page contents
লাইফস্টাইল, সংস্কৃতি ও বিশ্ব

‘মল্লিকাদি’

উচ্চতাভীতি জিনিসটা কী, সেটা বোঝার আগে থেকেই আমি উচ্চতাভীতিতে আক্রান্ত ছিলাম। ছোটবেলা মই দিয়ে ছাদে উঠতে পারতাম না। হাত পা কাঁপতে কাঁপতে ঠাণ্ডা হয়ে যেত ভয়ে। তখন হাত ধরে আদর করে ছাদে উঠিয়ে দিতেন যিনি, তিনি অবনী আপা; মাঝে মাঝে কোলে করেও উঠিয়ে দিতেন।

আমার দূরসম্পর্কের চাচাতো বোন ছিলেন তিনি, থাকতেন তিরিশ কিমি দূরে স্বামীর বাড়িতে। তবে বছরে কয়েকবার তিনি আমাদের বাড়িতে আসতেন।

আমার শৈশবটা মোটামুটি বাক্সবন্দিই বলা যেত অনায়াসে যদি না সেখানে অবনী আপার অস্তিত্ব থাকত। বাবা শিক্ষক হওয়ার সুবাদে আমাকে তথাকথিত ভাইরাস-ব্যাকটেরিয়ার ভয়ে সন্ত্রস্ত হয়ে ঘরের বাইরের খেলাধুলাকে চিরকালই না বলতে হয়েছে।

bithi-haque-logo

তেমনই শৃঙ্খলিত জীবনে আমার ছোটবেলার একমাত্র খেলার সাথী ছিলেন অবনী আপা, তিনি বয়সে প্রায় মায়ের বয়সী হওয়া সত্ত্বেও আমার সঙ্গে কেন জানি খুব বন্ধু বন্ধু ভাব হয়ে গিয়েছিল।

আমার মেয়েবেলায় প্রথম পুতুল খেলার পুতুলটিও অবনী আপার পুরনো কাপড় দিয়ে বানানো ছিল। সেজ চাচির সেলাইয়ের ঝুড়ি থেকে একটু সুতো চুরি করে এনে চুল বানিয়ে দিয়েছিলেন। আমার ছোট্ট মাথার সবটুকু আবাক হবার ক্ষমতা নিয়ে আমি তার হাতের দিকে তাকিয়েছিলাম। ছাদের ওপর বেল গাছের একটা বড় ডাল ছাদটির বেশির ভাগ দখল করে ছিল। সেই বেল গাছের নুয়ে পড়া ডালকে গাড়ি বানিয়ে পুতুলের বিয়েতে যেতাম। সবই তো মাত্র কটা দিন আগের কথা!

আমার স্কুলের বাকি সময়টা আমি তার সঙ্গে পুতুল খেলেই কাটিয়েছি। আপার দুই ছেলে আর এক মেয়ে। দুই ছেলেই আমার চেয়ে বছর সাত আট-এর বড় হবে।

আপার কাছেই প্রথম শুনেছিলাম ঋ, এ, ঐ, ও, ঔ, খ, গ, ঙ, ঞ, ণ, থ, প, শ এই কয়েকটা অক্ষর ছাড়া বাকিগুলো মাত্রা দিয়ে লিখতে হয়। রাতে আপার পাশে শুয়ে প্রথম মল্লিকাদির গান শুনে বুকের কোথাও চিনচিনে একটা ব্যথা অনুভূত হয়েছিল। গ্রামের এমন প্রাণোচ্ছ্বল একটা মেয়ে কেন ঘোমটা টেনে দাসীদের মত কলস ভরে পানি আনবে সেটাই মানতে পারি নি কখনো।

অবনী আপা বলতেন, “সবই ভাগ্য, বুঝলি!” সেদিন তার জায়গা থেকে তিনি যে ভাগ্যের কথা বলেছিলেন আর আমি যে জায়গা থেকে ভাগ্য বুঝেছিলাম তার ভেতর কতটা ফারাক ছিল তা দুজনের কেউই বুঝি নি। বুঝি নি ভাগ্য আমার আর ওনার মাঝেও একটা দেয়াল তুলে দিতে পারে ।

আমার শৈশব, কৈশোরে যতবার খারাপ সময় এসেছে, ভেবেছি আমার আর কিছু নেই, আমি নিঃশেষে বিভাজ্য! ততবার অবনী আপা আমার জীবনে চেইন্জমেকার হয়ে এসেছেন। এই না বোঝা মানুষগুলোর মাঝখান থেকে আপা আমাকে বুকে জড়িয়ে ধরে বাবা আর মাকে বোঝাতেন, তারা কেন আমাকে বোঝেন না!

কত কষ্ট আমি অবনী আপার আঁচলে মুছেছি, সেসব তার পুরোনো কোন শাড়িতে এখনো তোলা আছে হয়ত। রাতের আধারে এই আঁচলে মুখ গুঁজেই মল্লিকাদির পুরনো টানাপড়েনে কষ্ট পেয়েছি।

দশমীর এক রাতে অবনী আপাকে কয়েকজন মানুষ আমাদের বাড়িতে পৌঁছে দেন। সেই রাতে কেউ না বুঝলেও এখন সবাই জানে সেই থেকেই তিনি পাগল। পাগল অবস্থাতেও মাকে নাকি তিনি প্রায়ই আমার কথা জিজ্ঞেস করেন। তাকে এখন আর কেউই বাড়িতে উঠতে দেন না, কয়েকটা বাড়ি থেকে জিনিসপত্র চুরির গুজবও শুনেছি।

এক ঝড়-বৃষ্টির রাতে, সেজ কাকুর বাড়ির দরজার একটু খানি চালার নিচে একটা চাদর জড়িয়ে সারারাত পড়েছিলেন অবনী আপা। ইদানিং মানুষজনের সামনে কাপড় চোপড় খুলে ফেলেন, বেফাস কথা বলেন বলে কেউ আর তাকে পরিচয়ও দেয় না।

এতটুকুন শুনে আমি চোখ বন্ধ করেও আর জল আটকাতে পারলাম না। শৈশবের দেখা সেই জোয়ান শরীর আর পান খেয়ে লাল করা তরমুজের বিচির মত দাঁত বের করে জোরে শব্দ করে হেসে যাওয়া এই অবনী আপা যে আমার জন্য কী ছিল সেটা কোনোদিন কাউকে বোঝানো যাবে না, বোঝানোর দিনগুলোও হয়তো আর আমার আসবে না।

বাবা, মা, চাচা, চাচি তাকে ছোট সংসারের গলগ্রহ মনে না করে আর কীই বা করবেন! তিনি যে এখন পাগল।

এই তো সেদিন তিনি রাস্তা দিয়ে হেঁটে যাবার সময় জোরে জোরে গলা ছেড়ে গাইছিলেন,

“তোমরা ভুলেই গেছ মল্লিকাদির নাম
সে এখন ঘোমটা পড়া কাজল বধূ দূরের কোন গাঁয়
পথের মাঝে পথ হারালে আর কি পাওয়া যায়’’

আমি খুব পরিচিত একটা চিনচিনে ব্যাথা অনুভব করলাম, একটু জলও এলো এক চোখে। এটা কি শুধু মল্লিকাদির জন্যই! তাই হবে হয়ত, পাগলের জন্য আবার কেউ কাঁদে নাকি?

About Author

বিথী হক

ফ্রিল্যান্স ফটোগ্রাফার এবং স্ক্রিপ্ট রাইটার । আমেরিকান ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি-বাংলাদেশ (এআইইউবি) এর প্রিন্ট এন্ড ইলেক্ট্রনিক জার্নালিজম বিভাগ থেকে অনার্স শেষ করে এখনো কোথাও থিতু হইনি । অনলাইন পোর্টাল এটিএন টাইমস এবং ইনডিপেনডেন্ট টিভিতে কাজ করেছি । বেড়ে ওঠা রাজশাহী শহর এবং মফস্বল এলাকা মিলিয়ে ।