page contents
সমকালীন বিশ্ব, শিল্প-সংস্কৃতি ও লাইফস্টাইল

মঙ্গলে মানুষের ভবিষ্যৎ, এলন মাস্ক, মিচিও কাকু

ইন্টারপ্ল্যানেটারি কলোনাইজেশন বা পৃথিবীর বাইরের কোনো গ্রহে মানুষের বসতি স্থাপন করা কেন দরকার? এর পিছনে আসলেই কোনো প্র্যাকটিক্যাল কারণ আছে কিনা?

আপাতত কোনো কারণ নেই। তবে এই প্রশ্নের একটা প্র্যাক্টিকাল উত্তর তৈরি হয়ে গেছে যে ভবিষ্যতে সত্যি সত্যি ইন্টারপ্ল্যানেটারি কলোনাইজেশনের কারণ তৈরি হবে।

পৃথিবীর বাইরে অন্যান্য গ্রহ আছে বলেই সেখানে যেতে হবে—এটা কোনো কারণ না। এটাকে কারণ হিসাবে দেখলে ইন্টারপ্ল্যানেটারি কলোনাইজেশনের কোনো গুরুত্ব থাকে না। ভবিষ্যতে সত্যি সত্যি কারণ তৈরি হবে—এই ব্যাপারটা মেনে নিলে মানুষের ইন্টারপ্ল্যানেটারি কলোনাইজেশনের ইচ্ছাকে নিছক ইচ্ছা মনে হয় না, একটা প্রয়োজন মনে হয়।

ভবিষ্যতের কথা বাদ দিলে, এর পিছনে একটা ফিলোসফিক্যাল কারণ আছে। মানুষ নিজেকে সবচেয়ে অ্যাডভান্সড প্রজাতি হিসেবে দেখে, এবং আরো অ্যাডভান্সড প্রজাতি হিসেবে দেখতে চায়, তাই পৃথিবীর বাইরের কোথাও কলোনি তৈরি করতে চায়।

এখন পর্যন্ত পৃথিবীর বাইরের কোনো গ্রহে কোনো মানুষ পৌঁছাতে পারে নি। নাসা এবং ইউরোপিয়ান স্পেস এজেন্সি ২০৩০ এর দশকের মধ্যে মঙ্গলে হিউম্যান মিশনের প্ল্যান নিয়ে সামনে আগাচ্ছে। প্র্যাকটিক্যালি আগাচ্ছে।

এটা গেল মঙ্গলে শুধু হিউম্যান মিশন সাকসেসফুল করার কথা। আর ইন্টারপ্ল্যানেটারি কলোনাইজেশনের ব্যাপারটা এতদিন কথাবার্তা বা চিন্তার মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল। গত বছর, অর্থাৎ ২০১৬ এর মাঝামঝি এলন মাস্ক মঙ্গল গ্রহে কলোনি তৈরি করার ব্যাপারে তার পরিকল্পনার ঘোষণা দেন। এলন মাস্কের স্পেসএক্স কোম্পানি রকেট তৈরি করে, এলন মাস্ক এন্টারপ্রেনার হিসেবে সফল। ফলে, তিনি যখন তার প্রজেক্টের পরিকল্পনা নিয়ে সামনে আসেন তখন বিষয়টা প্র্যাকটিকাল স্টেপ হিসেবে দাঁড়িয়ে যায়। এতদিনে দাঁড়িয়ে গেছে আর কি।

ড্রাগন ক্যাপসুল পর্যবেক্ষণে এলন মাস্ক।

এখন এই কলোনাইজেশনের জন্য মঙ্গল গ্রহকে কেন বেছে নেওয়া হল। অবস্থানগত কারণে মঙ্গল পৃথিবীর জন্য সবচেয়ে সুবিধাজনক জায়গায় আছে। পৃথিবী থেকে চাঁদের দূরত্ব অনেক কম, কিন্তু চাঁদ বসবাস উপযোগী না। চাঁদের টেম্পারেচার রেঞ্জ অনেক বেশি, -১৫০ ডিগ্রী থেকে +১৫০ ডিগ্রী সেলসিয়াস পর্যন্ত, চাঁদের অ্যাটমোস্ফিয়ার বাইরের র‍্যাডিয়েশন থেকে প্রটেক্ট করতে পারে না, চাঁদের গ্র্যাভিটি অনেক কম।

অন্যান্যদের তুলনায় মঙ্গল বসবাস উপযোগী। মঙ্গলে পানি আছে। তাপমাত্রা ভাল। মঙ্গলের অ্যাটমোস্ফিয়ার বাইরের র‍্যাডিয়েশন থেকে ভিতরকে প্রটেক্ট করে। সোলার প্যানেল ব্যবহার করার মত যথেষ্ট সূর্যের আলো পাওয়া যায়। দিন রাতের সময় ব্যবধান প্রায় পৃথিবীর মতই। মঙ্গলের গ্র্যাভিটি পৃথিবীর গ্র্যাভিটির ৩৮ পার্সেন্ট, মানুষ এই গ্র্যাভিটিতে মানিয়ে নিতে পারবে।

আরো পড়ুন: মঙ্গল থেকে অপরচুনিটি রোভারের পাঠানো একটি অবিশ্বাস্য ছবি

মঙ্গল ও চাঁদ ছাড়া পৃথিবীর কাছাকাছি আরেকটা সেলেস্টিয়াল বডি হল ভেনাস বা শুক্র গ্রহ। ভেনাসের গড় তাপমাত্রা ৪০০ ডিগ্রী সেলসিয়াস। ফলে, এইটা নিয়ে কথা বলার কোনো স্পেস নাই।

আগে যে কারণে ইন্টারপ্ল্যানেটারি কলোনাইজেশনের কথাবার্তা হয়েছে, এলন মাস্কও সেটাকেই তার এই মঙ্গলে বসতি স্থাপন করতে চাওয়ার কারণ বলেছেন। এলন মাস্ক মনে করেন একটা সময়ে পৃথিবীতে অনিবার্যভাবে মানবজাতি বিলুপ্ত হয়ে যাওয়ার মত কিছু ঘটবে। আমরা মানব প্রজাতি যদি পৃথিবীতেই থাকতে থাকি তাহলে আমরা বিলুপ্ত হয়ে যাব। এর বিকল্প হল মহাবিশ্বের বিভিন্ন জায়গায় হিউম্যান সিভিলাইজেশনের ছড়িয়ে পড়া। আর এই মঙ্গলে কলোনাইজেশন শুরু করাটা, এলন মাস্কের মতে, ‘আমাদের’ এই জীবনকালেই সম্ভব।

সর্বোচ্চ ২০৩৩ সালের মধ্যে মঙ্গলে মানুষ পাঠাবে নাসা, এটা নাসার লক্ষ্য। অন্যদিকে স্পেস-এক্স মনে করে তারা এই কাজ আরো আগে করতে পারবে, আগামী সাত বা আট বছরের মধ্যেই মঙ্গলে হিউম্যান মিশনে সফল হবে তারা।

তবে এলন মাস্কের স্পেস-এক্সের মূল লক্ষ্য হল মঙ্গলে সেলফ-সাসটেইনিং বা স্বনির্ভর কলোনি তৈরি করা। মঙ্গলে যারা থাকবে সেই কমিউনিটি যেন আস্তে আস্তে এমন একটা অবস্থায় পৌঁছাতে পারে যেখানে বাইরের সাহায্যের উপর, আরো নির্দিষ্ট করে বললে পৃথিবীর রিসোর্সের উপর নির্ভর করতে হবে না।

মানুষ যদি আসলেই পৃথিবীর বাইরে কোথাও সেলফ-সাসটেইনিং কলোনি তৈরি করতে পারে, সেখানে সিভিলাইজেশন ধীরে ধীরে বাড়তে থাকবে। হিউম্যান সিভিলাইজেশনের জন্য এই ব্যাপারটা সিগনিফিকেন্ট কারণ একটা থিয়োরেটিক্যাল সম্ভাবনা ধরে নেওয়া যায় যে পৃথিবীতে মানুষ যেসব ভুল সিদ্ধান্ত নিয়েছে বা ভুল করেছে, সেখানে তারা সেটা সচেতনভাবেই করবে না। তবে এটা একটা ইউটোপিয়া। সিভিলাইজেশনের নিজস্ব ডায়নামিক্স আছে, সেজন্য সেখানে হিউম্যান সিভিলাইজেশন হয়ত অন্য কোনো ভুল করতে থাকবে।

মঙ্গলে সেলফ সাসটেইনিং কলোনি কীভাবে তৈরি হবে সেটা নিয়ে মিচিও কাকু কথা বলেছেন। মিচিও কাকু পপুলার থিওরেটিক্যাল ফিজিসিস্ট, এখন আবার ফিউচারিস্ট।

মিচিও কাকু।

মিচিও কাকু মনে করেন ২০৫০, ২০৬০ এর মধ্যে মঙ্গলে ছোটখাটো কলোনি তৈরি হয়ে যাবে। এবং এই কলোনিতে যেসব কমিউনিটি থাকবে তাদেরকে পৃথিবীর রিসোর্সের উপর নির্ভর করতে হবে না। ফল, শাকসব্জি উৎপন্ন হবে গ্রিনহাউজে। বিদ্যুৎ বা জ্বালানির জন্য এনার্জি ইনফ্র্যাস্ট্রাকচার দাঁড়িয়ে যাবে। পানি সরবরাহের ব্যবস্থা এবং রিসাইক্লিং ব্যবস্থা তৈরি হবে।

১৬০ জনের মত মানুষ হলেই ভালো ভাবে একটা কলোনি শুরু করা সম্ভব হবে। তাতে সবকিছু ঠিকঠাকভাবে চালানো যাবে এবং খুব বেশি খাবার ও অক্সিজেনেরও প্রয়োজন হবে না।

স্পেস এক্সের প্ল্যানও এরকম। ১০০ বা ২০০ জন মানুষ দিয়ে কলোনি শুরু করা। একটা সিঙ্গেল ট্রিপে ১০০ বা ২০০ মানুষ পাঠানো হবে। এরপর ৪০ থেকে ১০০ বছরের মধ্যে ১০০০ ট্রিপ সম্পন্ন করা হবে। স্পেস এক্স আশা করে এভাবে আস্তে আস্তে মঙ্গলে সত্যিকারের বড় একটা শহর তৈরি হবে। সেই শহরটা হবে সেলফ-সাফিশিয়েন্ট, শুধু স্বনির্ভরই না, একই সাথে পরিপূর্ণ। অর্থাৎ মঙ্গলে তখন সম্পূর্ণ আলাদা একটা হিউম্যান সিভিলাইজেশন শুরু হয়ে যাবে।

এখন এই শহরের অবকাঠামো এবং অর্থনীতি কীভাবে তৈরি হবে?

মিচিও কাকু বলছেন অ্যাস্ট্রয়েড বা গ্রহাণু সংগ্রহ করে যে প্লাটিনাম পাওয়া যাবে সেটা থেকেই মঙ্গলের কলোনি নিজস্ব ইনফ্র্যাস্ট্রাকচার তৈরি করবে। প্রতিটা ছোট ছোট অ্যাস্ট্রয়েড থেকে কয়েক বিলিয়ন ডলার মূল্যের প্লাটিনাম পাওয়া যাবে।

আরো পড়ুন: এলন মাস্কের ‘নিউরালিংক’—মানুষের ব্রেইন আর মেশিনের ব্রেইন একসাথে

মিচিও কাকু মনে করেন প্রতি সিঙ্গেল ট্রিপে ১০০ জন করে পাঠানোর এই প্ল্যান নিয়ে এলন মাস্ক যদি আগাতে থাকেন, তাহলে পরবর্তী শতাব্দীর শুরুর দিকেই মঙ্গলে প্রথম শহর তৈরি হয়ে যাবে।

এই ব্যাপারটা শুনতে কিছুটা দূরের কল্পনা মনে হতে পারে।

এই বিষয়ে কানাডার রিটায়ার্ড অ্যাস্ট্রোনাট ক্রিস হ্যাডফিল্ড অ্যান্টার্কটিকার কথা বলেছেন। অ্যান্টার্কটিকা প্রথম চোখে পড়ে ১৮০০ সালের পরে। প্রথম সেখানে কোনো মানুষ যায় ১৯০০ সালের পরে। আর এখন অ্যান্টার্কটিকায় অনেকগুলি বেস ক্যাম্প আছে, কয়েক হাজার মানুষ সেখানে বাস করছে। শীতের সময়ও সেখানে ১০০ এর বেশি মানুষ থেকে যায়।

মিচিও কাকু যে টাইমস্কেলের কথা বলছেন, এই রকম টাইমস্কেলের মধ্যেই অ্যান্টার্কটিকায় সেটলমেন্ট সম্ভব হয়েছে।

মিচিও কাকু বলেছেন, আমেরিকায় ১৮০৩ সালে থমাস জেফারসন মনে করেছিলেন লুইজিয়ানা পারচেজকে সম্পূর্ণ কলোনাইজেশন করতে এক হাজার বছর লাগবে। এরপরেই গোল্ড রাশ হয়। ৩ লাখ মানুষ সানফ্রান্সিসকোতে চলে আসে। পরের বছরই ক্যালিফোর্নিয়াকে স্টেট হিসেবে ঘোষণা দেওয়া হয়।

অ্যান্টার্কটিকা বা লুইজিয়ানা পারচেজে এসব হয়েছে অনুসন্ধান, আবিষ্কার, প্রযুক্তির ব্যবহার ইত্যাদির কারণে।

আরো পড়ুন: আন্তর্জাতিক মহাকাশ স্টেশনে রেঞ্চ ‘ইমেইল’ করল নাসা

মঙ্গলে কলোনি শুরু করার পর হয়ত দেখা যাবে সবকিছুর গতি বেড়ে গেছে।

কিন্তু কিছুই নিশ্চিত করে বলা সম্ভব না।

ভবিষ্যতে কোনো বিপর্যয়ে মঙ্গল গ্রহ হিউম্যান সিভিলাইজেশনকে সেইভ করবে এই আইডিয়ার পাশাপাশি পৃথিবীর বাসযোগ্যতার ব্যাপারেও আমাদের আরো সচেতন হওয়া প্রয়োজন। কারণ, ইট’স অলওয়েজ বেটার টু ব্রিদ দ্য এয়ার উইদাউট দ্য হেল্প অব টেকনোলজি।

কমেন্ট করুন

মন্তব্য

About Author

আশরাফুল আলম শাওন
আশরাফুল আলম শাওন

সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ার। জন্ম টাঙ্গাইলে। পড়াশোনা করেছেন ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ে, কম্পিউটার সায়েন্স ও ইঞ্জিনিয়ারিং এ।

Leave a Reply