page contents
Breaking News

মহাভারতে এক রাত্রি…

ছোটকালে শুনতাম যাগর পায়ে তিল থাকে তারা বিদেশ যান। আমার যমজ বইনের পায়ের একটা আঙুলের তলায় তিল ছিল, আমার পায়ে বহুত খুইজাও কোনো তিল দূরের কথা একটু গাঢ় রঙের চামড়াও পাই নাই। বড় হইতে হইতে এই সকল হাস্যকর হিসাব নিকাশের ব্যাপারে আমার সকল বিশ্বাস উইড়া গেছিল, প্রতিদিন ডিম ভাজি দিয়া রুটি খায়া পরীক্ষা দিতে গিয়াও ক্লাসে ফার্স্ট সেকেন্ড হইছি, কিন্তু বয়স তিরিশ পার হইয়া গেলেও যখন দেশের সীমানার বাইরে পাও রাখতে পারি নাই তখন তিলের ব্যাপারটা মাঝে মইধ্যে মনে পড়ছে।

আমি চাকরি শুরু করছিলাম বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রভাষক হিসাবে, ইউজিসির বিধি মোতাবেক এই পদের বেইসিক স্যালারি ছিল ১১,৯৮০ টাকা। এই বেতনে যার সংসার চালাইতে হয় তার জন্য বিদেশ যাত্রা ত দূরের কথা, কক্স’স বাজার বা সেইন্ট মার্টিন্স গিয়া তিন রাইত হোটেলে কাটায়া আসতে চাইলেও বহুত হিসাব নিকাশ করা লাগে।

আমার অনেক বন্ধুরা অবশ্য তত বিত্তবান না হইয়াও বিদেশ ভ্রমণ করছেন, যেমন আমার জিগরি দোস্ত দোলা। সে ছাত্রজীবনেই ইন্ডিয়া, মিশর এমনকি বিলাত থাইকাও ঘুইরা আসছে ঢাকা থিয়েটারের কর্মী হিসাবে। অনেকে স্কলারশিপে পড়ালেখা করতে বা কোনো কোর্স করতে গেছে, যেমন হুমায়রা থাইল্যান্ড গেছে, ইন্ডিয়া গেছে।

আমার বইন মুমু নেপাল গেছিল তার ম্যাস কমিউনিকেইশন অ্যান্ড জার্নালিজমের বন্ধুদের সঙ্গে স্টাডি ট্যুরে। আমি স্কলারশিপ বলতে পাইছিলাম ক্লাস ফাইভের ট্যালেন্টপুলের বৃত্তি আর ক্লাস এইটের সাধারণ বৃত্তি, এর পরে আর যোগ্যতা হয় নাই, সামর্থ্যও না।

তাই বন্ধুদের নেপাল গিয়া বাংগি জাম্পিঙের, বিলাত গিয়া মাদাম ত্যুসোর মিউজিয়ামে শাহ রুখ খান বা বারাক ওবামার ডামি জড়ায়া ধরার, ফ্রান্স গিয়া আইফেল টাওয়ারের সামনে খাড়ানের কিংবা ইন্ডিয়া গিয়া তাজমহলের সামনের বেঞ্চে বসনের ছবিতে ‘লাইক’ দিয়া দিয়া আমার দিন কাটতেছিল।

আমি খাঁটি ট্যুরিস্টের মতন একটা ক্রস বডি ব্যাগ আর কান্ধে ক্যামেরা ঝুলায়া জিন্স আর দৌড়ানের উপযোগী জুতা পিন্দা গেছিলাম

অবশেষে আমার যমজ বইন মুমুর সঙ্গে শিলং গেলাম, প্রভুকে তার স্কুলে দিয়া আমরা গৌহাটি যাব এমন প্ল্যান। গৌহাটি ইউনিভার্সিটিতে মুমুর এক বন্ধু পিএইচডি করতেছেন, সেইখানে গিয়া শহরটা আর ভার্সিটিটা দেইখা আসব।

আমি, মুমু আর প্রভু মমেনসিং থাইকা সিলেট গেলাম। রাইত আটটায় রওয়ানা কইরা পৌঁছাইলাম ভোর ছয়টায়। সেইখানে যেই সিএনজি চালকের আমাদেরে নিয়া তামাবিল যাওনের কথা সেই নাম মোজোর ভাই (প্রভু গবেষনা কইরা বাইর করল সম্ভবত উনি মোজো খান অনেক, নয়ত উনার ভাইয়ের নাম মোজো) আসলেন দেরি কইরা। তাইতে আমাদের বেশ খানিকটা সময় হুমায়ুন রশীদ চত্বরে বইসা থাইকা নষ্ট হইয়া গেল। তামাবিল যাইতে যাইতে পাহাড় দেখতে পাইলাম, নীল পাহাড়ের ঢেউ।

বর্ডারে গিয়া আমার একটু একটু নার্ভাস লাগতেছিল। পোলাপান রাইখা যাওয়াতে বেশ মন খারাপও লাগতেছিল। ওদেরে নিয়া যাওনের উপায় আছিল না, ওরা এত লম্বা জার্নি করতে পারত না, আর ফ্লাইটে নেওনের সামর্থ্য আমার নাই। কিন্তু বাচ্চারা কি আর অত লজিক বোঝে? ওরা খালি দেখে মা একা একা যাইতেছে।

আমার যমজ মুমু, আশু পালের কথায় ওয়াচ পয়েন্টে না দাঁড়াইয়া আমরা সাধারণ একটা রেইলিঙের সামনে ছবি তুলছিলাম।

বাস স্ট্যান্ড হোক বা পাসপোর্ট অফিস, ট্যাক্স অফিস বা হাসপাতাল—আপনি সব জায়গায় এমন কিছু মানুষ পাইবেন যারা সর্বজ্ঞ—সংশ্লিষ্ট লাইনে যার প্রচুর অভিজ্ঞতা আছে। আমরাও বর্ডারে এমন এক মহিলারে পাইলাম যিনি হরদম ইন্ডিয়া যান, এইবার গৌহাটি যাইতেছেন ব্যবসার কাজে। উনি যেই সিরিয়াসনেস নিয়া আরেক দম্পতির কাগজপত্র চেক করতেছিলেন তাতে আমার মনে হইছে সেইখানের অফিসার উনিই।

আমাদের চেকিং হইয়া গেলে হাঁইটা বর্ডার পার হইলাম, ইন্ডিয়ান কাস্টমস অফিসে গিয়াও উনার লগে আবার দেখা। অভিজ্ঞতা আছে বইলা উনি জানেন কোথায় কাকে কী পরিমাণ টাকা দিতে হয়। আমরা তখন পর্যন্ত কাউকে কোনো টাকা দেই নাই। কেউ আমাদের কাছে চায়ও নাই। তখন আলাপে জানতে পাইলাম যে শুধু ইন্ডিয়া না, উনি বিজনেসের কাজে আরো বিভিন্ন জায়গায় গেছেন, উনার সবচাইতে অসুবিধা হইছে চীনে গিয়া, সেইখানে কেউ ইংরেজি বোঝে না, ইশারা ইঙ্গিতে কথা কইলেও বোঝে না।

ডাওকি বর্ডারে আমি আর প্রভু—মুমুর মোবাইলে তোলা ছবি

ইন্ডিয়াতে ভাষাগত কোনো ঝামেলা নাই, ডাওকি বর্ডার থাইকা শিলং পর্যন্ত আমাদেরে নিয়া গেলেন যে ট্যাক্সি ড্রাইভার উনার নাম আশু পাল, উনি জাতিতে মণিপুরী, বাড়ি আসামে, বাংলা বলেন পরিষ্কার। ডাওকি থাইকা চাইলে গৌহাটি পর্যন্ত ট্যাক্সি ভাড়া করা যায়। শেয়ারে নেওয়া যায়, রিজার্ভও যাওয়া যায়। লোক কম হইলে শেয়ারে যাওয়া ভাল, বেশি হইলে রিজার্ভের খরচ পোষায় যায়।

আশুপালের ট্যাক্সিতে মুমু আর প্রভু

শিলং যাইবার পথে ক্লান্তিতে আমার চোখে আঠা লাইগা আসতেছিল, টম অ্যান্ড জেরি কার্টুনের টমের মতন চোখের দুই পাতায় কাঠি দিয়া খুইলা রাখার চেষ্টা করা যায় কিনা তাই ভাবতেছিলাম। যেহেতু আমি আগে কোনোদিনও এমন পাহাড়ি এলাকায় যাই নাই, পাহাড় বলতে দেখছি খালি সুসং দুর্গাপুরের মাটির পাহাড় আর ধোবাউড়ার উঁচু ভূমি,মেঘালয়ের পাথরের পাহাড় কাইটা বানানো রাস্তা দিয়া যাইতে যাইতে আমার অবস্থা হইল কুবেরের মতন, “মৃদু আলোতে তার চোখ ঝলসাইয়া যায়, চোখ ঝলসানো আলোতে সে হয় অন্ধ।”

শিলং যাবার পথে ট্যাক্সি থামায়া ট্যুরিস্টসুলভ পোজ দিলাম।

মুমু কইল, “তোমার ভাগ্য ভাল, আমি আগে যতবার আসছি, সব মেঘ আর কুয়াশায় ঢাকা ছিল, এই দৃশ্য আমিও আগে দেখি নাই।” বইলাই ঘুমায়া গেল। শিলং পৌঁছাইয়া বুঝলাম আমাদের ভাগ্য অতটা প্রসন্ন না, কেননা আমাদের কোনো থাকার জায়গা নাই।

মুমু আগের বার পৌঁছাইয়া বাবা লজ নামের রেস্ট হাউজ, এমনকি ভাল হোটেলেও জায়গা পাইছে, আগে থাইকা বুকিং না দিয়াই। কিন্তু এইবার শিলং ওভারক্রাউডেড, কেননা দার্জিলিঙের সকল ট্যুরিস্ট শিলং চইলা আসছে, সেইখানে গণ্ডগোল, মমতা দিদি বাংলারে বাধ্যতামূলক করাতে সেইখানের পাহাড়িরা বিক্ষোভ করতেছেন। আমরা কোনো থাকার জায়গা পাইতেছিলাম না, অবশেষে ড্রাইভারই একটা অফিসের অতিথি ভবনে আমাদেরে এক রাত থাকার ব্যবস্থা কইরা দিলেন।

গেস্ট হাউজটা আসলেই একটা হাউজ, সামনে উঠানওয়ালা বাড়ি। বেডরুম, লিভিং রুম, ডাইনিং রুম, কিচেন সব আছে, একটা চার সদস্যের মধ্যবিত্ত পরিবারের থাকার মতন। বাথরুমে আছে গিজার। কোনো ঘরেই কোনো সিলিং ফ্যান নাই। বাড়ির মাঝখানে আছে ফায়ার প্লেইস, কয়েকটা ঘর থাইকাই সেখানে লাকড়ি দেওয়া যাবে। শীতের দেশের বাড়ি এই রকমই হইবার কথা। জানলা খুললে আরেকটা বাড়ি দেখা যায় যেইটা অনেক নিচুতে, যদিও আমরাও একতলাতেই ছিলাম। জানালা দিয়া সেই বাড়ির কাঠের বারান্দা দেখা যাইতেছিল।

গেস্ট হাউজের জানালা দিয়া শিলং শহর

আমরা কোনো রকমে চেইঞ্জ কইরাই বাইর হইলাম, খাইতে আর ডলার ভাঙাইতে। সেই দিন শনিবার, পরের দিন সেইখানে সব বন্ধ থাকবে। ‘লামি’ নামে একটা রেস্টুরেন্টে প্রভু আমাদের নিয়া গেল। সেইখানে তিনজনের পছন্দে তিন রকম খাবার নিয়া একটা একটা হ-য-ব-র-ল লাঞ্চ সারলাম আমরা। বিল অনেক বেশি আসবে ভাবছিলাম, কিন্তু হিসাব কইরা দেখলাম তেমন একটা বেশি আসে নাই। ঢাকার, এমনকি মমেনসিঙের কোনো ভাল রেস্টুরেন্টে তিন চাইর জন ভরপেট খাইলে এমন বিলই আসে। খাবার আমরা শেষ করতে পারি নাই, উদ্বৃত্তটুক পার্সেল কইরা নিয়া নিছিলাম।

লিভিংরুমের এই ছবিটা প্রভু তুলছে আমার ক্যামেরা দিয়া

খাওয়া সাইরা আমরা গেলাম পুলিশ বাজার। সেইখানে প্রভুর ইশকুলের ইউনিফর্ম কিনতে পাওয়া গেল, মুমু একটা ইন্ডিয়ান সিম কিনল যেইটাতে বাংলাদেশ প্যাকেজ আছে। সিম যে দোকান থাইকা কিনল সেইটা একটা জগাখিচুড়ি দোকান, মোবাইল ফোন পাওয়া যায় আবার মিটসেফ চেয়ার টেবিলও আছে। সেই দোকানের সামনে আরএফএলের প্লাস্টিকের বক্সের মতন দেখতে চেস্ট অফ ড্রয়ার পাওয়া যায়।

ছোটবেলা থাইকা দেইখা আসতেছি বাংলাদেশের মানুষ ইন্ডিয়ান জিনিস কিনতে পাগল, জনপ্রিয় চিত্রনায়িকাদেরে দিয়া বিজ্ঞাপন করলেও জনি প্রিন্ট শাড়ি আর সুন্দরী প্রিন্ট শাড়ি আমাদের মা-খালারা পরতেন না, বাসায় পরার জন্য স্মাগলিং হইয়া আসা ইন্ডিয়ান শাড়ি কিনতেন। আমরা হাই ইশকুলে উঠতে উঠতে ইন্ডিয়ান পণ্যে বাজার সয়লাব হইয়া গেল, জুঁই হেয়ারকেয়ার অয়েলের বদলে কেয়োকার্পিন আর ডাবরভাটিকা তেল মাখানো শুরু করলেন কেশবতী মেয়েরা। এইসব প্রবণতার পিছনে পণ্যের মানের চাইতে বেশি দায়ী সম্ভবত স্যাটেলাইট চ্যানেলের প্রভাব।

শিলঙে প্রচুর মানুষ বাংলা জানেন, এমনকী মন্দিরের গায়েও বাংলা লেখা

ইন্ডিয়ায় দাঁড়াইয়া তাদের মার্কেটে বাংলাদেশের জিনিস বিক্রি হইতে দেইখা আমি তাই বিস্মিত হইলাম, কিছুটা গর্বিতও হইলাম। অ্যারোমেটিক নামে এক হালাল সাবান বিলুপ্ত হইয়া গেল, শুনতে পাইছি সেই কোম্পানিরে কিন্যা নিছে আরেক কোম্পানি যারা বহুজাতিক হইয়া ইন্ডিয়ান ব্র্যান্ডের জিনিস বাংলাদেশে বানায়া বিক্রি করে। লাভের গুড় সম্ভবত ব্র্যান্ডের মালিক কোম্পানিই খায়। যে চকলেট বারের দাম লেখা থাকে ১০০ রুপি বাংলাদেশে সেইটা ২৫০ টাকা দিয়া কিনতে হয়, বাড়তি ১০০ টাকা কে কে পায় সেইটাও আমি ঠিক জানি না।

আমি বিজনেসের ছাত্র ছিলাম না জীবনেও। অর্থনীতির জ্ঞান নাই বললেই চলে। এই সকল হিসাব আমি ধরতে পারি না তেমন। কিন্তু নারিকেল তেল চাইলে আজকাল কোনো দোকানে লালবাগের হাঁস মার্কা আগায়া দেয় না কেউ, দেয় প্যারাশুট, এই ব্যাপারটা আমারে প্যারা দেয় ব্যাপক।

এই গলিটার মাথায় মসজিদ, আর ভেতরের দিকে মন্দির। শহরের মাঝখানে একটা ইউরোপিয়ান চেহারার গির্জাও দেখছিলাম, ট্যাক্সিতে থাকার কারণে ছবি তুলতে পারিনাই। শহরটা সত্যিকার অর্থেই কসমোপলিটান। মেঘালয়ের ঐতিহ্যবাহী পোশাকে পিঠে বাচ্চা বাইন্ধা ঘুরতেও দেখলাম অনেক মহিলাকে।

ছোটবেলা থাইকা আমরা ইন্ডিয়ার বইপত্র প্রচুর পড়ছি। যদিও শুধু বাংলাভাষার বইই পড়ছি, ইন্ডিয়াতে আরো শ খানেক ভাষা আছে, সেই সকল ভাষার সাহিত্য সম্পর্কে আমাদের জ্ঞান অত হয় নাই। কিন্তু শুধু কলিকাতার সাহিত্য পইড়াই ভারত দেশটা যে কত বড় সেই ধারণা খানিকটা পাওয়া যায়।

বাণী বসু আমার একজন পছন্দের লেখক, উনার লেখার প্লট মোটামুটি সারা ভারতে ছড়ায়া থাকে, পশ্চিমবঙ্গে হইলেও সেগুলাতে অবাঙালি চরিত্ররা থাকে। কিন্তু শিলং গিয়া ইনাদের কারো লেখার কথা আমার মনে পড়ে নাই, টিপিক্যাল বাঙালির মতন রবীন্দ্রনাথের শেষের কবিতার কথাই মনে পড়ছে। শিলং শহরে একটা পার্কের বাইরে লেখা দেখছি, ‘রডোডেন্ড্রন ট্রেক’, সেইটা দেইখাই মনে হইছে রডোডেন্ড্রন নামে যে একটা উদ্ভিদ আছে সেইটা আমি প্রথম জানতে পাইছিলাম শেষের কবিতা পইড়া, তখন আমি পড়ি ক্লাস সেভেনে। তবে গাছটা দেখতে কেমন তা জানি না।

এই গাছ ঝাউ নামে চিনতাম, আমার জানা ঠিক হইয়া থাকলে শিলংরে অনায়াসে ঝাউয়ের শহর নাম দেওয়া যায়

শিলঙে প্রচুর ঝাউ জাতীয় গাছও দেখলাম, সেইগুলা ঝাউ না হইয়া পাইনও হইতে পারে। শীতপ্রধান অঞ্চলে পাইন জন্মানের সম্ভাবনাই বেশি। পাহাড়ের উপরে লম্বা লম্বা গাছের বন দেইখা মনে হইছে সেইগুলা সম্ভবত পাইনের বন হইতে পারে। দেইখা আমার ‘হোয়্যার ডিড ইউ স্লীপ লাস্টনাইট’ গানটার কথা মনে হইছে। গানটা অনেকেই গাইছেন, সেইটা একটা আমেরিকান লোকসংগীত, কে লিখছে জানা নাই, কিন্তু আমি খালি কূর্ট কোবেইনের ভার্সনটাই শুনছি। গানটার কথা যেইটুক মনে আছে আমি মুমুরে গায়া শুনাইলাম:

“মাই গার্ল, মাই গার্ল, ডোন্ট লাই টু মি
টেল মি হোয়্যার ডিড ইউ স্লিপ লাস্ট নাইট
ইন দ্য পাইনস, ইন দ্য পাইনস
হোয়্যার দ্য সান ডোন্ট এভার শাইন
আই উড শিভার দ্য হোল নাইট থ্রু”

শুইনাই মুমু বললো, “কী রকম পজেসিভ!” গানের বাকি কথা আমার মনে আছিল না, তবে এইটুক মনে আছে মেয়েটার স্বামীর মাথা ট্রেইনের চাক্কার তলে পাওয়া গেছে কিন্তু শরীর পাওয়া যায় নাই এইরকম তথ্য আছিল। গানটা আমেরিকার ব্ল্যাক গায়ক লিড বেলি অনেক আগে গাইছিলেন, অনুমান করা যায় যে শ্রমজীবি কালো মানুষ, যারা খনিতে কাজ করতেন তাদের জীবনের কথা আইসা থাকতে পারে। গানটার একটা ভার্সনে ‘মাই গার্ল’-এর জাগায় ‘ব্ল্যাক গার্ল’ বলে।

সীমানার ওই পাড় থাইকা দেখা যাইতেছে সিলেট

লাঞ্চ আর শপিং সাইরা প্রভূকে নিয়া আমরা একটা পার্কে গেলাম, বিশাল বড় একটা কৃত্রিম লেইক আছে সেখানে, রোয়িং করা যায়। আমরা অনেকখানি হাঁইটা সেই পার্কে ঢোকার গেইট পাইলাম,পার্কের হাঁটু সমান দেওয়ালের উপরে বিরাট লম্বা লোহার রড লাগানো বাউন্ড্রি, হাঁটতে হাঁটতে দেখতে পাইতেছি পার্কের ভিতরটা, কিন্তু ঢুকতে পারলাম প্রায় মিনিট বিশেক পরে।
শিলং পাহাড়ি শহর বইলা সেইখানে রিকশা চলার কোনো উপায় নাই। পাবলিক বাস আর ট্যাক্সিই ট্যুরিস্টদের ভরসা, লোকাল ছেলেমেয়েরা স্কুটি বা মটরসাইকেল চালায়। ট্যাক্সির ভাড়াও প্রচূর। যে কোনো দূরত্বে দুইশ টাকা হাঁকাইতেছিল। সম্ভবত পর্যটকের সংখ্যা বেশি হওয়াতে উনারা এই সুযোগটা নিতেছিলেন, বছরের বাকি সময়ে উনাদের বিজনেস তেমন হয় না।

শিলঙের সঙ্গে আমাদের ভৌগোলিক দূরত্ব যতটা, সাংস্কৃতিক দূরত্ব তার চাইতে হাজার গুণ বেশি মনে হইল। মেয়েরা যেমন হাঁটুর তিন ইঞ্চি উপরে স্কার্ট পিন্দা রাস্তায় হাঁটতেছে তেমন আমাদের দেশে কখনো সম্ভব হবে বইলা মনে হয় না।
ঢাকায় কিছু মেয়ে হাতকাটা জামা ব্লাউজ পরেন, কিন্তু সেইটা অল্প কিছু জায়গায়, সবখানে না। পাবলিক প্লেসে আড্ডা দেওয়া বা পাবলিক ট্রান্সপোর্টে চলা মেয়েদের জামাকাপড় নিয়া বেশ সচেতন থাকতে হয় আমাদের দেশে।

পার্ক থাইকা বাইর হইয়া আরো কিছু জিনিসপত্র কিন্যা আমরা যখন গেস্ট হাউজে ফিরা যাব, তখন কোন এলাকায় যাব তা ট্যাক্সি ড্রাইভারকে বোঝাইতে বেগ পাইতে হইল। ছেলেটা লোকাল, ইংরেজিতে না জিগায়া হে হিন্দীতে আমাদেরে জিগাইল, “কাহাঁ যায়োগে?” আমি লোকেশন বইলা রাস্তার কোন দিকে নামবো সেইটা বলতে গিয়া আটকায়া গেলাম, “উস অফিসকে পিছেকি গলিকা সামনে” বইলা আর বলতে পারি না, তিরিশ সেকেন্ড পরে বললাম, “লে যাও।”
আমার হিন্দীর দৌড় দেইখা মুমু আর প্রভু না হাইসা পারল না। আমি কইলাম, “জীবনে প্রথম একটা হিন্দী বাক্য বললাম, তোমাদের তো আমারে কংগ্র্যাচুলেট করা উচিৎ”। মা-বেটা সমস্বরে বলল, “কংগ্র্যাচুলেশনস।”

এইরকম একটা একলা বাড়িতে থাকতে কেমন লাগে কে জানে… আমাদের মতন জনবহুল সমতলে থাকা মানুষেরা সেইটা কীভাবেই বা অনুমান করবে?

পরের দিন থাকার জায়গার অভাবে শিলং ছাড়তে হইল আমাদের, আর ইশকুলে দেওয়ার সময় প্রভুর কান্না দেইখা মন খারাপ হইয়া যাওয়াতে গৌহাটি যাইবার প্ল্যানও বাতিল করলাম।
দুপুরের খাবারের সময় হওনের আগেই আমরা ডাওকির উদ্দেশ্যে রওনা দিলাম। সিলেট পৌঁছাইলাম সন্ধ্যার দিকে আর মমেনসিং পৌঁছাইলাম পরদিন ভোরে।

বিরাট দেশ ইন্ডিয়ার একটা প্রদেশের একটা শহরে একটা রাত্রি যাপন কইরা আমার বিদেশ যাইতে না পারার আফসোস ঘুচল।

কমেন্ট করুন

মন্তব্য

About Author

উম্মে ফারহানা
উম্মে ফারহানা

জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক। ইংরেজি সাহিত্য পড়ান। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়েছেন ২০০৩ থেকে ২০০৯ পর্যন্ত। জন্ম ময়মনসিংহ শহরে, ৬ অক্টোবর ১৯৮২। প্রকাশিত গল্পগ্রস্থ: দীপাবলি। shahitya.com-এ ধারাবাহিক উপন্যাস লিখছেন: লৌহিত্যের ধারে।

Leave a Reply