াল যোগাযোগ করছে এই ডিভাইস ব্যবহার করে, মেমোরি সেভ করে রাখছে এই ডিভাইসে, অনলাইন বা ভার্চুয়াল স্পেসে কানেক্টেড হচ্ছে এই ডিভাইস ব্যবহার করে। এবং যখন খুশি তখন, যেখানে খুশি সেখানে—টাইম এবং স্পেসের কোনো লিমিটেশন নাই।

এখন আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স যেভাবে এগিয়ে যাচ্ছে, তারা যদি ভবিষ্যতে সুপারস্মার্ট হয়ে যায়, তখন তারা কি মানুষের কাছে সেটা প্রকাশ করবে?—এখন মানুষের চিন্তাপদ্ধতি আর আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্সের চিন্তাপদ্ধতি এক না। আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স যদি মানুষের বিরুদ্ধে যায়, তারা নিশ্চয়ই মানুষের পলিটিক্যাল ক্ষমতা বা অর্থনৈতিক ক্ষমতা দখল করবে না, তাদের মানুষের মত লোভ বা ডিজায়্যার থাকবে না। কারণ তাদের তো আর মানুষের মত সেন্টিমেন্ট থাকবে না, মানুষের মত বায়োলজিক্যাল ইন্দ্রিয় থাকবে না।

তাহলে সমস্যা কোথায়? আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্সের মানুষের জন্য কীভাবে বিপদজনক হবে? এই উপন্যাসে এই প্রশ্নের উত্তরের একটা সূক্ষ্ম আউটলাইন আছে। ‘ভয়েড স্টার’ সায়েন্স ফিকশন বইতে, আর্টফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স ভিলেন না, আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স মানুষের চাকরও না। মানুষের অ্যাকশনগুলির বাইপ্রোডাক্ট হচ্ছে এআই এবং সেগুলির অ্যাকশন।

এখনকার পৃথিবীর বড় বড় টেক অর্গানাইজেশনগুলি যেভাবে আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্সের অপটিমাইজেশন ঠিক করে দিচ্ছে, এআই-দের কাজও সেরকম। অর্থাৎ টেক অর্গানাইজেশন বা তাদের মালিকদের হাতে প্রচুর ক্ষমতা চলে আসছে। ওয়ার্ল্ড সিস্টেমও খুব দ্রুত এআই নির্ভর হয়ে উঠছে। ইলেক্ট্রনিক কারেন্সির কারণে রিয়াল কারেন্সি একসময় হয়ত বিলুপ্ত হয়ে যাবে। ফলে বর্তমান ইকোনমিক সিস্টেম আর থাকবে না। টেক অর্গানাইজেশনগুলি ওয়ার্ল্ড সিস্টেম নিয়ন্ত্রণ করতে থাকলে বর্তমান স্টেট সিস্টেম বা রাষ্ট্র ব্যবস্থাও হয়ত থাকবে না। তখন কর্মী বা আর্মি হিসেবে মানুষের প্রয়োজনও থাকবে না।

আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স তো মোরালিটি নিরপেক্ষ, সাধারণ মানুষের প্রতি আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স-দের আচরণ কেমন হবে? সাধারণ মানুষ কীভাবে আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স-দের সাথে যোগাযোগ করবে?

জাকারি ম্যাসন এই বইয়ে সুপার-স্মার্ট আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্সের সাথে সাধারণ মানুষকে ইন্টার‍্যাক্ট করিয়েছেন।

এই বইয়ে থ্রিলিং এর ভিতর কিছু ভার্চুয়াল মজা আছে। যেমন, কিছু ফিজিক্যাল লোকেশন আসলে ভার্চুয়াল হ্যালুসিনেশন, আবার কিছু ফিজিক্যাল ক্যারেক্টার হল কোনো কম্পিউটার প্রোগ্রামের মেমোরি।

এক জাপানী ক্যারেক্টার আছে যে টারান্টিনোর সিনেমার ডায়লগ বলে। ফাইনাল সোর্ড নামের একটা তলোয়ার যুদ্ধের খেলায় প্রায়ই কনটেস্টেন্টরা রিং এর ভিতর মারা যায়। এইসব দিয়ে একটা ডাইস্টোপিয়ান সোশ্যাল অর্ডার তৈরি হয়েছে।

এই বই বের হয়েছে এই বছরের এপ্রিলে। টেক বিলওনিয়রদের রিসেন্ট প্রজেক্টের ছায়াও আছে এই বইয়ে। কয়েকদিন আগে এলন মাস্ক নিউরালিঙ্ক নামে ঘোষণা দিয়েছেন, মানুষের ব্রেইন আর কম্পিউটার ব্রেইন একসাথে কাজ করবে। এই বইয়ের প্রধান তিনটা ক্যারেক্টারের ঠিক সে রকমই নিউরাল ইমপ্ল্যান্ট থাকে।

কম্পিউটার প্রোগ্রামিং ল্যাঙ্গুয়েজ সি প্লাস প্লাস এ কোনো মেমোরি লোকেশনের দিকে নির্দেশ করা হয় void* (ভয়েড স্টার) দিয়ে।

ভয়েড স্টারের ক্যারেক্টারেরা বা মানুষ যেভাবে ভার্চুয়াল ওয়ার্ল্ডকে বোঝে এবং এন্টারপ্রেট করে, যেভাবে আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্সের সাথে মানুষ ইন্টার‍্যাক্ট করে সেটাই সবচেয়ে ইন্টারেস্টিং। আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্সের যেভাবে উন্নতি হচ্ছে, দ্যাটস ফ্যাসাইনেটিং। বাট হিউম্যানকাইন্ড’স ফিউচার উইল ডিপেন্ড অন হাউ দে উইল ইন্টার‍্যাক্ট উইদ দ্য এআই অর কম্পিউটার ব্রেইন।

About Author

আশরাফুল আলম শাওন
আশরাফুল আলম শাওন

জন্ম টাঙ্গাইলে। পড়াশোনা ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়।