বিকাল হতেই টেরি জো কেবিনে গিয়ে শুয়ে পড়ল। কিন্তু সন্ধ্যার দিকে ছোট ভাইয়ের কান্না আর চিৎকারের শব্দে ঘুম ভেঙে যায় তার।

১৯৬১ সালে বাহামাস দ্বীপপুঞ্জ দিয়ে যাওয়ার সময় একটা মালবাহী জাহাজের কিছু কর্মী সাগরের পানিতে অবিশ্বাস্য এক দৃশ্য দেখে। ছোট একটা বয়ার উপর ভেসে আছে একটি বাচ্চা মেয়ে। এখন প্রশ্ন হলো—টেরি জো ডুপেরো নামের সেই ১১ বছরের মেয়ে ঠিক কীভাবে আটলান্টিক মহাসাগরের মাঝখানে সম্পূর্ণ একা হারিয়ে গেল?

তার সেই গল্প একই সাথে আপনাকে আশ্চর্য ও বাকরুদ্ধ করে দিবে।

ডুপেরো পরিবারের ছোট মেয়ে টেরি জো’র কাছে পৃথিবীর এই কোণে বেড়াতে আসা ছিল তার জীবনের সবচাইতে অবিস্মরণীয় ঘটনা। তার বাবা আর্থার ডুপেরো—৪১ বছর বয়সী উইসকনসিনের এক চোখের ডাক্তার এবং তার মা—৩৮ বছর বয়সী জীন ডুপেরো এই সফরের জন্য বেশ কয়েকদিন ধরেই টাকা জমাচ্ছিলেন।

তাদের তিন সন্তান—ব্রায়ান (১৪), টেরি জো (১১) ও রেনে (৭)—সহ তারা ফ্লোরিডা থেকে সাত দিনের সফরে রওনা দেন বাহামাস দ্বীপপুঞ্জে। ‘ব্লুবেল’ নামের ৬০ ফুট লম্বা দুই মাস্তুলের এক জাহাজে করে তাদের যাত্রা শুরু হয়।

১৯৬১ সালের ৮ নভেম্বর জাহাজটি নিরাপদেই ঘাট ত্যাগ করে। জুলিয়ান হার্ভি নামের এক ভদ্রলোক ছিলেন জাহাজের ক্যাপ্টেন। সাথে ছিলেন তার স্ত্রী ম্যারি ডীন।

যাত্রার প্রথম চারদিন সবকিছু ঠিকঠাক ভাবেই চলল।

শান্ত সেই দিনগুলিতে পূর্বের ছোট ছোট দ্বীপ বিমিনি’র দিকে যেতে থাকে ব্লুবেল জাহাজ। গ্রেট আবাকো’র স্যান্ডি পয়েন্ট এলাকায় পৌঁছে বেশ কিছুক্ষণ সাঁতার কাটেন সবাই। চমৎকার চকমকে বালুতে শামুক কুড়িয়ে এনে জমা করতে থাকেন একে একে।

দ্বীপে থাকার সময় ফুরিয়ে এলে স্যান্ডি পয়েন্ট গ্রামের কমিশনার রডেরিক পিন্ডারের সাথে কথা হয় আর্থার ডুপেরো’র। ডুপেরো বেশ স্বাভাবিক ভঙ্গিমায় তাকে বলেন, “এইরকম ছুটি আমাদের জীবনে আর কখনো আসবে না। ক্রিসমাসের আগেই আমরা বাড়ি চলে যাব।”

পরিবারের সাথে টেরি জো (বাবার কাঁধে)।

অবশ্য ডুপেরো তখনও জানতে পারেন নি যে, তার সেই ভবিষ্যদ্বাণী আর সত্য হবে না।

নভেম্বরের ১২ তারিখ। জাহাজ ফিরতি পথে। ফিরে আসতে তখনো পুরো একদিনের যাত্রা বাকি। বিকাল হতেই টেরি জো কেবিনে গিয়ে শুয়ে পড়ল। কিন্তু সন্ধ্যার দিকে ছোট ভাইয়ের কান্না আর চিৎকারের শব্দে ঘুম ভেঙে যায় তার।

“আমার ভাই চিৎকার করে ডাকছিল, ‘বাবা, বাঁচাও! বাঁচাও”‘, টেরি জো—যার বর্তমান নাম টেরি ডুপেরো ফ্যাসবেন্ডার—প্রায় ৫০ বছর পর ফক্স নিউজকে বলেন, “সেই চিৎকার শুনেই আমি বুঝতে পারছিলাম খুবই ভয়ঙ্কর কিছু একটা ঘটছে।”

হাসপাতালে টেরি জো।

আসলে ৪৪ বছর বয়সী প্রাক্তন মিলিটারি পাইলট ক্যাপ্টেন হার্ভি ওইদিন রাতে তার স্ত্রীকে খুন করার সিদ্ধান্ত নেন। কিন্তু মাত্র চার মাস আগে বিয়ে করা স্ত্রীকে খুন করার কারণটা ঠিক কী ছিল?

পরবর্তীতে জানা যায়, স্ত্রী ম্যারির নামে কিছুদিন আগেই জীবনবীমা করিয়ে নিয়েছিলেন হার্ভি। তাই তার পরিকল্পনা ছিল—ম্যারিকে খুন করে সাগরে ফেলে দিয়ে তাকে নিখোঁজ দাবি করবেন তিনি।

তবে আশ্চর্যের ব্যাপার—কোনো দুর্ঘটনায় স্ত্রী হারানোর ঘটনা হার্ভির জীবনে সেটাই প্রথমবারের মতো না। তার আগের ৫ স্ত্রীর একজন সড়ক দুর্ঘটনায় মারা গিয়েছিলেন। সেবার নাকি প্রায় অলৌকিকভাবে বেঁচে যান হার্ভি। তাছাড়া তার ইয়ট ও একটা মোটরবোট ডুবে যাওয়ায় বীমা কোম্পানির কাছ থেকে এর আগেও তিনি বেশ মোটা অঙ্কের টাকা পেয়েছিলেন।

কিন্তু এবার তার পরিকল্পনা ঠিকমতো এগোয় নি। ডুপেরো সাহেব ম্যারিকে খুন হতে দেখে ফেলেন। পরে তাকে বাঁচাতে গিয়ে ডুপেরো নিজেই মারা পড়েন হার্ভির হাতে। তার এই অপকর্মের কোনো সাক্ষী রাখতে চান নাই হার্ভি। একে একে ডুপেরো পরিবারের বাকি সবাইকেই মেরে ফেলেন তিনি। বাদ রইল শুধু কেবিনের ভেতর ঘুমিয়ে থাকা টেরি জো।

কয়েক মিনিট পর রুম থেকে বেরিয়ে এসে নিজের মা ও ভাইকে মেঝেতে রক্তের ধারার উপর পড়ে থাকতে দেখে টেরি। এরপর চলে যায় উপরের ডেকে ক্যাপ্টেনের কাছে, কী হয়েছে জানার জন্য।

কিন্তু ক্যাপ্টেন হার্ভি তাকে ধাক্কা দিয়ে নিচের ডেকে ফেলে দেন। আতঙ্কিত টেরি নিজের কেবিনে ফিরে যায়। পরে জাহাজের ভেতর পানি ঢোকা শুরু করলে সে কেবিনের ভেতর থেকে ডেকে বেরিয়ে আসে আবার।

জাহাজের সবগুলি ভালভ খুলে দিয়েছিলেন হার্ভি। জাহাজটি ডুবিয়ে দিয়ে নিজে ডিঙি করে পালাতে চেয়েছিলেন। সেই ডিঙির সাথে বাঁধা একটা দড়ি টেরি জো’র হাতে দিয়ে আবার ভেতরে চলে যান তিনি।

টেরি জো’র বন্ধু রিচার্ড লোগান পরবর্তীতে টুডে ম্যাগাজিন’কে বলেন, “আসলে হার্ভি নিশ্চয়ই টেরি জো’কেও মেরে ফেলতে চেয়েছিলেন। টেরিকে দেখে হয়ত তার মনে হয়েছিল, ‘ও গড! এই মেয়ে যদি বেঁচে যায় তাহলে তো সে সত্যি ঘটনা সবাইকে বলে দিবে!’ তাই ওর হাতে দড়িটা দিয়ে তিনি ভেতরে গিয়েছিলেন ছুরি বা অন্য কোনো অস্ত্র আনতে। কিন্তু টেরি জো দড়িটা ছেড়ে দেন।”

উদ্ধারকারী জাহাজকর্মীর তোলা সেই ছবি।

টেরি জো দড়িটা ফেলে দেওয়ায় হার্ভি তড়িঘড়ি করে সমুদ্রে লাফ দেন। এরপর ডিঙির উপর উঠে বসেন। এদিকে ডুবন্ত জাহাজে একাই থেকে যায় টেরি জো। কিন্তু ১১ বছরের সদ্য অনাথ এই মেয়েটি সহজে হাল ছেড়ে দেয় নি।

ছোট একটা বয়া খুলে নিয়ে সেটার উপর চড়ে সাগরে ভেসেছিল সে। এদিকে তার চোখের সামনেই ডুবে যায় ব্লুবেল জাহাজ। পাতলা একটা জামা ও প্যান্ট পরে থাকায় নিজেকে প্রকৃতির দয়ার উপর ছেড়ে দেওয়া ছাড়া আর কোনো উপায় ছিল না তার। রাতের বেলা যেমন হাড়-কাঁপানো শীত প্রচণ্ড যন্ত্রণা দিচ্ছিল, দিনের বেলা তেমনি সূর্যের প্রবল রোদ পুড়িয়ে দিচ্ছিল তার শরীর।

এ রকম অবস্থায় ভাগ্যক্রমে কোনো জাহাজ বা নৌকার সন্ধান পাওয়ার সম্ভাবনা ছিল খুবই ক্ষীণ। একদিন ছোট একটা প্লেন উড়ে যেতে দেখে আশান্বিত হয় সে। কিন্তু পাইলটরা তাকে লক্ষ না করেই চলে যান।

রুক্ষ এই প্রকৃতির কবলে পড়ে হ্যালুসিনেশন হওয়া শুরু হয় তার। এক পর্যায়ে তার মনে হয়, সামনে সে একটা দ্বীপ দেখতে পাচ্ছে। অথচ ওটার দিকে এগোতেই অদৃশ্য হয়ে যায় সেই দ্বীপ।

কিন্তু তখনো সবকিছু শেষ হয়ে যায় নাই। ‘ক্যাপ্টেন থিও’ নামের একটা মালবাহী জাহাজ বাহামাসের ভেতর দিয়েই যাচ্ছিল। তারা টেরি জো’কে দেখতে পায়। প্রায় অর্ধমৃত টেরি জো’র গায়ে তখন ১০৫ ডিগ্রি জ্বর। সূর্যের তাপে গা পুড়ে গেছে, সেই সাথে ডিহাইড্রেশন। জাহাজের একজন কর্মী তার মধ্য সাগরে ভেসে থাকা ছোট রুগ্ন দেহের একটা ছবি তুলে রাখেন।

বাচ্চা এই মেয়েকে উদ্ধারের ঘটনা পরে বিশ্বজুড়ে খবর হয়ে ছড়িয়ে পড়ে।

হাসপাতালে টেরি জো।

এর তিন দিন আগে, ব্লুবেলের ডিঙিতে চড়ে আসা হার্ভি ও তার মৃত স্ত্রীর সন্ধান পায় কোস্টগার্ড। হার্ভি বলেন, আকস্মিক ঝড়ের কবলে পড়ে আগুন লেগে তার জাহাজ ডুবে যায়। তিনি আরো জানান, টেরি জো’কে পানিতে দেখতে পেয়ে বাঁচানোরও চেষ্টা করেছিলেন তিনি, কিন্তু পারেন নি।

পরে যখন তিনি জানতে পারেন টেরি জো’কে জীবিত উদ্ধার করা হয়েছে—লাঞ্ছিত হবার ভয়ে হার্ভি আত্মহত্যা করেন। তার হোটেল রুমের বাথরুমে দরজার পেছনে তার লাশ খুঁজে পায় পুলিশ।

এদিকে মায়ামির এক হাসপাতালের চিকিৎসায় তার দুরবস্থা থেকে ধীরে ধীরে সেরে ওঠে টেরি জো। তাকে উদ্ধার করার প্রায় সাত দিন পর তার সাথে প্রথম কথা বলার সুযোগ পায় পুলিশ। তখনই ওই ভয়ঙ্কর রাতের ঘটনা বর্ণনা করে টেরি।

উইসকনসিনের ফোর্ট হাওয়ার্ড মেমোরিয়াল পার্কে ডুপেরো পরিবারের সৌজন্যে একটি স্মৃতিসৌধ নির্মাণ করা হয়। যার ফলকে লেখা ছিল, “নভেম্বর ১২, ১৯৬১ তারিখে বাহামাস দ্বীপে হারিয়ে যাওয়া আর্থার ডুপেরো ও তার পরিবারের স্মরণে। তাদের প্রিয়জনদের হৃদয়ে খুঁজে পাওয়া যাবে তাদের। সৌভাগ্যবান তারা যাদের অন্তর খাঁটি, কারণ তারাই ঈশ্বরের সন্ধান পাবে।”

এদিকে টেরি জো’র জীবন আর থেমে থাকে নি। হাসপাতাল থেকে ছাড়া পেয়ে উইসকনসিনের গ্রীন বে’তে চলে যায় সে। সেখানে এক আন্টি ও তার তিন ছেলেমেয়ের সাথে নতুন করে জীবন শুরু করে।

টেরি এর পরের বিশ বছর ১৯৬১’র নভেম্বরের ওই রাত নিয়ে আর কারো সাথেই কোনো আলাপ করেন নি।

২০১০ সালে সাক্ষাৎকার দেওয়ার সময় টেরি জো।

পরে ১৯৮০ সালের দিকে এসে খুব কাছের কিছু বন্ধুর সাথে তার অভিজ্ঞতা খুলে বলা শুরু করেন তিনি। এর ফলে তাকে মনস্তাত্ত্বিক পরিচর্যার সাহায্য নিতে হয়। তারপর ধীরে ধীরে বন্ধু লোগানের সাথে মিলে তিনি লিখে ফেলেন বই ‘অ্যালোন : অরফ্যানড অন দ্য ওশান’। বইটাতে সেই রাতের ঘটনার গভীর ও বিশদ বিবরণ রয়েছে। অবশেষে ২০১০ সালের মে মাসে তার বইটি প্রকাশিত হয়—সেই দুঃসহ স্মৃতির প্রায় অর্ধশত বছর পর।

আশ্চর্যজনকভাবে, বইয়ের বিক্রি ও প্রচারণার সময় টেরির অতীত জীবনের কিছু মানুষের সাথে নতুন করে দেখা হয়। ‘ফোর্টি এইট আওয়ার্স’ এর সাথে এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, “৪৯ বছর আগের কয়েকজন শিক্ষক দেখা করতে আসেন আমার সাথে। এতদিন আমার সাথে কথা বলে সাহায্য করতে না পারায় তারা দুঃখপ্রকাশ করেন। তাদেরকে বলা হয়েছিল তারা যেন আমার সাথে সেই প্রসঙ্গে আর আলোচনা না করেন। তাই আমাকে চুপচাপ থেকেই বড় হতে হয়েছে।”

‘অ্যালোন : অরফ্যানড অন দি ওশান’ বইয়ের প্রচ্ছদ।

টুডে নিউজ’কে তার শৈশবের সেই ভয়াবহ স্মৃতির ব্যাপারে তিনি বলেন, “আমি কখনোই ভয় পাই নাই। ছোটবেলায় আমি সবসময় বাইরে বাইরে ঘুরে বেড়াতাম। সাগর-নদীতে সময় কাটানো আমার খুবই প্রিয় একটি কাজ ছিল। আর তাছাড়া আমার বিশ্বাস ছিল প্রচণ্ড। আমি শুধু ঈশ্বরের কাছে প্রার্থনা করে গিয়েছি। এরপর যা হবার হয়েছে।”

এমনকি তিনি এখনো পানির আশেপাশেই কাজ করেন। এই বই লেখা ছিল তার মানসিক অস্থিরতা কাটিয়ে ওঠার অন্যতম উদ্দেশ্য। যারা নিজেদের জীবনের ট্র্যাজেডিকে কাটিয়ে ওঠার চেষ্টা করছেন—এই বই পড়ে তারা কিছুটা আস্থা ফিরে পাবেন বলেই তার ধারণা। “আমি সবসময়ই বিশ্বাস করতাম আমার জীবন নিয়ে ফেরত আসার নিশ্চয়ই কোনো কারণ আছে। কিন্তু নিজের এই গল্প শুনিয়ে মানুষের মনে আশাবাদ ছড়িয়ে দেওয়ার ইচ্ছাশক্তি অর্জন করতে আমার পঞ্চাশ বছর লেগে যায়।”