page contents

‘মাল্টিটাস্কিং’

শেয়ার করুন!

দইয়ের ইদানীংকার ভাণ্ড যেমন হয় তেমনই। মানে প্লাস্টিকের কাপের মতো ওই বস্তুগুলো। পয়লাতে বুঝি নি যে দই। বা ভাবিও নি যে কী। কোনো কৌতূহল জাগে নি। কিন্তু দ্বিতীয়বার চোখ পড়তেই ভাণ্ড বা প্রকৃতার্থে পেয়ালাগুলোর দিকে চোখ পড়ে। এর আগে আমি কখনো স্বচ্ছ কাপে দৈ দেখেছি বলে মনে পড়ে না। আইসক্রিম আকছার দেখেছি। আবার এগুলো দৈ না হয়ে আইকা বা রঙের কৌটা অনায়াসেই হতে পারত। অন্তত কৌটায় থাকলেই তিন-চার হাত দূর থেকে তাকে দৈ ভাবতে হবে এমন কোনো বাধ্যবাধকতা নেই। কিন্তু ফ্রিজের মধ্যে খাবার-পানীয়র পাশে ওরকম মর্যাদা দিয়ে রাখা কোনো কৌটাকে অখাদ্য ভাবতে চাইছিলাম না।

আমার চোখে চশমা ছিল, মোবাইল পর্দার দিকে মনোযোগের কারণে। সেটা নামিয়ে ভাল করে দেখি। কিছু একটা নামও লেখা। জানা মতে আমার দূরদৃষ্টিতে চশমা লাগে না, হ্রস্বদৃষ্টিতেই কেবল লাগে। তাও ভালমতো পড়া গেল না। অবশ্য ছোট দোকানের হাত তিনেক জায়গাকে বিশেষ দূর ভাবারও কারণ নেই। তবে গোল কৌটার গায়ে নাম বেঁকে গেছে বলেও নাম না পড়া যেতে পারে। আমি চশমা আর চোখের যুগল সঙ্কট নিয়ে পেরেশান না হয়ে দোকানিকে জিজ্ঞেস করেই বসলাম, “ওগুলো কী?”

এই দোকানিকে আমি তাঁর নাম বারকয়েক জিজ্ঞেস করেছি। তিনি শাহাদাত বা এখলাস বা ইসাহাক বা কিছু একটা বলেছেন। একদিনে জিজ্ঞেস করি নি। নানান দিনে। প্রতিবারই কাছাকাছি আন্তরিকতায় তিনি উত্তর দিয়েছেন। বা চেষ্টা করেছেন। আজকেও তাঁকে কৌটার দ্রব্য প্রসঙ্গে জিজ্ঞেস করবার সময়ে নামটা ডেকে জিজ্ঞেস করবার সপ্রতিভতা দেখাতে গিয়ে দেখলাম যেকোনো নাম মনে পড়ছে। একটা বিশেষ কোনো নাম মনে পড়ে না। এর আগে অনেকদিন আমি এঁর ভাইকেও নাম জিজ্ঞেস করতাম। বড় ভাই বা ছোট ভাই। সেটাও জিজ্ঞেস করে জানা। কিন্তু এখন কিছুতেই মনে নেই। তখন সেই ভাই নিয়মিত বসতেন। তারপর দ্বিতীয় বা তৃতীয় বারের মতো তিনি আবার ‘মধ্যপ্রাচ্য’ গেছেন। দুবাই বা সৌদি আরব। এখন মনে নেই। সেটাও জিজ্ঞেস করেছিলাম। এই শাহাদাত, যদি হন, তিনিও ৬/৭ টা দেশে বিভিন্ন সময়ে গেছেন, থেকেছেন, ১২ বা ১৮ বছর বাইরে ছিলেন। ১৬ও হতে পারে। এসব গল্প হয় আমাদের, আমার বিশ্ববিদ্যালয়ের বাস আসবার আগে। তাঁর দোকানের নানাবিধ পরিষেবার মধ্যে একটা মেশিনের-চা পাওয়া যায়। মোমকাগজের কাপে চা-টা চায়ের মতোই রং ও মিষ্টি, দামও মাত্র ৬ টাকা। তবে স্বাদবিচারে পদার্থটিকে চা বলে পরিচয় করিয়ে না দিলে চেনা খুব কঠিন।

শাহাদাত জানালেন দৈ। তাঁর সহায়তায় নামও উদ্ধার হলো—‘ডেলিশাস দৈ’। খুব ইচ্ছে হলেও এক কৌটা আমি যন্ত্র-চায়ের পাশাপাশি দিতে বললাম না। শাহাদাত মৃদু একটা বিক্রয়-প্রস্তাব করেছিলেন, বা হয়তো উপহার। “এক কাপ খেয়ে দেখেন।” আমি রুচির দোহাই না তুলে বরং চায়ের রুচির দোহাই তুললাম। ভেবে দেখলে ওই চা খাবার পর, বা আগে, যে কোনো বস্তুই খেয়ে ফেলতে পারার কথা। দৈ-টা নিয়ে আমার বিশেষ কোনো সংশয় সন্দেহও ছিল না। নেহায়েৎ তখন খেতে ইচ্ছে হয় নি। আমি চায়ের স্বাদের মাহাত্ম্য বিবরণী করে দৈ থেকে পরিত্রাণ নিলাম।  পরের দিনগুলোতেও আর খাওয়া হয় নি। শাহাদাতও, যদি হন, কখনো সেটার জন্য পীড়াপিড়ি করেন নি। এমনিতে তিনি স্নিগ্ধ নন-এসার্টিভ ধরনের মানুষ। ‘মধ্যপ্রাচ্য’ ভ্রমণের কোনো বিশেষ অভিজ্ঞতা বা বাংলাদেশের সঙ্গে সে সবের কোনো তুলনা বা মুদ্রামর্যাদা পার্থক্য বলার সময় ছাড়া তাঁকে, আমাদের ওটুকু সম্পর্কে, কখনো কিছু জোর দিয়ে বলতে দেখা যায় না। যা হোক, দৈ বিষয়ক নানান প্রশ্ন আমার মাথায় ছিল। কোনটি করা সমীচিন হবে ভেবে আমি ‘কারা দিয়ে যায়’ পর্যন্ত কিছু একটা প্রশ্ন করার প্রাক্কালেই শাহাদাত তাঁর অতি অল্প থুতনিকেন্দ্রিক দাড়ি উঁচিয়ে সামনের দিকে ‘ওই তো হুজুর দিয়া যায়’ বলে ফেলেছেন। আমি দুই হাত বাই তিন হাত দোকানের চওড়ার দিকটাতে দাঁড়ানো। ‘হুজুর’ ছিলেন একদম সামনে। এতক্ষণ ঝুলিয়ে-রাখা প্লাস্টিকের খাবার সম্ভারের আড়ালে তাঁকে যেকোনো একজন খদ্দের হিসেবেই ভাবছিলাম আমি।

যাঁকে ‘হুজুর’ বলা হলো তিনি ২৫/২৬-এর এক যুবক হবার কথা। শাহাদাতের থেকে তাঁর দাড়িকে বলিষ্ঠ মানতে হবে, তবে তাঁর দাড়িও থুতনি-অঞ্চল থেকে বিশেষ বিস্তৃত হবার অবকাশ পায় নি। তিনি প্রতি বা কিছু ভোরে ফজরের নামাজের কিছুক্ষণ পর তৈরি হয়ে ব্যাগে ভরে এসব দৈ-এর কৌটা বিভিন্ন দোকানে সরবরাহ করেন। শাহাদাত যেমন আজ এক ডজনের প্যাকেট নিল। ‘হুজুর’ মৃদুস্বরে দুই ডজনের পক্ষে দরকষাকষি করছেন বলে তখন টের পেলাম। তাঁর নামও আমি না জিজ্ঞেস করে থাকতে পারি নি। মনে নেই। হয়তো রফিক বলেছিলেন, কিংবা সামাদ, আলিও হতে পারে। যা হোক, রফিক একটা পর্যায়ে দ্বিতীয় ডজন-প্যাক না গছাতে পেরেই অন্য দোকানের উদ্দেশ্যে হাঁটা শুরু করেন। তিনি হেঁটেই এই কাজ করেন। রফিকের শান্ত ও অন্তর্গত উপস্থিতিতে আমি আর দৈ-এর উৎস ও চলাচল বিষয়ে কোনো প্রশ্ন করবার মানসিক প্রস্তুতি নিতে পারলাম না। তারপর তো চলেই গেলেন। তিনি যে বাসায় বসে বসে দৈ বানান না সেটা আমি জানি বিধায় খচ খচ নিয়েই দৈ না খেয়ে চা শেষ করলাম।

শাহাদাত দৈয়ের উৎস বিষয়ে খুবই ঢিলেঢালা বা ঢালাও কিছু বললেন। “বোধহয় আশুলিয়া নাকি ভেড়িবাঁধ দিয়া আসে দৈ, এ্যার কাছে দিয়া যায়।” তো কীভাবে দিয়া যায়? আমার আগ্রহে শাহাদাত বিরক্ত হয়। “অত জানি না।” দৈ বিষয়ক আগ্রহ আমার ব্যাপক, কিন্তু জ্ঞান তখন বা এখন পর্যন্ত বিকশিত হয় নাই। বরং ও খানিক উৎসাহ নিয়ে বলে রফিক যে কেবল এই কাজই করেন না সেই বিষয়ে। রফিক একটা মাদ্রাসার শিক্ষক। সকাল সকাল দোকানে দোকানে দৈ সরবরাহের পর তিনি কল্যাণপুর বা ইব্রাহিমপুরের কোনো একটা মাদ্রাসায় গিয়ে পড়াবেন। দুপুর পর্যন্ত তাঁর সেটাই কাজ। তিনি থাকেনও ওই অঞ্চলের  একটা নিবিড় বসবাসের কোনো একটা বাসাতে।

শাহাদাত ‘মেস’ই বললেন। আমার কোনো সন্দেহ নেই যে পেশার জীবনী ভাবলে দৈ-বিক্রি রফিকের অপেক্ষাকৃত নবীন পেশা। মাদ্রাসার শিক্ষকতাই তাঁর আদিপেশা। তবে তাঁর বয়স বিবেচনা করলে সেটাও অনন্তকাল ধরে করার কথা নয়। আমি যখন মনে মনে রফিকের ও তাঁর দৈয়ের জীবনচক্র জীবনচলাচল ভাবছি তখন শাহাদাত বেশ জোর দিয়ে জানালেন “হ্যায় ইমামতি করে তো।” শাহাদাতের দিকে তাকিয়ে আমি জিজ্ঞেস করলাম “মাদ্রাসার সঙ্গেই মসজিদে?” “হুমম, ওইরকমই।” শাহাদাত তাঁর ধারণাসমেত সায় দিলেন।

পড়ুন: মানস চৌধুরীর আরো লেখা

রফিকের সঙ্গে আর দেখা হয় নি এরপর। আমি দোকানের ফ্রিজের স্বচ্ছ ডালার মধ্য দিয়ে তাকিয়ে দৈয়ের কোনো ভাণ্ড খুঁজি। দুয়েকদিন চোখে পড়ে নি। দৈয়ের ভাণ্ড খুঁজতে খুঁজতে আমি শাহাদাতকে রফিকের কথা জিজ্ঞেস করি। আমি অবশ্য বলি “হুজুরের খবর কী।” শাহাদাত নিস্পৃহ গলায় বলেন “আসছিল তো।” আমি বলি “ভাল আছেন তিনি?” শাহাদাত কিছু একটা বলেন। আমার প্রশ্নে সন্তুষ্টি বা অসন্তুষ্টি বোঝা যায় না। ভাবতে বসলে অসন্তুষ্টই মনে হয়। আর রফিকের ‘থাকার দশা’ বিশেষ অনুধাবন হয় না। তিনটি পেশার অধিকারী রফিক কেমন আছেন তা নিয়ে আমি কতটা মাথাব্যথী তা নিজেও আমি বিশেষ ওয়াকিবহাল নই। ইমাম রফিক। মাদ্রাসার শিক্ষক রফিক। দৈয়ের ফিরিওয়ালা রফিক। আমি শেষোক্তকে সামান্য চিনি। অন্য দুজনকে চেনার আগ্রহ আমার আছে বলেই মনে হয়। কিন্তু সময় করে যে চিনতে বেরোব তা মনে হয় না। এসবের মধ্যেই শাহাদাত সেদিন অপেক্ষাকৃত আগ্রহী গলায় বলল, আমার প্রশ্নের উত্তরে “দেশের যে অবস্থা! কেমন থাকবে… বোঝেন না? মেসে টেসে হুজুররা খুবই টেনশনে আছে।”

আমি ভাবলাম আমাদের ‘হুজুর’, হয়তো রফিকই, যদি দেশের অবস্থায় টেনশনে নাও থাকতেন, দৈ আর শিক্ষকতা আর প্রার্থনার নেতৃত্ব পেঁচিয়ে নিয়ে কেমন থাকতেন! স্যুরিয়েল রফিক!

… মে ২০১৭ থেকে… ১৬ জুলাই ২০১৭।। আদাবর

কমেন্ট করুন

মন্তব্য

About Author

মানস চৌধুরী
মানস চৌধুরী

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে নৃবিজ্ঞান বিভাগে মাস্টারি করে নির্বাহ করি। গল্প, কলাম ইত্যাদি লিখি। সুযোগ পেলে পর্দায় অভিনয়ও করি।

Leave a Reply